সৌম্য ভট্টাচার্য
বাঘুয়ার বিরুদ্ধে কালাপাহাড়ের অভিযানের পর দিন-দুয়েক কেটে গেছে। যক্ষপুরীর এক গুপ্তকক্ষে মন্ত্রণাসভা বসেছে। যক্ষপুরীর সব কাজই রাতে হয়। রাতে খোক্কোসরা বল পায়। মকররাজ ও কালাপাহাড়েরও শক্তি বেড়ে যায়। গভীর নিশুতি রাতে তাই চুপি চুপি মন্ত্রণাসভা বসে।
মকররাজ বুড়ো, চিমসে লোক। সারা জীবন সোনার তাল ঘেঁটে তাঁর রসকষ শুকিয়ে গেছে। সিংহাসনে অত্যন্ত বিরসবদনে তিনি বসে আছেন। দেশের সমস্ত সম্পদ সোনার তাল হয়ে রাতের অন্ধকারে জাহাজে করে আইরাক্ষস, কাইরাক্ষসের দেশে চলে যায়। সেখানে এক গোপন গুহায় মকররাজের ব্যাংক ভল্ট। সেই ভল্টে তাল তাল সোনা জমা পড়ে। অনেক সোনার মালিক হলেও মকররাজের জীবনে শান্তি নেই। তাঁর মুখ সবসময় গম্ভীর, বিষণ্ণ।
কালাপাহাড়কে কেমন দেখতে, কেউ ভালো করে জানে না। এক দীর্ঘ, কালো ছায়া তার অস্তিত্ব ঘোষণা করছে।
চলচ্ছক্তিহীন শেয়ালপন্ডিত যথোচিত গাম্ভীর্যে তাঁর আসনে বসে আছেন। এছাড়া বড়ো অমাত্য, মেজো অমাত্য, সেজো অমাত্য, ছোটো অমাত্য প্রভৃতিও রয়েছেন। বলা বাহুল্য, এঁরা সবাই খোক্কোস।
মকররাজের মুখ গম্ভীর, চিন্তাকুল। নানা ঘটনা তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে।
কালাপাহাড়ের সাম্প্রতিক অভিযান নিয়ে আলোচনা চলছিল। এসব সভায় কালাপাহাড় নিজে নীরব থাকে। ছোটো অমাত্য তার হয়ে বক্তব্য পেশ করেন।
মকররাজ বললেন, ‘বাচ্চাগুলোকে ধরা গেল না?’
ছোটো অমাত্য ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘না মহারাজ।’
—কেন?

অনেক সোনার মালিক হলেও মকররাজের জীবনে শান্তি নেই ।
—ওদের ধরতে ভোঁদড়ের গর্তে বিষের ধোঁয়া ছাড়া হয়েছিল। ওরা ভোঁদড়দের সঙ্গে ডুব-সাঁতার কেটে পালিয়ে যায়।
—তির ছোড়োনি?
—হ্যাঁ, মহারাজ। তবে ওদের গায়ে লাগেনি। শেষ পর্যন্ত ওরা খাঁড়ির জলে দেঁতো কুমিরের আওতায় চলে যায়। দেঁতোটা তিনজন খোক্কোসকে গিলে খেয়েছে।
—দেঁতোটা প্রচন্ড তেএঁটে আর বদ!
—যথার্থ বলেছেন, মহারাজ।
—ওকে ঢ্ঢি করা যায় না?
—মহারাজ, আমাদের বিষে কুমিরদের কিছু হয় না। তবে দেঁতোটা মাঝে আমাদের সভায় একটা আর্জি নিয়ে এসেছিল। তখন ওকে পিটিয়ে আধমরা করে দেওয়া হয়েছিল।
মকররাজ প্রসন্ন হাস্য করলেন, ‘কেন, কী আর্জি নিয়ে সে এসেছিল?’
এবার শেয়ালপন্ডিত মুখ খুললেন, ‘মহারাজ, কুমিরের বংশ নির্বংশ করতে আমি সাত-সাতটা কুমিরছানাকে জলযোগ করেছিলাম। দেঁতো সেই অভিযোগ জানাতে এসেছিল।’
—বেশ করেছিলে, শেয়ালপন্ডিত! তুমিই আমাদের রাজসভার গৌরব।
এবার ক্রুদ্ধ ফোঁস-ফোঁস শোনা গেল। কালাপাহাড় শেয়ালপন্ডিতের প্রশংসায় ক্ষিপ্ত হয়েছে। ক্ষিপ্ত হলে সে রাগে ফোঁস ফোঁস শব্দ করে।
মকররাজ সেই প্রলম্বিত, দীর্ঘ কালো ছায়ার দিকে ফিরলেন, ‘যতই ফোঁস-ফোঁস কর, কালাপাহাড়। তুমি এবার ব্যর্থই হয়েছ।’
ছোটো অমাত্য বললেন, ‘মহারাজ চেষ্টার ত্রুটি হয়নি। পরের দিন আবার অভিযান হয়েছিল। বনের মধ্যে জন্তু-জানোয়ারের এক জমায়েতে মেঘের আড়াল থেকে তির ছোড়া হয়েছিল। খবর আছে যে, চারটে বাচ্চাও সেখানে ছিল।’
—তাদের ধরা গেল না?
—একটা প্রকান্ড বাঘের পিঠে চড়ে তারা জঙ্গলের মধ্যে পালিয়ে যায়।
—প্রকান্ড বাঘ! কে সে! সুন্দরবনের খাঁড়ির বাঘগুলো তো তেমন বড়ো নয়?
মেজো অমাত্য—‘বাঘুয়া নয় তো?’
বাঘুয়ার নাম উঠতেই সভার পরিবেশ থমথমে হয়ে উঠল। মকররাজ চমকে থেমে গিয়ে, হেঁচে, কেশে অস্থির হয়ে উঠলেন। শেষে অনেক কষ্টে সামলে উঠে কাষ্ঠ হেসে বললেন, ‘তুমি কি পাগল হলে, মেজো অমাত্য? তোমাকে কোথাও দেখছি বায়ু পরিবর্তনে পাঠাতে হবে! বাঘুয়ার তো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়েই রয়েছে। তুমি কি ভেবেছ যে, আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের জেলখানা থেকে সে কোনোদিন মুক্তি পাবে?’
মেজো অমাত্য উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বাইরে গোলমালের শব্দ শোনা গেল।
—দেখো তো! কী ব্যাপার!
বলতে বলতেই সভার প্রতিহার এসে দাঁড়াল— ‘মহারাজ, আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের ভগ্নদূত হাজির।’
—পাঠিয়ে দাও।
ভগ্নদূতের রুক্ষ, উসকো-খুসকো চেহারা। বোঝাই যাচ্ছে, দীর্ঘপথ অত্যন্ত দ্রুত সে অতিক্রম করে এসেছে। নাওয়া, খাওয়ারও সময় পায়নি।
মকররাজকে প্রণাম করে সে তার বিনত বার্তা জানাল, ‘আইরাক্ষস-কাইরাক্ষস অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে মকররাজকে জানাচ্ছেন যে, বাঘুয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারাগারের গরাদ ভেঙে, দেওয়াল ফাটিয়ে সে অন্তর্ধান করেছে। তাকে খুঁজতে দ্বীপের সর্বত্র ডালকুত্তা লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার টিকির সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।’
—কীভাবে এত সহজে বাঘুয়া পালাতে পারল?
ভগ্নদূত জানাল যে, দীর্ঘদিন কেটে যাওয়ায় বাঘুয়ার রক্ষীরা অলস ও আত্মসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছিল। প্রতিরক্ষায় ঢিলেমিও এসেছিল যথেষ্ট। তবে আইরাক্ষস-কাই রাক্ষস উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছেন। সব রক্ষীকেই শূলে চড়ানো হয়েছে।
—হুঁ! চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে! তা এখন কী করা যায়?
শেয়ালপন্ডিত বললেন, ‘ভাববেন না, মহারাজ। আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের দ্বীপ আর বাংলার মধ্যে দুস্তর দরিয়া। এ দরিয়া সাঁতরে বাঘুয়া কখনোই ফিরতে পারবে না। ও তো বুড়ো হয়ে গেছে। তাছাড়া দেশের লোক বিশ্বাস করে যে, বাঘুয়া মরে গেছে। সে এলেও কেউ বিশ্বাস করবে না।’
—হ্যাঁ। এই প্রচারটা তুমি আর কালাপাহাড় মিলে বেশ সুন্দর করেছ।
শেয়ালপন্ডিত কৃতার্থ হয়ে হাসলেন। কালাপাহাড় হৃষ্ট হয়ে ফোঁস-ফোঁস করল।
মকররাজ বললেন, ‘সেই প্রবাদটা যেন কী? কী একটা গান আছে না, যা গাইলে নাকি বাংলা মা-র বুকের ঘা আবার সেরে যাবে?’
—সে গান তো নিষিদ্ধ, মহারাজ। কেউ তো সে গান আজকাল গায় না। লোকে কথা, সুর দুই-ই ভুলে গেছে, মহারাজ। তাদের ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
—হ্যাঁ। তোমরা বিষ ভালোই ছড়িয়েছ।
—হ্যাঁ, মহারাজ। দেশের এমন কোনো ইস্কুল, পাঠশালা, গুরুকুল, মাদ্রাসা, মক্তব বা শিক্ষাসত্র নেই, যেখানে সরকার থেকে বিনামূল্যে বিষের বড়ির জোগান দেওয়া হয়নি। মানুষের বাচ্চাদের খোক্কোসে রূপান্তরে আমরা আশ্চর্য সাফল্য অর্জন করেছি।
—শাবাশ! শাবাশ! তোমাদের দেশরত্ন উপাধি দিতেই হবে দেখছি।
শেয়ালপন্ডিতের মুখ বিগলিত হাস্যে উদ্ভাসিত হল। কালাপাহাড় খুশি হয়ে হায়নার হাসি হাসল।
মকররাজ বললেন, ‘সেই গানটা একবার বের করো তো। দেখি কী মারাত্মক কথা সেখানে লেখা আছে।’
সভার খোক্কোসেরা বিপদে পড়ল। গানটা কবির সব রচনাবলি থেকেই বাদ গেছে। দেশেও নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় গানটা পাওয়া সহজ নয়। শেষে অনেক কষ্টে যক্ষপুরীর পাঠাগার থেকে একটা পুরোনো কপি পাওয়া গেল।
মকররাজ আদেশ করলেন, ‘সেজো অমাত্য! গানটা পড়ো তো শুনি!’
সেজো অমাত্য কাগজটা ধরতেই ভয় পাচ্ছিলেন। শেষে অনেক কষ্টে থেমে-থেমে পড়লেন—
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।
মকররাজ অট্টহাস্য করলেন—‘কবির কল্পনা! পুণ্য হবে কী করে? বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—সবই তো আমরা বিষিয়ে দিয়েছি! বিকিয়ে দিয়েছি!’
‘ঠিক মহারাজ! ঠিক মহারাজ! ঠিক মহারাজ!’ অমাত্যরা সমস্বরে মাথা নাড়লেন।
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ—
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান।।
আবার হাসলেন মকররাজ—‘সবই তো শূন্য হে! সবই তো ফাঁকা! আমরা তো ঝেড়ে সব ফাঁক করে দিয়েছি। পূর্ণ হবে কী করে? কে করবে? কীভাবে করবে?’
‘ঠিক মহারাজ! আমরা ঝেড়ে সব ফাঁক করে দিয়েছি!’
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা—
এবার সভাসদদের মধ্যেকার আমোদ উদ্দাম হয়ে উঠল। হাহা, হিহি, হোহো শব্দে সবাই আমোদ করতে লাগল।
—বাঙালির আবার পণ? বাঙালির আবার আশা? বাঙালি কী আশা করতে পারে? খোয়াব দেখো! বাঙালির আশা! ‘হা হা! হি হি! হো হো! বাঙালি তো ভিখিরীর জাত! বাঙালি না কাঙালী!
মকররাজ হাসতে লাগলেন। শেয়ালপন্ডিত হাসতে লাগলেন। সভার সমস্ত খোক্কোস খিক-খিক, ফিক-ফিক করে হাসতে লাগল।
বড়ো অমাত্য বললেন, ‘আশায় মরে চাষা!’
তাতে আরেক প্রস্থ হাসির ধূম পড়ে গেল।
মকররাজের হাসতে হাসতে চোখে জল চলে এল, ‘হ্যাঁ, আধপেটা খেয়ে, না-খেয়েও চাষা ব্যাটাগুলো আশা করে বসে থাকে! আহাম্মক দেখো!’
শেয়ালপন্ডিত গম্ভীরমুখে বললেন, ‘বাঙালির দেশে কুয়াশা! প্রাণে হতাশা! পেটে আমাশা!’
সভার খোক্কোসরা এবার হেসে পরস্পরের গায়ে গড়িয়ে পড়ল। মকররাজ হাসতে হাসতে বললেন, ‘শেয়ালপন্ডিত! আজ থেকে তোমার উপাধি—রসরাজ!’
—আমি কৃতার্থ, মহারাজ।
বড়ো অমাত্য কাতর শব্দ করে একসঙ্গে হেঁচকি ও উদগার তুললেন।
—কী হল, বড়ো অমাত্য?
—আমাশার প্রসঙ্গে মনে পড়ল, মহারাজ, দেশশুদ্ধ লোকের আমাশা সারাতে বিশ্বব্যাংকের পানীয় জল প্রকল্পের যে-টাকাটা এসেছিল, তা আমরা সবাই মিলে ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়েছি। কিন্তু বড্ড বদহজম হচ্ছে, মহারাজ। খালি হেঁচকি আর চোঁয়া ঢেকুর উঠছে।
—কেন, আমার তো কিছু হচ্ছে না? শেয়ালপন্ডিতের তো কিছু হচ্ছে না?
—আপনারা তো সে টাকা আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমাদের তো টাকা লুকোতে গিয়ে রাতের ঘুম চলে যাওয়ার উপক্রম!
সব খোক্কোস এবার সমস্বরে দাবি জানাল যে, আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের দ্বীপে তাদেরও গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিতে হবে। কালাপাহাড় নীরব রইল। সে অর্থ চায় না। রক্ত চুষেই তার আনন্দ।
মকররাজ অধৈর্য হয়ে বললেন, ‘হবে, হবে, আমরা বিবেচনা করব। বাকি গানটা পড়ো তো শুনি।’
বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা—
—বাঙালির আবার কাজ! তার তো সবই অকাজ! বাঙালির তো কোনো ওয়ার্ক কালচারই নেই! নিষ্কর্মা, অপদার্থ জাত!
মকররাজের কথায় সবাই আবার সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।
তবে বাঙালির ভাষার প্রশ্নে সভার সবাই নীরব রইল। মকররাজ বিড়বিড় করে বললেন, ‘হ্যাঁ, বাঙালির ভাষা! এটা বড্ড বেয়াড়া, বদখদ! ওই দাড়িওলা কবিটা ভাষাটাকে এত পোক্ত করে দিয়ে গেছে যে, ভাঙতে সময় লাগবে। এ ভাষার এত শক্তি যে, এর জন্য লোকে জান পর্যন্ত দিয়েছে।’
শেয়ালপন্ডিত বললেন, ‘চিন্তা করবেন না, মহারাজ। ব্যবস্থা হয়েছে। ক্যাচ দেম ইয়াং!’
—মানে?
আমরা দূরদর্শনে অবাধ হিন্দি আর ইংরেজি সিরিয়ালের বাজার খুলে দিয়েছি, মহারাজ। রিয়েলিটি শো-র এখন রমরমা। বাচ্চারা সেগুলোতে বুঁদ হয়ে বাংলা ভাষা ভুলে যাচ্ছে, মহারাজ। তারা এখন হিন্দি আর ইংরেজিতে কথা কয়। রিয়েলিটি শোতে বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা হিন্দি আর ইংরেজি গানের সুরে কোমর দোলাচ্ছে।
—বাচ্চারা বাংলা ভুলে যাচ্ছে? কচি-কচি মেয়েরা হিন্দি গানের সুরে পাছা দোলাচ্ছে?
মকররাজ আল্লুস উল্লুস শব্দে জিভের জল সামলালেন।
—ধন্য সিরিয়াল! ধন্য রিয়েলিটি শো! অলীক কুনাট্য রঙ্গে, মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে! মজিয়ে দাও! সব্বাইকে মজিয়ে দাও! এসবে মজে থেকে লোকে সত্যিকারের সংস্কৃতি ভুলে যাক!
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক, হে ভগবান।
—সত্য কী করে হবে? সবই তো মিথ্যে এদেশে! সবই তো বানানো! এদেশে তো মিথ্যাই সত্য! কী বলো, শেয়ালপন্ডিত?
—ঠিক বলেছেন, মহারাজ। এ দেশে মিথ্যাই সত্য!
—ঠিক আছে। বাকিটুকু পড়ো।
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।।
মকররাজের চোখ কপালে উঠল— ‘এ কী সাংঘাতিক কথা লিখেছে কবি—পাগল না পেটখারাপ!’
—কবিরা তো পাগলই হয়, মহারাজ! ওদের না থাকে কোনো জ্ঞানগম্যি, না থাকে কোনো বাস্তববুদ্ধি!
—সবাই এক হবে? হিঁদু বাঙালি, মোচলমান বাঙালি, কেরেস্তান বাঙালি, বৌদ্ধ বাঙালি সব এক হয়ে যাবে? সবাই পরস্পরের ঘরে খাবে-দাবে, ফুর্তি করবে? হিঁদু মোচলমানকে বিয়ে করবে? মোচলমান কেরেস্তানকে শাদি করবে? কেরেস্তান বৌদ্ধকে ম্যারি করবে? সব জাত ভাই-ভাই? কিছুমাত্র বিবাদ নাই? এই কবিকে তো শূলে চড়ানো উচিত! তাকে ধরে বেঁধে নিয়ে এসো!
মকররাজের আদেশের উত্তরে বড়ো অমাত্য হেঁচকি থামিয়ে জানালেন যে, কবিকে ধরে-বেঁধে আনার কোনো সম্ভাবনা নেই, কারণ তিনি অনেকদিন আগেই পরলোকগমন করেছেন।
মকররাজ অত্যন্ত অপ্রসন্ন মুখে বসে রইলেন। রাখিসংগীতের শেষ পঙক্তিগুলো তাঁর সমস্ত অন্তঃকরণকে তিক্ত করে দিয়েছে।
শেয়ালপন্ডিত অভয় দিয়ে বললেন, ‘ভাববেন না, মহারাজ, সমস্ত সংবাদপত্র সম্পাদককে তো আমাদের বলাই আছে।’
—কী বলা আছে?
—বলা আছে যে, কেউ মারা গেলে যেন না লেখে—মানুষ মারা গেছে, বাঙালি মারা গেছে।
—তারা কী লিখছে?
—তারা লিখছে—হিন্দু মারা গেছে, মুসলমান মারা গেছে, খ্রিস্টান মারা গেছে। এর জন্য রাজকোষ থেকে নিয়মিত সংবাদপত্রদের অর্থসাহায্য করা হয়।
—বেশ! বেশ! খুব ভালো!
—সেবার নৌকোডুবি হয়ে যখন সাতশো লোক মারা গেল, দৈনিক মিথ্যাসংবাদ কাগজটা পড়েছিলেন, মহারাজ?
—না তো?
—ওরা লিখেছিল—চারশো মুসলমান, আড়াইশো হিন্দু আর পঞ্চাশজন বৌদ্ধ মারা গেছে। নিক্তিতে নিক্তিতে ওরা হিসেব মিলিয়ে দিয়েছিল, মহারাজ।
—এক্সেলেন্ট! কিন্তু যমুনানগরের দাঙ্গায় যে দৈনিক মিথ্যাসংবাদ লিখল —একশো বাঙালি তথা একশো মানুষ মারা গেছে! এই বেয়াক্কেলে, বেয়াদপিটা ওরা করল কেন? কেন এই নিমকহারামি?
—এ ব্যাপারে ওদের সম্পাদককে ডেকে ন্যায়াধীশ হিসেবে আমি সতর্ক করেছি, জরিমানাও করেছি।
—ভালো, কিন্তু এই অপকর্ম ওরা করল কেন?
—এটা এক উৎসাহী, ছোকরা সাংবাদিকের কীর্তি, মহারাজ। সম্পাদকও গাফিলতি করেছিল। ফাইনাল কপি ছাড়ার আগে ভালো করে দেখেনি।
—সেই সাংবাদিককে ডেকেছিলে?
—হ্যাঁ, মহারাজ। তাকে দুশো বেত মারার ব্যবস্থা করেছি। জুতো-পেটাও করা হয়েছে।
—তা তো করেছ, কিন্তু সে বেয়াদপ ছোকরা অজুহাত কী দিল?
জুতোপেটা আর বেত খেয়ে অনেক কান্নাকাটি আর ধানাই-পানাই করে সে বলল যে, দাঙ্গায় মৃত লাশগুলো এত বীভৎস পচে, গলে, ফুলে উঠেছিল যে, হিন্দু না মুসলমান, বৌদ্ধ না খ্রিস্টান, সেটা ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারেনি। তাই বাধ্য হয়ে লিখেছে —একশো বাঙালি মারা গেছে। একশো মানুষ মারা গেছে। বাচ্চা ছেলে! না-বুঝে একটা ভুল করে ফেলেছে, মহারাজ! মার খেয়ে শিগগিরই শুধরে যাবে। এরকম কত ছেলেকে শুধরে দিলাম! পথে আনলাম!
শেয়ালপন্ডিতের কথা শেষ হতে-না-হতেই বাইরে থেকে একটা মিষ্টি গানের সুর ভেসে এল।
মকররাজ চমকে উঠলেন, ‘কে? কে? কে গান গাইছে? এদেশে তো কেউ গান গায় না! গান গাওয়া তো এদেশে নিষিদ্ধ!’
সেজো অমাত্য উঠে জানালার বাইরে উঁকি দিয়ে বললেন, ‘একটা ময়না পাখি, মহারাজ। কার্নিশে বসে গান গাইছে।’
—কী গাইছে?
—গাইছে—‘আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলায় পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন!’
মকররাজ হৃষ্ট বোধ করলেন, ‘বেশ! বেশ! ঠিকই তো গাইছে! দেশের সব পথই তো ভাঙা। খোক্কোস ঠিকাদাররা ঘুষ খেয়ে যে রাস্তাই বানাক, তা তো ছ-মাসের মধ্যেই ভেঙে যায়! আর ভাঙা পথে ধুলো তো একটু হবেই! তবে সেখানে কার পায়ের চিহ্নের কথা বলছে?’
—বুঝতে পারছি না, মহারাজ। আরেকটু শুনি।
রাজসভা উৎকর্ণ হয়ে শুনতে লাগল ময়নার গান।
আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলায় পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন!
তারি গলার মালা হতে পাপড়ি হোথা লুটায় ছিন্ন।।
এল যখন সাড়াটি নাই, গেল চলে জানাল তাই—
এমন ক’রে আমারে হায় কে বা কাঁদায় সে জন ভিন্ন।।

‘একটা ময়না পাখি,মহারাজ।কার্নিশে বসে গান গাইছে ।’
‘বুঝতে পারছি না! কিচ্ছু বুঝতে পারছি না!’ মকররাজ বিড়বিড় করে স্বগতোক্তি করলেন। কবি কী বলছেন, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না!
তখন তরুণ ছিল অরুণ আলো, ...
মকররাজ আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘তরুণ ছিল অরুণ আলো! এ তো কুয়াশার দেশ! এ দেশ তো চিরকুয়াশায় আমরা ঢেকে রেখেছি! এখানে অরুণ আলো আসবে কী করে? আসবে কী উপায়ে?’
...পথটি ছিল কুসুমকীর্ণ।
—কুসুমকীর্ণ? মানে ফুলে ফুলে ঢাকা? এ দেশে তো ফুল গাছই নেই! সবই তো কাঁটাঝোপ!
বসন্ত যে রঙিন বেশে ধরায় সে দিন অবতীর্ণ।
মকররাজ আর থাকতে পারলেন না। অসহ্য আক্ষেপে ছটফট করতে করতে জানালার কাচ দিয়ে উঁকি দিলেন। দেখলেন যে, দেশের কুয়াশা কেটে গিয়ে বাইরে রোদ ঝলমল করছে। মলয় বাতাস বইছে। যে গাছগুলো মরে, হেজে গিয়েছিল, তাদের নতুন কচি-কচি পাতা বেরিয়েছে। যেখানে ছিল শুধু কাঁটাঝোপ, সেখানেও বন্য ফুলেরা তাদের নানা রংয়ের সমারোহ নিয়ে ফুটে উঠেছে। আর যক্ষপুরীর কার্নিশে বসে একটা ছোট্ট ময়না পাখি সেই বসন্তকে স্বাগত জানিয়ে গান গাইছে—
সে দিন খবর মিলল না যে, রইনু বসে ঘরের মাঝে—
আজকে পথে বাহির হব বহি আমার জীবন জীর্ণ।।
মকররাজ জানলার পাশে অর্ধচেতন হয়ে পড়ে গেলেন। অনুগত খোক্কোস অমাত্যরা তাঁর দেহ ধরাধরি করে রাজসভা থেকে শয়নকক্ষে নিয়ে গেল। সভা ভঙ্গ হল। সভাসদরা একে একে বিমর্ষ মুখে বিদায় নিলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন