সৌম্য ভট্টাচার্য
বাঘুয়ার দৃপ্ত বক্তৃতায় যক্ষপুরীর ভিত থর থর করে কেঁপে উঠল।
মকররাজ পেটের ভেতরে শূলবেদনা অনুভব করলেন। শেয়ালপন্ডিতের বুক ধড়ফড় ধড়ফড় করে উঠল। যে দীর্ঘ কালো ছায়া কালাপাহাড়ের সামনে সামনে যায় তা হ্রস্ব হয়ে গেল। বিষ আর অ্যাসিড দিয়ে যক্ষপুরীর যে-ফুলগাছগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো আবার মাটি ভেদ করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।
দুখিনী বাংলা মা মকররাজের যক্ষপুরীতে একলা শুয়ে শুয়ে চোখের জল ফেলেন—তাঁর মুখেও হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। যেডাইনি প্রতিদিন তাঁর ঘায়ে বিষ ঢালে, তার মাথা এমন গোলমাল হয়ে গেল যে, ডোজ বাড়ানো তো দূরস্থান, সে বিষ ঢালতেই ভুলে গেল।
যে খিদমতগার প্রতিদিন নিয়মমতো দু-বার করে বাংলা মা-র ঘরের মধ্যে বিষের ধোঁয়া ছাড়ে তার বুকে এমনই কাঁপুনি ধরল যে, সে কম্বল মুড়ি দিয়ে চুপচাপ নিজের ঘরের মধ্যে শুয়ে রইল। খোক্কোস অমাত্যরা ঘন ঘন হেঁচকি আর উদগার তুলতে লাগল। বৈদ্যরা ছোটাছুটি করতে লাগলেন।
যক্ষপুরীতে যখন এমন চাঞ্চল্য, তখন বাচ্চারা বাঘুয়াকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। তাদের মনে অনেক প্রশ্ন।
নীলু জিগ্যেস করল, ‘বাঘুয়া, আমাদের দলে কোনো মানুষ নেই?’
—অল্প কিছু থাকবে। বেশির ভাগই পশুপাখি।
—কেন, বাঘুয়া?
—আসলে মানুষের মধ্যে বিষ এমনভাবে ঢুকে গেছে যে, তা তাড়ানো খুব কঠিন। পশুপাখিরা অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় আছে, কারণ তারা বিষের বড়ি তেমন খায়নি।
—মানুষ ছাড়া আমরা কি সফল হব, বাঘুয়া?
—কেন, রামচন্দ্র কি সফল হননি? তাঁর সঙ্গে ক-জন মানুষ ছিল?
ডোনা বলল, ‘রামচন্দ্র কে, বাঘুয়া?’
—রামচন্দ্র কে! তোমরা রামায়ণ পড়োনি?
—না, আমরা হ্যারি পটার পড়েছি! রামায়ণটা পড়া হয়নি!
—আগে রামায়ণ, মহাভারত না পড়ে, হ্যারি পটার পড়েছ! আশ্চর্য!
বাঘুয়া দু-বার খাবি খেয়ে চোখ কপালে তুলে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর বাচ্চাদের সে রামায়ণের গল্প শোনাল। রামের চোদ্দো বছর বনবাসের কথা—রাবণের সীতা হরণের কথা—হনুমানের লঙ্কাদহনের কথা—বানরসৈন্য নিয়ে লঙ্কাজয়ের কথা—সীতার উদ্ধারের কাহিনি। শুধু সীতার পাতালপ্রবেশের গল্প বাঘুয়া বলল না। সে বড়ো দুঃখের কাহিনি। বাচ্চারা শুনলে কষ্ট পাবে। গল্প শেষ করে বাঘুয়া বলল, ‘বুঝলে, রাম-লক্ষ্মণের সঙ্গেও কোনো মানুষ ছিল না। বানর, ভাল্লুক, বনের পশুপাখি নিয়েই রামচন্দ্র লঙ্কাজয় করেছিলেন।’
ডোনা দেখল যে, গল্প শেষ করার পরও বাঘুয়া একদৃষ্টে তার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে আছে। তার দৃষ্টি বিষণ্ণ।
‘কী দেখছ?’ জিগ্যেস করল ডোনা।
—তোমার পেছনে একটা কালো ছায়া দেখছি, ডোনা।
—কোথায়?
বাঘুয়া তখন ডোনাকে একদিকে টেনে নিয়ে গেল। অন্য বাচ্চাদের থেকে দূরে— যাতে তারা ওদের কথা শুনতে না পায়।
ডোনা দেখল যে, বাঘুয়া তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। কিছু একটা পড়ার, কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে। ডোনা প্রথমে বেশ অস্বস্তি বোধ করল। সংকোচে তার মাথা নীচু হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য সে সাহস সঞ্চয় করে মাথা তুলে বাঘুয়ার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে চাইল।
বাঘুয়া বলল, ‘তুমি খুব বুদ্ধিমতি, ডোনা। কিন্তু একই সঙ্গে খুব চঞ্চলমতিও।’
ডোনা বলল, ‘সেটা আমার দোষ নয়। দ্যাটস নট মাই ফল্ট!’
বাঘুয়া এক গাল হাসল, ‘না না, দোষ কেন হতে যাবে। বাচ্চারা তো এ-বয়সে চঞ্চলমতি একটু হবেই।’
—তাহলে?
—তুমি খুব সাবধানে থেকো, ডোনা। কখনো তোমার বন্ধুদের কাছ ছেড়ো না।
—কেন?
—আমি তোমার সামনে ভীষণ বিপদ দেখছি, ডোনা। একটা কথা বলে রাখি—পথে, ঘাটে কক্ষনো কারো দেওয়া কোনো খাবার খাবে না— সেটা যত লোভনীয়ই হোক।
—কেন?
উত্তরে বাঘুয়া বলল, ‘অত প্রশ্নের জবাব আমি এক্ষুনি দেব না। শুধু মনে রাখো যে, বন্ধুদের কাছছাড়া হবে না। বাইরে কারো দেওয়া কোনো খাবার খাবে না।’
বলে বাঘুয়া শূন্যে থাবা বাড়িয়ে কোত্থেকে একটা কাপড়ের মোড়ক এনে ডোনাকে দিল।
—কী এটা?
—এতে কিছু আমসত্ত্ব আছে। বাংলা মায়ের আমসত্ত্ব। খুব, খুউব যদি খিদে পায়, তাহলে একটা আমসত্ত্ব খেলেই পেট তোমার ভরে যাবে। চব্বিশ ঘণ্টা আর খিদে পাবে না। এটা খুব যত্নে তোমার কাছে লুকিয়ে রেখো। কেউ যেন জানতে না পারে।
ডোনা আমসত্ত্বের মোড়কটা নিয়ে তার জামার ভেতরের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর দু-জনে আবার ফিরে গেল যেখানে ডোরা, মিতুল আর নীলু অপেক্ষা করছে।
‘ডোনাকে কী বললে, বাঘুয়া?’ ডোরা, মিতুল আর নীলু সমস্বরে প্রশ্ন করল।
উত্তরে অবশ্য ডোনা কিছু বলল না। বাঘুয়াও রহস্যময় হেসে চুপ করে রইল।
হঠাৎ নীলুর খেয়াল হল, ‘বাঘুয়া! তুমি যে বলেছিলে রাখিসংগীতের সুর, তাল, লয় শিখিয়ে দেবে?’
বাঘুয়া আকর্ণবিস্তৃত হাসল, ‘আমি তোমাদের শেখাব? বাঘের গলায় কি গান আসে? ভালো মাস্টার পাকড়েছ!’
—তবে কে শেখাবে আমাদের?
—সে-ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তার আগে রাখি দুটো দেখি?
ডোনা আর নীলুর পকেট থেকে রাখি দুটো বেরোল। বেশ বড়ো হলুদ সুতোর রাখি। সোনালি জরি আর পুঁতি বসানো। এ ক-দিন ওরা নিয়মিত রোদ খাইয়ে খাইয়ে রাখি দুটো শুকনো করে রেখেছে। শুকনো ঝকঝকে পরিষ্কার রাখিগুলো থেকে জেল্লা ঠিকরে বেরোচ্ছে।
বাঘুয়া মুগ্ধ বিস্ময়ে রাখিদুটোর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর বলল, ‘বা:! চমৎকার! তা এগুলো নিয়ে কী করতে হবে, জানো তো?’
‘বাংলা মায়ের হাতে পরিয়ে দিতে হবে।’ সমস্বরে বলল চার বাচ্চা।
—বেশ, তবে আগে রাখিসংগীতটা ঠিকঠাক গাইতে হবে। গান গাওয়া শেষ হলে তবেই মায়ের ডান হাতে দুটো রাখি তোমরা পরাবে। মনে রেখো—বাঁ হাতে নয়। তবে ডোনা, তুমি তোমার রাখিটা দিদিকে দিয়ে দাও।
বাঘুয়ার প্রস্তাবে ডোনা আপত্তি করল না। চুপচাপ তার রাখি ডোরাদিদিকে দিয়ে দিল।
মিতুল জিগ্যেস করল, ‘কেন? ডোনার রাখিটা ডোরাকে দেওয়া হল কেন?’
বাঘুয়া থমকে গিয়ে বলল, ‘সব প্রশ্নের জবাব হয় না, মিতুল। ধরে নাও এটাই আমার নির্দেশ। চলো, আমার পেছু পেছু চলো। তোমাদের গান শেখাতে নিয়ে যাই।’
বাঘুয়ার কন্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে, মিতুল আর প্রশ্ন করতে সাহস পেল না। বাচ্চারা দেখল যে, মাঠ ফাঁকা হয়ে গেছে। দধিকর্মার ছুঁচোর ফৌজ কেল্লার মধ্যে ঢুকে গেছে। অন্য পশুপাখিরা অদৃশ্য। সনাতন ভোঁদড় আর দেঁতো কুমিরকেও দেখা যাচ্ছে না। ওরা তখন বাঘুয়ার পেছন পেছন সুঁড়িপথ বেয়ে ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন