সৌম্য ভট্টাচার্য
সাপের ফোঁস ফোঁস, বেড়ালের মিউ মিউ, হায়নার হাসি—সেই ভয়াবহ মিশ্র ভৌতিক শব্দ ভেসে আসছে। ক্রমশই কাছে এগিয়ে আসছে।
ডোনার আবার শীত করে উঠল খুব। বমি বমি পেল সাংঘাতিক। দমবন্ধ হয়ে আসতে চাইল। বুড়ি মাসিটা ঘর ছেড়ে বেশ কিছুক্ষণ বেরিয়ে গেছে। বলল তো শরবত আনতে গেছে। তা এত সময় লাগাচ্ছে কেন? এদিকে সেই সাংঘাতিক আওয়াজটা ক্রমশই কাছে চলে আসছে। এক বিকট দুর্গন্ধে গুলিয়ে উঠছে পেটের ভেতরটা। ডোনা জানলার কাছে গেল। বাইরের বাতাস চাই, দম তার বন্ধ হয়ে আসছে। জানলাটা কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। কাপড় সরিয়ে জানলা খোলার চেষ্টা করল ডোনা। কবজাগুলো সব জং ধরে গেছে। বহুদিন এ জানলা খোলা হয়নি। অনেক চেষ্টা আর টানাটানির পর জানলা খুলতে মিষ্টি বাতাস এসে ঘরটা ভরিয়ে দিল। বাইরে গাঢ় অন্ধকার। কুয়াশায় ঢাকা চারদিক। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।
ডোনার খুব মনখারাপ করে উঠল। বুক ফেটে কান্না এল তার। ঘরবাড়ি, বাবা-মা ছেড়ে সে কতদূরে চলে এসেছে! ডোরাদিদি, নীলু, মিতুল এবং বাঘুয়ার নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে কালনেমির মতো এক মিথ্যেবাদীর পাল্লায় পড়ে সে যক্ষপুরীর মতো একটা ভয়ংকর জায়গায় ঢুকে পড়েছে। কীভাবে সে পরিত্রাণ পাবে? কীভাবে সে উদ্ধার পাবে এই পাপপুরী থেকে? ডোনা সেই খোলা জানলায় মাথা রেখে কাঁদতে লাগল। তার চোখ থেকে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
তারপর ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা।
ডোনা অনুভব করল যে, সে একা নয়। ঘরে আরো কেউ উপস্থিত হয়েছে।
কে সে?
ঘাড় ঘোরাতে ডোনা তার পাশে এক আশ্চর্য রূপসী মেয়েকে দেখতে পেল। মেয়েটা অপরূপ সুন্দরী। কালো দীর্ঘ এলো চুল মেঘের মতো তার কোমরের কাছে আছড়ে পড়েছে। কমনীয় মুখ। গলায় রক্তকরবীর মালা। দুই হাতে রক্তকরবীর কঙ্কণ।
চমকে গিয়ে ডোনা বলল, ‘তুমি কে?’
উত্তরে মেয়েটা এক স্নিগ্ধ হাসি হাসল। মুক্তোর মতো দাঁত ঝিকমিকিয়ে উঠল। সে-হাসিতে এমন আশ্চর্য কিছু ছিল যে, ডোনা আশা পেল, ভরসা পেল, তার নিরাশ বুক আবার আনন্দে ভরে উঠল।
মেয়েটা মিষ্টি রিনরিনে গলায় বলল, ‘আমি নন্দিনী!’
—নন্দিনী? কে তুমি? কোত্থেকে এলে?
—তুমিই তো আমায় নিয়ে এলে, ডোনা—যখন তুমি কাঁদলে!
—আমি তোমায় নিয়ে এলাম?
—হ্যাঁ গো! তোমার জানলার নীচে লোহালক্কড়ের জঞ্জালের মধ্যে আমি তো রক্তকরবী হয়ে ফুটেছিলাম। যেই তোমার চোখের জল আমার গায়ে পড়ল, আমি আবার জেগে উঠলাম। কোনো নিষ্পাপের চোখের জল গায়ে পড়লে আমি জেগে উঠি!
ডোনা হতবাক হয়ে একদৃষ্টিতে নন্দিনীর দিকে চেয়ে রইল।
এর মধ্যে ডোনার ঘরের দরজাটা ধীরে ধীরে ফাঁক হতে শুরু করল। সাপের ফোঁস ফোঁস, বেড়ালের মিউ মিউ আর হায়নার হাসির মিশ্র ভৌতিক শব্দ অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠেছে। বিকট দুর্গন্ধে ভরে গেছে ঘরটা। একটা দীর্ঘ প্রলম্বিত ছায়ার মতো কী যেন দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে এল। দেখে চমকে উঠল ডোনা। ছায়া নয়, কালো মাকড়শার রোঁয়া ওঠা শুঁড়। লক লক করে কাউকে খুঁজছে, চাইছে।
ভয়ে চিৎকার করে উঠল ডোনা, ‘বাঁচাও! বাঁচাও! রক্ষা করো!’
নিমেষে নন্দিনী সেই শুঁড় আর ডোনার মধ্যে নিজের শরীর স্থাপন করে ডোনাকে অভয় দিল, ‘ভয় পেয়ো না, ডোনা! কিচ্ছুটি ভয় পেয়ো না! আমি তো আছি! তোমার ভয় কীসের?’
রক্তপাগল কালাপাহাড়ের দ্বিতীয় শুঁড়ও দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেছে। দুই শুঁড় আছাড়ি-বিছাড়ি করে ডোনার রক্ত চাইছে। বীভৎস দুর্গন্ধে ভরে গেছে ঘরটা। ডোনা অজ্ঞানের মতো দেওয়ালে সিঁটিয়ে রয়েছে।
নন্দিনী কিন্তু ভয় পেল না। তার পরনের রঙিন বালুচরি শাড়ির আঁচলে বাঁধা এক তীক্ষ্ণ কুঠার সে দৃঢ় মুষ্টিতে ওপরে তুলে ধরল। তার পর সবলে বসিয়ে দিল একটা শুঁড়ের ওপর।
একটা তীব্র আর্তচিৎকার শোনা গেল। যেন যুদ্ধকালীন সাইরেন বিরতিহীনভাবে বাজছে। আহত শুঁড়টা থেকে স্রোতের মতো গলগলিয়ে নীল কালো বিষ বেরিয়ে এল। নন্দিনী তার কুঠারটা দ্বিতীয় শুঁড়ের ওপরও বসিয়ে দিল।
—তুমি ডোনাকে মারতে পারবে না, কালাপাহাড়! কেউ পারবে না! আমি ডোনাকে রক্ষা করব! আমি যক্ষপুরীর নন্দিনী!
নন্দিনীর এই প্রবল আত্মপ্রত্যয়ে থমকে গেল কালাপাহাড়। সাপের ফোঁস ফোঁস, বেড়ালের মিউ মিউ, হায়নার হাসি স্তব্ধ হয়ে গেছে। প্রলম্বিত ছায়াটা সরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আহত শুঁড়দুটো বিষক্ষরণ করতে করতে গুটিয়ে ছোটো হয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল।
এতক্ষণে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল ডোনা। নন্দিনী তার বালুচরি শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা বিষ মুছে মেঝেটাকে ঝকঝকে তকতকে করে তুলল।
তার শরীর থেকে বেরোনো আশ্চর্য সুগন্ধে ঘরের বাতাসও নির্মল হয়ে উঠেছে।
ডোনা ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘ও আর আসবে না?’
—না, ডোনা, ও ভয় পেয়েছে। আহত হয়েছে। তোমাকে আর ঘাঁটাবে না। আমি এবার যাই?
‘তুমি চলে যেয়ো না, থাকো,’ ডোনা মিনতি করল।
‘কিচ্ছু চিন্তা নেই, ডোনা,’ ঘরের দরজাটা ঠেলে বন্ধ করতে করতে বলল নন্দিনী, ‘তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমোও। কিছু খেয়েছ?’
—হ্যাঁ, বাঘুয়ার দেওয়া আমসত্ত্ব।
—তবে তো পেটভর্তি। পালঙ্কে শুয়ে একটু বিশ্রাম নাও দেখি। দু-চোখের পাতা এক করো। কতই না পরিশ্রম গেছে!
—তুমি কোথায় থাকবে নন্দিনী?
—কেন আমি তোমার জানলার নীচে লোহালক্কড়ের জঞ্জালের মধ্যে রক্তকরবী হয়ে ফুটে থাকব!
—ডাকলে আসবে তো?
—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আসব, ডোনা। তোমার কোনো চিন্তা নেই।
ডোনাকে পালঙ্কে শুইয়ে দিয়ে, গায়ে চাদর টেনে দিল নন্দিনী, মশারি টাঙিয়ে দিল। তারপর জানলা বন্ধ করে কালো পর্দা টেনে দিয়ে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। যাওয়ার আগে বার বার বলে গেল, ‘কিচ্ছু ভয় পেয়ো না, ডোনা। আমি কাছে-পিঠে থাকব। তোমায় পাহারা দেব। কোনো বিপদ হলেই আমায় ডেকো। মনে রেখো আমার নাম—আমি যক্ষপুরীর নন্দিনী।’
এই বলে বালুচরি শাড়ি পরা সেই অপরূপ সুন্দরী মেয়ে, গলায় আর হাতে যার রক্তকরবীর কঙ্কন, মেঘের মতো ঘন কালো চুল যার কোমর বেয়ে উপচে পড়েছে, সে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। ঘর জুড়ে এক আশ্চর্য সুগন্ধ, এক বর্ণনাতীত সুবাস ভেসে বেড়াতে লাগল। ডোনার খুব ঘুম পেল। যেন যুগ যুগ ধরে সে ঘুমোয়নি। কালো পর্দা ঢাকা অন্ধকার ঘরে মশারির তলায় বালিশে মাথা রেখে গায়ের চাদর টেনে নিয়ে ডোনা ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন