এলেম নতুন দেশে

সৌম্য ভট্টাচার্য

চোখ খুলে চাইল ডোনা। সে এসে পড়েছে এক নরম কাশঝোপের মধ্যে। চাঁদের হালকা আলোয়, সাদা কাশঝোপ মাথা দোলাচ্ছে। কাশফুল তো শরৎকালে ফোটে? এটা কি শরৎকাল? মনে মনে ভাবল ডোনা।

সে ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। গায়ে কোনো ব্যথা-বেদনা নেই। ক্লান্তি, শ্রান্তিও কিছু নেই।

কোথায় সে এসেছে? কোন দেশ এটা?

বুদ্ধিমান ডোনা বুঝল যে সে কল্যাণীর বাড়িতে নেই। বটগাছের গর্ত বেয়ে কোনো নতুন দেশে সে এসে পৌঁছেছে। নরম কাশঝোপে পড়েছে বলে গায়ে ব্যথা লাগেনি। অজানা দেশ— কিন্তু ডোনার মনে হল যে, এই দেশ যেন তার চিরপরিচিত। এ দেশের সঙ্গে যেন তার জন্মজন্মান্তরের পরিচয়।

ডোনার পেছন পেছন ততক্ষণে ডোরা, নীলু, মিতুলও এসে জুটেছে। তারাও পড়েছে আশেপাশের কাশঝোপে। গায়ের ধুলো ঝেড়ে তারাও একে একে উঠে দাঁড়াচ্ছে।

—এ আমরা কোথায় এলাম?

—স্ট্রেঞ্জ প্লেস!

—লেটস এক্সপ্লোর!

—ডোনা কোথায়?

নানারকম গুঞ্জনধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠছে জায়গাটা।

ডোনাকে দেখতে পেয়ে তো ডোরা, নীলু, মিতুল মহাখুশি।

—ডোনা, তোর লাগেনি তো?

—না, না। বেশ আছি। হোয়াট অ্যাবাউট ইউ, গাইজ?

—আমরাও ঠিক আছি।

‘হোয়াট প্লেস ইজ দিস? ইট অ্যাপিয়ার্স স্ট্রেঞ্জলি ফ্যামিলিয়ার।’

চার বাচ্চারই মনে হল যে, নতুন দেশটা যেন পুরোপুরি অচেনা নয়। কোনো জন্মে হয়তো এ দেশের সঙ্গে তাদের চেনাশোনা ঘটেছিল।

মুশকিল হচ্ছে হালকা চাঁদের আলোয় তেমন পরিষ্কার কিছু দেখা যাচ্ছে না। জলের কুল কুল শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা লাগছে মুখে। ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু দেখল যে, তাদের সামনেই এক বিশাল জলের বিস্তার। যতদূর চোখ যায়, জলের ওপর চাঁদের আলো পড়ে চিক চিক করছে। তারা পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে একটা কুয়াশা যেন ঢেকে আছে সব কিছু। এপার, ওপার ভালো করে ঠাহর করা যাচ্ছে না।

এটা কী? নদী না সমুদ্র?

‘বাচ্চারা, নদী বা সমুদ্র দেখোনি কখনো?’ কানের পাশে কট কট করে বলল কে যেন।

ওরা চারজনেই চমকে লাফিয়ে উঠল— কে? কে? কে বলছে কথাগুলো?

—তোমাদের একেবারেই ছেলেমানুষ মনে হচ্ছে? নদী-সমুদ্র চেনো না? কোন দেশ থেকে আসা হচ্ছে?

ডোরা দেখল যে, কথাগুলো ভেসে আসছে পাশের বটগাছের ওপরের ডাল থেকে। সেখানে একজোড়া চোখ ভাঁটার মতো জ্বলছে।

‘বাপরে!’ ডোরা ভয়ে লাফিয়ে উঠল—‘ভূত!’

—ভূতও নই। ভবিষ্যৎও নই। আমি এই বটগাছের ডালে থাকি। দিনে ঘুমোই, রাতে জাগি। যখন জেগে থাকি, তখন ইঁদুর ধরে ধরে খাই। ভয় পেয়ো না! তোমাদের আমার একেবারেই অখাদ্য বলে মনে হচ্ছে!

কথা বলার ভঙ্গিটা কড়া হলেও ডোরা-ডোনাদের ভয় করল না।

নীলু বলল, ‘ভাঁটার মতো চোখ, রাতে জাগে, ইঁদুর ধরে খায়। নিশ্চয়ই প্যাঁচা-ট্যাঁচা হবে।’

—ঠিক বলেছ। প্যাঁচা-ট্যাঁচা নয়। লক্ষ্মী প্যাঁচা। আমার নাম সুষমা।

লক্ষ্মী প্যাঁচার নাম সুষমা! বাচ্চাদের হাসি পেয়ে গেল।

সুষমা অবশ্য সেটা খেয়াল করল না। কট কট করে বলে চলল, ‘এতই যখন বুদ্ধি তখন নদী দেখে সমুদ্র বলে ভুল করছ কেন?’

—কী নদী এটা?

—অত খোঁজে তোমাদের কী দরকার? পদ্মাও হতে পারে, মেঘনাও হতে পারে, ভাগীরথী, দামোদর, রূপনারায়ণ হলেই বা ঠেকাচ্ছে কে?

—এটা কী দেশ?

—তাও জানো না? বাংলা। সোনার বাংলা।

—বাংলা?

—কেন? অবাক হলে নাকি? দেখছ না, আমি বাংলা ভাষায় কথা কইছি। তোমরা আসছ কোত্থেকে?

‘উই আর ফ্রম ওয়েস্ট বেঙ্গল, হুইচ ইজ আ স্টেট ইন ইণ্ডিয়া,’ বলল ডোনা।

—বেশ তো বাংলা বলছিলে। এখন ইংরেজিতে ফর ফর করছ কেন?

সুষমাকে বেশ রাগত মনে হল।

ডোরা এগিয়ে এল, ‘আমরা বাঙালি। আমরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে থাকি। সেখান থেকে এসেছি।’

—এসে আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করেছ! তা এলে কী করে?

—সে কী আমরাও ছাই জানি? কল্যাণীতে দাদুর বাড়িতে বেড়াতে গেছিলাম। ওখানে পুকুর পাড়ে একটা বিশাল বটগাছ। তার ডালে মৌচাক। সেই বটগাছের ফোকর গলে হঠাৎ আমরা এই দেশে চলে এলাম।

—হঠাৎ ফোকর গলতে গেলে কেন?

—সবাই বলল যে। মৌমাছিরা বলল, সোনা ব্যাং বলল।

—মৌমাছিরা বলল? সোনা ব্যাং বলল?

—হ্যাঁ। বিশ্বাস করো।

—তোমরা চারজন এসেছ?

—হ্যাঁ।

—আচ্ছা তোমাদের মধ্যে কারো জন্ম কি শ্বেতরাক্ষসের দ্বীপে হয়েছিল?

—শ্বেতরাক্ষসের দ্বীপ?

—হ্যাঁ। সে অনেক দূরের দেশ।

ডোরা-ডোনা হাত তুলল, ‘শ্বেতরাক্ষসের দ্বীপ কিনা জানি না, তবে আমরা দু-জনের কেউই ভারতে জন্মাইনি। উই ওয়্যার বর্ন ইন ইউ কে।’

এটা শুনে সুষমা চুপ করে গেল। একদম নি:স্তব্ধ হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর চোখ বুজে বিড় বিড় করে বলল, ‘পুরাণে এরকমই বলেছিল বটে।’

—কী বললে?

সুষমার বোজা চোখ খুলে গিয়ে ভাঁটার মতো জ্বলে উঠল। তার কন্ঠস্বর গম্ভীর, তবে কঠোর নয়।

—বাচ্চারা তোমরা যে-পথে এসেছ, সে-পথ দিয়ে এক্ষুনি, এক্ষুনি ফিরে যাও।

—কেন?

—তোমাদের সামনে বিরাট বিপদ।

—কীসের বিপদ?

—খোক্কোসরা তোমাদের হাতে পেলে তক্ষুনি মেরে ফেলবে।

—কেন?

—অত খোঁজে তোমাদের কাজ কী?

এর মধ্যে নীলু একটু অধৈর্য হয়ে উঠেছে, ‘তুমি এখনো বললে না আমরা কোন দেশে এসে পৌঁছেছি।’

—তোমার কী মনে হয়?

—তুমি বাংলা ভাষায় কথা বলছ—হয় এটা ওয়েস্ট বেঙ্গল, নয় বাংলাদেশ, না হয় ত্রিপুরা বা অসম। এসব জায়গাতেই তো লোকে বাংলা বলে।’

প্যাঁচা-ট্যাঁচা নয়। লক্ষ্মী প্যাঁচা। আমার নাম সুষমা ।

প্যাঁচার মুখে অনুকম্পার হাসি ফুটলে যে-ভাব দেখা যায়, সুষমার মুখে কতকটা সেই ভাব ফুটে উঠল।

—বুঝলে বাচ্চারা, পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, অসম সব ছাড়িয়ে সব পেরিয়ে এক দেশ ছিল—বাংলা, সোনার বাংলা। তোমরা সেই চিরকালের সোনার বাংলায় এসে পৌঁছেছ। তবে এ বাংলা কি আর সেই বাংলা আছে? শ্বেতরাক্ষসের শাপে, মানুষের পাপে সোনার বাংলা ধূসর কুয়াশায় ঢেকে গেছে। ধূসর বাংলা হয়ে গেছে। মানুষের বদলে এখন এখানে খোক্কোসের রাজত্ব। তোমাদের ভীষণ বিপদ! তোমরা পালাও! এক্ষুনি পালাও! যে ফোকর গলে এসেছিলে, সেই ফোকর গলে আবার নিজেদের দেশে মা-বাবার কাছে, দাদু-দিদুনের কাছে ফিরে যাও।

এই বলে সুষমা চোখ বুজল। ঘুমিয়েই বোধহয় পড়ল।

সুষমার কথায় বাচ্চারা বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। তাদের বিপদ ভীষণ বিপদ! খোক্কোসরা তাদের হাতে পেলে মেরে ফেলবে!

খোক্কোসরা কারা? তারা এত বিপজ্জনক কেন? তারা ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুকে মেরেই বা ফেলতে চাইবে কেন? সবটাই কেমন রহস্যময়, মিসটেরিয়াস!

ডোনা বলল, ‘ডোরাদিদি, ফিরে যাব? আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু গো ব্যাক!’

—ইউ আর রাইট, ডোনা। হোয়াই শুড উই রির্টান? দ্যাট উড বি শিয়ার কাওয়ার্ডাইস।

মিতুল, নীলুরও পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মহা আপত্তি। এই নতুন দেশে কোনো জাদুমন্ত্রবলে সদ্য তারা এসে পড়েছে। কোনো কিছু না দেখে, না শুনে স্রেফ একটা প্যাঁচার কথায় বিশ্বাস করে পালিয়ে যাবে? সেটা কি কাপুরুষতা হবে না?

নীলু বলল, ‘একটু অপেক্ষা করা যাক। রাতটা তো অন্তত কাটুক। দিনের আলোয় সব কিছু বিচার-বিবেচনা করে দেখা যাক।’

সেটাই ঠিক হল।

যে বটগাছের ডালে সুষমা চোখ বুজে ঝিমোচ্ছিল, তারই নীচে গুটিশুটি মেরে ওরা চারজন শুয়ে পড়ল। ঘুম আসবে না। ভেতরে নানারকম ভাবনা-চিন্তা কুরে কুরে খাচ্ছে। তবে বিশ্রামেরও দরকার। বটগাছের তলায় শুতে গিয়ে ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু আবিষ্কার করল যে, তাদের সঙ্গে বালিশ-বিছানা নেই, তোষক নেই, গায়ে দেওয়ার চাদর পর্যন্ত নেই। যে জিনিসগুলো দিয়ে পরম মমতায় তাদের মায়েরা প্রতি রাতে তাদের বিছানা করে দেয়, তা অনুপস্থিত। মাটিতে এভাবে কষ্ট করে শোয়া কারওরই অভ্যেস নেই। বালিশের অভাবে, মাথার নীচে হাত রেখে শুল চারজনে। ভাগ্যক্রমে ঠাণ্ডা বেশি না-পড়ায় আর বৃষ্টি-বাদলা না-থাকায় গায়ের চাদরের দরকার হল না। নদী থেকে একটা বাতাস অবশ্য বইছিল, সঙ্গে জলের কুলু কুলু শব্দ। ঘুম আসবে না, ঘুম আসবে না—ভাবতে ভাবতেই একটু তন্দ্রা এসেই গেল।

ডোরা ঘুম জড়ানো গলায় ডোনাকে বলল, ‘ডোনা, আই ফিল দ্যাট উই হ্যাভ স্টাম্বলড ইনটু আ রিয়েলি বিগ অ্যাডভেঞ্চার।’

—হ্যাঁ, ডোরাদিদি। আই ফিল দ্যাট আওয়ার রিয়েল হলিডে ইজ জাস্ট বিগিনিং।

সেই অন্ধকার রাতে, অচেনা দেশে, বটগাছের তলায়, নদীর ধারে ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু ঘুমিয়ে পড়ল।

তারপর কতক্ষণ কেটেছে, ঠিক নেই। ঘুম প্রথম ভাঙল নীলুর। চোখে সূর্যের আলো এসে পড়েছে। তড়াক করে লাফিয়ে উঠল সে। অনভ্যস্ত জায়গায় শুয়ে গায়ে, হাত-পায়ে বিষ ব্যথা। সূর্যটা বেশ অনেকটা আকাশে উঠে পড়েছে। সকাল ন-টা তো বটেই। তবে সূর্যের আলোটা যেন কেমন মরা মরা, তেজ নেই। কল্যাণীতে সকাল ন-টায় যেমন জোরদার আলো হয়ে যায় চারদিক সে তুলনায় ধূসর, ম্যাটমেটে সকালটাও। চোখ কচলে নীলু ভালো করে চেয়ে কারণটা বুঝল। সূর্যের তেজ কমেনি। তাদের চারপাশ ঘিরে পাক খাচ্ছে এক ধূসর কুয়াশা। কুয়াশার চাঁদোয়ায় সব কিছু ঢাকা। এমনকী বটগাছের মাথাটাও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। তবে সেই কুয়াশার মধ্যেই এমন কিছু নীলুর চোখে পড়ল, যা তাকে চমকে দিল। যে-বটগাছের নীচে রাতে তারা শুয়েছিল, তার গায়ে সাদা কাগজে লেখা একটা ইস্তাহার ঝুলছে। তাতে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা আছে—

সাবধান! সাবধান! সাবধান!

চারটি বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে দূরদেশ থেকে এখানে এসেছে। তাদের দেখামাত্র যেন গ্রেপ্তার করা হয় এবং সরকার বাহাদুরকে খবর দেওয়া হয়। জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় পেলে মোটা টাকার ইনাম দেওয়া হবে। সত্বর যোগাযোগ করুন।

ইস্তাহারটা পড়ে ভয়ে রক্ত হিম হয়ে গেল নীলুর। সে দেখল যে, শুধু সেই বটগাছেই নয়, আশপাশের সমস্ত গাছের ডালেও একই ইস্তাহার ঝুলছে। হাওয়ায় সাদা সাদা কাগজগুলো দুলছে।

সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%