সৌম্য ভট্টাচার্য
মকররাজ অসুস্থ। তাঁর মনমেজাজ একদম ভালো নেই। সেদিন তাঁর সভার বাইরে একটা ময়না পাখি গান গেয়ে তাঁর সমস্ত চিত্তকে তিক্ত করে দিয়েছিল। তারপর তাঁর পিত্ত, বায়ু আর কফ একসঙ্গে কূপিত হয়েছে। রাজবৈদ্যদের খবর দেওয়া হয়েছে। তাঁরা ব্যস্তসমস্ত হয়ে শয্যাশায়ী মকররাজের চিকিৎসা করছেন। চ্যবনপ্রাশ, মহাদ্রাক্ষারিষ্ট, মৃতসঞ্জীবনী, সূচিকাভরণ কোনো কিছুই বাদ নেই। বৈদ্যদের যে কোহল একবিন্দু পান করলে মৃত হাতি চাঙ্গা হয়ে উঠে বসে, তার দু-বোতল হজম করেও মকররাজের ঘোর কাটেনি। তিনি খালি বিড় বিড় করছেন—
বসন্ত যে রঙিন বেশে ধরায় সেদিন অবতীর্ণ।
...তখন তরুণ ছিল অরুণ আলো,...
তারপরই চমকে উঠে বলছেন, ‘অরুণ আলো আসবে কী করে? আসার তো কথা নয়! বেয়ারা! দাও জানলা বন্ধ করে দাও! আমার আলো সহ্য হয় না!’
আসলে জানলা-দরজা সবই বন্ধ। জানলাগুলো আবার কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। কারণ ডোরা, ডোনারা এ-দেশে আসার পর, বাঘুয়া ফেরার পর, কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। আলোর প্রাখর্যও গেছে বেড়ে। একটা পরিবর্তন যে আসছে, তা দেশের মানুষ তথা খোক্কোসরা বুঝতে পারছে। কিন্তু কী সে পরিবর্তন, তা কারো কাছেই স্পষ্ট নয়।
সেই জটিল, শঙ্কাকুল পরিস্থিতিতে মকররাজের অনুপস্থিতিতেই খোক্কোসদের একটা সভা বসেছিল। সভাপতিত্ব করছিলেন শেয়ালপন্ডিত, যিনি সভাপন্ডিত তথা রাজ্যের ন্যায়াধীশও বটে। কালাপাহাড় সশরীরে দেখা দেয়নি। আগের মতোই এক দীর্ঘ প্রলম্বিত ছায়া তার প্রতিনিধিত্ব করছে। ছোটো অমাত্য তার মুখপাত্র হিসেবে বর্তমান আছেন।
শেয়ালপন্ডিত বললেন, ‘সর্বশেষ সংবাদ কী? মকররাজ কেমন আছেন?’
সেজো অমাত্য মাথা নাড়লেন, ‘ভালো নয়। একদমই ভালো নয়। কেমন অস্থির, বিচলিত ভাব। মনমরা হয়ে আছেন সবসময়।’
—সোনা গুনছেন না?
—সেদিন পাতালঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ভাবলাম সোনার তাল গুনলে মনটা ঠিক হবে। কিন্তু একঘণ্টা সোনার তাল গুনেও কোনো শান্তি পেলেন না। আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের দেশে কত সোনার তাল জমেছে, সে হিসেব দেখেও মুখে হাসি ফুটল না। শেষে যা বললেন, তাতে আমাদেরই বুক ধুকপুক করতে লাগল।
—কী বললেন?
—বললেন, ‘মাটির নীচের এই তাল-তাল মরা সোনা গুনে কী হবে? বাইরে যে চারদিকে রোদের সোনা। সেটাই তো ঠেকানো গেল না।’
—হুঁ! কঠিন কেস! মালি?
শেয়ালপন্ডিতের আজ্ঞায় একটা লুঙ্গি পরা বুড়ো মতো লোক এসে মাথা ঝুঁকিয়ে সেলাম করল, ‘দন্ডবৎ হই, ন্যায়াধীশ।’
—ময়নাটা গান গাওয়ার পর বাগানে যে-গাছগুলো গজিয়ে উঠেছিল, যে-ফুলগুলো ঝলমল করে উঠেছিল, তাদের কী ব্যবস্থা করেছ?
—আপনার কথামতো বাগানে বিষ আর অ্যাসিড দিয়ে সব গাছ, সব ফুল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ন্যায়াধীশ। সব জায়গায় খুরপি দিয়ে মাটি খুঁড়ে মূলসুদ্ধ উপড়ে দেওয়া হয়েছে।
—বেশ করেছ। কোনো গাছ যেন না বাঁচে। কোনো ফুল যেন না ফোটে। কোনো ফল যেন না ফলে।
—তবে সমস্যা হচ্ছে, ন্যায়াধীশ।
—কী সমস্যা?
—বাগানের এককোণে লোহালক্কড়ের জঞ্জালের মধ্যে একটা রক্তকরবী ফুটেছে। সেটা কিছুতেই মরতে চাইছে না। এত বিষ দিলাম, এত অ্যাসিড ঢাললাম, তবু কিছু হল না।
শেয়ালপন্ডিত কালাপাহাড়ের ছায়ার দিকে তাকালেন।
—কী হে, সেনাপতি। কিছু ব্যবস্থা করো! তোমার বিষের বড়ি তো বিফল দেখছি!
কালাপাহাড় ক্রুদ্ধ হয়ে ফোঁস করল। ছোটো অমাত্য, যিনি কালাপাহাড়ের মুখপাত্র, তিনি শশব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘প্রভু বলছেন যে, তাঁর বড়ি অব্যর্থ। হয়তো প্রয়োগে ভুল হচ্ছে। রাজবৈদ্য কৃতান্তকুমার মারণরত্ন নিজে বাংলা মা-র চিকিৎসার ব্যাপারটা দেখছেন। আমরা সব ব্যাপারে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিচ্ছি।
—তাই যদি হবে তবে বাংলা মা মরছেন না কেন? কৃতান্তকুমারের মতো কৃতী বৈদ্যও বিফল হচ্ছেন কেন?
—ওনার খুব কড়া জান। তাছাড়া ওনার ইচ্ছামৃত্যু।
—বাজে কথা। আমাদের রাজত্বে ভালো কেউ বাঁচতে পারে না। ডাইনিটাকে ডাকো।
শেয়ালপন্ডিতের আদেশে সেই বীভৎস ডাইনিকে সভায় হাজির করা হল। তার কুলোর মতো কান, মুলোর মতো দাঁত, লকলকে জিভ। নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বিষের ধোঁয়া বেরোচ্ছে। কালাপাহাড়ের অনুচরী এই ডাইনি বাংলা মায়ের পরিচর্যা করে আর তাঁর বুকের ঘায়ে নিয়ম করে বিষ ঢালে। ডাইনির রূপ দেখে অনেক খোক্কোসই অজ্ঞান হয়ে গেল। অবিচলিত শেয়ালপন্ডিত বললেন, ‘ডাইনি! তুমি অকম্মার ঢেঁকি! বাংলা মা-কে মারতে পারছ না কেন?’
শুনে সে বুড়ি ডাইনি খাড়া হয়ে তার মুলোর মতো দাঁত বের করে, লকলকে জিভ ঠোঁটে বুলিয়ে প্রথমে প্রবল এক ভেঙচি কাটল। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে দুর্গন্ধময় বিষের ধোঁয়া গলগল করে বেরোতে লাগল। সভার খোক্কোসরা হেঁচে, কেশে অস্থির হয়ে উঠল।
শেয়ালপন্ডিত বললেন, ‘থাক! থাক! আর রাগ দেখিয়ে কাজ নেই! তোমার বিদ্যের দৌড় বোঝা গেছে!’
ডাইনি বলল, ‘ম্যাশ! ফ্যাঁশ! হ্যাঁচচো!’
ছোটো অমাত্য, যিনি কালাপাহাড়েরও ইন্টারপ্রিটার, তিনি বললেন, ‘ডাইনি বলছে যে, বিষ দেওয়ায় কোনো ত্রুটি নেই। নিয়মমতো সবই করা হচ্ছে।’
—তাহলে বিষের ডোজ বাড়াও। যদি একবার দিতে, তাহলে দু-বার দাও। যদি দু-বার দিতে, তাহলে তিনবার দাও। যদি তিনবার দিতে, তাহলে চারবার দাও। কিছু একটা করো! খালি ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করলেই চলবে?
শেয়ালপন্ডিতের আজ্ঞায় ডাইনি বিদায় হল।
বড়ো অমাত্য বললেন, ‘উঃ! সারা ঘরটা বিষাক্ত করে দিয়ে চলে গেল! জানলাটা খুলি?’
—তুমি কি পাগল হলে, বড়ো অমাত্য? এদেশে জানলা খুলে শেষে রোদ ঢুকতে দিয়ে মরি আর কী? প্রধান গুপ্তচরকে ডাকো।
গুপ্তচর প্রধান এলেন। তাঁকে খোক্কোস বলে চট করে চেনা যায় না। গোবেচারা, শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকের মতো চেহারা। শুধু মাফলার দিয়ে গলাটা ঢাকা।
—কী হে, গুপ্তচর প্রধান? সংবাদ কী? বাঘুয়া কি সত্যিই ফিরেছে?
—হ্যাঁ, ন্যায়াধীশ। খাঁড়ির জঙ্গলে যে প্রকান্ড বাঘটা সম্প্রতি দেখা গেছে, বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়েছি যে, সে বাঘুয়া ছাড়া আর কেউ নয়।
গুপ্তচর প্রধানের কথায় সভার খোক্কোসরা ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল। কালাপাহাড় ফোঁস করে উঠল। সেটা রাগে না ভয়ে, তা চট করে বোঝা গেল না।
শেয়ালপন্ডিত চমকে উঠেছিলেন। ভয়ে তাঁর প্রাণও ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। শেষে প্রবল প্রচেষ্টায় মুখে হাসির একটা অনুকৃতি করে বললেন, ‘তুমিও পাগল হলে গুপ্তচর প্রধান? আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের দ্বীপ থেকে অকূল দরিয়া সাঁতরে বাঘুয়া ফিরবে কী করে?’
—দরিয়া ফাঁক হয়ে তার পথ করে দিয়েছে, ন্যায়াধীশ।
—সর্বনাশ! আর চারটে বাচ্চা, তাদের খবর কী?
—তারা বাঘুয়ার সঙ্গে গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে। তাদের আর কোনো খবর নেই।
—তাদের মধ্যে পাপ আছে কি? জানো-তো, পাপমনে গাইলে রাখিসংগীত কোনো ফল দেবে না।
—যতদূর জানি, নেই। ন্যায়াধীশ বাচ্চাগুলো নিষ্পাপ, ওরা তো কখনো বিষের বড়ি খায়নি। তবে একটা বিষয় বেশ কৌতূহলজনক।
—কীরকম?
—আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত গুপ্তচর হল বৃদ্ধ ভাম কালনেমি। সে একটা ভোঁদড়ছানার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে। ভোঁদড়ছানাটার নাম হ্যাংলা।
—কে সে?
—সনাতন ভোঁদড়ের ছেলে।
—সনাতন? সে তো অতি পাজি, নচ্ছার, বদ ভোঁদড়! দেঁতো কুমিরের বিরাট বন্ধু।
—সনাতন বদ হতে পারে ন্যায়াধীশ, কিন্তু ওর ছেলেটা অতি পেটুক আর লোভী। ওকে তোপসে মাছ খাইয়ে কালনেমি কিছু গোপন তথ্য বের করেছে।
—বেশ! বেশ! কী সে তথ্য?
—ন্যায়াধীশ! হ্যাংলা কিছু কম খলিফা নয়। পাঁচসের তোপসে সাবড়ে তবে সে মুখ খুলেছে। এই মাগ্যি গন্ডার বাজারে পাঁচসের তোপসের দাম কম নয়, ন্যায়াধীশ। ওই অর্থ আমাকে রাজকোষ থেকে অবিলম্বে দেওয়া হোক।
শেয়ালপন্ডিত বিরক্ত হলেন, ‘তোমরা সবসময় টাকা, টাকা করো কেন? আচ্ছা সে হবেখন। এখন গুপ্ত তথ্যটা বলো।’
—চারটে বাচ্চা যে এসেছে, তাদের মধ্যে দু-জন বাংলা প্রায় জানেই না।
—জানেই না? বাংলা জানেই না?
—হ্যাঁ, ওদের জন্ম শ্বেতরাক্ষসের দ্বীপে হয়েছিল। ওরা নিজেদের মধ্যে হরবখৎ ইংরেজিতে কথা বলে।
—শ্বেতরাক্ষসের দ্বীপে জন্ম হল আর ভেতরে পাপ ঢুকল না?
—ন্যায়াধীশ! শ্বেতরাক্ষসরা নিজেদের দ্বীপ খুব সাজিয়ে গুছিয়ে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রেখেছে। যত পাপ ওরা বাইরে ছড়ায়। এটাই ওদের জাতিগত চরিত্র।
—যাই হোক, তারপর? আর কী তথ্য?
—এই দু-জনের মধ্যে ছোটোটার মতি স্থির নেই, ন্যায়াধীশ। বাচ্চা তো! একটু চঞ্চলমতি!
—যেমন?
—সে খালি ভাবছে যে, ভবিষ্যতে কী করবে, কী হবে। কখনো বলে খবরের কাগজের সাংবাদিক হবে। কখনো বলে হলিউডের স্ক্রিপ্টরাইটার হবে। কখনো-বা বলে তেলেভাজা-ফুলুরির দোকান দেবে।
—হুঁ, চঞ্চলমতি বাচ্চা মেয়ে। একে একটু চকলেট বলে বিষের বড়ি খাইয়ে দেওয়া যায় না?
—ঠিক, ন্যায়াধীশ! ঠিক! আমিও এটাই ভাবছি। পুরাণে লেখা আছে যে, চারটে নিষ্পাপ বাচ্চাকে একসঙ্গে গান গাইতে হবে। নইলে বাংলা মা-র বুকের ঘা সারবে না। এদের মধ্যে একজনকেও ভুলিয়ে এনে যদি কোনোক্রমে একটা বিষের বড়ি খাওয়ানো যায়, তাহলেই তো কেল্লা ফতে!
শেয়ালপন্ডিত পারলে তাঁর সিংহাসন থেকে লাফিয়ে উঠতেন। নেহাত কোমর ভাঙা বলে পারলেন না। বিগলিত হাস্যশোভিত মুখ দিয়ে হুক্কাহুয়া শব্দ বেরিয়ে এল। অনেক কষ্টে সামলে-সুমলে বললেন, ‘সাধু! সাধু! কী কথাই শোনালে, গুপ্তচর প্রধান! যদি চারজনের মধ্যে একজনকেও ভুলিয়ে এখানে আনতে পারো তাহলে কথা দিচ্ছি যে, মকররাজকে বলে ‘দেশভূষণ’ খেতাবটা আমি তোমাকে দেওয়াবই।’
—‘দেশরত্ন’টা পাওয়া যাবে, ন্যায়াধীশ?
—না, ওটা আমার জন্য তোলা আছে।
শেয়ালপন্ডিত খাজাঞ্চিকে অবিলম্বে গুপ্তচর প্রধানকে পাঁচসের তোপসের দাম মিটিয়ে দিতে বললেন।
গুপ্তচর প্রধানের গোপন তথ্য শুনে সভার সকলেই প্রফুল্ল বোধ করল। যে খোক্কোসরা ম্রিয়মাণ, গোমড়া মুখে চুপ করে বসেছিল, তারাও খিক খিক, ফিক ফিক করে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। কালাপাহাড় কখনো হাসে না। কিন্তু সেও ফ্যাঁচ করে এমন একটা মৃদু শব্দ করল যে, তার মুখপাত্র ছোটো অমাত্যের মুখ খুশিতে ভরে উঠল। এ-ভাবে আনন্দমুখর পরিবেশে সভাভঙ্গ হল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন