লেখকের কথা

সৌম্য ভট্টাচার্য

সেই যে রাক্ষসী-রানি? রাজার পুরীতে থানা দিয়া বসিয়াছে তো? আই-রাক্ষস কাই-রাক্ষস তার দুই দূত গিয়া খোক্কোসের মরণ-কথার খবর দিল। শুনিয়া রাক্ষসী-রানি হাঁড়ি মুখ ভারী করিয়া বুকে তিন চাপড় মারিয়া বলিল—‘আই রে! কাই রে! আমি তো আর নাই রে!’

বেহালার মামাবাড়িতে গেছি। দিদিমার কোলের কাছে শুয়ে রূপকথা শুনছি। লোডশেডিং চলছে। আজকের বাচ্চারা লোডশেডিং শব্দটার সঙ্গে পরিচিত নয়। আমাদের শৈশবে এ শব্দটা এক মারাত্মক দ্যোতনা বহন করে নিয়ে আসত। তখন কংগ্রেসের আমল। গণি খান চৌধুরী বিদ্যুৎমন্ত্রী। দুষ্টু লোকে বলত যে—গণি খান চৌধুরী সমস্ত বিদ্যুৎ খেয়ে ফেলেছেন! যাই হোক, লোডশেডিং গল্প শোনার একটা অবকাশও তৈরি করে দিত, বিশেষত মামাবাড়িতে। প্রায় নিরক্ষর দিদিমা—যিনি লাইফ ইনস্যুরেন্সকে বলতেন ‘লাইফ-ইনসারি’, ‘পার্মানেন্ট’কে বলতেন ‘পার্লামেন্ট’—তিনি অনর্গল রূপকথা বলে যেতেন। কোথা থেকে পেতেন দিদিমা রূপকথার এই প্রস্রবণ? নিশ্চয়ই ছাপা বই থেকে নয়। হয়তো রবীন্দ্রনাথের কথাই ঠিক।

এই যে আমাদের দেশের রূপকথা বহুযুগের বাঙালি বালকদের চিত্তক্ষেত্রের উপর দিয়া অশ্রান্ত বহিয়া কত বিপ্লব, কত রাজ্য পরিবর্তনের মাঝখান দিয়া অক্ষুণ্ণ চলিয়া আসিয়াছে, ইহার উৎস সমস্ত বাংলা দেশের মাতৃস্নেহের মধ্যে। যে স্নেহ দেশের রাজ্যেশ্বর রাজা হইতে দীনতম কৃষককে পর্যন্ত বুকে করিয়া মানুষ করিয়াছে, সকলকেই শুক্ল সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ দেখাইয়া ভুলাইয়াছে এবং ঘুমপাড়ানি গানে শান্ত করিয়াছে। নিখিল বঙ্গদেশের সেই চির পুরাতন গভীরতম স্নেহ হইতে এই রূপকথা উৎসারিত।

সেই রূপকথা শুনতে শুনতেই চারপাশে হই হই উল্লাস শুরু হত। ঘরে আলো জ্বলে উঠত। আমরা বুঝতাম, ন-টা বেজেছে। এবার খাওয়ার সময়।

প্রায় সেই সময়েরই কথা। চোখে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে শুয়ে আছি। দু-চোখ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। শুধু আমি নই। সেই কনজানকটিভাইটিস মহামারী আক্রমণ করেছে আমাদের যৌথ পরিবারের সবাইকে। চোখ লাল বড়ো জ্যাঠাইমা আমার শিয়রে বসে চোখ ধুইয়ে দিচ্ছেন।

—আমার কী হয়েছে, বড়োমা?

—একে বলে ‘জয় বাংলা’।

—জয় বাংলা?

—গান শুনতে পাচ্ছিস না?

সত্যি! আবহে মাইকে বাজছে—শোনো, একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কন্ঠে, স্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি, আকাশে বাতাসে ওঠে রণি—বাংলাদেশ! আমার বাংলাদেশ!

—বাদল আজ বর্ডারে গেছে। বাংলাদেশি রিফিউজিদের চাল-ডাল-কেরোসিন দিতে।

বাদল আমার জ্যাঠতুতো দাদা। আমি বলি ‘মেজদা’।

—মেজদা বর্ডারে গেছে?

—হ্যাঁ। এখন তো পাসপোর্ট-ভিসার বালাই নেই। ওদের দলটা রিলিফ দিতে গেছে।

মেজদা ফিরে এলে চেপে ধরি— ‘মেজদা। সত্যিই বর্ডারে গেছিলে? কী দেখলে?’

—হ্যাঁ রে, বর্ডার ক্রস করে দু-তিন মাইল ঢুকে গেছিলাম। বাংলা বাজার।

—কী দেখলে?

—একই দেশ। একই রকম মানুষ। ইশ, দুই বাংলা যদি এক হয়ে যেত!

বছরের মাঝামাঝি ইছামতি নদী বন্যায় ভেসে গেল। আরেক জ্যাঠতুতো দাদা চঞ্চলদারা থাকত বনগাঁয়। ওরা সপরিবারে কলকাতায় চলে এল।

চঞ্চলদা চলে আসায় আমরা খুব উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। বর্ডার সন্নিহিত বনগাঁর টাটকা খবর এবার পাওয়া যাবে।

—ইণ্ডিয়ান সোলজাররা খুব ভালো, বুঝলি। আমাকে দেখলেই চকলেট আর কাজুবাদাম খেতে দেয়।

চঞ্চলদার সৌভাগ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলি।

—একটা বালুচকে ওরা বেঁধে রেখেছে। মুশকো জোয়ান। বাঘের গর্জনের মতো গলার আওয়াজ। সেদিন আমায় ট্যাঙ্কে চড়িয়ে সোলজাররা সারা বনগাঁ ঘোরাল।

আমার বয়স পাঁচ-ছয়। চঞ্চলদা সত্যি কথা বলছে না চালিয়াতি করছে, তা বুঝতে না বুঝতেই সে বেঞ্চির ওপর উঠে পড়ল। গলা কাঁপিয়ে বলতে শুরু করল:

—আমারে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না! ঘরে ঘরে তোমরা দুর্গ বানায়ে তোলো!

—কার কথা বলছ, চঞ্চলদা?

—শেখ মুজিব। বাংলাদেশ লিবারেশনের ওই তো লিডার, বুঝলি! খানসেনারা ওকে বন্দি করে রেখেছে। মুজিবের স্পিচ শুনলে রক্ত গরম হয়ে যায়, বুঝলি!

সেই বছরের শেষের দিকে বাতাসে শীতের শিরশিরানি। আমার বাবা, কাকা, জ্যাঠাদের মধ্যে উত্তেজিত আলোচনা। ম্যানেকশ, অরোরা, জেকবের নেতৃত্বে ভারতীয় ফৌজ একের পর এক যুদ্ধ জিতে ক্রমেই ঢাকার নিকটবর্তী হচ্ছে, তাদের সাথী বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধারা। দুর্বৃত্ত খান সেনারা ক্রমশই পিছু হটছে।

মেজদা বলল, ‘আমেরিকা সেভেন্থ ফ্লিট পাঠাচ্ছে।’

আমার সিপিআই করা বাবা ক্ষেপে গেলেন—‘দূর! দূর! সেভেন্থ ফ্লিট! রাশিয়া টোয়েন্টিয়েথ ফ্লিট পাঠাচ্ছে টক্কর দেবার জন্য! ইন্দিরা গান্ধি গ্রোমিকোর সঙ্গে এমনি এমনি চুক্তি করেনি।

আমার বাবা, জ্যাঠাদের কাছে রাশিয়া তখন ছিল স্বপ্নের দেশ। সেখানে স্বর্গ মাটিতে নেমে এসেছে। যেখানে কেউ বেকার নয়। যেখানে সবার শিক্ষার, স্বাস্থ্যের অবারিত সুযোগ আছে। অলিম্পিকে সে দেশটা মুঠো মুঠো মেডেল পায়। শুধু বাবাদের একটাই দুঃখ। ব্যাটা চায়না! চায়না যদি ব্যাগড়া না দিত, রাশিয়ার কমিউনিস্ট অমৃতের মধ্যে দু-ফোঁটা গরুর চোনা ঢেলে না দিত, তা হলে সমাজতন্ত্রকে পায় কে? আমেরিকা? ধনতন্ত্রের সেই অশুভ কেন্দ্র কবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হত! গুঁড়িয়ে ছাতু হয়ে যেত!

রাশিয়া ও চায়নার এই মতদ্বৈধের দ্বৈরথ মুখর হয়ে উঠত আমাদের বাড়ির যে-কোনো নৈশভোজে, যখন সিপিএম পন্থী এক পিসতুতো দাদা অকুতোভয়ে তার চার সিপিআই করা মামার সঙ্গে লড়ে যেত। সেই অগ্ন্যুদগারী গালিগালাজের অধিকাংশই বুঝতাম না। তবে একটা জিনিস ধোঁয়াটে, অস্পষ্টভাবে অনুভব করতাম—এই কমিউনিস্টরা এত নিশ্চিত কেন? কেন এরা মনে করে যে সবকিছুর সারসত্য এরাই জেনে বসে আছে?

নকশাল আন্দোলনকে ছোটোবেলায় দূর থেকে ছায়া-ছায়া ভাবে দেখেছি। শুনেছি অর্ধশ্রুত গুজব। বলা বাহুল্য, আমাদের পরিচিত পরিধির মধ্যে কেউই উগ্র-বাম ছিলেন না। অতএব, সেই কঠোর ট্র্যাজেডির প্রত্যক্ষদর্শী হবার দুর্ভাগ্য হয়নি।

রূপকথা থেকে তখন টেনিদায় উত্তরণ ঘটেছে। মুগ্ধ হয়ে পড়ছি একের পর এক টেনিদার গল্প-উপন্যাস। মনে পড়ছে চারমূর্তি-র স্বামী ঘুটঘুটানন্দের সেই মোক্ষম ডায়ালগ :

আহা—নাবালক! তা, তোমাদের আর দোষ কী—আমার গুরুদেবের ঊর্ধ্বতন চতুর্থ গুরুর নাম শুনে আমারই দু-দিন ধরে সমানে হিক্কা উঠেছিল।

আর ঝাউবাংলোর রহস্য-তে সাতকড়িবাবুর সেই অমর ফরমুলা, যা দিয়ে একটা গাছে আম, কলা, আঙুর আপেল সব একসঙ্গে ফলানো যায়? সে ফরমুলা প্যালা একবার দেখতে চাওয়ায় বিরাট ভ্রূকুটি করে সাতকড়িবাবু বলেছিলেন:

—এনসাইক্লোপিডিক ক্যাটাস্ট্রফি বোঝো?

পরের পর দুর্ধর্ষ প্রশ্ন ধেয়ে এসেছিল—

—প্রাণতোষিণী মহাপরিনির্বাণ-তন্ত্রের পাতা উল্টেছ কোনোদিন?

—নেবুচাডনাজার আর পজিট্রনের কম্বিনেশন কী জানো?

—থিয়োরি অব রিলেটিভিটির সঙ্গে অ্যাকোয়া টাইকোটিস যোগ করলে কী হয় বলতে পারো?

বলা বাহুল্য, প্যালা, ক্যাবলা, হাবুল, টেনিদা কেউই সে সব দুর্ঘট প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি। আমরা পাঠকরাও পারিনি।

‘সভাপতি’ গল্পের সেই হতভাগ্য সাহিত্যসেবী রামহরি বটব্যাল? —যাকে দেখে এক কবিরাজ ‘আমাশয় প্রকরণ’ এবং ‘সহজ পাঁচন-নির্মাণ’ প্রণেতা কৃতান্তকুমার মারণরত্ন বলে ভুল করেছিলেন!

‘কৃতান্তকুমার মারণরত্ন’?!—একজন চিকিৎসকের এরকম নামকরণ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো জিনিয়াসের পক্ষেই সম্ভব!

আমি খুব লাজুক, পড়ুয়া ছেলে ছিলাম। বন্ধুবান্ধব বিশেষ ছিল না। সহজে মিশতে পারতাম না। আমাদের পাঠভবন স্কুলের প্রোগ্রেস রিপোর্টে তাই প্রতিবার লিখত—'He is a voracious reader. He must learn to relax.'

পাঠভবন এক আশ্চর্য স্কুল ছিল। পড়াশোনার থেকে ক্লাসে গল্পই হত বেশি। অঙ্কের মাস্টারমশাই দীপঙ্করদা অঙ্ক করানোর ফাঁকে ফাঁকে গল্পে মেতে উঠতেন:

—তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষে ত্রিশ লাখ মানুষ মারা গেছিল, বুঝলে?

—ত্রিশ লাখ?

—হ্যাঁ। কলকাতার পথে পথে তখন হাঘরে ক্ষুধার্তের হাহাকার। চারিদিকে আর্তনাদ—ফ্যান দাও! আমার বাছারে এট্টু ফ্যান দাও!

—এত খারাপ অবস্থা ছিল, স্যার?

—কবি অমিয় চক্রবর্তী একটা আগুন কবিতা লিখেছিলেন, জানো? সেই মন্বন্ত্বর নিয়ে—

কী কবিতা, স্যার?

—‘রাতের কান্না, ভোরের কান্না, ঘুরে ঘুরে বলে অন্ন দাও।’

অমিয় চক্রবর্তীর সেই পঙক্তিগুলো সেদিন আমার নৈশনিদ্রাকে বিঘ্নিত করেছিল—কোনো সন্দেহ নেই।

তেমনই প্রবলভাবে অভিভূত হয়েছিলাম স্কুলে ডাকঘর নাটক দেখে। লাজুক, মুখচোরা বলে কোনো পার্ট জোটেনি। শ্রোতা তথা দর্শকের ভূমিকায় বসে আছি। শেষাংকে, রাজকবিরাজ প্রবেশ করেছেন। খুলে দিতে বলছেন যত দ্বার-জানলা, বলছেন অর্ধরাত্রে রাজার আসার কথা। মাধব দত্তের ভয় হচ্ছে। প্রদীপের আলো নিভে গেছে। তারার আলোয় ঘর ভরে উঠছে। সেই সময় ঠাকুরদা গম্ভীর কন্ঠে বললেন—

—চুপ করো, অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না।

সেই গম্ভীর সতর্কবাণীতে দর্শকাসনে বসে শিউরে উঠেছিলাম। নিয়তির মতো অমোঘ, অব্যর্থ সেই উচ্চারণ আমার মর্মভেদ করেছিল। অবশ্য ছোটো ছিলাম বলে পুরো ব্যাপারটা যে অনুধাবন করেছিলাম, তা-ও নয়।

একইভাবে অকালপক্কতার জেরে পড়তে গেছিলাম শেষের কবিতা—কিছুটা দাদার অনুপ্রেরণায়।

পড়ে দ্যাখ বাপি, অদ্ভুত লেখা! রবি ঠাকুর নিজেই নিজেকে খিস্তি মেরেছেন!

রবি ঠাকুর নিজেই নিজেকে খিস্তি মেরেছেন? কেমন সে খিস্তি? শেষের কবিতা খুলে বসা গেল। অমিত রায়ের বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ যে তখনকার নব্য সমালোচকদের একহাত নিচ্ছিলেন, তা বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু মনে লেগে রইল—নিবারণ চক্রবর্তীর নাম।

—নিবারণ চক্রবর্তী? সে লোকটা কে?

—আজকের দিনে এই যে প্রশ্নের অঙ্কুর মাত্র, আগামী দিনে এর থেকে উত্তরের বনস্পতি জেগে উঠবে।

আর বেহালায় মামাবাড়িতে দাদুর ঘরে বসে পরশুরাম রচনাবলী পড়ার অমলিন স্মৃতি? দাদু লুঙ্গি পরে বিড়ি খেতে খেতে হুকুম করতেন—

—বাপি! ‘বিরিঞ্চিবাবা’ পড়, নয়তো ‘চিকিৎসা সঙ্কট’, নয়তো ‘ভুশন্ডীর মাঠে’।

শুনতেন আর দন্তবিহীন মুখে খিক খিক করে হাসতেন। আমরাও হাসতাম। ও সব গল্প পড়ে না-হেসে পারা যায়?

শিবুর তিনজন্মের তিন স্ত্রী এবং নৃত্যকালীর তিন জন্মের তিন স্বামী, এই ডবল ত্র্যহস্পর্শযোগে ভুশন্ডীর মাঠে যুগপৎ জলস্তম্ভ, দাবানল ও ভূমিকম্প শুরু হয়েছিল। তার আগে নেপথ্যে ছিল যক্ষের গলার গান:

ধনী শুনছ কিবা আনমনে।

ভাবছ বুঝি শ্যামের বাঁশি ডাকছে তোমায় বাঁশবনে।

ওটা যে খ্যাঁকশেয়ালী, দিও না কুলে কালী।

রাত-বিরেতে শ্যালকুকুরের ছুঁচোপ্যাঁচার ডাক শুনে।

কিন্তু বাঙালি জন্ম তো শুধু এক অসাধারণ সাহিত্য ও সংগীতের রসে স্নাত ও অভিভূত হওয়া নয়, এক দুর্নিবার, নিয়তিতাড়িত ট্র্যাজেডিরও শরিক হওয়া, ফলভোগ করা—যার সর্বোত্তম প্রতীক ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বিশ্বাস করত যে, সুভাষচন্দ্র মারা যাননি। তিনি বেঁচে আছেন এবং ফিরে আসবেনই আসবেন। তিনি এলেই দেশের সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে। বেকার থাকবে না, ভিখিরি থাকবে না। দেশ ফুলে, ফলে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। দুধ-মধুর স্রোত বইবে। যে কলকাতা নিরন্তর অবক্ষয়ের শিকার, তা আবার কল্লোলিনী তিলোত্তমা হয়ে উঠবে।

গ্যালিলেও নাটকে বের্টোল্ট ব্রেখট বলেছিলেন—‘Unhappy the land that is in need of heroes.’

আমাদের দুর্ভাগা, দ্বিখন্ডিত বাঙালি জাতি সুভাষচন্দ্রের মধ্যে সেই কল্পনায়কের সন্ধান পেয়েছিল। যিনি মরেননি, যিনি মরতে পারেন না, যিনি এলেই দেশের সব সমস্যার রাতারাতি সমাধান হয়ে যাবে।

তখন শৈলেশ দে-র লেখা আমি সুভাষ বলছি পড়ছি। সেই নবলব্ধ জ্ঞানের অভিঘাতে তাড়িত হয়ে বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘আচ্ছা বাবা, তোমরা কমিউনিস্টরা কি একসময় নেতাজিকে ‘‘তোজোর কুকুর’’ বলেছিলে?

বাবার চোয়ালের রেখা কঠিন হয়ে উঠেছিল—‘কোন বইতে এসব পড়েছ?’

—আমি সুভাষ বলছি।

বাবা বোমার মতো ফেটে পড়েছিলেন—‘এই জন্য এইসব বই তোমাদের পড়তে দিতে চাই না! উল্টোপাল্টা কুৎসা করে!’

সেবার বাবার ক্রোধের বহি:প্রকাশ দেখে বাদানুবাদে যাওয়ার সাহস দেখাইনি। অবশ্য নেতাজির সুদর্শন, অশ্বারোহী, বীরমূর্তিকে মনের মণিকোঠায় যে নায়কের আসনে বসিয়েছিলাম, সে কথা অস্বীকার করি কী করে? আজও তো যে কোনো বাঙালি বালক—‘My Favourite Hero’ রচনা লিখতে দিলে—নেতাজির নাম লেখে। একজন দেশপ্রেমীর পক্ষে এর থেকে পরম প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?

আর ছিল ফুটবল। ছিলাম ইস্টবেঙ্গলের কট্টর সমর্থক। আজ বিশ্বায়নের যুগে যেখানে টেলিভিশনে নিয়মিত দেশবিদেশের ম্যাচ দেখাচ্ছে, সেখানে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের পিটুলি গোলা ফুটবল কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। মাঠে লোক হয় না। আমাদের কৈশোরে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ ছিল মহারণ। সত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গলের অজেয় একাদশ পর পর ছ-বার লিগ জেতে। তার মধ্যে সবচেয়ে উদ্দীপক ছিল পঁচাত্তরের শিল্ড ফাইনালে মোহনবাগানকে পাঁচ গোল দেওয়ার সুখস্মৃতি। সাতাত্তর সালে পেলে কসমসের হয়ে কলকাতায় খেলতে এলেন। ইডেনের বর্ষণসিক্ত কাদামাখা মাঠে ২-২ গোলে মোহনবাগানের সঙ্গে খেলা ড্র রইল।

পাড়ার মোহনবাগান সমর্থক বন্ধুরা সেদিন কলার উঁচিয়ে যে আনন্দ-নৃত্য করেছিল, তা দেখে মর্মাহত বোধ করেছিলাম। সান্ত্বনা পেয়েছিলাম আরেক কট্টর ইস্টবেঙ্গল সমর্থক বন্ধুর কথায়।

আমায় একধারে টেনে নিয়ে সে বলেছিল—‘বাপি! খবর একেবারে পাক্কি!’

—কী খবর পাক্কি?

—ওটা পেলে ছিল না!

—পেলে ছিল না?!

—আসল পেলে থাকলে ছারপোকাদের দশ গোল মারত, বুঝেছিস! ওরা শান্তিগোপালকে পেলে সাজিয়ে মাঠে নামিয়েছে!

—ওটা পেলে নয় তাহলে? বিখ্যাত নট শান্তিগোপাল পেলে সেজে সবার সঙ্গে ছলনা করে গেছেন?

বন্ধু বাক্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলেছিলাম কিছুদিন।

এরপর মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, জয়েন্ট এন্ট্রান্স পাশ করে ডাক্তারিতে ভর্তি হলাম। নিরন্তর পড়াশোনা আর ইঁদুর দৌড়ের মধ্যে অবগাহিত হয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ হারালাম অনেকটাই। একসময় দেখলাম যে, আমি বিলেতের মাটিতে বসে আছি। হিম্যাটোলজিতে কনসালট্যান্ট। জীবনের সব পাওয়া কি হয়ে গেল? কিছুই কি বাকি রইল না?

ম্যাঞ্চেস্টারের স্ট্রেটফোর্ডে আমার ছোট্ট দোতলা বাড়িতে ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিলাম। পঁচিশে ডিসেম্বরের দুপুর। বাইরে অন্ধকারের ভ্রূকুটি। ক্রিসমাসের দিন—ছুটি। বাইরে শুন শান। আমাদের কিচেন গার্ডেনে পেঁজা পেঁজা তুলোর মতো বরফ পড়ছে।

ঘরের ভেতর ‘সেন্ট্রাল হিটিং’-এর কল্যাণে আরামদায়ক উষ্ণতা। আমি টিভিতে চ্যাপলিনের গোল্ড রাশ দেখছিলাম। ওরা ক্রিসমাসের সময় টিভিতে ভালো ভালো পুরোনো ক্লাসিক ছবি দেখায়। সাদা-কালো ছবি, অথচ এক অপূর্ব সাংগীতিক কাঠামোয় মোড়া। স্তরের পর স্তরে, ফ্রেমের পর ফ্রেমে এক মহত্তম সৃষ্টির সম্মুখীন হচ্ছি।

মনে পড়ছিল, ছোটোবেলায় জামাইবাবু সফিউলদার হাত ধরে ৩৯নং বাসে চেপে চৌরঙ্গিতে গোল্ড রাশ দেখতে যাওয়ার স্মৃতি। সেদিন বইটা তত ভালো লাগেনি। বুঝতে পারিনি। পরে নিজামের কাঠি রোল খেয়ে বাসে চড়ে ফিরতে ফিরতে সফিউলদার প্রশ্ন—

—বাপি! কেমন লাগল বইটা?

—ভালো। আচ্ছা সফিউলদা, গোল্ড রাশ-এর বাংলা কি ‘স্বর্ণতৃষা’ করা যায়?

—হ্যাঁ। কেন করা যাবে না? খুব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট।

সেই গোল্ড রাশ আবার দেখছি। আবহে আমার মিউজিক সিস্টেমে মোজার্টের ‘ম্যাজিক ফ্লুট’ বাজছে। স্ট্রেটফোর্ড আর্নডেল-এর WH Smith থেকে সদ্য কিনেছি। জার্মান ভাষায় নাম Die Zauber flote। ভাষা বুঝতে পারছি না, কিন্তু পাপাগেনোর গান আমাকে দোলাচ্ছে।

সিনেমা শেষ হতে অ্যান্ড্রু রবিনসনের-এর সত্যজিৎ জীবনী The Inner Eye খুলে বসলাম। অচিরেই পৌঁছলাম সত্যজিৎ-কৃত গোল্ড রাশ-এর সেই অসাধারণ সমালোচনায়:

If one thinks of Mozart and The Magic Flute and the knockabout foolery of Papageno merging into the sublimity of Sarastro, it is because the comparison is a valid one. Here is the same distilled simplicity, the same purity of style, the same impeceable craftsmanship. And the slightest tinge of disappointment at the happy ending—the sudden veering towards a bright key after the subtle chromaticism of all that has gone before—isn’t that rather like the cheery epilogue of Don Giovanni?

বাংলা ভাষায় কি এমন সৃষ্টি করা যায়? আলো-ছায়া, হাসি-কান্নার দোল খেলানো, ঢেউ দোলানো বহুস্তরীয় প্রকাশ— যা ‘ম্যাজিক ফ্লুট’ বা ‘গোল্ড রাশ’ এর প্রাণসম্পদ, তা কি বাংলা ভাষায় প্রস্ফুটিত করা সম্ভব!

কেন করা যাবে না? রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে যে অকল্পনীয় সমৃদ্ধি দিয়ে গেছেন, তার সুদৃঢ় ভিত্তিভূমির উপর দাঁড়িয়ে আমরা স্বপ্ন দেখতে পারব না কেন?

আমার চটকা ভেঙে যায়। ক্রিসমাসের সন্ধ্যায় এক প্রবাসী বাঙালি অতিথি সপরিবারে বাড়িতে এসেছেন। ভদ্রলোক ভালো, উদারহৃদয়, পরোপকারী, কিন্তু আমার জটিল মানসিকতা বুঝতে অক্ষম।

—কী করছ? কনসালট্যান্ট হয়ে এই এঁদো টু বেডরুম হাউজে পড়ে আছ? সেকেণ্ড হ্যাণ্ড টয়োটা চালাচ্ছ? যাও! যাও! সেল-এ (Sale ম্যাঞ্চেস্টারের অন্যতম অভিজাত অঞ্চল) ফোর বেডরুম ডিট্যাচড হাউজ বুক করো। মর্টগেজ এমন কিছু নয়। অ্যাফোর্ড করতে পারবে। আর বি এম ডাবলিউ কেনো। বি এম ডাবলিউ। আরে কনসালট্যান্ট হলে তো স্টেটাস মেনটেন করতে হবে? তুমি আর তোমার হসপিটালের ঝাড়ুদার একই মেক আর মডেলের গাড়ি চালাবে? আর স্বর্গে এসেছ, স্বর্গসুখটা ভালো করে ভোগ করবে না?

আমি নীরব থাকি। মাসখানেক আগে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতাল থেকে নিযুক্তির চিঠি এসেছে। বিলেতে যা মাইনে পাচ্ছি, তার এক পঞ্চমাংশ এক বছর পর্যন্ত দেবে। কোনো জব সিকিউরিটি নেই, সবেতন ছুটি নেই, পেনশন নেই, প্রভিডেণ্ড ফাণ্ডের ব্যবস্থা নেই। এক বছর পরে জীবিকা পুরোটাই প্র্যাকটিস-নির্ভর।

আমি তবু দেশে ফিরব। আমার স্ত্রীও ফিরতে চান। বাচ্চারা এখনও ছোটো। বড়ো হলে পশ্চিমের স্বর্গ থেকে চ্যুত হয়ে কলকাতার গরম, ঘাম, দূষণ, নোংরার মধ্যে তারা আসতে চাইবে না।

কেন ফিরছি? শুধু কলকাতায় হিম্যাটোলজি প্র্যাকটিস করা নয়। শুধু বাবা-মাকে বৃদ্ধ বয়সে সঙ্গ দেওয়াও নয়। ফিরছি, কারণ আমার মাথায় বাংলা ভাষায় লেখার ভূত চেপেছে। সে ভূত আমায় নিরন্তর তাড়িত করছে। স্বদেশের রক্ত, ঘাম, ধুলোর মধ্যে গড়াগড়ি দিতে না-পারলে আমার শাপমুক্তি হবে না।

এক কুয়াশা-ঘেরা সকালে বিমানে চড়ে কলকাতায় চিরদিনের জন্যে ফিরে এলাম—বুকের মধ্যে সেই বেসরকারি হাসপাতালের অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতির চিঠি।

যে কুয়াশামোড়া দেশে ফিরলাম, সেটাই বা কোন স্বর্গরাজ্য? এক প্রবীণ বামপন্থী রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষকের আক্ষেপ শুনি—‘শিক্ষার অনিলায়ন হয়েছে, বুঝেছ। চারদিকে মধ্যমেধার রাজত্ব। যদি কুড়িটা অধ্যাপকের পোস্ট খালি থাকে—তার মধ্যে সতেরোটায় সিপিএম সমর্থককে নিতেই হবে, একটা করে পাবে আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক আর সিপিআই!’

ভদ্রলোকের কথায় স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকি। চোখের সামনে দেখি বামপন্থার বিপর্যয়। যে আদর্শ আমার বাবাদের অনুপ্রাণিত করেছিল তার স্খলিত, গলিত, করুণ পরিণতি। বার্লিন প্রাচীরের পতন আগেই ঘটেছিল। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থার তথাকথিত অজেয় দুর্গও ধসে যায় তাসের ঘরের মতো।

আর আমার মেয়েরা? যাদের বাঙালি বলে মানুষ করব বলে দেশে আনলাম? তারা উজ্জ্বল, বুদ্ধিমান, কৃতী। অনেক বিষয়েই আমার থেকে তারা অনেক বেশি পারদর্শী। টপাটপ কম্পিউটার করছে, ইন্টারনেটে ঢুকছে, কিন্তু তারা এক বিশ্বায়িত পৃথিবীর নবীন প্রজন্ম। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, সংগীতের কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই।

চারদিকে চেয়ে দেখি একই হাল। অন্তত আমার পরিমন্ডলে যারা বাস করেন, তাঁদের কাছে বাংলা ভাষার কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। অনেকেই নিজের ছেলে-মেয়েকে মাতৃভাষা বাংলা শেখানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না।

এমনই এক সময়ে, এক রবিবারে দুপুরে, আমার দুই মেয়ের সঙ্গে টেলিভিশনে সি এস লিউইস-এর দ্য লায়ন, দ্য উইচ অ্যাণ্ড দ্য ওয়ার্ডরোব উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ দেখতে দেখতে চির কুয়াশার দেশে বইটার প্লট আমার মাথায় এসেছিল।

অবশ্য সামান্য কিছু বাহ্যিক সাদৃশ্য ছাড়া চির কুয়াশার দেশে-র সঙ্গে উপরের সুখ্যাত বইটার মিল নেই। আমার এই উপন্যাসকে একান্তই একটা বাঙালি রূপকথা তথা ফ্যান্টাসি তথা স্যাটায়ার বলা যায়।

আমার কল্যাণীর শ্বশুরবাড়ির বাগানের বেলগাছে একটা বিশাল মৌচাক আছে। আমার দুই মেয়ে সে জন্য সেখানে যেতে খুব ভয় পায়। ভাবলাম সেই মৌমাছি-সমৃদ্ধ মৌচাক, দেশভাগ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্রের মিথকে কেন্দ্র করে এক মজাদার, বহুস্তরীয় ফ্যান্টাসি ফাঁদব। সেখানে পরতে পরতে ঢুকিয়ে দেব ছোটোবেলায় পড়া প্রিয় বাংলা সাহিত্যের অনুষঙ্গ। রবীন্দ্রনাথের আকাশ-ভরা কোলে আমাদের সবার জন্ম। এক অর্থে আমরা সবাই তাঁর সন্তান। তাই বই-এর কাঠামো হবে রাবীন্দ্রিক। রবীন্দ্রসংগীতের মূর্ছনা একসূত্রে গ্রন্থিত করবে সমগ্র উপন্যাসকে।

সি এস লিউইস-এর কল্পলোক নার্নিয়া ঢেকে গেছিল চিরতুষারে। আমার বিভক্ত কল্প স্বদেশ ঢাকা থাকবে চির কুয়াশায়। সেই চির কুয়াশার দেশে কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে প্রবেশ করবে চারটি ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ে।

সেই অনুষঙ্গে আনব মকররাজ আর যক্ষপুরীকে। আনব নন্দিনীকে। ভুলব না যক্ষপুরীর লোহালক্কড়ের জঙ্গলে ফুটে থাকা একাকী রক্তকরবীকে। ভুলব না রোদের সোনা আর মাটির নীচে জমিয়ে রাখা মরা সোনার তালকে।

থাকবে দক্ষিণারঞ্জনের ঠাকুরমার ঝুলি—যেখানে কুমিরগিন্নিকে ইলিশ-খলিশের চচ্চড়ি, রুই-কাতলার গড়গড়ি, চিতল-বোয়ালের মড়মড়ি প্রস্তুত করতে বলে বোকা কুমির গায়ে পুরোনো চটের থান, ছেঁড়া জালের চাদর, মাথায় জেলে ডিঙির টোপর পরে এক গাল শ্যাওলা চেবাতে চেবাতে ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে শেয়াল-পন্ডিতের বাসার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। সাত-সাতটা ছানা শেয়ালপন্ডিতের তত্ত্বাবধানে লায়েক হয়ে উঠছে! তাদের তো ঘরে ফিরিয়ে আনতে হবে!

থাকবে অবন ঠাকুরের ক্ষীরের পুতুল, টেনিদা, হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন। থাকবেন পরশুরাম, সুকুমার ও সত্যজিৎ রায়। থাকবেন বিভূতিভূষণ। থাকবেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।

মেয়েদের ডেকে বলি— তোদের হ্যারি পটার ধার দে তো?

মেয়েদের হ্যারি পটার মুখস্থ—কেন, বাবা? হ্যারি পটার পড়ে কী করবে? তুমি তো ওগুলো ভালোবাসো না?

—একটা টোটালি নেগেটিভ ভিলেনের ক্যারেকটার তৈরি করতে চাই, যার মধ্যে ভালো কিছু নেই। দেখি তোদের ভোলডেমর্টের থেকে কোন ইন্সপিরেশন পাই কিনা?

আমি কালাপাহাড়ের কথা ভাবছি। বাঙালি জাতির মধ্যে যত বিষ আর পাপ আছে, তা তিলে তিলে এক করে কালাপাহাড়কে তৈরি করতে হবে। না, ভোলডেমর্ট থেকে কোনো ইন্সপিরেশন পাই না। অনুপ্রেরণা জোটে অন্য সূত্র থেকে—শুভঙ্কর। শুভঙ্কর আমার পান্ডুলিপির কিছু অংশ পড়েছে।

—স্যার, আপনার লেখাটা পড়ছি—ভালো লাগছে।

—ভালো হচ্ছে?

—হ্যাঁ, স্যার এটা তো মনে হয় গৌড়গোধূলি-র থেকেও ভালো।

গৌড়গোধূলি আমার আগের প্রকাশিত ঐতিহাসিক উপন্যাস। তরুণ সাহিত্যসেবী শুভঙ্কর সে উপন্যাসেরও মিডওয়াইফ।

—স্যার, শাহবাগ আন্দোলন সম্বন্ধে আপনি কী ভাবছেন?

শাহবাগ আন্দোলন শুরু হয়েছে ঢাকায়। তার অভিঘাতে কলকাতায় বসে থাকা আমার অন্তরাত্মাও কেঁপে উঠছে। বাঙালি জাতীয়তার এ রকম জয়গান শেষ কবে শুনেছি?

—শাহবাগ আমায় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, শুভঙ্কর। তখনকার হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে যে তেজ, যে স্বপ্ন, যে আদর্শ ছিল, তারই প্রতিধ্বনি শুনছি শাহবাগে।

—স্যার, সেই সময়েরই তো গান—বাংলার মাটি, বাংলার জল।

—ঠিক, রাখিসংগীত এ গান তো লোকে গায় না এখন।

—গানটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, স্যার।

—ঠিক, শুভঙ্কর। গানটার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ খুব বড়ো কিছু কথা বলে গেছিলেন। বাঙালি গানটা গেয়েছে, কিন্তু মর্ম বোঝেনি।

বাড়ি ফিরে চির কুয়াশার দেশে-র পান্ডুলিপি খুলি। লেখাটা শেষ হয়ে গেছে। আমার কিন্তু পড়তে মোটেই ভালো লাগে না। আমার এটাই হয়। লেখা শেষ হওয়ার পর নিজের সৃষ্টিকে অত্যন্ত তুচ্ছ, সাধারণ বলে মনে হয়। মনে হয় এত খেটে এ কী আবর্জনা তৈরি করলাম! দীপ্তিহীন, নিষ্প্রাণ অক্ষরগুলো দাঁত বের করে হাসতে থাকে। ধূসর পান্ডুলিপিটা বন্ধ করে দিই।

চোখ বুজি। মাথাটা বড্ড ধরেছে। গত ছ-মাসের চেষ্টায় যে উপন্যাসটা লিখলাম, সেটা কি গোল্ড রাশ বা ম্যাজিক ফ্লুট-এর বহুস্তরীয় সিদ্ধির শতাংশের শতাংশও অর্জন করতে পেরেছে? সেটা হলেই তো ধন্য বোধ করব। আর যে বাচ্চাদের জন্য লেখাটা লিখলাম (তাদের মধ্যে আমার দুই মেয়েও রয়েছে), তারা হয়তো এর অনেক কিছুই বুঝতে পারবে না। তারা যদি অনেক অনেক দিন পরে, বড়ো হয়ে, ভারিক্কি হয়ে, মান্যগণ্য হয়ে আমার বইটার পাতা ওলটায় (অবশ্য ততদিন যদি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য টিকে থাকে!), তাহলে হয়তো উপলব্ধি করবে যে, আমি ঠিক কী বলতে চেয়েছিলাম।

সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%