গরমের ছুটিতে

সৌম্য ভট্টাচার্য

তোমরা ডোরা, ডোনাকে চেনো কি? ওরা কলকাতার পাটুলিতে থাকে। ডোরার ভালো নাম সোহিনী। ডোনার ভালো নাম রাগিণী। নামে গান থাকলেও গানে ওদের তেমন মন নেই। মা গান শেখাতে বসলেই চোখ ওদের ঘুমে ঢুলে আসে। ডোরা একটু বেঁটে, ডোনা একটু লম্বা। ডোনা একটু শ্যামলা, ডোরা একটু ফরসা।

ডোরা এক্সপার্ট সুইমার। অনেক কাপ, মেডেল পেয়েছে। ডোনা পড়াশোনায় খুব ভালো। প্রায়ই ফার্স্ট, সেকেণ্ড হয়। দুই বোনের মধ্যে খুনসুটি লেগেই আছে। ওদের স্কুলে যাওয়ার বাসে, স্কুলে, বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি চলতেই থাকে—অবশ্য ভাব হতেও সময় লাগে না।

সেবার গরমের ছুটিতে বেজায় গরম পড়েছে। আকাশে সূর্য যেন ধক ধক করে জ্বলছে। বাতাসে আগুনের হলকা। রোদে রাস্তার পিচ গলে আঠালো কাদা। ডোরা-ডোনার ফ্ল্যাটের আশপাশের কাক, চিল, বেড়ালগুলো পর্যন্ত গরমে কাবু হয়ে পড়েছে। ডোনা অনেকক্ষণ গুলতি দিয়ে পোষা বেড়াল তুতবুলুর ল্যাজ তাক করছিল। তুতুবুলু হঠাৎ গায়ের রোঁয়া ফুলিয়ে খ্যাঁক করে উঠল। ডোরাদিদি ঘরের এক কোণে কানে আইপড লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে গান শুনছে। ডোনা ভাবল, এই সুযোগে ডোরাদিদির বিনুনিটা ধরে টানবে কিনা।

এমন সময় মায়ের আবির্ভাব— ‘ডোনা! তুই ফের তুতুর পেছনে লাগছিস! কান টেনে ছিঁড়ে দেব! তোদের নিয়ে আর পারা যায় না। চল, কালকেই চল কল্যাণী। দিন কয়েক হাড় জুড়িয়ে আসি।’

‘মা, দার্জিলিং? গ্যাংটক?’

‘এসব এবার হবে না। তোদের বাবা বলল সামার ভেকেশনে কয়েকদিন কল্যাণীতে কাটাবে।’

কল্যাণীতে ডোরা-ডোনার মামাবাড়ি। অবশ্য মামা-মামি কেউ নেই। প্রকান্ড জমিদার বাড়ির এক কোণে বৃদ্ধ দাদু-দিদুন থাকেন। দাদু ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। এখন অবসর নিয়েছেন। বাড়ি ভরতি শুধু বই, বই আর বই! লোকে এত বই পড়তেও পারে! মামাবাড়ি গেলে তাই ডোরা-ডোনার তাক লেগে যায়। তা ছাড়া দিদুন তো আছেনই। নাতনিদের দেখলেই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। লুচি, আলুর দম, পাঁঠার কালিয়া, চিংড়ির মালাইকারি, পিঠে, পায়েস প্রভৃতি বিবিধ সুখাদ্য থালায় থালায় সাজিয়ে হাজির করতে থাকেন। দিদুনের রান্নার হাতটাও চমৎকার। কল্যাণী যেতে ডোরা-ডোনার তাই মন্দ লাগে না। তবে ডোরা-ডোনাদের স্কুলটা খুব পাজি। গরমের ছুটি বলে নিশ্চিন্তে কাটানোর উপায় নেই। হোমটাস্ক হিসেবে কয়েক গন্ডা প্রোজেক্ট দিয়ে দিয়েছে। সেই প্রোজেক্ট-এর চিন্তায় চিন্তায় ডোরা-ডোনা জেরবার। তাদের মায়েরও রাতের ঘুম চলে গেছে।

দার্জিলিং, গ্যাংটক নয়, শিলং, কালিম্পং নয়, নেহাতই কল্যাণী। তবে কল্যাণীই বা মন্দ কী? বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শহর। রাস্তাঘাটগুলো চওড়া চওড়া। রাস্তার পাশে সার দিয়ে দেবদারু, আম, জাম, বট, জারুল, শাল, শিমুলগাছ। গাছের ডালে গান গাইছে কত নাম-না-জানা পাখি। ভোরের মিষ্টি বাতাস যেন গা জুড়িয়ে দেয়। ভিড়ভাট্টা, গাড়িঘোড়া খুব কম। বেশ একটা শান্তির পরিবেশ। সমস্যা নেই তা নয়। গাছের ডালে ডালে গোদা হনুমানের পাল বংশবৃদ্ধি করেছে। তারা গুপগাপ হুপহাপ শব্দে লোকালয়ে নেমে মাঝে মাঝেই সব কিছু লন্ডভন্ড করে দেয়। তবে তার থেকেও মারাত্মক ব্যাপার রয়েছে। মামাবাড়ির বিস্তৃত বাগানে, যেখানে একটা আদ্যিকালের বুড়ো বটগাছ পুকুরের পাশে আদ্দেক হেলে পড়েছে, তার ডালে বাসা বেঁধেছে এক বিশাল মৌচাক। লক্ষ লক্ষ মৌমাছি সেখানে দিনরাত গুনগুন করছে। ফি-বছর শীতকালে চাক খালি করে মৌমাছিরা উড়ে যায়। বটগাছের ডালে ফিতের মতো লেগে থাকে তাদের মৌচাকের অবশেষ। আবার বসন্তকালে তারা ফিরে আসে। মৌচাক মধুতে ভরে ওঠে। বটগাছতলা আবার ফের মুখরিত হয়।

মৌমাছির ভয়েই ডোরা-ডোনা যেতে চাইছিল না। অবশ্য মায়ের কাছে দরবার করে কোনো ফল হল না।

— মা, ওখানে অনেক মৌমাছি। কামড়ে দেবে!

— রাখ তো! আজ পর্যন্ত কাউকে কামড়েছে?

— ভয় করে, মা। যদি কামড়ায়!

— তোরা তো টিকটিকিকে ভয় করিস, আরশোলা দেখলে দৌড়ে পালাস। চামচিকে দেখলে চিৎকার করতে থাকিস!

— কিন্তু আমাদের প্রোজেক্ট?

— প্রোজেক্ট তো কী? ওখানে গিয়ে করবি।

— হোমটাস্ক?

— বইপত্র সব নিয়ে চল। আমি আর বাবা তোদের পড়াব।

বাবা পড়াবে শুনে ডোরা-ডোনা বিশেষ খুশি হল না। বাবা তাদের গম্ভীর ডাক্তার। দিনরাত কাজেই ব্যস্ত থাকে। যেটুকু ফাঁকা সময় পায়, ডোরা-ডোনার ঘরে এসে গম্ভীর গলায় বলে—‘আয় তোদের চটকাই!’ বলেই খামচাতে শুরু করে! কখনো বলে—‘আয়, আমার বগলের তলায় কোয়ালিটি টাইম স্পেণ্ড কর!’ বাবা কি বোঝে না যে, ডোরা-ডোনা আর ছোট্টটি নেই? তারা বড়ো হয়ে যাচ্ছে। এখন এ সবে তাদের লজ্জা করে! বাবাগুলো যেন কেমন!

বাবা নিজে ভোরে ওঠে। ডোরা-ডোনাকেও তুলতে চায়, বলে— ‘আরলি টু বেড অ্যাণ্ড আরলি টু রাইজ, মেকস আ ম্যান হেলদি অ্যাণ্ড ওয়াইজ।’

অ্যালার্ম দিয়ে ভোরে ওঠার একটা নামও বাবা রেখেছিল—‘নব আনন্দে জাগো!’

ডোরা-ডোনার পক্ষে সে তো আনন্দের জাগা নয়! ঘুমের গভীর থেকে বড়োই দুঃখের, বড়োই কষ্টের সে জাগরণ! ভাগ্য ভালো যে বাবা—‘নব আনন্দে জাগো’-টা বেশিদিন চালাতে পারেনি। ডোরা-ডোনার মা-ও ঘুমকাতুরে। ভোরে ওঠাটা তারও সাংঘাতিক অপছন্দের। তাদের যৌথ চক্রান্তে ‘নব আনন্দে জাগো’ প্রকল্পটা অকালে ভেস্তে গেছে।

বাবার আরেক মুশকিল হল, কল্যাণীতে গেলেই অত বই দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারে না। একটা মোটাসোটা বই নিয়ে কোন রাজ্যে তলিয়ে যায়। তখন কানের পাশে কাঁসর বাজালেও শুনতে পায় না। তা ছাড়া অধ্যাপক শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা তো আছেই। বাবা ডাক্তার হয়েও ইতিহাসের মতো রসকষহীন বিষয়ে এত উৎসাহ পায় কেন কে জানে!

বাবাকে নিয়ে তাই ডোরা-ডোনার মনে চাপা দুঃখ আছে। প্রায়ই ভাবে যে, তারা যদি একটা মনের মতো বাবা পেত— যে চটকাবে না, ভোরে ওঠার জন্য তাড়া দেবে না, ‘নব আনন্দে জাগো’-র মতো একটা বিচ্ছিরি আইডিয়া যার মাথা থেকে বেরোবে না...।

*

যাই হোক ডোরা-ডোনার অনুনয় অগ্রাহ্য করে মে মাসের এক ভোরে তারা সবাই কল্যাণীর উদ্দেশে রওনা হল। মা খুব গুছুনে, তাই পনেরোটা লাগেজ আর বাইশ-জোড়া চটি নিয়েছে। তা ছাড়া বইপত্র, খাতা-পেনসিল, প্রোজেক্ট করার জন্য ল্যাপটপ সঙ্গে চলেছে। ড্রাইভার তিলকমামা গজগজ করতে করতে সব লাগেজ গাড়িতে তুলল। লাগেজের ভারে কেউ ঠিকভাবে বসতে পারেনি। তেড়েবেঁকে কোনোরকমে বসে ‘দুর্গা, দুর্গা’ বলতে বলতে সবাই কল্যাণীর দিকে চলল।

ভোরের রাস্তা ফাঁকা ফাঁকা। তিলকমামা রাজারহাটের মধ্যে দিয়ে স্পিডে গাড়ি চালিয়ে দিল। রাজারহাটে আসতে ডোরা-ডোনা বেশ পছন্দ করে। চোখের সামনে কী সুন্দর একটা প্ল্যানড সিটি গড়ে উঠছে! চওড়া চওড়া রাস্তা। উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি। ম্যাকডোনাল্ডের দোকান। মনেই হয় না তারা কলকাতায় আছে। যেন বিদেশে কোথাও বেড়াতে এসেছে।

ডোরা-ডোনার জন্ম ভারতে নয়। তারা বিদেশে, ইংল্যাণ্ডে জন্মেছে। তবে মরতে কেন বাবা-মা অত সুখসুবিধা ছেড়ে এই নোংরা, অগোছালো শহরে গরম, ঘাম আর পলিউশনের মধ্যে ফিরে এল?

বাবা-মাকে প্রশ্ন করলে দু-জনেই মুচকি হাসে; বলে, ‘পরে বুঝবি, ডোরা-ডোনা— দেশের মাটির টানই আলাদা। হোক নোংরা, হোক অগোছালো। তবু এ তো আমাদের নিজেদের দেশ, নিজেদের মাটি। সারাটা জীবন কি বিদেশ বিভুঁইয়ে পড়ে থাকা যায়?’

তা হতে পারে কলকাতা বা ভারত বাবাদের নিজের দেশ, নিজের মাটি। কিন্তু ডোরা-ডোনা তো ইংল্যাণ্ডে জন্মেছে। তাদের কি সে দেশের ওপর কোনো টান নেই? প্রায় পাঁচ-ছ বছর তারা ইংল্যাণ্ড ছেড়ে এসেছে। এখনো পর্যন্ত সেখানে ফিরে যাবার সৌভাগ্য হয়নি। দু-বোনই চুপচাপ ভাবে, কবে তারা ইংল্যাণ্ডে ফিরবে। সেই সুন্দর দেশ, সেখানে রাস্তাঘাটে নোংরা পড়ে থাকে না, ফুটপাথে ভিখিরির উপদ্রব নেই, মানুষ সেখানে ভদ্র, সেখানে এত পলিউশন নেই। দু-বোনে চুপিচুপি পরামর্শ করে যে, কীভাবে, কখন সেখানে ফেরা যায়। কোন পথে? কোন উপায়ে?

*

কল্যাণী যাওয়ার রাস্তায় স্মরণীয় কিছু ঘটেনি। ব্যারাকপুর ছাড়িয়ে তিলকমামা একজায়গায় টি-ব্রেক দিল। কাচের গ্লাসে ধোঁওয়া-ওঠা চা আর মিষ্টি মিষ্টি বিস্কুট। চায়ের দোকানের পাশে খাটিয়া পাতা, তাতে বসে পথের শোভা দেখতে দেখতে চা-বিস্কুট খেয়ে তারা আবার গাড়িতে চড়ল। দেখতে দেখতে সাদা ধনুকের মতো কল্যাণীর রেলব্রিজটা কাছে চলে এল। এই ব্রিজটা এলেই মনে হয় কল্যাণী চলে এসেছে। আর দেরি নেই।

বলতে ভুলে গেছি—কল্যাণী মানে শুধু পুরোনো জমিদার বাড়ি, দাদু, দিদুন, গাছপালা, হনুমান আর মৌমাছিই নয়, কল্যাণীতে ডোরা-ডোনার দুই বন্ধুও থাকে। মিতুলদিদি বয়েসে তাদের চেয়ে একটু বড়ো, একটু উঁচু ক্লাসেও পড়ে—শান্ত, গম্ভীর। আর আছে নীলু। ডোরা-ডোনার থেকে একটু ছোটো—চঞ্চল, ছটফটে, অঙ্কে পাকা মাথা। প্রায়ই নানা অঙ্ক প্রতিযোগিতায় প্রাইজ পায়। কাছেই তারা থাকে। ডোরা-ডোনা এলেই তারা আনন্দে দৌড়ে দেখা করতে চলে আসে।

*

কল্যাণীতে কয়েকদিন বেশ হইচই করে কাটল। সকাল আর বিকেলে সাইকেলে চেপে তারা বেরিয়ে পড়ে। কল্যাণীর ফাঁকা ফাঁকা রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালানোর খুব আরাম। সাঁই সাঁই করে সাইকেল চালিয়ে কখনো তারা চলে যায় বুদ্ধপার্ক, কখনো-বা কল্যাণীর লেকে। লেকে বোটিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

মামাবাড়ির বিশাল বাগানে আমগাছে প্রচুর আম হয়েছে এবার। কাঁঠাল গাছে থরে থরে কাঁঠাল ফলে রয়েছে। তাদের গন্ধে ভুর ভুর করছে বাগানটা। গাছে চড়ে আম-কাঁঠাল খাওয়ার মজাই আলাদা। মাঝে মাঝে গাছে চড়ার দরকারও পড়ে না। গাছের তলাতেই থরে থরে পাকা আম পড়ে থাকে। এ ছাড়া দিদুনের আদরযত্ন তো আছেই। কয়েকটা দিন নিত্য মজা, নিত্য চড়ুইভাতি। হোমটাস্ক, প্রোজেক্ট ইত্যাদির কথা তারা ভুলেই গেল। মা-ও কিছু বলে না। কাছেই আলপনামাসির বাড়ি। মা সেখানে গিয়ে প্রতিদিন গান-বাজনা করে আসছে। আলপনামাসি খুব সুন্দর ক্লাসিকাল গান গায়। গলা দিয়ে যেন মধু ঝরছে। আর বাবার কথা তো কহতব্য নয়। বিশাল লাইব্রেরি থেকে একটার পর একটা বই বের করছে আর শেষ করছে! মা বলে, বাবা ‘গ্রন্থকীট’! কথাটা খটমট। পরে ডোরা-ডোনা জেনেছে যে গ্রন্থকীট মানে হল বইয়ের পোকা! বাপরে, একটা মানুষ এত বইও পড়তে পারে?

বাবার আরেকটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হল— ডোরা-ডোনাকে বাংলা পড়ার জন্য চাপ দেয়। প্রায়ই বলে, ‘ডোরা, ডোনা—বাঙালি মেয়ে হয়ে তোরা বাংলা পড়বি না? জানবি না বাংলা ভাষায় কত মজা! বাংলা ভাষা কী সুন্দর! পড়বি না আবোল তাবোল, পাগলা দাশু, বুড়ো আংলা, চাঁদের পাহাড়, ফেলুদা, টেনিদা, মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি? ওইসব বই বাবা কিনে আনে মাঝে মাঝে। ডোরা-ডোনা অবশ্য বাংলা বই ছুঁয়েও দেখে না। গল্পের বই তারা পড়ে না তা নয়। হ্যারি পটার-এর সাতটা ভলিউম তাদের মুখস্থ। রোয়াল্ড ডাহল-এর মাটিলডা তাদের খুব ভালো লেগেছে। দুষ্টু ছেলে হরিড হেনরির নানা কীর্তিকলাপ তাদের ঠোঁটের ডগায়। কিন্তু বাংলা—ওরে বাপরে! ভাবলেই ডোরা-ডোনার কম্প দিয়ে জ্বর আসে।

বাবা কি বোঝে না যে, বাংলা একটা ডিফিকাল্ট ল্যাঙ্গুয়েজ। তার বানান তো বিভীষিকা! দুটো ই-ঈ, দুটো উ-ঊ, তিনটে শ-ষ-স, তিনটে র-ড়-ঢ়! বাংলা পড়তে গেলেই ডোরা-ডোনার দু-চোখ ফেটে জল আসে। পরীক্ষার পড়া করতেই প্রাণ ওষ্ঠাগত। দু-লাইন বাংলা লিখতেই দুটো কলম ভেঙে যায়— তো শখের বাংলা পড়া! ফেলুদা, টেনিদার অমনিবাস, বুড়ো আংলা, হযবরল, চাঁদের পাহাড়, গোঁসাইবাগানের ভূত তাই ডোরা-ডোনার গল্পের বইয়ে তাকে অনেকদিন ধরে ধুলো খাচ্ছে।

আগেই বলেছি যে, মামাবাড়ির বাগানের ঠিক মাঝখানে একটা পুকুর আছে। বেশি বড়ো নয়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কাচের মতো স্বচ্ছ জল। তাতে উঁকি দিলে দেখা যায়, ছোটো-বড়ো অনেক মাছ খেলে বেড়াচ্ছে। দাদু পুকুরের একধার সুন্দর করে বাঁধিয়ে দিয়েছে। একটা ছোট্ট ঘাটও আছে।

পুকুরের ঠিক উলটো দিকেই একটা সেকেলে, আদ্যিকালের বুড়ো বটগাছ। বটগাছটা অদ্ভুতভাবে যেন পুকুর থেকেই উঠে পুকুরের মধ্যে আদ্দেক হেলে রয়েছে। তার কান্ডটার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জলের তলায়।

সেই বটগাছের ডালে বিশাল মৌচাক। মৌচাকে দিবারাত্র মৌমাছির গুনগুনানি। তারা মাঝেমধ্যেই ঘরেও ঢুকে পড়ে। তবে ডোরা-ডোনা মানতে বাধ্য যে, মৌমাছিরা এখনও পর্যন্ত বেশ ভদ্র আচরণ করেছে। একবারও কামড়ায়নি।

অবশ্য মৌমাছিদের ভয়েই ডোরা-ডোনারা পুকুরপাড়ে বেশি যায়নি। মাছধরা বা সাঁতার কাটার ইচ্ছে থাকলেও সে-ইচ্ছে অনেক কষ্টে দমন করে রেখেছে।

দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। তারপর হঠাৎ একদিন আকাশ কালো করে পালে পালে মেঘ দেখা দিল। বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। ঠাণ্ডা বাতাস বইতে লাগল। বাবা ঘুম থেকে উঠে চা খেতে খেতে বলল, ‘কী ব্যাপার? অসময়ে বর্ষা? দেশের হলটা কী? সবই গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর খেল।’

মা বলল, ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর আর দোষ কী? তুমিই তো ইউকে থেকে ফিরেই দুমদাম দুটো গাড়ি কিনে ফেললে? তুমিও তো এতে কনট্রিবিউট করছ।’

‘হ্যাঁ, আমরা সবাই জ্ঞানপাপী।’

গ্লোবাল ওয়ার্মিং কিনা কে জানে, টিভির খবরে জানা গেল বঙ্গোপসাগরে একটা গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে, ফলে আগামী দু-তিনদিন বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি চলবে।

শুনে ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুর মুখ হাঁড়ি। কয়েক দিন তোফা মজায় কাটছিল। এখন তারা ঘরে বন্দি।

ডোনা বলল, ‘ডোরাদিদি, আমাদের হলিডে রুইনড হয়ে গেল!’

ডোরা আর মিতুলও মাথায় হাত দিয়ে বসল— ‘কী করা যায়?’

আগেই বলেছি যে, বয়সে সবার ছোটো হলেও নীলুর মাথাই সবচেয়ে পরিষ্কার। সে আবার মাঝে মাঝে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে ভালোবাসে। সে বলে উঠল, ‘এই বর্ষণ আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উদঘাটন করেছে।’

—মানে? স্পিক ইন প্লেন ইংলিশ।

—তোমরা শুদ্ধ বাংলা বোঝো না?

—না। টু ডিফিকাল্ট!

—হোয়াই ডোন্ট উই টেক দিস রেইন অ্যাজ অ্যান অপরটুনিটি?

—কীভাবে?

—এই বাড়িটা কি আমরা কেউ পুরোটা ঘুরে দেখেছি?

—না। টু বিগ!

—হিউজ!

—এগজ্যাকটলি! সামনের দু-তিন দিন আমরা এই বাড়িটা এক্সপ্লোর করব। এর সব ক-টা ঘর, ঘুপচি ঘুরে ঘুরে দেখব। লুকোচুরি খেলব।

—লুকোচুরি কী, ডোরাদিদি?

—তাও জানিস না, ডোনা? লুকোচুরি মানে হাইড অ্যাণ্ড সিক।

শান্ত গম্ভীর মিতুল বলল, ‘আই থিংক ইটস অ্যান এক্সেলেন্ট আইডিয়া। থ্যাঙ্ক ইউ, নীলু! ইউ আর দ্য ব্রেইনি ওয়ান অব দ্য লট।’

মা আর দিদুন মিলে জলখাবারে ন্যুডলস করেছে। ডোরা-ডোনারা ন্যুডলস ভীষণ ভালোবাসে। ভালোবাসে পাস্তা, পিৎজা, বার্গার। যাই হোক, পেট ভরে টম্যাটো সস আর ভিনিগার দিয়ে ন্যুডলস খেয়ে তারা চারজন সেই পুরোনো বিরাট জমিদার বাড়িটা এক্সপ্লোর করতে বেড়িয়ে পড়ল।

বাড়ি না-বলে প্রাসাদ বলাই ভালো। প্রায় পঞ্চাশটা ঘর। দাদু-দিদুন বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পাঁচটা ঘর নিয়ে, সাফসুতরো করে আছেন। অন্যত্র বহু ঘরই তালাবন্ধ। ওপরে বিশাল কড়িবরগা। অন্ধকার অন্ধকার বারান্দা। তিনতলা বাড়িটা একটা চতুষ্কোণের আকারে তৈরি। মাঝের উঠোনে ওপর থেকে সূর্যের আলো আসছে। সেখানে বহুদিনের পুরোনো একটা কুয়ো। এখনো সেখানে জল আছে।

ডোরা-ডোনারা প্রথমে ছাদে ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু ছাদের বিশাল গেট তালাবন্ধ। অনেক টানাটানিতেও খুলল না সেটা।

ছাদের পাশে চিলেকোঠার ঘর। এই ঘরটার দরজা অবশ্য খোলা। ঠেলা দিতেই হাট হয়ে খুলে গেল। অন্ধকার ঘুপচি ঘর। কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। ধুলোয় ধুলো।

‘ঢুকবে ভেতরে, ডোরাদিদি’? ডোনা মিনমিনে গলায় বলল।

—না! না! যদি চামচিকে থাকে?

—শুধু চামচিকে কেন? ইঁদুর, বাদুড়, সাপখোপ, তেঁতুলে বিছে!

শান্ত মিতুলও ভয় পেয়েছে।

আগেই বলেছি যে, বয়সে ছোটো হলেও নীলু বেশ সাহসী আর বুদ্ধিমান। তা ছাড়া বাড়িটা ‘এক্সপ্লোর’ করার প্ল্যানটাও তার মাথা থেকেই বেরিয়েছে। সে এত সহজে দমল না।

‘দূর! দূর! কিচ্ছু হবে না!’ —বলেই একলাফে ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে। ঘরে ঢুকেই চিৎকার—‘ডোরাদিদি! মিতুলদিদি! ডোনাদিদি! শিগগির এসো! গুপ্তধন! আই হ্যাভ ফাউণ্ড ট্রেজার!’

গুপ্তধনের কথা শুনে বাকিরা কেউ স্থির থাকতে পারল না। চামচিকে, সাপখোপ, বিছে, আরশোলা, ইঁদুর, বাদুড়ের ভয় তুচ্ছ করে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল সেই অন্ধকার ঘরের মধ্যে।

নীলু ঘরে ঢুকেই জানলা খুলে দিয়েছে। ফলে অল্প-স্বল্প আলো আসছে ঘরের মধ্যে। সবাই দেখল যে, নোংরা, ধূলিধূসর অপরিচ্ছন্ন ঘরের কোণে মান্ধাতার আমলের এক তোরঙ্গ। তারই সামনে নীলু মহোল্লাসে লাফালাফি করছে।

—কী হল, নীলু? এত লাফাচ্ছিস কেন?

—ডোরাদিদি, এর মধ্যে গুপ্তধন আছে। হিডেন ট্রেজার।

—তোর মাথা আর মুন্ডু!

—না, ডোরাদিদি, ঘরে ঢুকেই মনে হচ্ছে যে, এর মধ্যে স্পেশাল কিছু আছে। আমার মন বলছে। মাই সিক্সথ সেন্স।

এখন নীলুর সিক্সথ সেন্স সত্যিই হয়তো রয়েছে। যা তার মনে বলে, তা অনেক সময় ডোরা-ডোনা হাতে হাতে ফলে যেতে দেখেছে।

সুতরাং নীলুর ঘোষণাকে তারা দুম করে উড়িয়ে দিতে পারল না।

ডোনা অবশ্য প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল, ‘হাসালি, নীলু। যদি ট্রেজারই হবে তবে এখানে ফেলে রাখবে কেন? খোলা দরজা, কোনো প্রোটেকশন নেই। রাখলে ভালো করে পুঁতে রাখবে।’

‘ঠিকই তো।’ সায় দিল ডোরা, ‘গুপ্তধন সবসময় ডিফিকাল্ট জায়গায় লুকিয়ে রাখে। অনেকসময় ক্রিপটিক মেসেজ থাকে। অনেক মাথা ঘামিয়ে, কাঠখড় পুড়িয়ে, সেই সংকেতের রহস্যভেদ করে তবে গুপ্তধন উদ্ধার করা যায়।’

তারা সবাই যখন নানা জল্পনাকল্পনা করছে, ততক্ষণে নীলু কাজে লেগে গেছে।

তোরঙ্গটার সামনে বসে প্রাণপণে তার ডালা খোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারবে কী করে? একটা বিরাট, মরচে পড়া তালা সেখানে লাগানো। হাজার টানাটানিতেও ডালা তাই খুলল না।

এবার আসরে নামল ডোরা।

—দে, আমি একবার চেষ্টা করে দেখি।

—কী করবে, ডোরাদিদি?

—দ্যাখই না।

ডোরার সঙ্গে সবসময় চুলের কাঁটা থাকে। বেছেবুছে বড়োসড়ো একটা কাঁটা বের করল সে। তালার ফুটোয় কাঁটাটা ঢুকিয়ে বার-দুয়েক জোরে চাড় দিতেই ফট করে খুলে গেল তালাটা।

—গ্রেট, ডোরাদিদি! গ্রেট!

ডোরা বিজয়ীর হাসি হাসল।

ডোনা ততক্ষণে একটানে ডালাটা খুলে ফেলেছে। তোরঙ্গ তার সমস্ত রহস্য এবং সম্ভাব্য গুপ্তধন নিয়ে বাচ্চাদের সামনে উন্মুক্ত।

চারজনে অধীর আগ্রহে ঝুঁকে পড়ল তার ওপর। তারপর সবারই বুক ফেটে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।

না! তোরঙ্গে সোনা, দানা, হিরে, জহরত, মণি, মাণিক্য, চুনি, পান্না—কিছুই নেই!

ওপরে একটা সাদা থানকাপড় বেছানো। সেটা সরাতে ওরা দেখল লাল শালুতে মোড়া একটা বইয়ের মতো কী যেন। তার নীচে বেশ বড়ো মাপের গোল গোল দুটো রাখি।

—ব্যস! এইমাত্র!

—কীরে, নীলু? কোথায় তোর গুপ্তধন? হিডেন ট্রেজার?

নীলু ডোনার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। সে ততক্ষণে লাল শালুর বাঁধন খুলে ভেতরের বইটা বার করেছে।

—ডোরাদিদি! মিতুলদিদি! এটা বই নয় ডায়েরি।

—তো?

—ওপরে কী একটা নাম লেখা আছে। ভালো পড়া যাচ্ছে না।

—লাল শালুটা দিয়ে ভালো করে মোছ দেখি।

ভালো করে ঘষতেই ডায়েরির ওপর থেকে অনেকদিনের জমা ময়লা উঠে গেল। পুরোনো দিনের মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো বেশ মোটা দামি ডায়েরি। তার ওপর সোনার জল দিয়ে নাম লেখা। ঘরের আবছা আলোর মধ্যে ডোরা-ডোনা নামটা পড়ল— ‘অনন্তলাল ভট্টাচার্য’। নামটা তাদের চেনা।

দাদুর বাবা। তাদের দাদুর নাম শচীপ্রসাদ ভট্টাচার্য। তারা শুনেছে যে, দাদুর বাবার নাম ছিল অনন্তলাল ভট্টাচার্য। দেয়ালে বাঁধানো তাঁর ছবিও তারা দেখেছে।

—দাদুর বাবাকে সাধু বাংলায় কী যেন বলে, ডোরাদিদি?

ডোনার প্রশ্নে ডোরা একটু বিপন্ন বোধ করল। তার বাংলার দৌড় বেশিদূর নয়। সে তাকাল মিতুলের দিকে।

মিতুল জিগ্যেস করল, ‘বাবার দিকের না মায়ের দিকের?’

—ওরে বাবা! এসব ফ্যাকড়া আছে নাকি?

—নিশ্চয়ই! এটা কী ইংরেজি পেয়েছিস যে, বাবার বাবাই হোক কী মায়ের বাবাই হোক, সবই গ্র্যাণ্ড ফাদার হবে? বাংলা অনেক রিচ ল্যাঙ্গোয়েজ। এখানে বাবার বাবার এক নাম, মায়ের বাবার আরেক।

—যেমন?

—বাবার বাবা হল পিতামহ। তার বাবা হল প্রপিতামহ। মায়ের বাবা হল মাতামহ। তার বাবা প্রমাতামহ।

—ভেরি কমপ্লিকেটেড!

—যাই হোক, তোদের মায়ের বাবা এবং তোদের দাদু বা মাতামহ হলেন শচীপ্রসাদ ভট্টাচার্য, তাঁর বাবা বা তোদের প্রমাতামহ হলেন ঈশ্বর অনন্তলাল ভট্টাচার্য।

—‘ঈশ্বর’ মানে?

—কেউ মারা গেলে তাঁর নামের আগে আমরা চন্দ্রবিন্দু চিহ্ন দিই আর মুখে বলি ‘ঈশ্বর’।

—শুনেছি আমাদের দাদুর বাবা মানে প্রমাতামহ বহুদিন আগে মারা গেছেন। এটা তাহলে তাঁর ডায়েরি।

ওরা ততক্ষণে চিলেকোঠার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। পুরোনো পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামছে। ডোনা বলল, ‘নীলু! রাখিগুলো কোথায় রে?’

—আমার পকেটে রেখেছি।

—দে, আমাকে একটা দে।

নীলু পকেট থেকে দুটো রাখিই বের করল। বেশ বড়ো হলুদ সুতোর রাখি— সোনালি জরি আর পুঁতি বসানো। ঘষে পরিষ্কার করায় তাদের জেল্লা আরো ফুটে বেরোচ্ছে।

একদৃষ্টে রাখি দুটোর দিকে চেয়ে রইল নীলু। মুখে বিচিত্র হাসি।

—ডোনাদিদি, আমার মন বলছে যে, এই রাখিগুলোর মধ্যে কোনো জাদু লুকিয়ে আছে।

ডোনার বিশ্বাস হল না। বেশ পুরোনো রাখি। দেখতে অসাধারণ কিছু নয়।

—কেন বলছিস এ কথা?

—আমার মন বলছে।

আগেই বলেছি যে নীলুর মধ্যে মাঝে মাঝে ইনট্যুইশন কাজ করে যেগুলো প্রায়ই সত্যি হয়।

—তুই তো বলেছিলি তোরঙ্গের মধ্যে গুপ্তধন আছে!

—হয়তো এটাই সেই গুপ্তধন!

ডোনা কথা বাড়াল না। নীলুর হাত থেকে একটা রাখি নিয়ে পকেটে পুরল। ওরা চারজনে ততক্ষণে নীচে নেমে এসেছে।

অধ্যায় ১ / ৩৫
সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%