সৌম্য ভট্টাচার্য
বাঘুয়ার কথা শেষ হতে-না-হতেই এক বিশাল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল। চাঞ্চল্যের উৎস ভোঁদড় বুড়ি। ডোরা, ডোনারা তাকে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে দেখে কুমিরের গুহা থেকে বেরিয়েছে। কোন ফাঁকে ঘুম থেকে উঠে সে এতক্ষণ বাঘুয়ার কথা মন দিয়ে শুনছিল। এবার সে হুমড়ি খেয়ে বাঘুয়ার পায়ের ওপর পড়ল।
‘বাঘুয়া রে! তুই শেষপর্যন্ত ফিরলি! সব্বাই ভেবেছিল যে, তুই মরে গেচিস! আয় বাবা! তোর চাঁদমুখে চুমো খাই!’ বলে ভোঁদড়বুড়ি বাঘুয়াকে চোখের জলে বুক ভিজিয়ে আদর করতে লাগল। ‘বাঘুয়া রে! আজ আমার জীবন সাত্থক হল! তোকে আবার দেকব বলেই তো পরানটা এতদিন যাই-যাই করেও যায়নি।’
বুড়ির আদরে বাঘুয়ার প্রাণ ওষ্ঠাগত হবার উপক্রম। যতই সে ‘থাক! থাক!’ করে, ততই ভোঁদড়বুড়ি তাকে চুমু খায় আর চোখের জল ফেলে।
ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল আর অন্য জন্তুজানোয়াররা অবাক হয়ে দেখছিল। ভোঁদড়বুড়ি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে, চোখের জল ফেলে আর চুমু খায়। তারপর হঠাৎ সে ধুপ করে মাটিতে বসে পড়ল। তার কান্না থেমে গেল। একধারে গড়িয়ে শুয়ে পড়ল সে।
সনাতন, সনাতনগিন্নি, হ্যাংলা, ল্যাংড়া আর খাই-খাই ব্যস্ত হয়ে দৌড়ে এল। ভোঁদড়-বুড়ি চুপ করে হাতপা চিতিয়ে শুয়ে আছে। তার চোখের তারা উলটে গেছে। মুখে এক দারুণ তৃপ্তি আর প্রশান্তির ছাপ।
বাঘুয়া গম্ভীর হয়ে বলল, ‘উনি চলে গেছেন।’
‘চলে গ্যাচেন?’—সনাতন আর্তনাদ করে উঠল। ‘কোতায়?’
—যেখানে গেলে কেউ আর ফেরে না। আর ফিরবেন না উনি। আমাকে শেষ দেখা দেখবার জন্যই এতদিন বেঁচেছিলেন।
—তুমি বাঁচিয়ে দিতে পারো না? তোমার এত ক্ষমতা?
—আমি মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারি না, সনাতন। সে ক্ষমতা, সে শক্তি আমার নেই।

-কালাপাহাড় !মেঘের আড়াল থেকে তির ছুড়ছে !
বাঘুয়ার কথা শেষ হল না। এতক্ষণ উজ্জ্বল আকাশে ঝলমল করছিল সূর্য। হঠাৎ সূর্যের আলো ঢেকে গেল অন্ধকারে। সারা আকাশ জুড়ে এক বিশাল কালো ছায়া পক্ষবিস্তার করেছে। রোদের তাপ মুছে গিয়ে বইতে লাগল হিমেল বাতাস। এমন সময় ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু সেই অদ্ভুত আওয়াজটা আবার শুনতে পেল—সাপের ফোঁস ফোঁস, বেড়ালের মিউ মিউ আর হায়নার হাসি একসঙ্গে মিললে যে ভয়াবহ, ভৌতিক শব্দের সৃষ্টি হয়, তাই যেন তাদের একদম মাথার ওপর থেকে ভেসে আসছে।
আওয়াজটা শুনে বাঘুয়া থমকে গেল। তার শরীরের সমস্ত রোঁয়া ফুলে উঠল রাগে। সশব্দে ল্যাজ আছড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে সে গর্জন করে উঠল। প্রত্যুত্তরে বৃষ্টির ধারার মতো আকাশ থেকে নেমে এল তিরের ঝাঁক। মেঘের আড়াল থেকে কেউ অবিরল ধারায় তির ছুড়ছে। ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুর চারপাশে ঝাঁকে ঝাঁকে তির এসে মাটিতে গেঁথে যেতে লাগল।
হঠাৎ সুষমার কর্কশ গলার স্বর ভেসে এল। সে ডানা ঝাপটে উড়ছে— ‘পালাও তোমরা! গভীর জঙ্গলে পালাও! গাছের তলায় লুকিয়ে পড়ো!’
—‘এ কে?’ চেঁচিয়ে উঠল ডোনা।
—কালাপাহাড়! মেঘের আড়াল থেকে তির ছুড়ছে! এর সঙ্গে এখন পারবে না। পালিয়ে প্রাণ বাঁচাও।
বাঘুয়ার গায়ে এর মধ্যেই দু-তিনটে তির লেগেছে। সে গ্রাহ্যই করল না। গা ঝাড়তেই তিরগুলো খসে গেল। হলুদ ডোরা কাটা শরীরে ক্ষীণ রক্তের ধারা। বাঘুয়া একবার গা-টা চেটে নিলে। তারপর বললে, ‘বাচ্চারা। দেরি কোরো না। এক্ষুনি আমার পিঠে চেপে বসো।’
মিতুল বলল, ‘ভোঁদড়বুড়ি! তার কী হবে?’
বাঘুয়া বলল, ‘সনাতনের মায়ের বয়েস হয়েছিল। বিধির বিধান কে খন্ডাতে পারে? সনাতন, তোমার মাকে জলে ভাসিয়ে দিয়ে তোমরা পালিয়ে যাও। পরে আবার দেখা হবে।’
চোখের জল মুছতে মুছতে সনাতন, সনাতনগিন্নি, হ্যাংলা, ল্যাংড়া আর খাই-খাই ভোঁদড়বুড়ির দেহ নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে জলের গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। পেছু পেছু গেল কুমির, কুমিরগিন্নি আর জলহস্তীরা।
এদিকে ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু বাঘুয়ার প্রশস্ত পিঠে চেপে বসেছে।
‘শক্ত করে ধরো’—বলল বাঘুয়া।
প্রাণপণে বাঘুয়াকে আঁকড়ে ধরল চারজন— যেন খুব কোমল, নরম কার্পেটের ওপর বসেছে। চারজনকে পিঠে নিয়ে উল্কার বেগে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গেল বাঘুয়া। পেছন পেছন গেল ইঁদুর, বাদুর, সজারু, ছুঁচো, বেজি, ভাম, শেয়াল, ভাল্লুক, গন্ডার— এমনকী হাতি পর্যন্ত। বাঘুয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে লাগল চিতাবাঘ আর গুলেবাঘ। এদের কারো কারো গায়ে তির লেগেছে। রক্ত পড়ছে। যে ময়ূরটি পেখম তুলে নাচছিল, গলায় তির বিঁধে সে মারা গেছে। কালাপাহাড়ের দুঃসাহসিক অভিযানে মৃত বলতে এই একজনই। তবে অল্পবিস্তর আহত অনেকেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন