সৌম্য ভট্টাচার্য
বাংলা মায়ের কথা শেষ হল। এবার দেশে ফেরার পালা। জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রে তেপান্তরের মাঠে ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল বাংলা মায়ের সঙ্গে বসে রয়েছে।
মিতুল বলল, ‘আমরা নিজেদের মায়ের কাছে কীভাবে ফিরব, বাংলা মা?’
বাংলা মা বললেন, ‘খুব সোজা। তেপান্তরের মাঠে দাঁড়িয়ে তোমরা চারজন চোখ বন্ধ করে হাত ধরাধরি করে এই মন্তরটা বলবে। দেখবে নিমেষে নিজেদের দেশে ফিরে গেছ।’
—কী সে মন্তর?
নিজের মায়ের কোলে ফিরতে চাই
মায়ের তুলনা কোথাও নাই।
নীলু বলল, ‘আর যদি তোমার কাছে আবার ফিরতে চাই, মা?’
—আরো সোজা! একইভাবে চারজন চোখ বন্ধ করে হাত ধরাধরি করে দাঁড়াবে। মন্তরটা অবশ্য একটু পালটে নেবে। বলবে—
বাংলা মায়ের কোলে ফিরতে চাই
মায়ের তুলনা কোথাও নাই।
দেখবে নিমেষে আমার কোলে, আমার বুকে আবার ফিরে এসেছ।
ডোনা হুঁশিয়ার মেয়ে। ছোটোবেলা থেকেই বাবা, মায়ের সঙ্গে দেশ-বিদেশে ঘুরেছে। সে বলল, ‘মা, তোমার কোলে ফিরতে আমাদের পাসপোর্ট, ভিসা লাগবে না?’
বাংলা মা খিল খিল করে হেসে উঠলেন। সেই ভঙ্গুর হাসি জ্যোৎস্নার আলোয় শত টুকরো হয়ে আকাশে, বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল, ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
—দূর বোকা! মায়ের কোলে ফিরতে কখনো পাসপোর্ট, ভিসা লাগে?
—দূর বোকা! মায়ের কোলে ফিরতে কখনো পাসপোর্ট, ভিসা লাগে?
—দূর বোকা! মায়ের কোলে ফিরতে কখনো পাসপোর্ট, ভিসা লাগে?
বাচ্চারা দেখল যে, সেই হাসির সঙ্গে সঙ্গে বাংলা মার অপরূপ সুন্দর মূর্তি চন্দ্রকিরণে গলে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। তিনি তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
তখন জ্যোৎস্নালোকিত তেপান্তরের মাঠে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল পরস্পরের হাত ধরে চোখ বুজে বাংলা মায়ের শিখিয়ে দেওয়া মন্তরটা বলতে লাগল—
নিজের মায়ের কোলে ফিরতে চাই।
মায়ের তুলনা কোথাও নাই।
চোখ বুজে বার বার তিনবার মন্ত্রটা আবৃত্তি করতে হবে। আবৃত্তি শেষ হওয়ার পর চোখ খুলতে হবে—বাংলা মা এরকমই শিখিয়ে দিয়েছিলেন। একা একা আবৃত্তি করলেও চলবে না। একসঙ্গে চারজনকে আবৃত্তি করতে হবে।
মন্ত্র বলতে বলতে বাচ্চাদের মনে হল, যেন একটা ঝড় উঠেছে। কানের পাশে শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর চোখ মেলতেই চারজন দেখল যে, তারা কল্যাণীর দাদুর বাগানে নরম সবুজ ঘাসের ওপর বসে আছে। ঘাসের ওপর জলের ফোঁটায় রোদ পড়ে চিকচিক করছে। পাখি ডাকছে, মৌমাছিরা গুনগুন করছে। পুকুরটা কানায় কানায় ভর্তি। তার পাশেই সেই আদ্যিকালের বুড়ো বটগাছ অদ্ভুতভাবে পুকুর থেকেই উঠে আবার পুকুরের মধ্যে আদ্দেক হেলে রয়েছে। আকাশে উঠেছে এক জাদুকরী মায়াবী রামধনু।
ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল তখন সমস্বরে বলে উঠল, ‘আমরা ফিরে এসেছি! আমরা ফিরে এলাম!’
মৌমাছিরা গুন গুন করছে। বটগাছের ডালে বিশাল মৌচাকটা ঝুলে আছে। অজস্র মৌমাছি উড়ছে। তাদের কেউ কেউ উড়ে আসছে পুকুরের এপারে।
আগে বাচ্চারা মৌমাছির গুনগুনুতিতে কিছু কথা, কিছু শব্দ, কিছু অর্থ বুঝতে পেরেছিল। এবার আর সেটা পারল না।
একটা সোনা ব্যাঙ গাল ফুলিয়ে তুড়ি লাফ খেতে খেতে যাচ্ছিল। গ্যাঙর গ্যাঙ শব্দে অস্তিত্ব জাহির করছিল সে। তার ভাষাও বাচ্চারা এবার বুঝতে পারল না। ব্যাঙটা একলাফে পুকুরের জলে গিয়ে পড়ল। তিন তুড়ি লাফ খেয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল সে।
ডোরা বলল, ‘আশ্চর্য! এ তো সেই বাগান! সেদিন যে-অবস্থায় রেখে গেছিলাম, অবিকল সেই অবস্থায় রয়ে গেছে!’
নীলু বলল, ‘আমরা কি আদৌ সেই জাদুর দেশে গিয়েছিলাম, না স্বপ্ন দেখেছি?’
মিতুল বলল, ‘স্বপ্নই যদি হবে, তাহলে আমরা চারজনে একই স্বপ্ন একসঙ্গে কী করে দেখব? তা কি সম্ভব?’
বাচ্চারা ধাঁধায় পড়ে গেল। তাদের বিগত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতা— সনাতন, দেঁতো কুমির, সুষমা, বাঘুয়া, কালাপাহাড়, মকররাজ, শেয়ালপন্ডিত, নন্দিনী, সর্বোপরি বাংলা মা—এ কী উষ্টুম ধুষ্টুম স্বপ্ন, নাকি সত্যি? নাকি স্বপ্ন হলেও সত্যি?
ডোনা বলল, ‘আমার তো স্পষ্ট মনে আছে যে, সেই আজব দেশে গিয়ে আমি ঘুমিয়েছি। মানুষ কি কখনো স্বপ্নের মধ্যে ঘুমোতে পারে?’
ঠিক কথা! ঠিক কথা! চারজনই চিন্তায় মাথা চুলকোতে লাগল।
নীলু বলল, ‘চলো আমরা বাড়ির মধ্যে ঢুকি। দেখি সেখানে কী অবস্থা?’
বাড়ির ভেতরটাও আগের মতোই। মা আর দিদুন অকাতরে ঘুমোচ্ছে। দু-জনেরই নাক ডাকছে, মায়েরটা একটু জোরে—ঘর ঘর ঘরাৎ! দিদুনের একটু মিহি—ফোঁত ফোঁত ফুরুৎ! দুটো নাকই বেশ সুরে বাজছে—যেন দুই ওস্তাদের যুগলবন্দি!
লাইব্রেরি ঘরের পাশে এসে ওরা থমকে গেল। ঘরের দরজা হালকা ভেজানো। ভেতর থেকে টুকরো টুকরো কথা ভেসে আসছে। শ্বশুর আর জামাই কফি খেতে খেতে গল্প করছে।
ডোনা বলল, ‘আশ্চর্য! তার মানে কি এখানে কেউ বুঝতেই পারেনি যে, আমরা জাদুরাজ্যে বাংলা মায়ের কাছে চলে গেছিলাম? সব কিছু একই রকম রয়েছে কীভাবে? ঠিক যেমন রেখে গেছিলাম?’
কফিপানরত বাবা আর দাদুকে রেখে, ডোরা, ডোনা, নীলু আর মিতুল চুপিসারে পা টিপে টিপে ওদের ঘরের দিকে চলল।
পুরোনো দিনের মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো বেশ মোটা দামি ডায়েরিটা টেবিলে রাখা। ওপরে সোনার জলে নাম লেখা—অনন্তলাল ভট্টাচার্য।
ডায়েরিটার সামনে ওরা চারজন বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। কেমন একটা রহস্যের গন্ধ। ডায়েরিটা কেউই খুলতে সাহস পাচ্ছে না। তারপর সাহস করে ডোনা পাতা ওলটাল। ওলটাতেই ভেতর থেকে খসে পড়ল একটা কাগজ।
কাগজটায় খুদে খুদে সুছাঁদ অক্ষরে একটা গান লেখা। ডোনা পড়ল—
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।।
এবার নীলু বলে উঠল, ‘বুঝেছি! বুঝতে পেরেছি!’
—কী বুঝেছিস, নীলু?
—রাখি দুটো কোথায়? আমার পকেটে তো কোনো রাখি নেই। ডোরাদিদি, তোমাকে বাঘুয়া ডোনার রাখিটা দিয়েছিল না? সেটা খুঁজে দেখো।
ডোরাও তার রাখি খুঁজে পেল না।
নীলু বলল, ‘বুঝলে এবার। এটা স্বপ্ন নয়, সত্যি। আমরা সত্যি সত্যিই জাদুর দেশে গিয়ে বাংলা মায়ের হাতে রাখি বেঁধে এসেছি। তাই রাখি দুটো খুঁজে পাচ্ছি না।’
তাই যদি হবে, তাহলে এখানে কেউ টের পেল না কেন? এখানে তো মনে হচ্ছে কোনো সময়ই কাটেনি?
তারও ব্যাখ্যা আছে। আমি পড়েছি যে, জাদুরাজ্যের সময় সবসময় পৃথিবীর সময়ের সঙ্গে একতালে চলে না। ওখানে হয়তো যেটা কয়েক মাস, এখানে সেটা মাত্র কয়েক সেকেণ্ড। তাই এত বড়ো অ্যাডভেঞ্চার করে এসেও এখানে এক মুহূর্তও নষ্ট হয়নি। কেউ জানতেও পারেনি যে, আমরা চলে গিয়েছিলাম।
নীলুর কথা শেষ হতে-না-হতেই দেয়ালের টিকটিকিটা টিক টিক করে উঠল।
বাচ্চাদের মনে হল যে টিকটিকিটাও বলছে— ঠিক! ঠিক! ঠিক!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন