সৌম্য ভট্টাচার্য
বাইরে মুষলধারে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ অন্ধকার। মেঘ ডাকছে গুরু গুরু। থেকে থেকে বিদ্যুতের চমক যেন আকাশকে দু-ফালা করে চিরে বেরিয়ে যাচ্ছে।
মিতুল আর নীলুর বাড়ি ফেরা হল না। মা আর দিদুন মিলে খিচুড়ি রেঁধেছে। সঙ্গে ডিমভাজা আর ইলিশমাছ ভাজা। চারজনে পেটপুরে খেল। গরম গরম খিচুড়ি, সঙ্গে ডিমভাজা, ইলিশমাছ ভাজা—আহা, যেন অমৃত! অনেকটা বেশিই খেয়ে ফেলল চারজনে। তারপর খাটে শুয়ে বালিশ নিয়ে মারপিট শুরু করল। দুপুরে কারোরই ঘুমোনোর অভ্যেস নেই। কিছুক্ষণ বাদে পা টিপে টিপে চারজনে বেরোল। উদ্দেশ্য, আবার বাড়িটা ‘এক্সপ্লোর’ করা। মা আর দিদুন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। দু-জনেরই নাক ডাকছে। মায়েরটা একটু জোরে—ঘড় ঘড় ঘড়াৎ! দিদুনেরটা একটু মিহি— ফোঁৎ ফোঁৎ ফুরুৎ! দুটি নাকই বেশ সুরে বাজছে—যেন দুই ওস্তাদের যুগলবন্দি!
লাইব্রেরি ঘরের পাশে এসে ওরা থমকে গেল। ঘরের দরজা হালকা ভেজানো। ভেতর থেকে টুকরো টুকরো কথা ভেসে আসছে। আগেই বলেছি যে, দাদু ইতিহাসের বিরাট পন্ডিত আর বাবা ডাক্তার হলেও ইতিহাসে খুব উৎসাহী। প্রায়ই শ্বশুর-জামাইয়ের মধ্যে এসব নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রথমে ওরা বাবার গলা শুনতে পেল—
—আপনার বাবা তো স্বাধীনতার পরপরই মারা যান, তাই না?
—হ্যাঁ। ওনার মন ভেঙে গেছিল।
—দেশভাগের জন্যে?
—হ্যাঁ। দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু কী সে স্বাধীনতা? লক্ষ লক্ষ রিফিউজি সীমান্ত পার হয়ে এপার বাংলায় চলে আসছে। বাবা সহ্য করতে পারেননি। প্রায়ই বলতেন—‘এই কি চেয়েছিলাম? এই কি চেয়েছিলাম?’
—উনি কি স্বাধীনতাসংগ্রামী ছিলেন?
—সে অর্থে কখনো গুলি, বন্দুক, পিস্তল ধরেননি, কিন্তু বিপ্লবীদের অর্থসাহায্য করতেন। কাউকে কাউকে আমাদের বাড়িতে লুকিয়েও রেখেছেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে এসেছিলেন।
—রবীন্দ্রনাথ!
—হ্যাঁ, জানো না? রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং বাবার হাতে রাখিবন্ধনের দিন নিজের হাতে রাখি বেঁধে দিয়েছিলেন।
—বলেন কী? এ তো স্মরণীয়, ঐতিহাসিক ঘটনা!
—হ্যাঁ, বাবা ভুলতে পারেননি। মৃত্যুদিন পর্যন্ত বারবার সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতেন।
—বলুন না একটু।
—বাবা তখন বেশ ছোটো। সদ্য ম্যাট্রিক পাশ করেছেন। জানো তো বঙ্গভঙ্গের দিন, ৩০শে আশ্বিন দেশজুড়ে অরন্ধনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। কারো বাড়ি সেদিন হাঁড়ি চড়েনি। বাবা ওইদিন চিৎপুরের নাখোদা মসজিদের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।
—ওখানেই রবীন্দ্রনাথকে দেখলেন?
—হ্যাঁ। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ খালি পায়ে গান গাইতে গাইতে আসছেন—‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’।
—ওঃ! এই গানটা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়।
—ভাবো যে, রবীন্দ্রনাথ নিজে খালি পায়ে গান গাইতে গাইতে আসছেন! কী দৃশ্য!
—তা, আপনার বাবাও রবীন্দ্রনাথের হাতে রাখি বেঁধেছিলেন?
—না, ওনার হাতে রাখি ছিল না। তাতে কী, রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ দু-জনে বাবার সঙ্গে কোলাকুলি করে ডান হাতে দুটো রাখি বেঁধে দিলেন। তারপর সবাই মিলে গান গাইতে গাইতে চললেন।
—আপনার বাবা গান গাইতেন?
—গলায় সুর বেশি ছিল না, তবে চেষ্টা করতেন। জানো, রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে গানটা বাবাকে লিখে দিয়েছিলেন যাতে কথা ঠিকমতো ফলো করতে পারেন।
—নিজের হাতে?
—হ্যাঁ। তখন তো জেরক্সের যুগ ছিল না। হাতে লিখে কপি করতে হত। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’-এর বেশ কয়েকটা কপি রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে করেছিলেন। তার একটা বাবাকে দিয়েছিলেন।
—সে-কপি রয়েছে আপনার কাছে? আর রাখি দুটো?
—সে-কথা আর বোলো না।
—কেন? হারিয়ে গেছে নাকি?
—আমার বয়েস হয়েছে। ভুলো মন। বাবার একটা ডায়েরি ছিল। মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো পুরোনো ডায়েরি। ওপরে সোনার জলে নাম লেখা।
ডোরা-ডোনারা এতক্ষণ কান খাড়া করে শুনছিল। মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো পুরোনো ডায়েরির কথা উঠতে তাদের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। ডোনা ডোরাকে কনুইয়ের গুঁতো মেরে বলল, ‘ডোরাদিদি’!
ডোরা বলল, ‘ইউ শাট আপ, ডোনা! চুপ করে শোন।’
ওদিকে বন্ধ ঘরের ওপাশ থেকে বাবার গলা ভেসে আসছে— ‘সেই ডায়েরিটার কী হল?’
—আর বোলো না। বাবার ডায়েরি, তার ভেতরে ভাঁজ করা একটা কাগজে রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে লেখা গান আর দুটো রাখি আমি যত্ন করে একটা তোরঙ্গে ভরে রেখেছিলাম। তারপর মাঝে বাড়িটা রেনোভেট করলাম। আমাদের এই অংশটা ভেঙেচুরে নতুন করে বানালাম। সেই ডামাডোলে ওগুলো যে কোথায় গেল! অনেকদিন খুঁজে পাচ্ছি না। বয়েসও হয়েছে। আগের মতো খুঁজতে পারি না।
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু ভাবল— এক্ষুনি ঘরের ভেতরে ঢুকে সব ফাঁস করে দেয়। নীলু তো লাফিয়ে ঢুকতেই যাচ্ছিল। মিতুল আটকাল, ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, ‘দাঁড়া। চুপ করে শোন।’
বাবা বলছে, ‘আপনি যে জিনিসগুলোর কথা বলছেন সেগুলোর তো সাংঘাতিক হিস্টরিক্যাল ভ্যালু। শুধু তাই নয়, আজকের বাজারে রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে লেখা গান বা বঙ্গভঙ্গের সময়ের রাখির মেটেরিয়াল ভ্যালুও অনেক হওয়া উচিত।’
—শুধু অর্থ দিয়ে এর মূল্য যাচাই করা যায় না। আমার কাছে এর একটা অন্য সিগনিফিক্যান্সও আছে।
—মানে?
—বাবা তো জানো দেশভাগের পরপরই মারা যান। বয়েস হয়েছিল ষাটের কাছাকাছি।
—অকালমৃত্যুই বলা চলে।
—হ্যাঁ। মৃত্যুকালে বাবার পায়ের কাছে বসে আছি। বাবা ডাকলেন। মুখের কাছে মাথাটা নিয়ে গেলাম। বাবা ফিসফিস করে বললেন, ‘শচী, ভাঙা মন নিয়ে চলে যাচ্ছি। বাঙালির সর্বনাশ যে এভাবে দেখতে হবে ভাবিনি কোনোদিন। একটা কথা বলি, শোন। আমার ডায়েরি, রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আর রাখি দুটো যত্ন করে রাখিস। কখনো হারাস না।’ আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘রাখব বাবা।’ ‘শচী আমার মন বলছে যে, রাখি দুটো আর গানটার মধ্যে অলৌকিক কোনো শক্তি আছে। হয়তো ওদের মধ্যে দিয়েই বাঙালি সাংঘাতিক বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাবে। হারাস না, বাবা। যত্ন করে রাখিস।’ বলে বাবা বালিশের তলা থেকে ডায়েরি, রবীন্দ্রনাথের লেখা কবিতা আর রাখিদুটো বের করে দিলেন। তাই তো ওগুলো হারিয়ে মুষড়ে পড়েছি। মন-মেজাজ খারাপ থাকে। বাবার শেষ ইচ্ছেটা রাখতে পারলাম না।
নীলু ফিস ফিস করে বলল, ‘ডোরাদিদি, বলছিলাম না, গুপ্তধন।’
—গুপ্তধনই বটে।
—কী করবি, দাদুকে দিয়ে দিবি সব কিছু?
‘দাঁড়াও আগে ডায়েরিটা পড়ে দেখি,’ বলল ডোনা।
ডোনা খুব পড়ুয়া। পড়ার কোনো কিছু পেলে স্থির থাকতে পারে না।
এদিকে লাইব্রেরি ঘরের মধ্যে সব চুপচাপ।
দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারল মিতুল—শ্বশুর-জামাই বসে বসে কফি খাচ্ছে। দাদু লাইব্রেরি ঘরের মধ্যে একটা কফি মেশিন বসিয়েছেন। তোফা ব্যবস্থা। ইচ্ছে হলেই বাবারা কফি বানিয়ে খায়। মা বা দিদুনের মুখঝামটা সইতে হয় না!
কফি পানরত বাবা আর দাদুকে রেখে ডোরা, ডোনা, মিতুল আর নীলু চুপিসারে পা টিপে-টিপে ওদের ঘরের দিকে চলল। সদ্য উদ্ধার হওয়া ডায়েরি আর রাখিগুলো ওখানেই ওরা রেখেছে।
পুরোনো দিনের মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো বেশ মোটা দামি ডায়েরি। ওপরে সোনার জলে নাম লেখা— ‘অনন্তলাল ভট্টাচার্য’।
ডায়েরিটার সামনে ওরা চারজন বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। কেমন একটা রহস্যের গন্ধ। ডায়েরিটা কেউই খুলতে সাহস পাচ্ছে না। তারপর সাহস করে ডোনা পাতা ওলটাল। ওলটাতেই ভেতর থেকে খসে পড়ল একটা কাগজ। সঙ্গে শুকিয়ে বাসি হয়ে যাওয়া দুটো জবা ফুল। কাগজটাতে খুদে খুদে সুছাঁদ অক্ষরে একটা গান লেখা। ডোনা পড়ল :
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।।
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ—
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান।।
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা—
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।।
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন—
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।।
অক্ষরগুলো দীর্ঘদিনের ব্যবধানে আবছা হয়ে এসেছে। তবু ডোনার পড়তে তেমন কষ্ট হল না। সে বলল, ‘ডোরাদিদি, এই কি সেই ট্যাগোর যিনি আমাদের ন্যাশনাল অ্যানথেম ‘জানা গানা মানা’ লিখেছেন?’
—তাই হবে।
‘জানা গানা মানা’-র সঙ্গে ডোরা-ডোনা পরিচিত। ইণ্ডিপেণ্ডেন্স ডে এবং তাদের বাৎসরিক ‘কোলাহল’ অনুষ্ঠানে তারা কোলাহলসহকারে গানটা গেয়ে থাকে।
বাবাটা কী বেরসিক! কোলাহল-এর নাম শুনলে বলে, ‘তোদের ‘হলাহল’ প্রোগ্রামটা কবে হচ্ছে?’
যাই হোক, বেরসিক বাবার কথা ভুলে যাওয়াই ভালো। বাবারা ওরকম অনেক উলটোপালটা কথা বলে থাকে।
মিতুল ততক্ষণে ডায়েরিটা থেকে চেঁচিয়ে পড়ছে। সে বেশ ভালো বাংলা পড়তে পারে। খুঁজে খুঁজে তিরিশে আশ্বিনের পাতাটা বের করেছে সে। পুরোনো ধরণের সাধু গদ্যে ডায়েরিটা লেখা।
আজ তিরিশে আশ্বিন। দুর্বৃত্ত লাট কার্জন বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের ব্যবস্থা পাকা করিয়াছে। সদর্পে বলিয়াছে—‘পার্টিশন অব বেঙ্গল ইজ আ সেটলড ফ্যাক্ট।’ দেশনায়ক সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় উপযুক্ত জবাব সিংহগর্জনে দিয়াছেন—‘উই উইল আনসেটল দ্য সেটলড ফ্যাক্ট।’ আপামর বাঙালির ঘরে আজ অরন্ধন। কোথাও চুলা জ্বলিবে না। সদ্য ম্যাট্রিক পাশ করিয়া শহরের পথে পথে বেড়াইতেছি। জঠরে খাদ্য নাই কিন্তু অন্তর উৎসাহে পরিপূর্ণ। চিৎপুরের নাখোদা মসজিদের সামনে থামিয়া গেলাম। গান গাহিতে গাহিতে নগ্নপদে একদল মানুষ আসিতেছে। তাহাদের নেতাকে দেখিয়া চমকিত হইলাম। শালপ্রাংশু, বিশালদেহী, বিশাল বক্ষ মহাপুরুষ। উজ্জ্বল গৌর গাত্রবর্ণ। মুখমন্ডল কৃষ্ণ গুম্ফ-শ্মশ্রুতে আবৃত। খড়্গের ন্যায় উন্নত নাসা। প্রশস্ত ললাট। আয়ত, ধ্যানমগ্ন দৃষ্টিপাত। মরি, মরি! মানবদেহে এত রূপ হইতে পারে? সমস্ত অঙ্গ হইতে যেন প্রতিভার জ্যোতি বিচ্ছুরিত হইতেছে!
সেই বিশালদেহী পুরুষ আমার সামনে আসিয়া থামিয়া গেলেন। স্নেহক্ষরিত কন্ঠে বলিলেন, ‘আজ রাখিবন্ধন। আসুন, আপনার হাতে রাখি বেঁধে দিই।’
লজ্জিত বোধ করিলাম। আমার নিজের হাতে তো কোনো রাখি নাই! মহাপুরুষ বুঝিলেন, বলিলেন, ‘তাতে কী? আমাদের রাখি পরুন।’ আলিঙ্গন করিয়া আমার দক্ষিণ হস্তে রাখি বাঁধিয়া দিলেন। সহযোগী প্রিয়দর্শন এক যুবককে বলিলেন, ‘অবন, তুমিও রাখি বেঁধে দাও। সেই যুবক আমার দক্ষিণ হস্তে আরেকটি রাখি বাঁধিয়া দিলেন।
মহাপুরুষ কহিলেন, ‘গান লিখেছি। এই নিন একটা কপি। বলিয়া একটা কাগজ আমার হাতে দিলেন। গান গাহিতে গাহিতে জোড়াসাঁকো, চিৎপুরের পথ পরিক্রমণ করিলাম। কী প্রাণোন্মাদনাকারী সুর! কী মনোহর কাব্য! যেন গান গাহিয়া বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের জ্বালা জুড়াইয়া দিলাম।
পথে এক সঙ্গীকে প্রশ্ন করিয়া জানিলাম যে, মহাপুরুষ জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়ির সন্তান। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের পুত্র রবীন্দ্র। লোকে রবিঠাকুর বলিয়া জানে। সহযোগী প্রিয়দর্শন যুবক তাঁহারই ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ।
রাখি দু-টি আর গানের কপি যত্ন করিয়া রাখিয়া দিয়াছি। এই ঘটনার স্মৃতি আমার মনের মণিকোঠায় চিরজাগরুক থাকিবে।
এতটা পড়ে মিতুল চুপ করল।
‘কী খটমট পড়লি, মিতুল? কিছুই তো বুঝলাম না।’ বলল লীনা।
—বুঝলি না? সেই তিরিশে আশ্বিন, ১৯০৫-এর কথা হচ্ছে রে। যেদিন রবিঠাকুর তোর দাদুর বাবার হাতে রাখি বেঁধে দিয়েছিলেন।
অনন্তলাল ভট্টাচার্য নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন না। যখন খেয়াল হত, তখন কিছু লিখতেন। ডায়েরিতে তাই অনেক ফাঁক। একদম শেষ হয়েছে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ষোলোই ডিসেম্বর।
কাঁপা কাঁপা হস্তাক্ষরে কয়েকটি লাইন লেখা।
ভগ্নহৃদয়ে, ভগ্নশরীরে এই ভবসংসার ছাড়িয়া যাইতেছি। আশা রাখি, পরমকরুণাময় ঈশ্বর তাঁহার চরণে স্থান দিবেন। বাঙালির সর্বনাশ হইয়াছে। যে দুর্গতি প্রতিনিয়ত দেখিতেছি তাহা সহজে ঘুচিবার নহে। পুত্র শচীপ্রসাদকে ডাকিয়া তাহার হস্তে রবীন্দ্রনাথ লিখিত রাখিসংগীতের কপি ও রাখি দুটি দিব। যত্ন করিয়া রাখিতে বলিব। এই দু-খানি সঞ্চয় আমার জীবনের অক্ষয়সম্পদ এবং এক দেবদুর্লভ সৌভাগ্যের প্রতীক। মন বলিতেছে যে, ইহাদের মাধ্যমে আমাদের জাতের উদ্ধার হইলেও হইতে পারে। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। সেই বিশ্বাস অটুট রাখিয়া এবং কোনো দুর্গতিই চিরস্থায়ী নয়, এই আশা বক্ষে ধরিয়া চলিয়া যাইব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন