সৌম্য ভট্টাচার্য
তারপর যক্ষপুরীর প্রাঙ্গণেই এক মহতী সভা আহ্বান করা হল। যক্ষপুরীর অনেক অংশই আগুনে পুড়ে গেছে। তার অলিন্দ, সোপান, কক্ষ-সবই রক্তে এবং যুদ্ধের ক্লেদে মলিন। অগণিত খোক্কোস আর ছুঁচোর প্রজ্জ্বলন্ত চিতা থেকে কটুগন্ধী ধূম উঠছে।
দিকে দিকে খবর রটে গেছে যে, যক্ষপুরীর পতন হয়েছে। বাংলা মা মুক্তি পেয়েছেন। সেই সংবাদে পিল পিল করে মানুষ, পশুপাখি আসছে তো আসছেই। যক্ষপুরীর ভাঙা সিং-দরজা দিয়ে জনস্রোতের কোনো বিরাম নেই। প্রাঙ্গণ কানায় কানায় পূর্ণ।
দধিকর্মার ছুঁচোবাহিনী রাতারাতি একটা অস্থায়ী মন্ডপ বানিয়ে ফেলল। তাদের সাহায্য করল বনের পশুপাখিরা।
রোগমুক্ত বাংলা মাকে ধরাধরি করে সিংহাসনে এনে বসানো হল। বাংলা দেশের হৃদয় হতে জননী অপরূপ রূপে বেরিয়ে এলেন। মায়ের দিকে তাকিয়ে কারো চোখই শুকনো থাকল না। সবাই কাঁদছে। হাউ-হাউ করে কেঁদে চোখের জল ফেলছে। বাংলা মা সেরে উঠলেও পুরো বল, পুরো শক্তি ফিরে পাননি। তাঁর আসনে আধশোয়া হয়ে তিনি সমবেত জনতার অভিবাদন গ্রহণ করলেন। রোগপান্ডুর মুখে তৃপ্তির হাসি।
সবাই সমস্বরে বলে উঠল, ‘জয় বাংলা! বাংলা মায়ের জয়!’
ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল এককোণে জড়সড় হয়ে লজ্জা লজ্জা মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
হঠাৎ এক কান্ড ঘটল। কোত্থেকে সভার মধ্যে ঢুকে পড়ল এক বৃদ্ধ বাউল। পরনে তার শতচ্ছিন্ন আলখাল্লা। হাতে ভাঙা একতারা।
—কে? কে? কে এই অনাহূত? রব উঠল চারপাশে।
সনাতন ভোঁদড় বলল, ‘মা, এই বাউল যক্ষপুরীর কারাগারে এতদিন বন্দি ছিল। দেশে তো আর কোনো বাউল অবশিষ্ট নেই। মকররাজ, কালাপাহাড় আর শেয়ালপন্ডিত মিলে সবাইকে যমালয়ে পাঠিয়েছে। এই শেষ জীবিত বাউল। আজ ও মুক্তি পেয়েছে। শোকে, দুঃখে, কষ্টে অর্ধপাগল হয়ে আছে।’
মা বললেন, ‘আহা! এই দুঃখী মানুষটাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’
ছেঁড়া আলখাল্লা পরা শ্মশ্রুমন্ডিত বৃদ্ধ বাউল টলমল পায়ে এগিয়ে এসে বাংলা মাকে প্রণাম করল।
মা বললেন, ‘বলো বাউল, তুমি কী চাও?’
একটা গান গাইতে চাই, মা। কারাগারে পচতে পচতে সব গানই তো ভুলে গেছি। একটা গান শুধু মনে আছে। সে-গান এখন এ দেশে কেউ গায় না। সবাই ভুলে গেছে তার কথা, তার সুর। আজ যখন খবর পেয়েছি মা যে, তোমার বুকের ঘা জুড়ে গেছে, তুমি আবার সেরে উঠেছ, তখন এত পাগলের মতো আনন্দ হচ্ছে যে, নেচে নেচে সে-গানটাই গাইতে ইচ্ছে করছে।
মা বললেন, ‘বেশ তো! শোনাও বাউল, তোমার সেই ভুলে যাওয়া গান।’
ভাঙা একতারা বাজিয়ে বাউল তখন নেচে নেচে গান ধরল :
নিশিদিন ভরসা রাখিস, হবেই হবে, ওরে মন, হবেই হবে।
যদি পণ করে থাকিস সে পণ তোমার রবেই রবে।
ওরে মন, হবেই হবে।
শুনে সভার সবাই উৎসাহে গর্জন করে উঠল, ‘ওরে মন হবেই হবে।’
বাউল গেয়ে চলল :
পাষাণসমান আছে পড়ে, প্রাণ পেয়ে সে উঠবে ওরে,
আছে যারা বোবার মতন তারাও কথা কবেই কবে।।
ওরে মন হবেই হবে।
সভায় সমস্বরে প্রতিধ্বনি হল, ‘আছে যারা বোবার মতন, তারাও কথা কবেই কবে। ওরে মন হবেই হবে।’
এবার সেই একাকী বাউলের সঙ্গে সঙ্গে সভার সবাই সমবেত হয়ে গলা মেলাল :
সময় হল, সময় হল—যে যার আপন বোঝা তোলো রে—
দুঃখ যদি মাথায় ধরিস সে দুঃখ তোর সবেই সবে।
ওরে মন হবেই হবে।
ঘণ্টা যখন উঠবে বেজে দেখবি সবাই আসবে সেজে—
এক সাথে সব যাত্রী যত একই রাস্তা লবেই লবে।।
ওরে মন হবেই হবে।
ডোরা-ডোনা একদৃষ্টে সেই জনতার দিকে চেয়ে দেখছিল। চেষ্টা করছিল গলা মেলাতে। তারা আগে বাঘুয়ার বরে সত্যদৃষ্টি পেয়েছিল। দেখেছিল যে, সমগ্র দেশবাসীর মধ্যে এমন কেউ নেই, যার মধ্যে পাপ নেই। এমন কেউ নেই, যার শরীর পাপের বিষে নীল নয়। আজ আবার তারা সত্যদৃষ্টি ফিরে পেয়েছে। অবাক হয়ে তারা দেখল যে, দেশবাসীর ভেতরের পাপ ধুয়ে ধুয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিষমুক্ত, পাপমুক্ত, শাপমুক্ত হয়ে দেশের মানুষ শুভ্র, সুন্দর হয়ে উঠছে। এ কি বাংলা মা-এর ভাঙা বুক জুড়ে যাওয়ার জন্য হল? নাকি বাউলের গানের জন্য হল?—তা বাচ্চারা ঠাহর করে উঠতে পারল না। পরিপূর্ণ হৃদয়ে তারা শুধু দেখতে লাগল।

ভাঙা একতারা বাজিয়ে বাউল তখন নেচে নেচে গান ধরল।
গান শেষ করে বাউল যখন থামল, তখন সভার সবাই হর্ষধ্বনি করে উঠল। বাংলা মায়ের চোখে জল ছলছল করছে। তিনি বাউলকে কাছে ডাকলেন। বললেন, ‘এ কী গাইলে, বাউল! সত্যিই তো—নিশিদিন ভরসা রাখিস হবেই হবে! ওরে মন হবেই হবে! আমার দেশ যখন শ্বেতরাক্ষসের শাপে, মানুষের পাপে চিরকুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল, যখন দু-আধখানা বুকে আমি বিষের ঘোরে আচ্ছন্ন ছিলাম, তখন তো এই আশার, এই ভরসার কথাই দেশের প্রাণের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। এই গান গেয়ে দেশের অন্তরের সেই চিরঞ্জীব, মৃত্যুঞ্জয়ী আশার বাণীই তো তুমি নতুন করে শোনালে—কী পুরস্কার নেবে বলো, বাউল?’
বাউল তখন বাংলা মাকে প্রণাম করে বলল, ‘মা! আজ বুকের ঘা সারিয়ে তুমি সুস্থ হয়ে সিংহাসনে বসেছ, আমি মুক্তি পেয়েছি, এর চেয়ে বড়ো পুরস্কার আর কী আছে?’
—কিচ্ছু নেবে না, বাউল? সোনা-দানা, হিরে-জহরত?
—মা, পাখি আর দরবেশ কি কিছু সঞ্চয় করে? সোনা-দানা, হিরে-জহরতে কাজ কী, মা? আশীর্বাদ করো, যেন তোমার গান গাইতে গাইতে আমার বাকি জীবন কেটে যায়।
মা বললেন, ‘তথাস্তু।’
তখন সেই ছেঁড়া আলখাল্লা পরা শ্মশ্রুমন্ডিত বৃদ্ধ বাউল তার ভাঙা একতারা বাজাতে বাজাতে গান গাইতে গাইতে সভা ছেড়ে চলে গেল।
বাংলা মায়ের চোখ এবার এককোণে জড়সড় হয়ে লজ্জা লজ্জা মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ডোরা, ডোনা, মিতুল আর নীলুর দিকে পড়ল। তিনি হাতছানি দিয়ে তাদের ডাকলেন। বললেন, ‘বাচ্চারা তোমরা দাঁড়িয়ে কেন? এসো, আমার কাছে এসো।’
বাচ্চারা কাছে যেতে বাংলা মা তাদের তাঁর বুকে টেনে নিলেন। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলেন তাদের গাল। চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেন তাদের মাথার চুল। মৃদুস্বরে বললেন, ‘ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল, তোমরা অসাধ্য আজ সাধন করেছ। তা করার কথা কবিরা স্বপ্নে ভেবেছেন। কত দেশসেবক তার জন্য কষ্টভোগ করেছেন। কত মা শূন্য বুকে হাহাকার করেছেন। তোমাদের কী দিই, বলো তো? আমার সব কিছু দিয়ে দিলেও তো মনে হয় না কিছু দিলাম! সভার দিকে তাকিয়ে বাংলা মা জিগ্যেস করলেন—
‘সভাসদরা? মন্ত্রীরা? অমাত্যরা? ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুলকে যোগ্য পুরস্কার আমরা কী দিতে পারি?’
ডোরা, ডোনারা বাংলা মায়ের কাছে যেতেই করতালিতে মন্ডপ মুখর হয়ে উঠেছিল। এবার সভাসদরা সরবে দাবি জানাল যে, বাচ্চাদের সবাইকে ‘দেশরত্ন’ খেতাব দেওয়া হোক।
ছুঁচোরা কোত্থেকে চারটে ছোটো ছোটো সিংহাসন এনে ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুলকে মায়ের দু-পাশে বসিয়ে দিল।
মুখর সভা শান্ত হলে, বাংলা মা বিষণ্ণমুখে মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘না হে! খোক্কোসরা এই খেতাবগুলোকে খুব খেলো করে দিয়েছে। স্তাবক দলদাসদের দেশশ্রী, দেশভূষণ, দেশবিভূষণ, দেশরত্ন এইসব খেতাব বিলিয়ে বিলিয়ে এগুলোকে সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও হাস্যকর করে তুলেছে। বাচ্চাদের কী দেব, সে ব্যাপারে ভাবতে হবে। অনেক ভাবতে হবে।’
বলতে বলতেই সভায় এক আলোড়ন উঠল। খোক্কোসদের সঙ্গে যুদ্ধে দধিকর্মার অজেয় এক অক্ষৌহিণী ছুঁচোর ফৌজ অসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে। তারা বহু খোক্কোস যেমন সংহার করেছে, তেমনই প্রাণও দিয়েছে অকাতরে। তারা এবার বাংলা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে ত্রিশূল হাতে কুচকাওয়াজ করতে করতে মন্ডপে প্রবেশ করল। এত ছুঁচো একসঙ্গে সেই বদ্ধ মন্ডপে ঢুকে পড়ায় তাদের গায়ের দুর্গন্ধে অনেকেই বমি করে ফেলল। কারো কারো মাথা প্রবল ঘুরতে লাগল। বাংলা মা সর্বংসহা। যুগের পর যুগ তিনি বুকের ঘা সহ্য করেছেন। হজম করেছেন বিষ আর বিষের ধোঁয়া। তিনি সে-মরাপচা গন্ধেও অবিচলিত রইলেন। শুধু কোমলকন্ঠে বললেন, ‘সামনের বার যখন আসবে তখন গায়ে একটু আতর দিয়ে এসো, বাবারা।’ বলে সেই আত্মোৎসর্গকারী বীরদের কাউকে শৌর্যচক্র, কাউকে বা পরমবীরচক্র দিয়ে সম্মানিত করলেন।
ছুঁচোদের নেতা দধিকর্মা পরম আপ্যায়িত হয়ে বলল, ‘মা, আজ তুমি আমাদের এত বড়ো সম্মান দিলে! আমরা জানলাম যে, ছুঁচোরা হীন, তুচ্ছ প্রাণী নয়। এ জগৎ-সংসারে ছুঁচোদেরও সম্মানের স্থান রয়েছে। মা, দেশ আমাদের তাহলে এত অসম্মান করে কেন? কেন বাংলা ভাষায় ‘‘ছুঁচো’’ শব্দটা গালাগালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়?’
মা বললেন, ‘দধিকর্মা, দেশ আমাদের অজ্ঞানের অন্ধকারে ডুবে রয়েছে। তুমি নিশ্চিন্ত থাক। কেউ তোমাদের ভুলবে না। আমার উদ্ধারে তোমাদের অবদানের কথা, আত্মোৎসর্গের কথা বাঙালির ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। যুগ যুগ ধরে বাঙালি কবিরা ছুঁচোদের জয়গান গাইবেন।’
দধিকর্মা তখন বলল, ‘মা জয়গানের কথাই যখন বললে, তখন আমার একটা আর্জি আছে।’
—কী আর্জি, দধিকর্মা?
—আমার বাহিনীর খুব সাধ যে, তোমার অভিষেকের সময় দিবারাত্রব্যাপী এক মহতী ছুঁচোর কীর্তনের আয়োজন করে। তারা তোমায় কীর্তন শুনিয়ে ধন্য হতে চায়, মা।
দয়ালু বাংলা মা বললেন, ‘তাই হোক! তবে তাই হোক!’
এভাবে পুরস্কৃত ও সংবর্ধিত হয়ে দধিকর্মা দলবল নিয়ে চলে গেল।
এবার সভায় করতালিধ্বনি সাগরের গর্জনের মতো প্রবল হয়ে উঠল। সবাই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। ঘাড় বাড়িয়ে, উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছে—কে আসছে।
নীলু ডোরার কানে ফিস ফিস করল, ‘বাঘুয়া আসছে! বাঘুয়া!’
সত্যিই তাই। দর্শকদের ভিড়ের মধ্যে হলুদের একটা আভাস দেখা দিল। ধীরে ধীরে বাঘুয়া মন্ডপে প্রবেশ করল। তার পেছনে দুলতে দুলতে ঢুকল দেঁতো কুমির। বাঘুয়ার হলুদ, ডোরাকাটা দেহে পেশির ঢেউ খেলছে। বলদৃপ্ত ভঙ্গিতে সে বাংলা মায়ের পায়ের কাছে এসে গর গর শব্দে তাঁর পা চাটতে লাগল। বাঘুয়ার দেহে কালাপাহাড়ের সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধের কোনো ক্ষতচিহ্ন নেই। সে সুস্থ, সতেজ, সুন্দর। দেঁতো কুমির বাংলা মায়ের সভায় আসবে বলে বিশেষ সাজ করেছে। তার গায়ে পুরোনো চটের থান, ছেঁড়া জালের চাদর, মাথায় জেলে ডিঙির টোপর। এক-গাল শ্যাওলা চেবাতে চেবাতে ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে সে উপস্থিত। বাংলা মা বাঘুয়ার ঘাড়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলেন। মৃদুস্বরে বলতে লাগলেন, ‘বাঘুয়া রে, এতদিনে তুই ফিরলি? আমি তো জানি, তুই মরিসনি। একদিন-না-একদিন তুই ফিরবিই। দেশের পুরাণেও তাই তো লেখা ছিল।’
বাঘুয়া বলল, ‘আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের দ্বীপে বহুদিন বন্দি হয়ে ছিলাম, মা। তাই এত দেরি হল।’
মা বললেন, ‘কী নিবি বল, বাঘুয়া? কী চাই তোর?’
বাঘুয়া বলল, ‘মা, আমি তো বহুদিন পর দেশে ফিরলাম। তুমি তো জানো যে, শ্বেতরাক্ষসদের তাড়াতে আমি জীবনপণ করেছিলাম। কিন্তু দেশে ফিরে সব কিছু দেখে মন খুব খারাপ হয়ে গেছে, মা। তুমি কিছু করো।’
মা বললেন, ‘আমিও অচেতন ছিলাম রে, বাঘুয়া। মকররাজ আর খোক্কোসরা রাজত্ব করছিল। দেশ চির কুয়াশায় ঢাকা ছিল। জানি, বহু কাজ বাকি। বল কী কী করতে হবে? সব কাজ একদিনে পারব না। সময় লাগবে।’
বাঘুয়া তখন দেঁতো কুমিরকে দেখিয়ে বলল, ‘মা, শেয়ালপন্ডিত অন্যায়ভাবে দেঁতো কুমিরের সাত-সাতটা ছানাকে খেয়ে নিয়েছিল। দেঁতো আর তার গিন্নির তাই মনে খুব কষ্ট। তুমি সেই সাতটা ছানাকে বাঁচিয়ে দাও।’
বাংলা মা বললেন, ‘তথাস্তু।’
তখনই মায়ের বরে দেঁতোর সাত-সাতটা ছানা পুনর্জীবিত হয়ে কিলবিল করে ‘বাবা’ ‘বাবা’ বলে দেঁতোর গা বেয়ে উঠতে লাগল। কেউ দেঁতোর গা খামচায়। কেউ-বা দেঁতোর পায়ে আদরের কামড় বসায়। কেউ-বা ছোটো ছোটো সাদা সাদা তীক্ষ্ণ দাঁতে দেঁতোকে ভয় দেখায়। আনন্দে দেঁতোর চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়াতে লাগল।
ডোরা, ডোনারা চুপ করে দেঁতোর অশ্রুপাত দেখছিল। ডোনা ডোরাকে চুপি চুপি জিগ্যেস করল, ‘ডোরাদিদি, এটাকেই কি ইংরেজিতে বলে ক্রোকোডাইল টিয়ার্স।’
ডোরা দিদিসুলভ গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল, ‘ইয়েস, ডোনা!’
এরপর বাঘুয়ার অনুরোধে, বাংলা মায়ের বরে, সনাতন ভোঁদড়ের ভাঙা ঘরও ঠিক হয়ে গেল।
বাঘুয়া বলে চলল, ‘মা, শ্বেতরাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধে এত দেশপ্রেমিক যে প্রাণ দিয়ে শহিদ হল, তাদের কারো কোনো স্মৃতিসৌধ নেই। অকৃতজ্ঞ দেশ শ্বেতরাক্ষসদেরই তৈরি করা মনুমেন্টকে শহিদ মিনার নাম দিয়ে, তার চূড়াটা লাল রঙের করে দিয়ে কর্তব্য সেরেছে। শ্বেতরাক্ষসদেরই তৈরি কিছু ভাঙাচোরা রাস্তার নাম নতুন করে রেখে শহিদ স্মৃতিতর্পণ করেছে। যে-লোকগুলো দুর্ভিক্ষে, দাঙ্গায় উদবাস্তু অবস্থায় পোকামাকড়ের মতো মরে গেল, তাদের কি কেউ মনে রাখবে না, মা? কেউ কি তাদের জন্য চোখের জল ফেলবে না? আমরা কি মা এত দীন হয়ে গেছি যে, তাদের জন্য একটা স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত বানাতে পারব না?’
বাংলা মা বললেন, ‘পারব, বাঘুয়া, পারব। এদের যাতে কেউ না ভোলে, তার ব্যবস্থা আমায় করতে হবে।’
বাঘুয়া বলল, ‘মা, এখনো দেশে এত ভিখিরি কেন? কেন এখনো লোকে এদেশে না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে? কেন দেশের লোকের বিদ্যা নেই, শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্য নেই?
বাংলা মা বললেন, ‘ওরে পাগল! ওরে খ্যাপা! সব কি একদিনে হয়? সময় লাগে!’
বাঘুয়া বলল, ‘মা, কবিই তো বলেছেন— ‘‘চিরকল্যাণময়ী তুমি ধন্য, দেশবিদেশে বিতরিছ অন্ন?’’
মা বললেন, ‘ওরে পাগল! সে যখন ‘‘সোনার বাংলা’’ ছিল, বাংলা যখন সকল দেশের রানি ছিল, কবি তো তার কথা বলছেন। সে বাংলা কি আর আছে? রাক্ষস-খোক্কোসরা তো দেশকে চুষে ছিবড়ে করে দিয়েছে! তা যাক, কি নিবি বল? তোকে যে আমার কিছু উপহার দিতে ভীষণ ইচ্ছে করছে রে, বাঘুয়া! তোকে কিছু দেব বলে চায় যে আমার মন। নাই বা তোর থাকল প্রয়োজন।’
বাঘুয়া বলল, ‘মা, আমি কি কখনো তোমার কাছে নিজের জন্য কিছু চেয়েছি?’
মা বললেন, ‘ঠিক বাঘুয়া, তুই শুধু দিয়েই গেছিস। কখনো নিসনি কিছু নিজের জন্য।’
বাঘুয়া বলল, ‘মা, বর দাও যেন বনের পশুপাখিরা সুখে থাকে। মানুষ যেন বন কেটে বসত আর না করে। দেশে ফিরে দেখছি যে, পশুপাখির বড়ো দুর্দিন, মা। বন্যেরা বনেই সুন্দর। তাদের বাড়িছাড়া কোরো না। আর নিতান্তই যদি কিছু দেবে, তাহলে তোমার গলার একটা মালা আমায় পরিয়ে দাও। আমি বনের বাঘ, মা। সোনা-দানা, মণি-মানিক্য নিয়ে কী করব?’
বাংলা মা তখন সেই বর দিয়ে বাঘুয়ার গলায় একটা রজনীগন্ধার মালা পরিয়ে দিলেন। সে মালা গলায় দুলিয়ে বনের রাজা বাঘুয়া চলেই যাচ্ছিল। মা পিছু ডাকলেন, ‘বাঘুয়া, দাঁড়া! বাচ্চাগুলোকে পিঠে চড়িয়ে সবপেয়েছির দেশ-এ নিয়ে যা। ওরা আমার জন্য এতদিন কত কষ্টই না করেছে। এখন দিনকতক তোর সঙ্গে সবপেয়েছির দেশ-এ আনন্দ করুক। আর আমার অভিষেকের দিন তোরা সবাই আসবি। তোদের যে বিশেষ সম্মান দিতে হবে রে, বাঘুয়া! সেটা নিয়েই ভাবতে হবে এখন।’
তখন মায়ের আজ্ঞায় বাঘুয়ার কোমল, প্রশস্ত কার্পেটের মতো পিঠে চেপে তার গলা জড়িয়ে ডোরা, ডোনা, নীলু আর মিতুল ‘সবপেয়েছির দেশ’-এ বেড়াতে চলে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন