সৌম্য ভট্টাচার্য
কালনেমির কথা শুনে ডোনার মাথায় তালগোল পাকিয়ে গেল। এতদিন যার সঙ্গে তারা উঠেছে, বসেছে, পিঠে চড়ে ঘুরেছে, সেই বিশাল বাঘ তাহলে বাঘুয়া নয়? নটসূর্য নাড়ুগোপাল বাঘুয়া সেজে তাদের সঙ্গে ছলনা করেছে? তাদেরকে বোকা বানিয়েছে? ভাবতে ভাবতে ডোনার গা-হাত-পা ঝিমঝিম করতে লাগল। অবসন্ন হয়ে সে ধুপ করে ঝোপের মধ্যে বসে পড়ল।
কালনেমি বলল, ‘নটসূর্য নাড়ুগোপাল কী না পারে? কখনো লেনিন, কখনো স্ট্যালিন, কখনো মাও-সে-তুং, কখনো-বা সুভাষ বোস! যাই সাজতে বলো, সে সেজে দেখিয়ে দেবে! হুবহু! আসল-নকল তফাত করা যায় না! এমনকী সে পেলে পর্যন্ত সেজেছিল!’
—পেলে?
—হ্যাঁ গো! ফুটবল খেলে, সেই বিখ্যাত পেলে!
—নটসূর্য নাড়ুগোপাল পেলে সেজেছিল?
—আর বলো কেন? যক্ষপুরীর কিছু পাজি খোক্কোস টাকা তুলবে বলে পেলের নাম দিয়ে বড়ো বড়ো ইস্তাহার টাঙিয়েছিল। অমুক দিন পেলে নাকি স্বয়ং এসে খোক্কোসভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবল খেলবেন— এই বলে তো এন্তার টিকিট ব্ল্যাক করেছিল।
—টিকিট ব্ল্যাক কী জিনিস?
—‘না, তুমি নেহাতই নাবালিকা!’ কালনেমি অনুকম্পার হাসি হাসল, ‘টিকিট ব্ল্যাকও বোঝো না? পঞ্চাশ টাকার টিকিট পাঁচশো টাকায় বিক্কিরি করছিল গো। এটাকেই তো বলে ধনতন্ত্র!’
—ও আচ্ছা।
—তা যেদিন পেলের আসার কথা, সেদিন ইস্তাহার আর বিজ্ঞাপনের জেরে তো খোক্কোসভারতী ক্রীড়াঙ্গন কানায় কানায় ভরতি। এমনকী উৎসাহের চোটে অনেকে আশপাশের বটগাছে, তালগাছে চড়েও বসে আছে। বসে আছে আর গরমে, রোদে ভাজা ভাজা হচ্ছে। কিন্তু পেলের দেখা নেইকো!
—তারপর?
—বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তো আ-খোক্কোস, ছা-খোক্কোস বেজায় খেপে গেল। মাঠে ইট-পাথর ছুড়তে লাগল। পটকা ফাটাতে লাগল। চিৎকার করে বলতে শুরু করল, ‘পেলের নাম করে এ কী ছেলেখেলা চলছে? টিকিট ব্ল্যাকারদের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও!’
—তো?
—তখন যে খোক্কোসরা টিকিট ব্ল্যাক করেছিল, তাদের সর্দার হাতজোড় করে বলতে লাগল, ‘মোসাইরা, বোসুন বোসুন। অনেক দূর থেকে এসে পেলে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ওনার একটু আমাসাও হয়েছে।’
কালনেমির গল্প বলার একটা চমৎকার ঢং আছে। একবার শুরু করলে শ্রোতাদের মনোযোগ সে এমনভাবে আকর্ষণ করে রাখে যে, তারা বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। ডোনারও তাই হল। সে ভুলে গেল যে, দলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে— ডোরা, মিতুল আর নীলু এগিয়ে গেছে বহুদূর। মুগ্ধ হয়ে ডোনা সেই ঘনায়মান অন্ধকারে কালনেমির কথা শুনতে লাগল।
—খোক্কোস দর্শকরা বলল, ‘ওসব ছলনায় আমরা ভুলছি না। আপনাদের ভালোমতো চেনা আছে। পেলে, পেলে করছেন। আমরাও দর্জিপাড়ার ছেলে! পেলেকে এনে দেখান, নয়তো ছুরি দিয়ে আপনাদের ভুঁড়ি ফুটো করে দেব।’
—তখন কী হল?
—তখন একজনের মাথায় খেলল যে, আরে পেলে নেই তো কী হয়েছে! নটসূর্য নাড়ুগোপাল তো রয়েছে! তাকেই পেলে সাজিয়ে নামিয়ে দেওয়া হোক!
—নটসূর্য রাজি হলেন?
—আরে শোনো না গল্পটা! নটসূর্য তো তাঁর স্যাঙাতদের সঙ্গে বসে চায়ের সঙ্গে মুড়ি, তেলেভাজা খাচ্ছিলেন। চার-পাঁচজন টিকিট ব্ল্যাকার তাঁর আড্ডায় গিয়ে পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল, ‘নাড়ুগোপালবাবু, বাঁচান! বাঁচান! রক্ষা করুন!’ বলতে বলতে তাদের পকেট থেকে ঝুপ ঝুপ করে পাঁচশো টাকার বাণ্ডিল পড়তে লাগল!
—পাঁচশো টাকার বাণ্ডিল?
—হ্যাঁ গো! টিকিট ব্ল্যাকের টাকা গো! তা নটসূর্যের এক স্যাঙাত তো খুব খচে গেল। বলল, ‘সম্মান দিতে শেখেননি, মশাইরা? নাড়ুগোপাল, নাড়ুগোপাল করছেন! হয় নটসূর্য বলুন নয়তো নাড়ুবাবু বলুন! নাড়ুগোপালটা কোনো একটা কথা হল?’
—তারপর?
—তখন টিকিট ব্ল্যাকার খোক্কোসরা ভেউ ভেউ করে কেঁদে বলল, ‘নাড়ুবাবু, আপনি আমাদের বাঁচান! এই অন্ধকারে আপনিই একমাত্র আশার আলো। নইলে দর্জিপাড়ার খোক্কোসরা ছুরি দিয়ে আমাদের ভুঁড়ি ফুটো করে দেবে! পিঠের চামড়া তুলে তা দিয়ে ডুগডুগি বাজাবে!’ নটসূর্য নাড়ুগোপালের দয়ার শরীর। কান্না দেখে তিনি গলে গেলেন। বললেন, ‘আমাকে কী করতে হবে?’
—আপনাকে পেলে সাজতে হবে।
—পেলে সাজতে হবে? না, না! সে একেবারেই অসম্ভব!
—আপনার পক্ষে সবই সম্ভব। আপনি লেনিন সেজেছেন, স্ট্যালিন সেজেছেন, নেতাজি সেজেছেন, আর পেলে সাজতে পারবেন না? এ তো আপনার কাছে ছেলেখেলা!
নটসূর্য বললেন, ‘সেই কলেজ লাইফে বারদুয়েক খেলেছি। এখন ফর্মও পড়ে গেছে।’
টিকিট ব্ল্যাকার খোক্কোসরা সমস্বরে বলল, ‘আপনার ফর্ম কখনো পড়তে পারে, নাড়ুবাবু? লেনিন, স্ট্যালিন, নেতাজির ফর্ম কখনো পড়তে দেখেছেন?’ এই বলে তো নটসূর্যকে তারা চ্যাংদোলা করে নিয়ে গিয়ে রংচং মাখিয়ে, জার্সি পরিয়ে, পেলে সাজিয়ে খোক্কোসভারতী ক্রীড়াঙ্গনের মাঠে নামিয়ে দিল।
ডোনা রুদ্ধশ্বাসে কালনেমির গল্প শুনছিল। সে বলল, ‘তারপর?’
—তারপর? হাজার হাজার খোক্কোস নটসূর্যকে দেখে চেঁচাতে লাগল— পেলে! পেলে! পেলে! তাইতে নটসূর্য এমন চেগে উঠলেন যে, দু-দুটো গোল করে ফেললেন। কিন্তু হাফটাইমের ঠিক আগে এক দুরাত্মা তাঁকে এমন কষে লেঙ্গি মারল যে, তিনি ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে অবসর নিতে বাধ্য হলেন। পরে কোমরের ব্যথায় পাঁচদিন বিছানায় শুয়েও থাকতে হয়েছিল।
গল্প শেষ করে কালনেমি মুচকি হেসে বলল, ‘বুঝলে ডোনা, যে লেনিন সাজতে পারে, স্ট্যালিন সাজতে পারে, নেতাজি সাজতে পারে, মাও-সে-তুং সাজতে পারে, এমনকী পেলে সেজে দু-দুটো গোল খোক্কোসভারতী ক্রীড়াঙ্গনের মতো জাঁদরেল মাঠে করে ফেলতে পারে, তার পক্ষে বাঘুয়া সেজে তোমাদের বোকা বানানোটা কি খুব একটা কঠিন কাজ?’
কালনেমির প্রশ্নের উত্তর ডোনার কাছে ছিল না। সে অবসন্ন, ঝিমধরা মুখে চুপ করে বসে রইল।
তার অবস্থা দেখে উৎসাহিত কালনেমি বলল, ‘তা ছাড়া আরেকটা জিনিসও ভেবে দেখো। বাঘুয়াকে তোমরা কখনো খেতে দেখেছ?’
‘না তো?’—সত্যি ডোনা বাঘুয়াকে এ ক-দিনে কখনো কিছু খেতে দেখেনি।
—অথচ তোমরা নিশ্চয়ই ভালো ভালো খাচ্চ? সে তো চেহারা দেখেই মালুম হচ্ছে।
প্রতিদিন খাওয়া-দাওয়া আর ফিস্টের বহরের কথা চিন্তা করে ডোনার জিভে জল এসে গেল।
কালনেমি বলল, ‘নিজে না-খেয়ে তোমাদের ভালো ভালো খাবার খাওয়ানোর মতলব কিছু বুঝতে পারছ?’
—কী মতলব?
—তোমাদের খোদার খাসি বানাচ্ছে গো!
—খোদার খাসি?
—হ্যাঁ গো। এখন খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করছে। পরে সময় হলেই হালুম হুলুম করে তোমাদের পেটে পুরবে! বাঘুয়ার আসল মতলব এটাই!
ভয়ে ডোনার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। সর্বনাশ! বাঘুয়ার আসল মতলব তাহলে সেটাই? তাদের খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করে পেটে পোরার অভিসন্ধি? ডোনা দেখল জঙ্গলের মধ্যে রাতের অন্ধকার। ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। কেমন কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ।
সে অবসন্ন গলায় কালনেমিকে বলল, ‘মকররাজ, কালাপাহাড়, শেয়ালপন্ডিত এরা কেমন লোক?’
—ভীষণ ভালো। বাচ্চাদের দেখলেই ওঁরা চকলেট খেতে দেন। মকররাজ তো সারাদেশের সমস্ত ইস্কুলে বিনেপয়সায় চকলেটের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ওনার মতো মানুষ হয় না। একজন সত্যিকারের মহাত্মা।
—লোকে যে ওনাদের সম্বন্ধে অনেক আজেবাজে কথা বলে?
—ওসব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার।
ডোনার মনে হলিউডের স্ক্রিপ্টরাইটার হওয়ার একটা গোপন ইচ্ছে ছিল। সে বলল, ‘আচ্ছা, যক্ষপুরী থেকে হলিউডটা কতদূরে?’
—ও তো যক্ষপুরীর ছাদ থেকেই দেখা যায়। হাত বাড়ালেই হলিউড! তা ছাড়া মকররাজের অনেক টাকা। শিগগির শিগগিরই হলিউডের একটা স্টুডিয়ো উনি কিনবেন।
শুনে তো ডোনা মোহিত হয়ে গেল। বলল, ‘আচ্ছা, তেলেভাজা, ফুলুরির দোকান?’
—কোনো ব্যাপার নয়। যক্ষপুরীর রান্নাঘরটা দেখলে তোমার চোখ টেরিয়ে যাবে। কী ঝক্কাস ব্যাপার-স্যাপার! কী ঘ্যাম-চ্যাক! ওখানে তেলেভাজা, ফুলুরি, কেক, পেস্ট্রি, ফুচকা, আলুকাবলি সব কিছু বানানোর ট্রেনিং তুমি পেয়ে যাবে।
ডোনার মনের সংশয় অবশ্য পুরোপুরি গেল না। সে বলল, ‘আচ্ছা, যক্ষপুরীতে সাংবাদিক, মানে জার্নালিস্ট হওয়া যায়?’
—কেন যাবে না? দৈনিক মিথ্যাসংবাদ-ই তো সাংবাদিক খুঁজছে।
—কিন্তু সাংবাদিকতা তো একটা ডেঞ্জারাস প্রোফেশন? প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে খবর জোগাড় করতে হয়?
—কে বলল তোমায় এসব কথা? যত সব আজেবাজে চিন্তা মাথায় ঢুকিয়েছ! সাংবাদিকরা প্রাণ বিপণ্ণ করে কে বলল? ঠাণ্ডা ঘরে বসে তর তর করে পাতার পর পাতা মিথ্যে কথা যদি বানিয়ে বানিয়ে লিখে যেতে পার, তাহলেই তো তুমি সবচেয়ে বড়ো জার্নালিস্ট! দৈনিক মিথ্যাসংবাদ-এ এ ব্যাপারে স্পেশাল ট্রেনিং-এর বন্দোবস্ত আছে।
ডোনা বলল, স্কুলে ‘ক্রিয়েটিভ রাইটিং’-এ আমি বরাবর খুব ভালো নম্বর পাই।’
—তাহলে তো কথাই নেই। দৈনিক মিথ্যাসংবাদ-এ চাকরি তোমার পাকা। চাইলে মকররাজ তোমাকে সম্পাদকও করে দিতে পারে!
—সম্পাদক, মানে এডিটর!
—এডিটর! একেবারে চিফ এডিটর। দৈনিক মিথ্যাসংবাদ-এর প্রধান সম্পাদকের ওপর মকররাজ বেজায় খেপে আছে কিনা! তার পদটা তুমিই পাবে। আমি কথা দিচ্ছি।
ডোনার সামনে সমস্ত পৃথিবী দুলে উঠল। সে অনুভব করল যে, তার সামনে একটা অনন্ত সম্ভাবনার জগৎ, একটা সব পেয়েছির জগৎ খুলে যাচ্ছে। সে যা চায়, তা-ই সে হতে পারবে। তা সে হলিউডের স্ক্রিপ্টরাইটারই বল, সংবাদপত্রের জার্নালিস্টই বল, বা তেলেভাজা, ফুলুরির দোকানদারই বল।
কালনেমি বলল, ‘মকররাজের মতো একজন আদর্শ মহাত্মা, মহর্ষিকে ছেড়ে দধিকর্মার মতো চোর, বাঘুয়ার মতো জোচ্চোর, সনাতনের মতো ছ্যাঁচ্চোড়, দেঁতো কুমিরের মতো খচ্চরের চ্যালা হয়ে, ইঁদুর-বাদুর-ছুঁচো-বেজির সর্দার হয়ে কী দেশোদ্ধার করবে, ডোনা? আগে নিজে উদ্ধার হও, তবে তো দেশকে উদ্ধার করবে, বাংলা মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন