সৌম্য ভট্টাচার্য
যক্ষপুরীর নিঝুম ঘরে, পালঙ্কের ওপর মশারির তলায় ডোনা কতক্ষণ ঘুমিয়েছে, তার ঠিক নেই। ঘুম যখন ভাঙল, তখন ঘর শুনশান।
বাইরে হট্টগোল হচ্ছে। কালো পর্দা ঢাকা জানলা খুলে ডোনা দেখে, বাইরে তখনো গাঢ় অন্ধকার। মশাল জ্বেলে কারা ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে। তবে ডোনা এত ওপরের তলায় আছে যে, নীচে কী হচ্ছে, কে কী করছে বা বলছে তা কিছুই বুঝতে পারল না।
ভীষণ একা লাগল ডোনার। বাইরে এখনো অন্ধকার? তাহলে সে কি টানা একদিন ঘুমিয়েছে? কিচ্ছুটি টের পায়নি? নন্দিনী ঘরে নেই। সান্ত্বনা দেওয়ার, ভরসা দেওয়ার মতো কেউ নেই। নেই বাবা-মা, ডোরা, নীলু, মিতুল। নেই বাঘুয়া। ডোনার ভীষণ খিদে পেল। জল এল চোখ ফেটে। হঠাৎ তার আমসত্ত্বের কথা মনে পড়ল। বাঘুয়ার দেওয়া সেই আমসত্ত্ব। আছে তো সেগুলো? বুকের গোপন পকেট থেকে মোড়কটা বের করে একটা আমসত্ত্ব চুষতে লাগল লীনা। বেশি খাওয়া যাবে না। হিসেব করে খরচ করতে হবে। যক্ষপুরীর কোনো খাবারই সে মুখে দিতে পারছে না।
আশ্চর্য! এবারও পলকে মুখের মধ্যে মিলিয়ে গেল আমসত্ত্বটা। ম্যাজিকের মতো খিদে চলে গেল ডোনার। যে প্রবল নিরাশার ভাব তার মনের মধ্যে জাগছিল, তাও কাটল কিছুটা।
কী করা যায় এবার? কী করা যায়?
ডোরা বা ডোনা যখন খুব একলা হয়ে পড়ে, তখন মন ভালো করতে ওরা গান গায়। ডোনা ঠিক করল যে, সে-ও গাইবে। ওর খুব প্রিয় গান। কলকাতায় থাকাকালীন প্রায়ই ক্যারাওকে সহযোগে সেই গানটা ডোনা গাইত— ক্রিসটিনা অ্যাগুইলেরার ‘ফাইটার’। সবচেয়ে বড়ো কথা— ডোনার মনে হল যে, সেই গানে যে লড়াইয়ের কথা আছে, যে সংগ্রামের কথা আছে, তা তাকে ভরসা দেবে, সাহস দেবে, উৎসাহ দেবে। কালনেমি যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সে দুঃখও ঘুচিয়ে দেবে।
ক্যারাওকে নেই। মিউজিক সিস্টেম নেই। গিটার, পিয়ানো, ড্রাম, বাস—কিছুই নেই। ডোনা তাই চোখ বুজে খালি গলায় গাইতে লাগল—
After all that you put me through
You think I’d despise you
But in the end I wanna thank you
'Cause you’ve made me that much stronger
Well I thought I knew you
Thinkin' that you were true
Guess I, I couldn’t trust
Called your bluff time is up
'Cause I’ve had enough
You were there by my side
Always down for the ride
But your joy ride came down in flames 'Cause your greed sold me out in shame
এটুকু বলে আবেগে ডোনার গলা কাঁপতে লাগল। গলার শির ফুলিয়ে, চোখ বুজে, তারস্বরে ডোনা গাইতে লাগল—
Makes me that much stronger
Makes me work a little bit harder
It makes me that much wiser
So thanks for making me a fighter
Made me learn a little bit faster
Made my skin a little bit thicker
Made me that much smarter
So thanks for making me a fighter
—উহু হুহু হু! উহুহুহুহু! উহুহুহুহু আহা! হা হা হা হা হা!
—উহুহুহু! উহুহুহুহু! উহুহুহু হু! আহা! হা হা হা হা হা!
আবেগে ডোনার গলা থরথর করে কাঁপছে। চোখে জল আসছে। রিন-রিন করে তার কন্ঠ-নি:সৃত সুর ছড়িয়ে যাচ্ছে যক্ষপুরীর আনাচে-কানাচে।
হঠাৎ খুট করে ঘরের দরজা খুলে গেল। চোখ মেলে ডোনা দেখে যে এক বৃদ্ধ চশমা-আঁটা শেয়াল হুইল চেয়ারে করে তার ঘরে ঢুকছে। দুটো খোক্কোস সেই হুইল চেয়ার ঠেলছে। সেই শেয়ালকে ডোনা বিলক্ষণ চেনে। তার ঘরেই শেয়ালটার ছবি ঝুলছে। যক্ষপুরীর ন্যায়াধীশ শেয়ালপন্ডিত!
শেয়ালপন্ডিত অবশ্য ডোনাকে দেখতে পেলেন না। তাঁর চোখ আবেশে বোজা। বিড় বিড় করে তিনি বলছেন, ‘আহা কী শুনিলাম! জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না!’
ডোনার সামনেই চোখ বুজে শেয়ালপন্ডিত বলে চললেন—
জাতভাইদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সম্মানের চিরনির্বাসনে
সমাজের উচ্চ মঞ্চে বসেছি সংকীর্ণ বাতায়নে।
মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে;
ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।
—কতদিন আমার জাতভাই খ্যাঁকশেয়ালদের গান শুনিনি! যক্ষপুরীর সম্মানের চিরনির্বাসনে স্বজাতি, স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি! আজ এই গান শুনে জানটা একেবারে তর হয়ে গেল! যক্ষপুরীতে এরকম সুগায়ক খ্যাঁকশেয়ালের আবির্ভাব হল কবে থেকে?
শেয়ালপন্ডিতের কথা শুনে ডোনা হাসবে, না কাঁদবে, না রাগ করবে, তা ভেবেই পেল না। সে বলল, ‘এটা খ্যাঁকশেয়ালের গান নয়! এটা ক্রিস্টিনা অ্যাগুইলেরার গান! ইটস আ ফেমাস সং।’
—হাগুলেরা?
শুনে ডোনা খেপে গেল— ‘হাগুলেরা নয়! অ্যাগুইলেরা! ক্রিস্টিনা অ্যাগুইলেরা!’ চিৎকার করে বলল সে। ডোনার চিৎকারে চোখ মেললেন শেয়ালপন্ডিত।
আবেগের চটকা ভেঙে যাওয়ায় বিষম বিরক্ত তিনি। মুখটাকে আলুপোস্তের মতো করে বললেন—
—কে তুমি?
—আমি ডোনা।
—এই গান তুমি গেয়েছ?
—হ্যাঁ, দিস ইজ আ ফেমাস সং। আ সং বাই ক্রিসটিনা অ্যাগুইলেরা।
—এ গান তোমার গাওয়া? আমার তো মনে হল রাজ্যের উপোসী, বিরহী খ্যাঁকশেয়াল একসাথে আর্তনাদ করে উঠেছে! জাতভাইদের ডাক ভেবেই তো স্থির থাকতে পারলাম না! ছুটে চলে এলাম!
ডোনা ভীষণ অপমানিত বোধ করল। রাগে, অপমানে, দুঃখে তার মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠল। সে উত্তর দিল না। মাথা নীচু করে চুপচাপ মেঝের দিকে চেয়ে রইল।
শেয়ালপন্ডিত অবশ্য ততক্ষণে সম্বিত ফিরে পেয়েছেন। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তুমিই ডোনা? তুমিই কি সেই সাংঘাতিক মেয়ে যে কালাপাহাড়কে জখম করেছ? তোমার বাকি স্যাঙাতেরা কোথায়? তোমার সঙ্গে আরেকটা মেয়ে ছিল না?’
ডোনা চুপ করে রইল, উত্তর দিল না।
শেয়ালপন্ডিত অবশ্য কালাপাহাড়ের দুর্দশায় ব্যথিত নন। বললেন, ‘ব্যাটাকে কুঠার দিয়ে মেরেছ, বেশ করেছ! আমিও ওটাকে দেখতে পারি না! ধরাকে সরা জ্ঞান করে! ওর এটা প্রাপ্য ছিল! তা ছাড়া ‘দেশরত্ন’ খেতাব পাওয়ার ব্যাপারে ও আমাকে ব্যাগড়া দিচ্ছিল। বাহাদুর মেয়ে! তা তুমি তো কালনেমির সঙ্গে এসেছ? বাকিরা কোথায়?
শেয়ালপন্ডিতের কথা শেষ হল না। দমাস করে ঘরের দরজা খুলে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল ডোরা, মিতুল আর নীলু। তাদের পেছন পেছন সনাতন ভোঁদড় আর বিভীষণ। ডোনাকে দেখে ডোরা, মিতুল আর নীলু সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, ‘ডোনা! তুই এখানে! আমরা এসে গেছি! আমরা এসে গেছি! ভয় পাস না! ভয়ের কিছু নেই!’
শেয়ালপন্ডিত ক্রূর দৃষ্টিতে চারজনকে দেখতে লাগলেন। তাঁর ছুঁচোলো মুখ থেকে ধূর্তামি আর নষ্টামি ঠিকরে বেরোতে লাগল। বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, ‘চারটে বাচ্চা একজোট হয়েছে! চারটে বাচ্চা একজোট হয়েছে! বাঘের ঘরে ঘোঘের বসতি! বাঘের ঘরে ঘোঘের বসতি! কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে! কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন