বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়

সৌম্য ভট্টাচার্য

বাচ্চারা যখন গান গেয়ে, রাখি পরিয়ে বাংলা মায়ের বুকের ঘা জুড়িয়ে দিচ্ছে, তখন কালাপাহাড়ের কী হল? বাঘুয়ার কী হল?

এ ব্যাপারে একমাত্র সাক্ষী ছিল নান্দীমুখ এবং তার সঙ্গী কিছু সশস্ত্র ছুঁচো।

বিষকুন্ডের পাশে প্রতীক্ষায় ছিল কালাপাহাড়। সে জানত যে, বাঘুয়ার সঙ্গে অন্তিম সংগ্রাম আসন্ন। বাঘুয়া যখন গর্জন করতে করতে বিষকুন্ডের সামনে এল, তখন দুই মারাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বী সর্বপ্রথম পরস্পরের মুখোমুখি হল।

দেঁতো কুমির আর তার দলবল চুমুক দিয়ে বিষকুন্ড সাফ করে দিয়েছে। কালাপাহাড়ের পক্ষে কুন্ডে ডুব দিয়ে মেঘলোকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। নিরুপায় কালাপাহাড় তার মর্ত্যরূপ পরিগ্রহ করে কুন্ডের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বাঘুয়াকে আক্রমণ করল।

কেমন সে রূপ? কেমন সে ভয়াল, ভয়ংকর চেহারা?

নান্দীমুখ আড়াল থেকে দেখেছিল। তার সাক্ষ্য সবসময় বিশ্বাসযোগ্যও নয়। তবে নান্দীমুখের মতে, সে একটা প্রকান্ড মিশকালো মাকড়সা। আটটা চোখ, আটটা রোমশ শুঁড় বা দাঁড়া। সামনের দাঁড়া দুটি চিমটের মতো ঠক ঠক শব্দ করছে। আকার আয়তনে একটা অতিকায় ঘোড়ার সমান।

সে একটা লড়াই হয়েছিল বটে! কালাপাহাড় প্রথমে রেশমি সুতোর জাল বিছিয়ে বাঘুয়াকে বন্দি করে ফেলে। নামেই সুতো, আসলে জাহাজ বাঁধার কাছির মতো মোটা। আষ্টেপৃষ্টে বাঘুয়াকে বেঁধে ফেলে কালাপাহাড় বাঘুয়াকে তার বিশাল হাঁ-মুখের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

বাঘুয়াও ছাড়বার পাত্র নয়। থাবার আঘাতে কালাপাহাড়ের চারটে শুঁড়কে সে কেটে ফেলে। গল গল করে নীল কালো বিষ বেরোতে থাকে ছিন্ন শুঁড়গুলো থেকে।

উপর্যুপরি থাবার আঘাতে বাঘুয়া ভেঙে দেয় কালাপাহাড়ের মাথা। কামড়ে গেলে দেয় তার নিষ্পলক চোখ। তখন তীব্র আর্তচিৎকার করে কালাপাহাড় মরে যায়। সে চিৎকার নান্দীমুখের প্রাণে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধকালীন সাইরেনের বিরতিহীন আর্তরবের মতো সে চিৎকারে যক্ষপুরীর ভিত পর্যন্ত টলে উঠেছিল। তবে কালাপাহাড় ছাড়ার পাত্র নয়। মৃত্যুর আগের মুহূর্তে শেষ মরণকামড়ে সে তার সবটুকু বিষ বাঘুয়ার দেহে ঢেলে দেয়।

কালাপাহাড়ের মৃত্যুর পর বেশ কিছুক্ষণ বাঘুয়া তার মৃতদেহের পাশে আচ্ছন্নের মতো শুয়েছিল। নান্দীমুখ তো ভেবেছিল যে, বাঘুয়া মরেই গেছে। শেষপর্যন্ত মরণাহত বাঘুয়া, তার সর্বশরীর বিষের নীলে নীল, টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়। যক্ষপুরীর একপাশে লোহালক্কড়ের জঞ্জালের কাছে গিয়ে যন্ত্রণায় চোখের জল ফেলতে থাকে সে। তখনই ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা। সে-গল্প বলতে গিয়ে নান্দীমুখেরও সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল।

জঞ্জালের মধ্যে থেকে সহসা বেরিয়ে আসে এক অপরূপ রূপসী মেয়ে। বালুচরি শাড়ি পরা সেই মেয়ের গলায় আর হাতে রক্তকরবীর কঙ্কণ। মেঘের মতো ঘন কালো চুল তার কোমর বেয়ে উপচে পড়ছে। সেই মেয়ে তার শাড়ির আঁচল দিয়ে যত্ন করে মুছে দেয় বাঘুয়ার বিষনীল শরীর। তার আঁচল দিয়ে শুষে নেয় বাঘুয়ার দেহের বিষ। তার আঁচলের স্পর্শে বিষের প্রকোপ কেটে গিয়ে বাঘুয়া আবার ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে, বল পায়, পুনর্জন্ম লাভ করে।

আর মেয়েটা? সে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। ফেলে রেখে যায় এক বর্ণনাতীত সুবাস, যা ভেসে বেড়াতে থাকে যক্ষপুরীর প্রাঙ্গণে। নান্দীমুখ দেখে ছিল যে, কালাপাহাড়ের শবদেহও মিলিয়ে যাচ্ছে। কটু কালো ধোঁয়া হয়ে সেটা মিশে যাচ্ছে বাতাসে। তার কোনো চিহ্ন পড়ে থাকছে না। মিলিয়ে যাচ্ছে মাটিতে পড়ে থাকা নীল-কালো বিষ।

এই অন্তিম যুদ্ধের বিষয়ে পরে বাঘুয়া কোনোদিন মুখ খোলেনি। তার যন্ত্রণার কথা, কষ্টের কথা, যন্ত্রণার থেকে তার মুক্তির উপাখ্যান— তার নিজের মুখ থেকে কেউ কখনো শোনেনি।

নান্দীমুখের বক্তব্যও সবাই বিশ্বাস করেনি। বিশেষ করে সেই আশ্চর্য সুন্দরী মেয়েটার গল্প।

সনাতন তো বলেই ফেলেছিল, ‘নান্দীমুখ! ক-ছিলিম গাঁজা সেদিন তুই টেনেছিলি? এরকম উষ্টুম-ধুষ্টুম গল্প ফেঁদেছিস!’

একমাত্র ডোনা নান্দীমুখের গল্প পুরোটা বিশ্বাস করেছিল। সবাই যখন সেই মেয়েটার আবির্ভাব নিয়ে রসিকতা করছে, তখন একমাত্র ডোনাই চুপ করে ছিল। সে মনে মনে বলছিল, নন্দিনী! নন্দিনী এসেছিল! মৃতপ্রায় বাঘুয়াকে, বিষনীল বাঘুয়াকে সেই উদ্ধার করেছে! সে তো বলেছিল দরকার পড়লেই সে আবার আসবে!

সেই ভয়ংকর যুদ্ধে কালাপাহাড় বাঘুয়ার হাতে মারা গেল। বাঘুয়া মরতে মরতে নন্দিনীর হাতে পুনর্জন্ম পেল। শেয়ালপন্ডিত দেঁতো কুমিরের জলখাবার হলেন। সম্মুখসমরে অগণিত খোক্কোস আর ছুঁচো মারা পড়ল। তাদের মৃতদেহ যক্ষপুরীর প্রাঙ্গণে স্তূপাকৃতি করে অগ্নিসৎকার করা হল।

মকররাজের কী হল? কেউই ভালো মতো জানে না। ধিনিকেষ্ট নামধারী এক তরুণ ছুঁচো মকররাজকে তাড়া করেছিল। তার মতে, বেগতিক দেখে মকররাজ যক্ষপুরীর ছাদ থেকে তাঁর পোষা পক্ষীরাজের পিঠে চড়ে পালিয়ে যান।

কোথায় গেলেন তিনি? তা নিয়েও বিস্তর জল্পনা-কল্পনা। কেউ বলে তিনি হলিউডের দিকে গিয়েছেন। ওখানে তাঁর স্টুডিয়ো কেনার কথা ছিল। তবে গরিষ্ঠসংখ্যক লোকের মতে, তিনি আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের দ্বীপে পালিয়ে গেছেন। ওখানকার গোপন ব্যাংক ভল্টে ওনার তাল তাল চোরাই সোনা জমিয়ে রাখা ছিল। সেই সোনা গুনে, আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের আতিথেয়তা উপভোগ করে, সূর্যকরোজ্জ্বল দ্বীপের বেলাভূমিতে আরামেই অবসর কাটাচ্ছেন তিনি।

কালনেমিকে কিছু ত্রিশূলধারী ছুঁচো তাড়া করেছিল। কোণঠাসা হয়ে, মৃত্যু আসন্ন জেনে কালনেমি বলেছিল যে, সে আদতে কালনেমি নয়, ছদ্মবেশী নটসূর্য নাড়ুগোপাল! তার অকালমৃত্যুতে কলাজগতের বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে। বলা বাহুল্য, সশস্ত্র ত্রিশূলধারী ছুঁচোরা কেউই কালনেমির মিথ্যাভাষণ বিশ্বাস করেনি। ত্রিশূলের আঘাতে সেই মিথ্যেবাদী বৃদ্ধ ভামের দেহান্ত ঘটে। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে কালনেমি বিলাপ করে বলেছিল, ‘হায়! তোমরা যদি জানতে যে, আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কত বড়ো মহৎ একজন শিল্পী দুনিয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছেন!’

সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%