কালনেমির কবলে

সৌম্য ভট্টাচার্য

সনাতন অধৈর্য হয়ে তাড়া দিল, ‘বাচ্চারা, শিগগির শিগগির চলো। অন্ধকার হলে পাপের শক্তি বেড়ে ওঠে। শয়তানেরা মাথা চাড়া দেয়।’

তখন ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল সেই বিশাল বটগাছতলা ছেড়ে অন্ধকার সুঁড়িপথ বেয়ে সনাতন ভোঁদড়ের পেছন পেছন চলল। শাল, শিমুল, জারুল, অর্জুন আর সুন্দরী গাছের ঘন বন। রয়েছে গরানের ঝোপ। ঝিঁঝি ডাকছে। মাঝে মাঝে জোনাকির আলো দপ দপ করে জ্বলছে। শুকনো পাতা থেকে খড়মড় খড়মড় শব্দ হচ্ছে। ডোরা সবচেয়ে আগে, তারপর মিতুল আর নীলু। ডোনা সবার পেছনে। সারিবদ্ধ হয়ে তারা সনাতনকে অনুসরণ করছে। আগেই বলেছি যে, ডোনা একটু চঞ্চল আর অস্থিরমতি। তা ছাড়া চুপ করে নানারকম চিন্তাও করে সে। ময়নাবুড়ির কাছে গান শিখে সনাতন ভোঁদড়ের পেছন পেছন ফেরার সময়ও তার মাথায় হরেক ভাবনাচিন্তা খেলছিল। একটু অন্যমনস্ক থাকায় তাদের দল থেকে সামান্য পিছিয়েও পড়েছিল সে। হঠাৎ সেই ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যেই তার মনে হল যে, ফিস ফিস করে তাকে কেউ কিছু বলছে। কী বলছে? কৌতূহলে থমকে দাঁড়াল ডোনা।

ঝোপের মধ্যে থেকে একটা হেঁড়ে গলা ভেসে এল—

ধনী, শুনছ কিবা আনমনে

ভাবছ বুঝি শ্যামের বাঁশি ডাকছে তোমায় বাঁশবনে।

ওটা যে খ্যাঁকশেয়ালি, দিয়ো না কুলে কালি।

রাতবিরেতে শ্যালকুকুরের ছুঁচো প্যাঁচার ডাক শুনে।

ঝোপের মধ্যে উঁকি দিতে ডোনা এক আশ্চর্য জীবকে দেখতে পেল। লম্বায় তিন হাতের বেশি নয়। মুখটা কিছুটা বেড়াল আর কিছুটা নেউলের মতো। বেড়ালের মতোই গোঁফ। ছাইবর্ণ দেহ। সাদা-কালো ডোরাকাটা বিশাল ল্যাজ। গলায় একটা ধূসর মাফলার জড়ানো। প্রাণীটা ল্যাজের ওপর ভর দিয়ে বসে সামনের দুই থাবা প্রণামের ভঙ্গিতে জোড় করে রেখেছে। এহেন জীবকে ডোনা আগে কখনো দেখেনি।

ডোনাকে দেখে প্রাণীটা বার বার নমস্কার করতে লাগল।

ডোনা বলল, ‘তুমি কে?’

—দন্ডবৎ হই। আমি কালনেমি।

—বুঝলাম, কিন্তু তুমি কোন প্রাণী?

—আমি ভাম গো, ভাম বোঝো?

—না তো।

শুনে কালনেমি খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল। এমন অদ্ভুত হাসিও ডোনা কোনোদিন শোনেনি। ডোনা আরেকটা জিনিসও লক্ষ করল। প্রাণীটার গা থেকে একটা তীব্র সুগন্ধ বেরোচ্ছে। কেমন ঝিম ধরানো, নেশা ধরানো গন্ধ। তা ছাড়া গোঁফের সাদা রং দেখে মালুম হয় যে, বেশ বয়সও হয়েছে তার।

কালনেমি বলল, ‘আমাদের অনেক নাম। ভাম বলতে পার। খট্টাশ বলতে পার। আমাদের গায়ের গন্ধের জন্য কেউ কেউ গন্ধগোকুল বলেও ডেকে থাকে। হ্যাংলাকে চেনো তো? হ্যাংলা আমার বিশেষ বন্ধু। সেই তো আমায় তোমার কথা বলল।’

—হ্যাংলা? সনাতন ভোঁদড়ের ছেলে?

—হ্যাঁ, ভীষণ ভালো ছেলে। আজকালকার দিনে এমন ছেলে বড়ো একটা দেখা যায় না।

—তা তুমি আমায় কী বলছিলে?

—বলছিলাম যে, এই বিজন, বিভুঁইয়ে ছুঁচো-প্যাঁচার সর্দার হয়ে কী দেশোদ্ধার করছ?

—কেন? আমরা বাংলা মায়ের বুকের ঘা জুড়িয়ে দেব।

কালনেমি আবার খ্যাক খ্যাক করে অট্টহাস্য করল, ‘দধিকর্মার অপোগন্ড ছুঁচোদের নেতা হয়ে তুমি বাংলা মা-কে উদ্ধার করবে? দধিকর্মার ইতিহাস জান?’

—কী ইতিহাস?

—দধিকর্মা অতি পাজি, ছ্যাঁচড়া এক চোর। চোট্টামির জন্য মকররাজ ওকে যক্ষপুরী থেকে নির্বাসন দিয়েছেন।

—কিন্তু দধিকর্মা যে বলল, নিরীহ ছুঁচোদের গর্তে বিষের ধোঁয়া ছেড়ে তাদের মারা হয়েছে?

—সে তো বলবেই। দধিকর্মা আর তার দলবল যক্ষপুরী চুরি করে ফাঁক করে দিচ্ছিল। মকররাজ উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে সে এইসব মিথ্যে রটাচ্ছে।

—মকররাজ কেমন লোক?

‘ভীষণ ভালো। তোমাদের মতো বাচ্চা দেখলেই চকলেট খেতে দেন। খাবে নাকি একটা?’—কালনেমি কোত্থেকে একটা রংচঙে রাংতা মোড়া চকলেট বের করল।

ডোনার মাথায় হঠাৎ বাঘুয়ার সতর্কবাণী ভেসে উঠল—‘বাইরে কারো দেওয়া কোনো খাবার খাবে না। বন্ধুদের কাছ ছাড়া হবে না।’ ভীষণ শীত করে উঠল ডোনার। কালনেমির হাত থেকে চকলেটটা নিতে নিতেও নিল না সে।

—কী হল?

—না, আমি বাইরের খাবার খাই না। ডোরাদিদি কোথায়? নীলু, মিতুল কোথায়?

স্পষ্টতই নিরাশ কালনেমি চকলেটটা হাতে নিয়ে একটু হাসল, ‘ওরা যে এগিয়ে গেছে।’

—তাহলে কী হবে? আমায় এক্ষুনি তুমি ওদের কাছে পৌঁছে দাও। বাঘুয়ার কাছে পৌঁছে দাও।

‘বাঘুয়া?’ আশ্চর্য হয়ে মাথা নাড়ল কালনেমি, ‘বাঘুয়া কে?’

—বাঘুয়াকে চেনো না? সমস্ত জঙ্গল তাকে চেনে। সে জঙ্গলের রাজা। এক প্রকান্ড রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার।

—সে তো বহুদিন মারা গেছে। দরিয়া সাঁতরাতে গিয়ে ডুবে গেছিল।

ডোনা খেপে উঠল, ‘মিথ্যে কথা! আমি নিজের চোখে তাকে দেখেছি।’

কালনেমির অট্টহাসি এবার থামতেই চাইল না। খ্যাক খ্যাক করে হাসতে হাসতে সে পেটে হাত দিয়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল। শেষে অনেক কষ্টে হাসি চেপে সে বলল, ‘ওটা বাঘুয়া, কে বলল তোমায়?’

—কেন? ওটা তবে কে?

—ওটা তো নটসূর্য নাড়ুগোপাল!

—নটসূর্য নাড়ুগোপাল?

—হ্যাঁ গো। যাত্রাদলে অ্যাকটো করে। আমাদের কাছে খবর আছে যে, নটসূর্য নাড়ুগোপাল বাঘুয়া সেজে সকলকে বোকা বানাচ্ছে, ভুল বোঝাচ্ছে।

সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%