সৌম্য ভট্টাচার্য
‘সবপেয়েছির দেশ’ জায়গাটা কীরকম? ডোরা, ডোনারা আগে বাবা-মা-র সঙ্গে ফ্লোরিডার অরল্যাণ্ডোতে ডিজনি ওয়ার্ল্ডে বেড়াতে গিয়েছিল। সেরকম কুড়িটা ডিজনি ওয়ার্ল্ড এক করলেও ‘সবপেয়েছির দেশ’-এর জুড়ি মিলবে না।
সে এক নতুন দেশ, স্বপ্নের রাজ্য। সেখানে কেবল ছুটোছুটি, কেবল খেলাধুলো। সেখানে স্কুল নেই, পরীক্ষা নেই, প্রোজেক্ট নেই। শুধু আছে কাকচক্ষু সরোবর, বেতের বন, তেপান্তরের মাঠ। মাঝে মাঝেই আম-কাঁঠালের বাগান। গাছে গাছে ময়না, শালিক, দোয়েল, টিয়া, ফিঙে, বুলবুল। সরোবরের জলে বড়ো বড়ো লালপেট রুই মাছ। বনগাঁবাসী মাসি-পিসি খইয়ের মোয়া তৈরি করে অকাতরে বিলিয়ে যাচ্ছেন। একজায়গায় বিলি হচ্ছে বাঙালির বিখ্যাত সব মিষ্টি—রসগোল্লা, রাজভোগ, চমচম, জিলিপি, মিহিদানা, সন্দেশ, সরভাজা, সরপুরিয়া, সীতাভোগ—সে বলে শেষ করা যাবে না। মাঠে চরে বেড়াচ্ছে অজস্র পক্ষীরাজ ঘোড়া। হাততালি দিলেই তারা ভয় পেয়ে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে আকাশে!
এক জায়গায় অনেক লোক দল বেঁধে চলেছে।
ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল জিগ্যেস করল, ‘কোথায় চলেছ তোমরা?’
—কমলাপুলির দেশে যাচ্ছি গো!
—কেন? সেখানে যাচ্ছ কেন?
—আমাদের পুঁটুরানির বিয়ে যে! দেখছ না, কেমন ডুলি সাজিয়ে বর চলেছে!
—কমলাপুলির দেশটা কেমন?
—দারুণ! সে তো টিয়াপাখির দেশ। সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়াপাখি দাঁড়ে বসে ধান খোঁটে। গাছে বসে ক্যাঁচ ম্যাঁচ করে। সে-দেশে নিমেষে সকাল, পলকে সন্ধ্যা! সে-দেশের ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা।
ডোরারা তখন বাঘুয়ার পিঠে চেপে সেই আশ্চর্য কমলাপুলির দেশের দিকে চলল। মাঝে নদীর ঝুরঝুরে বালির মধ্যে চিকচিকে জল। সেখানে ছেলেরা মাছ ধরছে। এমন সময় টাপুর-টুপুর বৃষ্টি এল, নদীতে বান এল। ছেলেরা সব তড়িঘড়ি পালাল।
একটি ছেলে শুধু হাপুশ নয়নে কাঁদতে লাগল। কাঁদবে না কেন? তার ছিপ নিয়ে গেছে কোলা ব্যাংয়ে, মাছ নিয়ে গেছে চিলে!
ছেলেটির কান্না দেখে বাঘুয়ার খুব কষ্ট হল। তার বরে নদীর জল থেকে একটা ভোঁদড় উঠে ছেলেটার হাতে একটা বিশাল রুই মাছ ধরিয়ে দিল। ছেলেটি তো আনন্দে হাততালি দিয়ে নাচতে শুরু করল। ভোঁদড়টা ফিরে ফিরে চেয়ে দেখতে লাগল।
এদিকে সেই চিকচিকে জলের ধারে ঝুরঝুরে বালির চরে শিবঠাকুর এসে নৌকা বাঁধলেন। সঙ্গে তাঁর তিন কন্যা। এক কন্যা রাঁধলেন, বাড়লেন। এক কন্যা খেলেন। এক কন্যা না-খেয়ে বাপের বাড়ি গেলেন।
সেই বাপের বাড়ির দেশই হল কমলাপুলির দেশ যেখানে বিয়েটা হচ্ছে। কিন্তু ডোরাদের আর সেখানে যাওয়া হল না।
তারা দেখল যে, তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে আসছে তিন পরিচিত মূর্তি—দধিকর্মা, নান্দীমুখ আর ধিনিকেষ্ট।
কী ব্যাপার?
কাছে এসে ছুঁচোরা খুব একচোট হাঁপাতে লাগল। কম কথা নয়। কতদূর তারা দৌড়ে এসেছে!
তারপর সামলেসুমলে তারা তাদের আসার কারণ জানাল। দলের তরুণতম সদস্য হল ধিনিকেষ্ট। সে একটু ফচকে স্বভাবের।
নীলুর দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘নীলুবাবু, আপনার সাথেই যে আমাদের বিশেষ দরকার ছিল।’
—কেন, আমার সাথে কেন?
—কারণ আপনাদের দলে আর সব তো ‘শি’, আপনিই শুধু ‘হি’—বলে ধিনিকেষ্ট হি হি করে হাসতে লাগল।
তার সেই ফচকে মিচকে হাসি দেখে নীলুর রাগে গা-পিত্তি জ্বলে গেল। সে গরম হয়ে বলল, ‘মানে?’
ধিনিকেষ্ট বলল, ‘নীলুবাবু, আমরা খেয়ালই করিনি। আপনি কি ধুতি পরতে পারেন?’
—না তো।
—আপনার বাবা, মা শেখাননি?
—না। কোনোদিন নয়।
শুনে দধিকর্মা আর নান্দীমুখ বিষণ্ণমুখে মাথা নাড়ল, ‘এই হয়েছে মুশকিল! দেশের বাচ্চারা ধুতি পরা, শাড়ি পরা ভুলে যাচ্ছে! নিজেদের সভ্যতা-সংস্কৃতি বিসর্জন দিচ্ছে। মহাপাপী বাবা মা-রাও কিছু খেয়াল করছে না!’
ধিনিকেষ্ট বলল, ‘জানেন তো, নীলুবাবু আমাদের দেশে বিখ্যাত প্রবাদ আছে—
বাইরে কোঁচার পত্তন
ভেতরে ছুঁচোর কেত্তন।
এখন বাংলা মা-এর অভিষেকের দিন যেদিন ছুঁচোদের মহতী কীর্তন অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন আপনি যদি কোঁচা দেওয়া ধুতি না পরেন, তাহলে তো সব ব্যর্থ হয়ে যাবে, নীলুবাবু।’
দধিকর্মা আর নান্দীমুখ সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, ‘এত বড়ো প্রবাদ মিথ্যে হয়ে যাবে, নীলুবাবু! সে আমাদের প্রাণে সইবে না! ধম্মে সইবে না!’
নীলু কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, ‘আমাকে কী করতে হবে?’
তিন ছুঁচো বলল, ‘আপনাকে ধুতি পরা শিখতে হবে নীলুবাবু। আমরা আপনাকে শেখাব।’
ধিনিকেষ্ট বলল, ‘এ ব্যাপারে আপনার স্পেশাল পোশাকের অর্ডার গেছে। জানেন তো, নীলুবাবু।’
—কী রকম?
—আপনি পরবেন জরির কল্কা দেওয়া টকটকে লালবনাতের কোট। কোঁচানো লাল জরিপেড়ে শান্তিপুরি ধুতি। পায়ে লাল ফুলমোজা আর নাগরা। এইসব পরে, টেরি বাগিয়ে, বাঁহাতে কোঁচার ফুলটা আলগোছে ধরে আপনি ফুলবাবু সেজে যখন বাইরে দাঁড়াবেন, তখনই-না ভেতরে ছুঁচোর কীর্তনটা ভালোমতো জমে উঠবে!
শুনে নীলু আতঙ্কে কুল কুল করে ঘামতে লাগল। ক্ষীণ, অবসন্ন গলায় বলল, ‘আমি শুনেছি, ধুতি পরা সাংঘাতিক কঠিন একটা ব্যাপার। কাছা সামলাতে গিয়ে কোঁচা খুলে যায়, কোঁচা সামলাতে গিয়ে কাছা! এভাবে লাটুবাটু হয়ে আমাকে সারারাত ছুঁচোর কীর্তন শুনতে হবে?’
দধিকর্মা অভয় দিয়ে বলল, ‘আমরা তো আছি! ঘাবড়াবেন না, নীলুবাবু! প্র্যাকটিসে কী না হয়! দেখবেন প্র্যাকটিস করতে করতে ধুতি পরাটা প্যারালাল বারে জিমনাস্টিক করার মতোই সহজ হয়ে গেছে!’
নান্দীমুখ আর ধিনিকেষ্ট তখন মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর সেই অনুষ্ঠানে যে আপনাদের শাড়ি পরতে হবে, মা-লক্ষ্মীরা। স্পেশাল অর্ডার গেছে—ঢাকাই জামদানি, শান্তিপুরি, বালুচরি।’
শুনে ডোরা, ডোনা, মিতুল আতঙ্কে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল, ‘শাড়ি পরতে হবে? আমাদের শাড়ি পরতে হবে?’
—অবশ্যই! বাংলা মায়ের অভিষেকের দিন আপনারা শাড়ি পরবেন না, তা কখনো হয়? আপনারা শাড়ি পরে সভা আলো করবেন, তবে না সবকিছু জমে উঠবে!
এরপর ছুঁচোর দল জানাল যে, আর তিনদিন সময় আছে। এর মধ্যেই তারা ডোরা, ডোনাদের ধুতি আর শাড়ি পরার ট্রেনিং দিয়ে যাবে।
বাঘুয়া দধিকর্মাকে বলল, ‘তোমাদের কীর্তনের মহড়া কেমন চলছে?’
—দারুণ, বাঘুয়া। সারা দেশের ছুঁচো সম্প্রদায় মেতে উঠেছে!
—কী রকম?
যখন জানা গেল যে, এই কীর্তনের ব্যাপারে ছুঁচোদের মধ্যে প্রবল উৎসাহের সঞ্চার হয়েছে। দিকবিদিক থেকে লক্ষ লক্ষ অর্বুদনির্বুদ ছুঁচো যক্ষপুরীতে জমায়েত হয়েছে। উৎসাহের আধিক্যে তারা দিনরাত সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি সেধে যক্ষপুরীকে গুলজার করে তুলেছে।
দধিকর্মা বলল, ‘পাকড়াশি, ডোয়ের্বিন—হারমোনিয়াম, ফ্লুট, খোল, করতাল তবলা জুগিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না, বাঘুয়াবাবু। ওহো, সে একটা আসর হবে বটে! ভাবতেই আমার রোমাঞ্চ হচ্ছে!’
সত্যিই দেখা গেল যে, উৎসাহে, উত্তেজনায় দধিকর্মার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে।
এইসব সংবাদ বিনিময় করে ছুঁচোর দল যখন তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ফিরে গেল, তখন সবপেয়েছির দেশে সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে।
ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল অত্যন্ত বিষণ্ণ, ব্যাজার মুখে বসে রইল। সকালে তারা ঠেসে রসগোল্লা, পান্তুয়া, জিলিপি, মিহিদানা খেয়েছিল। খাবে না কেন? সবপেয়েছির দেশে তো সবই ফ্রি। পয়সাকড়ির বালাই নেই। এখন পেট খালি হতে খিদে খিদে পাচ্ছে, কিন্তু খাওয়ার ইচ্ছে কারোরই নেই।
নীলু বলল, ‘সারারাত ধুতি পরে আমায় ছুঁচোর কীর্তন শুনতে হবে?’
ডোরা বলল, ‘জীবনে কখনো শাড়ি পরিনি। ছুঁচোর দলের এ কী অন্যায় অত্যাচার?’
ডোনা বলল, ‘জিনস আর টপ কী দোষ করল?’
মিতুল বলল, ‘শালোয়ার কামিজ? তাই-বা খারাপ কী সে?’
কারোরই ব্যাপারটা মনঃপূত নয়। তাদের উৎসাহের বেলুন ছুঁচোরা একেবারে চুপসে দিয়েছে।
বাঘুয়াও কিছু বলল না। গর গর করে থাবা চাটতে লাগল। ভাব দেখে মনে হল তার বেজায় ঘুম পেয়েছে।
হঠাৎ ডোনা হাউমাউ করে উঠল, ‘ডোরাদিদি! আমাদের প্রোজেক্ট!’
ডোরা শিউরে উঠল, ‘ঠিক বলেছিস! আমাদের স্কুলের প্রোজেক্ট! কয়েক গন্ডা প্রোজেক্ট দিয়েছে। কিছুই তো হয়নি! এখানে আমরা মজা করছি! সময় নষ্ট করছি!’
ডোনা বলল, ‘ডোরাদিদি! আমরা এ দেশে কত দিন আছি?’
ডোনার এ প্রশ্নে নানা রকম জবাব মিলল—ডোরার ধারণা এক সপ্তাহ। মিতুল আর নীলুর ধারণায় দিন পনেরোর কম নয়। আর ডোনার মতে, টানা একমাস তারা এই আজব দেশে এসেছে। আসলে এ দেশে সব কিছু এত নতুন, এত মায়াময়, এত রোমাঞ্চকর যে, তারা দিনক্ষণের হিসেব রাখেনি।
ডোনা বলল, ‘আমাদের গরমের ছুটি শেষ হয়ে এল। প্রোজেক্ট শেষ না হলে তো স্কুলে পিঠের চামড়া তুলে নেবে।’
ডোরা বলল, ‘আর বাবা, মা! তাদের কথা ভুলে যাচ্ছিস? বাবা, মা আমাদের না দেখে না-জানি কত কান্নাকাটিই করছে?’
নীলু বলল, ‘কান্নাকাটি? বাবা আমায় খুঁজে না পেলে ঠ্যাঙা হাতে বেরিয়ে পড়ে! বাবা কান্নাকাটির বান্দাই নয়!’
মিতুল বলল, ‘বাড়ি ফিরে মা-র সামনে যেতেই তো ভয় করবে! সাক্ষাৎ জ্বলন্ত ভিসুভিয়াস!’
বাচ্চাদের সবারই দেশের কথা, কল্যাণীর কথা, কলকাতার কথা মনে পড়ে গেল। কতদিন তারা স্বদেশ ছেড়ে, স্কুল ছেড়ে অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছে! ডোরা-ডোনাদের পাটলির ফ্ল্যাট, বাবা-মা, মেনি বেড়াল তুতুভুলু কল্যাণীর মামাবাড়ি, দাদু-দিদুন সবার কথাই মনে আসতে লাগল। তাদের না দেখে মা-বাবা না জানি কত কষ্টই পাচ্ছে!
ডোরা বলল, ‘চলো, আমরা বাংলা মায়ের কাছে গিয়ে বলি যে, আমরা দেশে ফিরতে চাই।’
ডোনা, মিতুল, নীলু সায় দিল। বলল, ‘চলো, আমরা এখুনি বাঘুয়ার পিঠে চড়ে ফিরে যাই।’
কিন্তু বাচ্চারা সমস্বরে বাঘুয়াকে ডাকলেও সে উঠল না। গভীর ঘুমের অতলে বাঘুয়া তলিয়ে গিয়েছে।
তখন সব পেয়েছির দেশে, তেপান্তরের মাঠে বসে ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল একমনে বাংলা মাকে ডাকতে লাগল। চমৎকার জ্যোৎস্না আকাশে, ঝিরঝিরে মিঠে বাতাস বইছে।
বাচ্চারা বলল, ‘বাংলা মা, তুমি এক্ষুণি এসো! আমাদের এক্ষুনি-এক্ষুনি দেশে ফিরিয়ে দাও। আমাদের মা-বাবা আমাদের জন্য কাঁদছে। মেনি বেড়াল কাঁদছে। দাদু-দিদুন চোখের জল ফেলছে। আমাদের গরমের ছুটি শেষ হয়ে এল। আমাদের কোনো প্রোজেক্ট শেষ হয়নি। কোনো হোমটাস্ক শেষ হয়নি।
হঠাৎ তাদের সামনে কে যেন খিল খিল করে হেসে উঠল। সে হাসির শব্দ জলতরঙ্গের মূর্ছনার মতো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। এক আশ্চর্য সুগন্ধ ভেসে এল তাদের ঘ্রাণে। বাচ্চাদের ডাকে সাড়া দিয়ে অপরূপ সাজে সেজে অন্তর্যামী বাংলা মা উপস্থিত হয়েছেন।
—ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল—তোমরা সবপেয়েছির দেশের এই মজা, এই আনন্দ ছেড়ে দেশে ফিরতে চাও?
—হ্যাঁ, মা। আমাদের প্রোজেক্ট শেষ হয়নি। হোমটাস্ক শেষ হয়নি।
—প্রোজেক্ট আর হোমটাস্ক-এর জন্য সবপেয়েছির দেশ ছাড়বে, তোমরা? যেখানে নিত্য মজা, নিত্য খেলা, নিত্য আনন্দ?
—কিন্তু আমাদের বাবা-মা যে আমাদের না দেখতে পেয়ে কাঁদছে। দাদু-দিদুন কাঁদছেন। মেনিবেড়াল তুতুভুলু কেঁদে কেঁদে ম্যাও ম্যাও ডাক ছাড়ছে। আমাদেরও ভীষণ মন কেমন করছে।
‘সে একটা কথা বটে!’ ‘বাংলা মা ভাবিত হয়ে পড়লেন, মা-বাবাকে দুঃখ দেওয়াটা ঠিক নয়। তোমরা সত্যিই ফিরবে তাহলে?’
—হ্যাঁ, মা।
—আমার অভিষেক পর্যন্তও থাকবে না?
—ভীষণ মন কেমন করছে, বাংলা মা।
—এত বড়ো কাজ করলে তোমরা। কোনো খেতাব? কোনো পুরস্কার? তোমাদের কত কিছু দেব বলে ঠিক করে রেখেছি।
কিচ্ছু চাই না, মা।
সত্যিই কিছু চাও না?
ডোনা তখন বাংলা মাকে তার গোপন একটা ইচ্ছের কথা জানাল। তার ক্লাসে পাঁচ-পাঁচটা দুর্ধর্ষ ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। তারা রাক্ষসের মতো পড়ে। খোক্কোসের মতো কোয়েশ্চেনের অ্যানসার লেখে। নাম তাদের—অরিত্র, আদিপ্ত, উত্তরণ, রওনাক আর অঙ্কিত। তাদের সঙ্গে ডোনা কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছে না। হাজার পড়েও তাদের বিট দিতে পারছে না। এখন বাংলা মায়ের বরে যাতে ডোনা ক্লাসে ফার্স্ট হয়—এই তার বিনীত প্রার্থনা।
বাংলা মা হাসলেন। বললেন, ‘ডোনা—গত বছর বার্ষিক পরীক্ষায় বাংলায় কত পেয়েছ?’
ডোনা লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, ‘আশিতে সাতান্ন।’
বাংলা মা বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়লেন, ‘খারাপ! খুব খারাপ! আশিতে সাতান্ন মোটেই ভালো নম্বর নয়। আর ডোরা তুমি?’
ডোরা আরো লজ্জিত হয়ে বলল, ‘আশিতে সাতচল্লিশ।’
মায়ের বিষণ্ণতা বেড়ে গেল। বললেন, ‘বাংলায় এত খারাপ করলে তোমরা পরীক্ষায় ভালো ফল করবে কী করে?’
—কিন্তু মা, বাংলা যে একটা ডিফিকাল্ট ল্যাঙ্গুয়েজ! তার বানান তো বিভীষিকা! দুটো ই, ঈ; দুটো উ, ঊ; তিনটে শ, ষ, স; তিনটে র, ড়, ঢ়!
—দূর বোকা! নিজের মাতৃভাষা কখনো কঠিন হতে পারে? তোমরা বাংলা কখনো ভালোবেসে পড়ে দেখেছ? পড়েছ আবোল তাবোল? পাগলা দাশু? বুড়ো আংলা? চাঁদের পাহাড়? ফেলুদা? টেনিদা? ঘনাদা? কাকাবাবু? মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি? জানো, কত মজা, কত আনন্দ সে ভাষায় লুকিয়ে আছে?
ডোনা বলল, ‘হ্যাঁ, বাবা অবশ্য অনেক বই কিনে দিয়েছে আমাদের। পড়া আর হয়ে ওঠেনি। বইগুলো তাকে ধুলো খাচ্ছে।’
বাংলা মা বললেন, ‘গরমের ছুটিতে ওই বইগুলো সব পড়বে! ওটাই আমার দেওয়া হোম টাস্ক! চাঁদের পাহাড়-এ দেখবে কেমন করে দামাল ছেলে শঙ্কর টর্চের আলো জ্বেলে একটা ব্ল্যাক মাম্বাকে ঠাণ্ডা করেছিল।
বাংলা মায়ের আজ্ঞা শুনে ডোরা, ডোনা ভ্যাঁক করে কেঁদে ফেলল, বলল, ‘দোহাই মা, আরো হোম টাস্ক দিয়ে আর টর্চার করবে না! আমাদের প্রচুর প্রোজেক্ট বাকি আছে!’
মা করুণার হাসি হেসে বললেন, ‘তাই তো! তোমাদের বাচ্চাদের ওপর কত চাপ! জানো, তোমাদের বাবা ব্যস্ত ডাক্তার হলেও লুকিয়ে লুকিয়ে বাংলায় উপন্যাস লেখে?’
শুনে ডোরা, ডোনা চমকে গেল—তাদের ব্যস্ত বাবা লুকিয়ে লুকিয়ে উপন্যাস লেখে? এ কথা তো তারা জানত না?
বাংলা মা বললেন, ‘সে উপন্যাস অবশ্য তোমাদের পড়তে বলছি না। একেবারেই অপাঠ্য! ছাপানোর পর তিন কপি মাত্র বিক্রি হয়েছিল! তবে তোমরা শীর্ষেন্দুর মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি-টা পড়ে দেখতে পারো। কী লেখাই না ছেলেটা লিখেছে! অন্য দেশ হলে মাথায় তুলে রাখত। এ পোড়া দেশে জন্মেই কল্কে পেল না!
—বইটা কত বড়ো?
—বেশি বড়ো নয়। শীর্ষেন্দু তো তোমার বাবার মতো বড়ো উপন্যাস লেখে না। ধারাপাত লেখে! এক ঘণ্টায় পড়ে শেষ করে ফেলবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন