দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

সৌম্য ভট্টাচার্য

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি দ্বিখন্ডিত হয়েছিল। সেই খন্ডিত জার্মানি আবার জোড়া লেগেছে। জোড়া লেগেছে দ্বিধাবিভক্ত ভিয়েতনাম। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে শত পার্থক্য থাকলেও মাঝেমাঝে ঐক্যের আলোচনা হয়। কিন্তু ভারত উপমহাদেশের ঐক্যের ব্যাপারে কারো হেলদোল দেখি না। দুই বাংলা এক হওয়ার ব্যাপারেও কারো কোনো সক্রিয় প্রচেষ্টা নেই। সমসাময়িক বাংলার একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়—তাঁর প্রথম আলো উপন্যাসে, ‘লেখকের কথা’ অংশে লেখেন—‘অদূর ভবিষ্যতে দুই বাংলা আবার যুক্ত হবার সম্ভাবনা নেই, হয়তো যৌক্তিকতাও নেই।’ লেখাটা পড়ে আর্তনাদ করে উঠতে ইচ্ছে করে—একজন বাঙালি লেখক এ কথা লিখলেন? লিখতে পারলেন?

চির কুয়াশার দেশে দেশভাগ নিয়ে, সেই চির-বিতর্কিত, চিরকলঙ্কিত ও চরম ক্ষতিকর ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে লেখা একটা ফ্যান্টাসি-স্যাটায়ার। এই অনুষঙ্গে একজন মোটামুটি ওয়াকিবহাল ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে দেশভাগ নিয়ে আমার বক্তব্য পেশ করব। কোনো ঐতিহাসিক বা সমাজতাত্ত্বিকের মতো ফুটনোট কণ্টকিত প্রবন্ধ লেখার সাধ বা সাধ্য কোনোটাই আমার নেই। এ ব্যাপারে আমার আদর্শ রবীন্দ্রনাথ। বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ তিনি পেরোননি, কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর হিরণ্যগর্ভ প্রবন্ধ আমাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের ধ্রবতারা।

ইতিহাসে বাংলার স্থান

শশাঙ্কের অভ্যুদয়ের আগে বাংলার ইতিহাস কুয়াশাবৃত। পান্ডববর্জিত ভূখন্ড হিসেবে পূর্বপ্রান্তের এই প্রদেশের প্রতি উত্তরভারতের বরাবরই একটা অবজ্ঞা ছিল। রঘুবংশে নৌযুদ্ধে নিপুণ বাঙালিদের কথা কালিদাস লিখেছেন। মহাভারতে বঙ্গাধীপ পৌন্ডক বাসুদেবের উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি কৌরবপক্ষে যোগ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

গ্রিক ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় গঙ্গার অববাহিকায় গঙ্গাহৃদি (Gangaridae) বলে একটি পরাক্রান্ত রাষ্ট্র ছিল বলে জানা যায়। সেই রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও রণহস্তীর কথা বিবেচনা করেই নাকি আলেকজাণ্ডারের অজেয় গ্রিকবাহিনী ভারতের ভেতরে আর অগ্রসর হওয়ার সাহস পায়নি।

রোমান আমলে বাংলার সঙ্গে রোমের নৌবাণিজ্য ছিল। বাংলার সূক্ষ্ম বস্ত্র রপ্তানি হয়ে স্বর্ণরৌপ্যের আকারে ফিরে আসত। তাম্রলিপ্তি ছিল সমৃদ্ধ বন্দর। এই বন্দর দিয়েই সম্রাট অশোক সিংহলে তাঁর পুত্র-কন্যা মহেন্দ্র ও সঙঘমিত্রাকে পাঠিয়েছিলেন। চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন এবং হিউ-এন-সাঙ-ও এই বন্দর দিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। সামুদ্রিক বাণিজ্যলব্ধ বাংলার সমৃদ্ধির বিবরণ নীহাররঞ্জন রায় বাঙ্গালীর ইতিহাস বইতে দিয়েছেন। সে সময় বাংলার জমি কেনাবেচা হত স্বর্ণমুদ্রায়, যা আর্থিক সমৃদ্ধির অভ্রান্ত দ্যোতক। ইসলামের অভ্যুদয়ে আরবসাগরে প্রবল জলদস্যুর প্রকোপ শুরু হয়। বাঙালির স্বর্ণপ্রসূ পশ্চিমি বাণিজ্যও সলিলসমাধি লাভ করে।

শশাঙ্ক,পাল ও সেন আমল

এই সন্ধিক্ষণে পরাক্রান্ত গৌড়রাজ শশাঙ্কের অভ্যুদয়। হর্ষবর্ধনের সঙ্গে উত্তরাপথে তাঁর প্রবল যুদ্ধবিগ্রহ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। গৌড় হয়ে ওঠে উত্তর ভারতের নিয়ামক শক্তি। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর শতাব্দীব্যাপী মাৎস্যন্যায় সূচিত হয়। বাংলার ইতিহাসে নেমে আসে রাত্রির অন্ধকার। সেই অন্ধকার কাটে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে, যখন বাংলার গোষ্ঠীপতিরা সমবেত হয়ে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে দয়িতবিষ্ণুর পুত্র গোপালকে সম্রাট ঘোষণা করেন। গোপালের পুত্র ও পৌত্র যথাক্রমে ধর্মপাল ও দেবপালের সময় বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা পঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত হয়। বৌদ্ধ পালরাজাদের আমলে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে যথেষ্ট। বাংলা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তবে পূর্বের নৌবাণিজ্যলব্ধ সমৃদ্ধি আর ফিরে আসে না।

এরপর আসে কর্ণাটাগত সেন রাজবংশ। এঁরা ব্রাহ্মণ্যধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এই বংশের সম্রাট লক্ষ্মণসেনের আমলে বক্তিয়ার খিলজির নেতৃত্বে তুর্কিরা ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে গৌড় জয় করে নেয়। লক্ষণীয় যে, তুর্কিরা গৌড় জয় করলেও বহুদিন পূর্ববঙ্গ বিজয় করতে পারেনি। সেখানে সেন রাজবংশের অবশেষ কিছুদিনের জন্য হলেও থেকে যায়।

তুর্কি ও সুলতানি আমল

নানা দিক থেকে তুর্কিদের এই বঙ্গবিজয় এক যুগান্তকারী ঘটনা। ব্রাহ্মণ্যবাদী সেনদের স্মৃতি-শাস্ত্র কণ্টকিত রাজত্বের অবসান ঘটল। সেন আমলের উৎপীড়িত বৌদ্ধরা ব্যাপক হারে ধর্মান্তরিত হল। নানা লৌকিক দেবদেবী যথা মনসা, চন্ডী, ধর্মঠাকুর, শীতলা ইত্যাদির পূজার প্রচলন হল। সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠল বাংলা ভাষা—যে ভাষার ঊষাকাল তার আগেই বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের চর্যাপদ-এ দেখা যাচ্ছিল। প্রান্তবাসী বাংলা দিল্লির আধিপত্য থেকে বেরিয়ে এসে ১৩৩৮ সালে স্বাধীন সুলতানি কায়েম করল। এই শাসন চলে দুশো বছর। ১৫৩৮ সালে আফগান রণনায়ক শের শাহ গৌড়ের সুলতানকে উৎখাত করেন। এই দুশো বছর বাংলার রাজস্ব বাইরে যায়নি। বাঙালি মোটামুটি স্বাধীন সত্তা বজায় রাখতে পেরেছিল। দেখা যাক, বঙ্কিমচন্দ্র এই সুলতানি আমল সম্পর্কে কী বলছেন।

বঙ্কিমচন্দ্রের বক্তব্য

‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ প্রবন্ধে বঙ্কিম লিখছেন—

পরাধীন রাজ্যের যে দুর্দশা ঘটে, স্বাধীন পাঠানদিগের রাজ্যে বাঙ্গালার সে দুর্দশা ঘটে নাই। রাজা ভিন্ন জাতীয় হইলেই রাজ্যকে পরাধীন বলিতে পারা যায় না। সে সময়ে জমিদারদিগের যে রূপ বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায়, তাহাতে তাঁহাদিগকেই রাজা বলিয়া বোধ হয়। তাঁহারা করদ ছিলেন মাত্র। পরাধীনতার একটি প্রধান ফল ইতিহাসে এই শুনা যায় যে, পরাধীন জাতির মানসিক স্ফূর্তি নিবিয়া যায়। পাঠান শাসনকালে বাঙ্গালির মানসিক দীপ্তি অধিকতর উজ্জ্বল হইয়াছিল, বিদ্যাপতি চন্ডীদাস, বাঙ্গালার শ্রেষ্ঠ কবিদ্বয় এই সময়েই আবির্ভূত। এই সময়েই অদ্বিতীয় নৈয়ায়িক, ন্যায়শাস্ত্রের নূতন সৃষ্টিকর্তা রঘুনাথ শিরোমণি; এই সময়ে স্মার্ততিলক রঘুনন্দন; এই সময়েই চৈতন্যদেব; এই সময়েই বৈষ্ণব গোস্বামীদিগের অপূর্ব গ্রন্থাবলী, চৈতন্যদেবের পরগামী অপূর্ব বৈষ্ণবসাহিত্য। পঞ্চদশ ও ষোড়শ খ্রিষ্টশতাব্দীর মধ্যেই ইহাদিগের সকলেরই আবির্ভাব। এই দুই শতাব্দীতে বাঙ্গালির মানসিক জ্যোতিতে বাঙ্গালার যেরূপ মুখোজ্জ্বল হইয়াছিল; সে রূপ তৎপূর্বে বা তৎপরে আর কখনো হয় নাই।

এ বিষয়ে এই সময়কার বিদেশি পরিব্রাজকদের সাক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে। মার্কো পোলো তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে বঙ্গদেশের কথা বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বঙ্গভূমিতে অপর্যাপ্ত পরিমাণে তুলোর চাষ হত এবং তা থেকে সমৃদ্ধ বাণিজ্য হত। জটামাংসী, আদা, আঁখ প্রভৃতি অনেক কিছুই বঙ্গভূমিতে উৎপন্ন হত।

পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে চৈনিক পরিব্রাজক মাহু বঙ্গদেশে এসেছিলেন। তাঁর বিবরণে আছে যে, বঙ্গদেশে নানারকম শস্য উৎপন্ন হত। মাহুর সাক্ষ্য অনুযায়ী, বঙ্গদেশের অধিবাসীরা রেশমি রুমাল, সোনালি কাজ করা টুপি, চিত্রিত মাটির বাসন, বন্দুক, ছুরি, কাঁচি এবং বৃক্ষত্বকজাত শ্বেতবর্ণের একধরণের কাগজ ব্যবহার করত। পাঁচ ছ-রকম মসলিন প্রচলিত ছিল। বহু সমৃদ্ধিশালী নগরও ছিল।

ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমে ইতালীয় পরিব্রাজক ভারমেমা বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনিও সোনার বাংলার সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে গেছেন। ভারমেমার মতে, এখানে অপর্যাপ্ত শস্য এবং সবরকমের মাংস প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। প্রচুর চিনি, আদা, তুলো হত। প্রতি বছর পঞ্চাশখানা জাহাজ সুতি ও রেশমি বস্ত্রে পরিপূর্ণ হয়ে বঙ্গদেশ থেকে তুরস্ক, সিরিয়া, আরব, পারস্য প্রভৃতি দেশে এবং ভারতের অন্যান্য স্থানে প্রেরিত হত।

বস্তুত, বাংলার এই ধনসম্পদের বিবরণ শুনেই বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাগ্যান্বেষীদের এদেশে আনাগোনা শুরু হয়।

আকবরের বঙ্গবিজয় এবং বাঙালির স্বাধীনতার অবসান

আফগান নরপতি শের শাহ ১৫৩৮ সালে গৌড় দখল করেন। বাংলার স্বাধীন সত্তার অবসান শুরু হয়। আকবরের সেনাপতি মানসিংহ ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে বারো ভুঁইয়াকে পরাস্ত করে বাংলার গরিষ্ঠ অংশ মোগল অধিকারে আনেন। বঙ্গবিজয় সম্পূর্ণ করেন ঔরঙ্গজেব ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে যখন চট্টগ্রাম অধিকৃত হয়। বাংলার স্বাধীনতার অবসানের ফলাফল কী হল? বঙ্কিমচন্দ্রের জবানিতেই শোনা যাক—

অতএব দেখা যাইতেছে যে, যে আকবর বাদশাহের আমরা শতমুখে প্রশংসা করিয়া থাকি, তিনিই বাঙ্গালার কাল। তিনিই প্রথম প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালাকে পরাধীন করেন। সেইদিন থেকেই বাঙ্গালার শ্রীহানির আরম্ভ। মোগল-পাঠানের মধ্যে আমরা মোগলের অধিক সম্পদ দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া মোগলের জয় গাহিয়া থাকি। কিন্তু মোগলই আমাদের শত্রু, পাঠান আমাদের মিত্র। যে দিন হইতে দিল্লির মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হইয়া বাঙ্গালা দুরবস্থা প্রাপ্ত হইল, সেইদিন হইতে বাঙ্গালার ধন আর বাঙ্গালার রহিল না। দিল্লির বা আগ্রার ব্যয়নির্বাহার্থ প্রেরিত হইতে লাগিল।...

...যখন আমরা তাজমহলের আশ্চর্য রমনীয়তা দেখিয়া আহ্লাদ সাগরে ভাসি, তখন কি কোনো বাঙ্গালির মনে হয় যে, যে সকল রাজ্যের রক্তশোষণ করিয়া এই রত্নমন্দির নির্মিত হইয়াছে, বাঙ্গালা তাহার অগ্রগণ্য?...যখন জুমা মসজিদ, সেকন্দরা, ফতেপুর সিক্রি বা বৈজয়ন্ততুল্য শাহজাহানাবাদের ভগ্নাবশেষ দেখিয়া মোগলদের জন্য দুঃখ হয় তখন কি মনে হয়, যে বাঙ্গালার কত ধন সে সবে ক্ষয় হইয়াছে?

অবশ্য বাদশাহ শাহজাহানের রাজত্বকালে সুপ্রসিদ্ধ ফরাসি পরিব্রাজক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ে অন্য সাক্ষ্য দিচ্ছেন। বার্নিয়ে বঙ্গভূমিকে প্রকৃত সোনার বাংলা বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য:

Egypt has been represented in every age as the finest and most fruitful country in the world, and even modern writers deny that there is any other land so peculiarly favoured by nature : but the knowledge I have acquired of Bengal, during two visits paid to that kingdom, inclines me to believe that the pre-eminence ascribed to Egypt is rather due to Bengal....In a word, Bengal abounds with every necessity of life; and it is this abundance that has induced so many Portuguese, Half-castes and other Christians, driven from their different settlements by the Dutch, to seek an asylum in this fertile kingdom.

নবাবি আমল ও ব্রিটিশদের অভ্যুদয়

মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর বাংলার স্বল্পস্থায়ী স্বাধীন নবাবি আমল চালু হয়। এর মধ্যে মুর্শিদকুলি খান এবং আলিবর্দি বুদ্ধিমান ও রণকুশল ব্যক্তি ছিলেন। আলিবর্দির কাছে বাঙালির বিশেষ কৃতজ্ঞতার কারণ আছে। হিন্দু মারাঠা বর্গীদের হামলায় বাংলার পশ্চিমাঞ্চল এ সময় বার বার বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। বর্গীদের নিষ্ঠুর অত্যাচার প্রবাদপ্রতিম ছিল এবং এমনকী ছেলেভুলোনো ছড়াতেও তার উল্লেখ আছে। মুসলমান নবাব আলিবর্দি হিন্দু বর্গীদের হাত থেকে বাংলার জনসাধারণকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁর রাজ্যের বহু জমিদার ছিলেন হিন্দু এবং বাহিনীতে ছিলেন হিন্দু সেনাপতি। আলিবর্দীর মৃত্যুর পর তাঁর পৌত্র সিরাজদ্দৌল্লার রাজত্বকালে ঘটে যুগান্তকারী পলাশির যুদ্ধ। বিশ্বাসঘাতকতার ফলে সিরাজ পরাস্ত হলেন। ব্রিটিশ সেনাপতি ক্লাইভের খঞ্জর বাঙালির খুনে রাঙা হয়ে উঠল। এই বিশ্বাসঘাতকতা ও চক্রান্তের পেছনে যেমন মুসলমান মিরজাফর ও ইয়ার লুৎফ খান ছিলেন, তেমনই ছিলেন হিন্দু জগৎশেঠ, কৃষ্ণচন্দ্র, রায়দুর্লভ, নন্দকুমার ও উর্মিচাঁদ। এরপর থেকেই বাংলায় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির শাসন চালু হল। অবাধ শোষণের পথ খুলে গেল।

কীরকম সে শোষণ?

এডওয়ার্ড টমসন বলছেন :

A gold-lust unequalled since the hysteria that took hold of the Spaniards of Cortes' and Pizarro’s age filled the English mind. Bengal in particular was not to know peace again until it had been bled white.

–History of British Rule in India by Edward Thompson, Edward T. & G. T. Garrat

চোর শিরোমণি রবার্ট ক্লাইভ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নিজের অর্থলিপ্সার সাফাই গেয়ে বলেছিলেন :

I stand astonished at my own moderation!

অর্থাৎ চুরির অবাধ সুযোগ থাকলেও তিনি কমই নিয়েছেন!

এই অবিরত শোষণের ফলশ্রুতি হল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর—Famine of 1769-70। কী রকম সে দৃশ্য? বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ থেকে সাহায্য নিই:

লোকে প্রথমে ভিক্ষা করতে আরম্ভ করিল, তারপরে কে ভিক্ষা দেয়? উপবাস করিতে আরম্ভ করিল। তারপর রোগাক্রান্ত হইতে লাগিল। গোরু বেচিল, লাঙ্গল-জোয়াল বেচিল, বীজধান খাইয়া ফেলিল, ঘরবাড়ি বেচিল। জোতজমা বেচিল। তারপর মেয়ে বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর ছেলে বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর স্ত্রী বেচিতে আরম্ভ করিল...খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল, ঘাস খাইতে লাগিল, আগাছা খাইতে লাগিল। ইতর ও বন্যেরা কুক্কুর, ইন্দুর, বিড়াল খাইতে লাগিল। অনেকে পলাইল। যাহারা পলাইল, তাহারা বিদেশে গিয়া অনাহারে মরিল। যাহারা পলাইল না, তাহারা অখাদ্য খাইয়া, না খাইয়া, রোগে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল।

মুর্শিদাবাদের স্বাধীন নবাবদের আমলে ১৭৫০ সালে বাংলা ছিল এক সমৃদ্ধ প্রদেশ। ব্রিটিশের অবিরত শোষণে বাংলা শুকিয়ে ছিবড়ে হয়ে গেল। সেই অপহৃত সম্পদ ব্রিটেনে সৃষ্টি করল Industrial Revolution। আর বাংলায় ঘাঁটি গেড়ে বসে ব্রিটিশরা তার পরের সত্তর-আশি বছরে সমগ্র ভারতকে দখল করে নিল। অবশ্য, বিদেশির এই অবিরত শোষণ বাঙালি বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়নি। লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাঙালি ও বঙ্গদেশে বসবাসকারী অন্যান্য জাতির কৃষক সম্প্রদায় অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে অসংখ্য উত্থান ও বিদ্রোহের শরিক হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল— ধলভূম (১৭৬৯-৭৪), রংপুর (১৭৮৩), বিষ্ণুপুর (১৭৮৯), চুয়ার (১৭৯৯), সিলেট (১৭৯৯), তিতুমির (১৮৩১), কোল (১৮৩১-৩২), ভূমিজ (১৮৩২), পাগলপন্থী (১৮৩৩), ফরাজি (১৮৩৮-৪৭) ও সাঁওতাল (১৮৫৫-৫৬) বিদ্রোহ।

কলকাতার উত্থান

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কলকাতা। ক্রমে তা হয়ে উঠল সারা ভারতের রাজধানী। তার গৌরবের শীর্ষে, অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে কলকাতাকে বলা হত—Second city of the Empire। গরিমা ও বৈভবে লণ্ডনের পরেই ছিল তার স্থান। কিন্তু আমরা যদি সত্যনিষ্ঠ হই, তাহলে বলব যে, এই আপাত গরিমা বা বৈভব ছিল ফাঁকা চাকচিক্য মাত্র। কলকাতাকে বানানোই হয়েছিল ভারত-শোষণের সিংহদুয়ার হিসেবে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী বজ্র আঁটুনিতেও ফস্কা গেরো থাকে। কেরানি বানানোর চেষ্টায় ব্রিটিশরা এ দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রচলন করল। সাম্রাজ্যবাদীদের অজ্ঞাতসারেই আমাদের মধ্যে নবজাগরণের বীজ বোনা হল। আমরা মহান ইংরেজি সাহিত্যের সংস্পর্শে এবং তার হাত ধরে ইউরোপীয় বিজ্ঞান-সাহিত্য-দর্শনের সান্নিধ্যে এলাম। তার মাধ্যমে আমাদের স্থবির জাতীয় মননে যুগান্তর এল।

এই নবজাগরণের কার্যকারণ ও প্রেক্ষাপট চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন নীতীশ সেনগুপ্ত তাঁর Land of Two Rivers গ্রন্থে:

The nineteenth-century Bengal Renaissance was the product of a variety of circumstances: the advent of settled British rule, the so-called Pax Britannca, the economic boom brought about by the growth of Calcutta as a major world hub of industry, the introduction of English education and, along with it, the influence of Western science and philosophy, the revival of the study of ancient Indian Sanskrit literature and philosophy, and the growth of a new middle class and a professional class. It was indeed a remarkable phenomenon of which there are few parallels in history of a small region blossoming into a whole range of creative activities—literary, cultural, social and economic.

রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমের হাত ধরে এই নবজাগরণের সূচনা। নবোদিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কেন্দ্র করে এর প্রসার। পাশ্চাত্য গণতন্ত্র, সমানাধিকার এবং স্বাজাত্যবোধ এর প্রেরণা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে এই জাগরণ পূর্ণতা পায়। রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, জগদীশচন্দ্র তাঁদের প্রতিভার দীপ্তি ছড়াতে থাকেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সারা ভারতের নেতা হয়ে ওঠেন। ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালিরা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সম্মানের আসন লাভ করেন। বাংলা তখন এক সুবিশাল প্রদেশ। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও বিহার, উড়িষ্যা ও পূর্ববঙ্গ তার অন্তর্ভুক্ত। ব্রিটিশ ভারতে অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক গুরুত্ব খুব বেড়ে যায়। নবোদিত বাঙালির জাতীয়তাবোধ ব্রিটিশকে ভাবাতে শুরু করে।

ভারতের ঐক্যসাধনে ইংরেজের ভূমিকা

ইংরেজরা আরেকটা বড়ো কাজ সে সময়ে করছিল। বাহুবলে জয় করা দেশের বৃহদংশকে আমলাতন্ত্রের জালে বেঁধে ফেলছিল তারা। এই সিভিল সার্ভিস (civil service)-এর ধারণা ইংরেজরা পেয়েছিল চিনের কাছ থেকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চিনে এক অদ্ভুত স্থায়িত্ব ও রাজনৈতিক ঐক্য দেখা যায়। এর মূল ভিত্তি ছিল কনফুশিয়াসের মতে দীক্ষিত সুশিক্ষিত আমলাতন্ত্র। ইংরেজরা সিভিল সার্ভিস এর এই ধারণাটা চিনের কাছ থেকে ধার করল—যে-জন্য আমলাদের অনেক সময় ইংরেজিতে 'Mandarin' বলে। এছাড়া, পর পর যুদ্ধে ভারতের আয়তনও অনেকটা বাড়িয়ে ফেলল ব্রিটিশরা। ১৮১৪-১৬ খ্রিস্টাব্দে নেপালের সঙ্গে যুদ্ধে ভারতের তাঁবে এল সিকিম, দার্জিলিং, কুমাউন, গাড়োয়াল ও তরাই উপত্যকা। ব্রহ্মদেশের সঙ্গে যুদ্ধে জয় করা হল আসাম, মণিপুর, কাছাড় ও জয়ন্তিয়া। এছাড়া, ভারতের একটা বড়ো অংশে নির্বীর্য করদরাজ্যের রাজাদের পোষণ করত ইংরেজরা— Subsidiary Alliance-এর সূত্রে। এ ভাবে দেখা গেল যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সারা ভারতব্যাপী এক বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য—পেশোয়ার থেকে প্রাগজ্যোতিষ, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী— একই প্রশাসনিক সূত্রে বাঁধা। একই আইন প্রতিষ্ঠিত সারা দেশ জুড়ে। ভারতের এরকম ভৌগোলিক বিস্তার অশোক, আকবর, ঔরঙ্গজেব—কারও আমলেই আগে দেখা যায়নি। ব্রিটিশ ভারত তখন তার উদয়ের মধ্যগগনে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই এল বঙ্গভঙ্গ ও তার বিরোধী আন্দোলন।

ডিভাইড অ্যাণ্ড রুল নীতি ও বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন

আগেই বলেছি যে, কলকাতাকে কেন্দ্র করে বাঙালিদের উত্থান এবং জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণা ইংরেজদের ভাবাচ্ছিল। বড়লাট কার্জন এ ব্যাপারে ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি ভারতসচিব ব্রডরিককে লিখলেন:

The Bengalis, who like to think themselves a nation, and who dream of a future when the English will have been turned out, and a Bengali Babu will be installed in Government House, Calcutta, of course bitterly resent any disruption that will be likely to interface with the realisation of this dream. If we are weak enough to yield to their clamour now, we shall not be able to dismember or reduce Bengal again; and you will be cementing and solidifying, on the eastern flank of India, a force already formidable and certain to be a source of increasing trouble in the future.

অতএব, নবোদিত বাঙালি জাতি, যার অমিত শক্তি ও সম্ভাবনা, সাম্রাজ্যের স্বার্থে তাকে দ্বিখন্ডিত করতে হবে। ব্রিটিশদের এই Divide And Rule নীতি রোম সাম্রাজ্যের Divide et Empera নীতির অনুকরণ বা প্রতিধ্বনি।

এ ব্যাপারে দুঁদে আমলা হারবার্ট রিজলির বক্তব্য উল্লেখযোগ্য:

Bengal united is a power; Bengal divided will pull in several different ways. One of our main objects is to split up and thereby weaken a solid body of opponents to our rule.

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ব্রিটিশ আমলেই বারবার বাংলার ভৌগোলিক সীমারেখা পরিবর্তিত হয়েছে। ১৮৭৪ সালে বাংলাভাষী কাছাড়, সিলেট ও গোয়ালপাড়া অঞ্চল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অসম প্রভিন্সে সংযুক্ত হয়।

এই চক্রান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই এল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ। এর বিরোধী আন্দোলন সারা দেশকে কাঁপিয়ে দিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ রাখিবন্ধনের জন্য পথে নেমে এলেন। স্বদেশি গানে, বয়কট আন্দোলনে এবং স্বদেশি দ্রব্যের প্রচলনে বাংলা উত্তাল হয়ে উঠল। সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকায় বসে ‘হিন্দ স্বরাজ’ গ্রন্থে মহাত্মা গান্ধি বললেন:

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ভারতে সত্যকার জাগরণের সূচনাকারী। বঙ্গভঙ্গ অন্দোলন আমাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে চাওয়ার পেছনে কোনো বল থাকা দরকার।

এটা লক্ষণীয় যে, আন্দোলনের নেতৃত্ব হিন্দুরা করলেও তাদের সঙ্গে সঙ্গে বহু মুসলমানও বাঙালি চেতনার শরিক হয়ে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে মৌলানা আবুল কাশেম, মৌলানা মুজিবর রহমান, মৌলানা লিয়াকৎ হোসেন, আবুল হোসেন, আবুল হালিম গজনভি, নবাব আবদুস সোভান প্রমুখের নাম করা যায়।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ক্ষতিকর দিক ও হিন্দু-মুসলমান বিরোধ

বহু মুসলমান ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন করলেও এটাও সত্যি যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানই বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিলেন এবং ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ায় তাঁরা অসন্তুষ্ট এবং ইংরেজদের ওপর ক্ষুব্ধ হন। তার কারণও ছিল। নতুন প্রদেশে মুসলমানদের বেশি চাকরি হয়। সুযোগ-সুবিধা কিছুটা হলেও বাড়ে। মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষাবিভাগের কর্মচারী ও শিক্ষকদের সংখ্যাও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়। মুসলমানরা মিউনিসিপ্যালিটিতে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান।

এছাড়া বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের জোয়ারে বহু জায়গাতেই হিন্দু আন্দোলনকারীরা জোর করে হরতাল, বয়কট ও পিকেটিং-এ অনিচ্ছুক মুসলমানদেরও যোগ দিতে বাধ্য করেছিলেন। দেশনেতাদের অনেকেই দেশ ও মা কালীকে সমার্থক মনে করতেন। ১৯০৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মহালয়ার দিন কালীঘাটের মন্দিরে বহু হাজার আন্দোলনকারীকে পুরোহিতরা শপথবাক্য পাঠ করিয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম সংগীত সে সময় দেশসেবার মন্ত্র হয়ে ওঠে। কিন্তু তার দ্বিতীয়াংশ—‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণীয’ প্রকৃতপক্ষে দুর্গাস্তব, যা প্রতিমা পূজা-বিরোধী মুসলমানদের পক্ষে গাওয়া অসম্ভব ছিল। এছাড়া খাজনা বাড়িয়ে, স্বদেশবান্ধব বসিয়ে, প্রতিমা পূজা বাবদ ঈশ্বরবৃত্তি চাপিয়ে মুসলমানদের স্বদেশি আন্দোলন থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল। লক্ষণীয় যে, বঙ্গভঙ্গবিরোধী পূর্ববঙ্গের বহু হিন্দুই ছিলেন জমিদার শ্রেণির। বয়কটের নামে তাঁদের অত্যাচার দরিদ্র মুসলমান প্রজারা মেনে নিতে পারেনি। এই সময়ের সত্যনিষ্ঠ বিবরণ রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরে উপন্যাসে পাওয়া যায়।

সাম্রাজ্যবাদী ইন্ধন

বলা বাহুল্য, হিন্দু-মুসলমান বিরোধ জাগিয়ে তুলতে এবং জিইয়ে রাখতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ইন্ধন ছিল যথেষ্ট। লর্ড কার্জন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাকে নামমাত্র সুদে এক লক্ষ পাউণ্ড ঋণ দিয়ে হিন্দু-মুসলমানদের বিরোধ জাগিয়ে তোলার ব্যবস্থা করলেন। এরই ফলশ্রুতি হল ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা। চল্লিশ বছরের অক্লান্ত সাম্প্রদায়িক প্রচেষ্টায় দলটা ভারতভাগ করতে সক্ষম হয়। নবগঠিত পূর্ববঙ্গের গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলার প্রকাশ্যেই বলে বেড়াতেন যে, মুসলমানেরা তাঁর সুয়োরানি, হিন্দুরা দুয়োরানি। সব মিলিয়ে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনেক জায়গাতেই হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাধে।

রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সমকালীন তাঁর ‘ব্যাধি ও তার প্রতিকার’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন:

মুসলমানদের যে হিন্দুর বিরুদ্ধে লাগানো যাইতে পারে...এই তথ্যটাই ভাবিয়া দেখিবার বিষয়, কে লাগাইল সেটা এত গুরুতর বিষয় নয়। শনি তো ছিদ্র না পাইলে প্রবেশ করিতে পারে না। অতএব শনির চেয়ে ছিদ্র সম্বন্ধেই সাবধান হইতে হইবে। আমাদের মধ্যে যেখানে পাপ আছে, শত্রু সেখানে জোর করিবেই...শত্রুকে দোষ না দিয়া পাপকেই ধিক্কার দিতে হইবে।

...আমরা বহুশত বৎসর পাশে পাশে থাকিয়া এক ক্ষেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি। আমরা এক ভাষায় কথা কই, আমরা একই সুখদুঃখে মানুষ, তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই। আমাদের মধ্যে সুদীর্ঘকাল এমন একটি পাপ আমরা পোষণ করিয়াছি যে, একত্রে মিলিয়াও আমরা বিচ্ছেদকে ঠেকাইতে পারি নাই। এ পাপকে ঈশ্বর কোনোমতেই ক্ষমা করিতে পারেন না।

হিন্দু-মুসলমান এক হইলে পরস্পরের কত সুবিধা—একদিন কোনো সভায় মুসলমান শ্রোতাদিগকে তাহাই বুঝাইয়া বলা হইতে ছিল। তখন আমি এই কথাটি না বলিয়া থাকিতে পারি নাই যে, সুবিধার কথাটা এস্থলে মুখে আনিবার নহে, দুই ভাই এক হইয়া থাকিলে বিষয়কর্ম ভালো চলে। কিন্তু সেইটেই দুই ভাই এক থাকিবার প্রধান হেতু হওয়া উচিৎ নহে। কারণ, ঘটনাক্রমে সুবিধার গতি পরিবর্তন হওয়া আশ্চর্যকর নহে।...

আমাদের পরস্পরের মধ্যে সুবিধার চর্চা নহে, প্রেমের চর্চা, নি:স্বার্থ সেবার চর্চা যদি করি তবে সুবিধা উপস্থিত হইলে তাহা পুরা গ্রহণ করিতে পারিব এবং অসুবিধা উপস্থিত হইলেও তাহাকে বুক দিয়া ঠেকাইতে পারিব।

অবশ্য হিন্দু-মুসলমান বিরোধ লাগাবার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথ নীরব থাকেন নি। ‘সভ্যতার সঙ্কট’-এ তিনি লিখলেন:

সভ্যশাসনের চালনায় ভারতবর্ষের সকলের চেয়ে যে দুর্গতি আজ মাথা তুলে উঠেছে সে কেবল অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা এবং আরোগ্যের শোকাবহ অভাব মাত্র নয়; সে হচ্ছে ভারতবাসীর মধ্যে অত্যন্ত নৃশংস আত্মবিচ্ছেদ...এই দুর্গতির রূপ যে প্রত্যহই ক্রমশ উৎকট হয়ে উঠেছে, সে যদি ভারতশাসনযন্ত্রের ঊর্ধ্বস্তরে কোনো এক গোপন কেন্দ্রে প্রশ্রয়ের দ্বারা পোষিত না হত তা হলে কখনোই ভারত-ইতিহাসের এত বড়ো অপমানকর অসভ্য পরিণাম ঘটতে পারত না।

বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়

হিন্দু ও মুসলমান কোনো সমাজই Monolithic চরিত্র বিশিষ্ট নয়। কুরআন ও নবী কতৃক সাম্য প্রচার এবং একত্র নামাজ সত্ত্বেও ভারতের মুসলমানদের মধ্যে আশরফ-আতরফ-আজলফ ইত্যাদি বিভাজন রয়েছে। শিয়া-সুন্নি বিভাজন তো আছেই। এ ছাড়া হিন্দু-মুসলমান বিরোধরূপে খ্যাত সংঘর্ষ উভয় সমাজের উপরের স্তরেই সচরাচর সীমাবদ্ধ থাকে। এই বিবাদ মূলত মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতা-প্রতিপত্তি-অধিকার ও সুযোগ-সুবিধাকেন্দ্রিক।

এটাও অনস্বীকার্য যে, স্বাধীনতার আগে কলকাতা, ঢাকা, মুর্শিদাবাদের উর্দুভাষী, শিক্ষিত, অভিজাত মুসলিমরাই নিজেদের বাংলার মুসলিম বলে আত্মপরিচয় দিয়েছেন। এঁরা অনেকেই বাংলাভাষী দেশজ মুসলিমদের ‘ছোটোলোক’ মুসলিম বলে জানতেন। ঢাকার নবাব সলিমুল্লা, যিনি ‘মুসলিম লিগ’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনিও উর্দুভাষী ছিলেন এবং বাংলা জানতেন না।

সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলিমকে কেবল বেঁচে থাকার জন্যই নিজ নিজ পেশায় উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে হত এবং হয়। এদেরই ধর্মের নামে উন্মত্ত করে দিয়ে উভয় সম্প্রদায়ের ‘স্বাভাবিক নেতারা’ দাঙ্গার হতভাগ্য শিকারে পরিণত করতেন ও করেন।

পূর্ববঙ্গে ইসলামের প্রসারের একটা কারণ হল— ব্যাপক হারে বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তকরণ। সে ধর্মান্তকরণ যে সবসময় শক্তির সাহায্যে সাধিত হয়েছিল, তা নয়। ইসলামের অন্তর্নিহিত সাম্যের বাণীতেও এরা অনেকে অনুপ্রাণিত হয়। ধর্মান্তরিত মুন্ডিতমস্তক বৌদ্ধদের দেখেই সম্ভবত মুসলমানদের ‘নেড়ে’ বলে ডাকবার প্রচলন হয়।

ড. আমেদ শরীফ বলছেন:

ওহাবী-ফারায়েজী আন্দোলনের পূর্বে এখানে শরিয়তী ইসলামও তেমন আমল পায় নি। একপ্রকার লৌকিক তথা দেশজ ইসলামই লোকের অবলম্বন হয়েছিল। তখন পার্থিব জীবনের স্বস্তির ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্য কল্পিত হয়েছিল দেবপ্রতিম পাঁচ গাজী ও পাঁচ পীর। নিবেদিত চিত্তের ভক্তি লুটেছে খানকা, অর্ঘ্য পেয়েছে দরগাহ, শিরণী পেয়েছেন দেশের সেনানী-শাসক জাফর-ইসলাম-খানজাহান গাজিরা এবং বিদেশাগত বদর-আদম-জালাল-সুলতান প্রভৃতি সুফিরা, তার পরেও প্রয়োজন হয়েছিল সত্যপীর-খিজির-বড়খাঁ-গাজী-কালু-বনবিবি-ওলাবিবি প্রভৃতি দেবকল্প কাল্পনিক পীরের। এঁরা বাঙালির ঐহিক জীবনের নিয়ন্তা দেবতা।

এটাও এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে, লোকায়ত পূর্বোক্ত পীর-গাজী-দেবদেবীর কাছে ব্রাহ্মণ্য প্রথার অনুসারী হলেও হিন্দু নর-নারীর মাথা নোয়াতে কখনো অসুবিধা হয়নি। মাঝে মাঝে দ্বন্দ্ব বিরোধ সত্ত্বেও এখনও কোনো সঙ্কোচ হয় না।

সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীত, বাদ্যযন্ত্র, স্থাপত্য, খাদ্যতালিকা জীবনযাপনের যাবতীয় ক্ষেত্রে হিন্দুধর্ম ও ইসলামের সমন্বয় ঘটে। এই সমন্বয়ী ভাবনার ফলেই তাঁর জাত জিজ্ঞেস করলে এদেশের বাউল গাইতে পারেন:

সুন্নত দিলে হয় মুসলমান নারী লোকের কী হয় বিধান?

বামন চিনি পৈতার প্রমাণ বামনি চিনি কী ধরে?

অবশ্য এও মানতে হবে যে, সমন্বয়ই একমাত্র স্বীকৃত পন্থা ছিল না। পরস্পরের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষও ছিল। মধ্যযুগে পীর-মৌলবিদের প্রভাবে বা স্বয়ং শাসকের উদ্যোগে মন্দির ভাঙা, লুঠ করা থেকে শুরু করে বিধর্মী প্রজাপীড়নের বহু ঘটনা ঘটেছে।

এই সমন্বয়বিরোধী অসহিষ্ণুতার ধারা পুষ্ট করেন দুই ঊনবিংশ শতাব্দীর মুসলমান নেতা—আরবের ওয়াহাবি আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত রায়বেরিলির সৈয়দ আহমেদ (১৭৮৬-১৮৩১) এবং সৈয়দ জামান-অল-দিন আফগানি (১৮৩৯-১৮৯৭)। এঁদের লক্ষ্য ছিল ভারতের মুসলমানদের আদি ইসলামের ধর্মীয় আচার-আচরণ, বিশ্বাস ও প্রথায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। অভ্যুদয় ঘটে ইকবালের মতো কবির। জন্মসূত্রে পঞ্জাবি-কাশ্মীরি এই কবি আজীবন কাব্যচর্চা করেন মাতৃভাষা পঞ্জাবিতে নয়, বরং ফার্সি এবং উর্দুতে। দূর অতীতের আরব-ইরানের কৃতিত্বের স্বপ্নে বিভোর ইকবাল জন্ম দেন দ্বিজাতি তত্ত্বের।

এঁদের ধ্যানধারণার প্রসার ও প্রচারের ফলে বাঙালি মুসলমান আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে ভুগতে থাকে। তাদের আত্মপরিচয় কী? তারা আগে মুসলমান, না আগে বাঙালি? তাদের আনুগত্য কোথায়? দেশের প্রতি, না ইসলামের প্রতি?

এই আত্মপরিচয়ের সংকট চমৎকার ফুটিয়েছেন অদ্বিতীয় হাস্যরসিক পরশুরাম তাঁর ‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্পে। সেটা এখানে উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।

মৌলবী জানাইলেন: যে তাঁকেও কম অপমান সহ্য করিতে হয় নাই। মামাবাবু (গণেশ) যে তাঁর উপর লম্বাই চওড়াই করিবে তা তিনি বরদাস্ত করিবেন না। তিনি খানদানী মনিষ্যি। তাঁর ধমনীতে মোগলাই রক্ত প্রবাহিত হইতেছে। যদিও লোকে তাঁকে বছিরুদ্দি বলে, কিন্তু তাঁর আদত নাম ম্রেদম খাঁ, তাঁর পিতার নাম জাঁহাবাজ খাঁ, পিতামহের নাম আবদুল জব্বর, তাঁদের আদি নিবাস ফরিদপুর নয়—আরবদেশে, যাকে বলে তুর্খ। সেখানে সকলেই লুঙ্গি পরে এবং উর্দু বলে, কেবল পেটের দায়ে তাঁকে বাংলা শিখিতে হইয়াছে। সেই আরবদেশের মধ্যিখেনে ইস্তাম্বুল, তাঁর বাঁয়ে শহর বোগদাদ। এই কলকাতা শহরডা তার কাছে একেবারেই তুশ্চু।...

লক্ষণীয় যে, এই সঙ্কট বাঙালি তথা ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে আজও রয়ে গেছে। অবশ্য এ ব্যাপারে হিন্দুদের অবদানও কম কিছু নয়। অনেক উচ্চশিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোককে বলতে শুনেছি—লোকটা বাঙালি নয়, মুসলমান!

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী যুগের রাজনীতি

তুমুল রাজনৈতিক বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়ে ইংরেজ সরকার ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার করে নেয়। দুই বাংলা আবার সংযুক্ত হয়। রাজধানী স্থানান্তরিত হয় দিল্লিতে। বাংলার গরিষ্ঠসংখ্যক মুসলমান এতে খুশি হয়নি। তাদের মনে হল যে ব্রিটিশ সরকার হিন্দুদের তোষণ করছেন। তাদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে।

এরপর ভারতের রাজনীতিতে এল গান্ধিজির যুগ। এল ১৯২১-২২ সালের অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন।

এই পর্বে বাংলার সর্বোত্তম রাজনীতিবিদ নি:সন্দেহে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, হিন্দু-মুসলিম মিলনের দূত—চিত্তরঞ্জন দাশ। প্রখর বুদ্ধিমান দেশবন্ধু দেখেছিলেন যে, মুসলিমদের মূল সমস্যা হল তাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের চাকরিবাকরির অভাব এবং হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাদের পশ্চাদপদতা। তিনি তখন কলকাতা কর্পোরেশনের কর্ণধার। সেখানে আশি শতাংশ চাকরি মুসলিমদের জন্য সংরক্ষণ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন তিনি। এই দৃপ্ত ঘোষণায় বাংলার রাজনীতিতে ঝড় বয়ে গেল। কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা অনেকেই দেশবন্ধুর ওপর খড়্গহস্ত হলেন। দূরদর্শী দেশবন্ধু বললেন—'What you have to give ultimately, give it in time and give it gracefully.'

কিন্তু বাঙালির কপাল চিরকালই পাথরচাপা। ১৯২৫ সালে মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে প্রয়াত হলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। আর বিশ বছর তিনি বাঁচলে বাংলা ভাগ হয় না।

তিরিশ ও চল্লিশের দশকে বাংলার রাজনীতির অন্ধকার

দাশের অকালমৃত্যুর পর বাংলার রাজনীতিতে এক বিপুল শূন্যতা তৈরি হল। আর কোনো রাজনীতিবিদ ছিলেন না যিনি সর্বভারতীয় স্তরে গান্ধীজির সঙ্গে টক্কর দিতে পারেন, জাতীয় স্তরে বাংলা ও বাঙালির স্বার্থ দেখতে পারেন। বাংলার কংগ্রেসে সুভাষপন্থীদের সঙ্গে যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তপন্থীদের তীব্র গোষ্ঠীসংঘর্ষ চলতে থাকল। পরে সুভাষচন্দ্র দীর্ঘদিনের জন্য দেশান্তরি হতে বাধ্য হলেন।

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি মুসলিম ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক-প্রজা-পার্টির উত্থান ঘটল। এই নবগঠিত পার্টি সেই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না। ফজলুল হক কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মন্ত্রীসভা গঠন করার কথা বললেন। কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের অদূরদর্শী নেতারা সে প্রস্তাব বানচাল করে দিলেন। ফজলুল হক মুসলিম লিগের সঙ্গে আপোশ করতে বাধ্য হলেন। পলাশির যুদ্ধের পর এই প্রথম সীমিতভাবে হলেও মুসলিমরা বাংলার শাসনক্ষমতায় এলেন। তাঁরা হয়তো তখন হিন্দুদের দিকে চেয়ে মুচকি হেসেও ছিলেন—আপনারা বলতেন না, আমরা বাঙালি নই, মুসলিম? এখন দেখুন, বাংলার শাসনভার কার হাতে?

ত্রিপুরীর কেলেঙ্কারি

জাতীয় কংগ্রেসের অদূরদর্শী নেতারা দ্বিতীয় কেলেঙ্কারিটা করলেন ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ত্রিপুরী কংগ্রেসে। গণতান্ত্রিক ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সুভাষচন্দ্রকে গায়ের জোরে পদচ্যুত ও বিতাড়িত করা হল। বল্লভভাই প্যাটেল, জহরলাল নেহরু, গোবিন্দবল্লভ পন্থ প্রভৃতি বহু বীরই এই ক্রিয়াকলাপে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। তবে গান্ধীজি যে আড়াল থেকে আসল কলকাঠি নেড়েছিলেন, তাতে সন্দেহমাত্র নেই। বাংলার প্রতি সর্বভারতীয় নেতৃত্ব বারংবার অবিচার করে এসেছে। ত্রিপুরীর কলঙ্ক তার সবচেয়ে নগ্ন বহি:প্রকাশ। সুভাষচন্দ্রের মতো তরুণ, আদর্শবান, প্রজ্জ্বলন্ত দেশপ্রেমিককে কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত করে বাংলার যে সমূহ ক্ষতি করা হল, ভবিষ্যতের বাঙালি তার ক্ষতিপূরণ গুনবে। লক্ষণীয়, তখন বাংলায় মুসলিম লিগের অপশাসন শুরু হয়েছে।

দেশনায়ক

মহাত্মার মাহাত্ম্যে ব্যথিত অশীতিপর রবীন্দ্রনাথ এই সময় দ্বিতীয়বার লিখলেন তাঁর ‘দেশনায়ক’ প্রবন্ধ। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় এই শীর্ষক আরেকটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন তিনি—সেখানে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেশনায়কের পদে বরণ করেছিলেন। এবার বরণ করলেন ত্রিপুরী কংগ্রেসে লাঞ্ছিত-অপমানিত সুভাষচন্দ্রকে।

কবির দূরদৃষ্টি আমাদের অবাক করে দেয়। তিনি স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছেন যে, বাঙালির অদৃষ্টাকাশে দুর্যোগ ঘনিয়ে আসছে—বাংলার রাজনীতির হালে-দাঁড়ে মিল নেই। সুভাষচন্দ্রকে তিনি আহ্বান করলেন এই ধ্বংসোন্মুখ অথচ নানাদিক থেকে প্রতিভাবান জাতির সৃষ্টিকে পুনঃসঞ্জীবিত করে তুলতে। এও বললেন যে ভারতের আসন্ন রাষ্ট্রমিলন যজ্ঞে বাঙালি যেন ভেদবুদ্ধিবশত নিজেকে পৃথক না ভাবে—বাঙালির বাহু যেন ভারতের বাহুকে বল দেয়। কবির এই আহ্বান সুভাষচন্দ্রের কাছে পৌঁছল না। বলা ভালো যে, কবির ঘনিষ্ঠ কিছু পরিকর পৌঁছতে দিলেন না। অশান্ত, অস্থির দেশপ্রেমী সুভাষচন্দ্র এর কিছু পরেই দেশের মুক্তির সন্ধানে ভারত ত্যাগ করেন।

চল্লিশের দশকের অন্ধকার

উনিশশো চল্লিশের দশক বাঙালির সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার, বিস্মরণীয়, কলঙ্কজনক দশক। বাংলায় তখন মুসলিম লিগের অপশাসন কায়েম হয়েছে। ফজলুল হক বেশিদিন টিকলেন না। পর্যায়ক্রমে এলেন নাজিমুদ্দিন ও সুরাবর্দি। এঁরা কেউই বড়ো মাপের মানুষ বা রাজনীতিবিদ ছিলেন না। বাংলার প্রয়োজন ছিল হুসেন শাহ বা আলিবর্দির মতো নেতা, যিনি হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের উর্দ্ধে উঠে অসাম্প্রদায়িক রাজধর্ম পালন করবেন, সংখ্যালঘুরা যাঁর ছত্রছায়ায় নিরাপদ বোধ করবে। এই অযোগ্য, অদূরদর্শী শাসকদের আমলে তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষে প্রায় ত্রিশ লাখ বাঙালি মারা গেলেন। ছেচল্লিশের ১৬ আগস্ট জিন্নার Direct Action Day-র অনুপ্রেরণায় কলকাতায় বীভৎস দাঙ্গা ঘটল, যা ইতিহাসে Great Calcutta Killing নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। এরপরেই ঘটল নোয়াখালির দাঙ্গা। দেশের কোণে কোণে সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বলতে শুরু করল। সেই বহ্ন্যুৎসবে সমিধ হল বাঙালির অখন্ড জাতিসত্তা। হিন্দুরা মুসলিম লিগের সদিচ্ছার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন। হারিয়ে ফেললেন এই প্রত্যয় যে, মুসলিম রাজত্বে তাঁদের অস্তিত্ব সুরক্ষিত থাকবে।

মুসলিমরা পশ্চিমবঙ্গকে হারাল

ঐতিহাসিক সত্য হল, ১৯৪৭ সালে মুসলিমরা বঙ্গবিভাগ চাননি। চাইবেন কেন? তাঁরা তো তখন অখন্ড বঙ্গপ্রদেশের অধীশ্বর। গণতান্ত্রিক ভোট হলেও শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মুসলিমরা বাংলার নিয়ন্তা হন। তাছাড়া বঙ্গবিভাগ হলে তাঁরা হারাচ্ছেন বঙ্গদেশের রাজধানী তথা প্রাণপ্রদীপ কলকাতা এবং সন্নিহিত শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চল। মুসলিমরা তাই চাইলেন পাকিস্তানের অধীন যুক্তবঙ্গ। স্বভাবতই অধিকাংশ হিন্দুর সেটা না-পসন্দ হল। শরৎ বসু ও সুরাবর্দি শেষ চেষ্টা করলেন। ‘স্বাধীন যুক্তবঙ্গ’-র পরিকল্পনার একটা ফানুস বাতাসে ভাসানো হল। হিন্দুদের কাছে তখন সুরাবর্দির কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতারা ভারতের Balkanization চাইবেন কেন? জিন্নাই বা কেন চাইবেন পাকিস্তানের বিভাজন? অতএব স্বাধীন যুক্তবঙ্গের পরিকল্পনা শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ল।

তেলের শিশি ভাঙল বলে

১৯৪৭ সালের বিশে জুন বেঙ্গল লেজিস্লেটিভ অ্যাসেম্বিলর ভোট হল। সংযুক্ত সেশনে ভারতভুক্তির পক্ষে পড়ল নব্বই (৯০) ভোট। একশো ছাব্বিশজন (১২৬) ভোট দিলেন ভারতভুক্তির বিপক্ষে। এরপর মুসলিমগরিষ্ঠ অঞ্চলের প্রতিনিধিরা ভোট দিলেন। তাঁরা চাইলেন অবিভক্ত বঙ্গকে পাকিস্তানে সংযুক্ত করতে। এই প্রস্তাবের স্বপক্ষে পড়ল একশো ছয় (১০৬) ভোট। পঁয়ত্রিশজন (৩৫) বিরোধিতা করলেন। এরপর হিন্দুগরিষ্ঠ অঞ্চলের প্রতিনিধিরা ভোট দিলেন। তারা ৫৮-২১ ভোটে বঙ্গবিভাগ এবং পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তির স্বপক্ষে রায় দিলেন। বঙ্গবিভাগ হল। রাজধর্ম পালনে ব্যর্থতার জন্য বাংলার এক তৃতীয়াংশ খোয়ালেন মুসলিমরা। হিন্দু নেতা শ্যামাপ্রসাদ উল্লসিত হয়ে বললেন—‘ওরা ভারতকে ভাগ করেছে আর আমরা পাকিস্তানকে ভাগ করলাম।’

বাংলার মতো বিভক্ত হল পঞ্জাবও। বিমর্ষ জিন্না বললেন—এই কীটদষ্ট (Moth-eaten) পাকিস্তান নিয়ে তিনি কী করবেন? অরুচিকর ঠেকলেও, পরিস্থিতির চাপে ব্যাপারটা হজম করে নিতে হল তাঁকে। প্যাটেল আর জহরলাল দেখলেন যে, ভাগাভাগি হলেও ভারতের ভাগে যা ইংরেজরা রেখে যাচ্ছে, তা কম কিছু নয়। অশোক, আকবর, চন্দ্রগুপ্ত, ঔরঙ্গজেব কারো আমলেই ভারতের ভৌগোলিক বিস্তার এত ব্যাপক ছিল না। তার জন্য যদি পঞ্জাব আর বাংলাকে যূপকাষ্ঠে বলি দিতে হয়, তাই সই। উত্তরপ্রদেশ তো ভাগ হচ্ছে না! দেশীয় করদরাজ্যদের ইংরেজদের রেখে যাওয়া সুশিক্ষিত সেনাবাহিনীর সাহায্যে ত্বরিতগতিতে ভারতভুক্ত করলেন প্যাটেল। অবশ্য এই নির্বিষ, নির্বীর্য করদরাজ্যগুলোকে জয় করার মধ্যে গ্যারিবল্ডি বা বিসমার্কসুলভ কৃতিত্বের সন্ধান করা বাতুলতা তথা আত্মছলনা মাত্র। দেশান্তরি সুভাষচন্দ্রের সন্ধান মিলল না। তাঁকে নিয়ে পল্লবিত হয়ে উঠল নানা বিশ্বাস্য-অবিশ্বাস্য গল্পগাথা। পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের হিন্দু বাঙালি দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জলে আক্ষেপ করবে—সুভাষ ঘরে ফেরে নাই! সুভাষ ঘরে ফেরে নাই!

রাজনীতিকরা যখন এই ভাঙা-গড়ার খেলায় মত্ত, তখন একজন বাঙালি আইসিএস অফিসার তথা সাহিত্যিক খুব বিমর্ষ ছিলেন। তাঁর বাড়ির ছোট্ট খুকু একটা তেলের শিশি ভেঙে ফেলেছে বলে খুব বকুনি খাচ্ছে। তিনি নীরবে ঘরের এককোণে বসে কবিতার খাতা বের করে খস খস করে লিখতে লাগলেন:

তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর পরে রাগ করো?

তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো?

তার বেলা?

দেশভাগ তথা বঙ্গবিভাগ আবারও মর্মান্তিক ভাবে সত্য প্রমাণিত করল বঙ্কিমচন্দ্রের আক্ষেপোক্তি: ‘বাঙালি বরাবরই পরিস্থিতির দাস। পরিস্থিতি কখনোই বাঙালির দাস নহে।’

ভুল হয়ে গেছে বিলকুল

ভাগ হলেন না আরেকজনও। মুসলিম হয়েও বিয়ে করেছেন হিন্দু নারীকে। আজীবন রয়ে গেছেন হিন্দু-মুসলমান মিলনের উদগাতা। রচনা করেছেন শ্যামাসংগীত এবং ইসলামী গীতি একই কলমে—বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলাম। দেশভাগের সময় তিনি দুরারোগ্য অসুখে জড়বুদ্ধি। অন্নদাশঙ্কর রায় সেই ঐতিহাসিক ভুলটাও স্বীকার করলেন:

ভুল হয়ে গেছে বিলকুল।

আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে,

ভাগ হয়নি কো নজরুল।

সেই ভুলটুকু বেঁচে যাক।

বাঙালি বলতে একজনই আছে, দুর্গতি তার ঘুচে যাক।

দেশভাগের ফলে মুসলিমদের মারাত্মক ক্ষতি

এই শীর্ষক অনেককেই বিমূঢ় করবে। তাঁরা বলবেন—সে কী মশাই? মুসলমানরাই তো দেশভাগ করল? তাদের ক্ষতির কথা কী বলছেন? কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই মালুম হবে, দেশভাগের সর্বনাশা রাজনীতি সমগ্র ভারত-উপমহাদেশের মুসলমানদের কী মারাত্মক ক্ষতি করেছে।

দেশভাগের রাজনীতির পুরোধা ছিলেন উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মুসলমানেরা। সংখ্যালঘুত্বের কারণে তাঁদের শঙ্কার সঙ্গত কারণ ছিল। বাংলা বা পঞ্জাবের মুসলমানদের সে আশঙ্কা ছিল না, কারণ নিজেদের প্রদেশে তাঁরাই সংখ্যাগুরু ছিলেন। দেশভাগের ফলে বাংলা ও পঞ্জাবের মুসলমানরা তাঁদের হিন্দুগরিষ্ঠ অংশ হারালেন। অবশ্য পঞ্জাবি মুসলমানরা সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্তপ্রদেশের ওপর ছড়ি ঘোরাবার অবকাশ পেলেন। বাঙালি মুসলমানদেরও জুতোর তলায় রাখলেন তাঁরা। সেই আধিপত্য অন্যান্যদের ভালো লাগল কিনা—সেটা স্বতন্ত্র প্রশ্ন।

সারা উত্তর ভারতে সুলতানি ও মুঘল আমলে মুসলমানদের আধিপত্য ছিল। স্থাপত্য, শিল্প, কলাবিদ্যায় তাঁরা অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। সেই সব পুরুষানুক্রমে অর্জিত কৃতি বিসর্জন দিয়ে তাঁরা দেশান্তরি হলেন। পড়ে রইল তাজমহল, ফতেপুর সিক্রি, শাহজাহানাবাদ। তাঁদের নির্মাতাদের উত্তরসূরীরা হয় মোহাজির হয়ে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তানে, নয় তাঁরা গেলেন পূর্ব পাকিস্তানে— যেখানে তাদের পরিচয় হল বিহারী মুসলমান। ভবিষ্যতে এই দুই দেশে তাঁদের কী হেনস্থা ঘটবে, সেটা তাঁরা তখন অনুধাবন করেননি।

ভারতে অবশিষ্ট মুসলমানরা বিবর্ণ, দীপ্তিহীন, হতমান জীবনযাপন করতে লাগলেন। তাঁদের গর্বের উর্দু ভাষা গ্রহণের গ্রাসে পড়ল। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হলেও এক ধরনের ঘেটো মানসিকতায় আক্রান্ত হলেন ভারতের মুসলিমরা। তাঁদের পশ্চাদপদতা ও অনগ্রসরতার সুযোগ নিলেন চতুর রাজনীতিবিদরা। এই জনগোষ্ঠী হয়ে উঠলেন ভোটের কড়ি ও একের পর এক দাঙ্গার শিকার—এই অন্তহীন সারণিতে রয়েছে মুম্বই, ভাগলপুর, বাবরি মসজিদ, গোধরা ইত্যাদি। এদের কুশীলবদের এখনো যথার্থ বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা হয়নি। এই সত্য ভারতের গণতান্ত্রিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে কলঙ্কজনক। ভারতে থেকে যাওয়া মুসলমানদের এই পরিণতির ভবিষ্যদবাণী দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ আগেই তাঁর India wins Freedom গ্রন্থে করে গিয়েছিলেন। তাঁর সেই ভবিষ্যদবাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

পাকিস্তানের সুন্নি বাহুবলীরা প্রথমে হিন্দু ও শিখদের সমূলে বিতাড়িত করে সংখ্যালঘু সমস্যার সমাধান করবেন ভেবেছিলেন। মুশকিল হল, শাসনযন্ত্র সাম্প্রদায়িকতার দানবী সামান্য উপচারে সন্তুষ্ট হয় না। এখন শিয়া, আহমদিয়া, খ্রিস্টান প্রভৃতি সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নির্বিচার নিধন পাকিস্তানের পাপের ভার বাড়িয়ে তুলছে। সেই অভাগা দেশে উগ্রপন্থীদের উলঙ্গ নৃত্য চলছে।

পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপক হিন্দু বিতারণ

দেশভাগের আগে পূর্ববঙ্গে শিক্ষায়, দীক্ষায়, কর্মস্থানে হিন্দুরাই অগ্রণী ছিলেন। এই প্রতিভাবান জনগোষ্ঠীই উপহার দিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা প্রমুখ দিকপাল বিজ্ঞানীদের। এছাড়া গরিষ্ঠসংখ্যক জমিদারই ছিলেন হিন্দু। দেশভাগের পর হয় তাঁরা স্বেচ্ছায়, নয়তো লাঞ্ছিত, তাড়িত হয়ে স্বদেশত্যাগ করলেন। হিন্দু জমিদাররা ছেড়ে যাওয়ায় একধরনের ভূমিসংস্কার হল বটে, কিন্তু উজ্জ্বল প্রতিভাবান, মেধাবী হিন্দুরা দেশত্যাগ করায় পূর্ববঙ্গ তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে চলে এলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। সেটা কি আইনস্টাইনের জার্মানি ত্যাগের সমতুল্য ক্ষতি নয়? দেশের সবচেয়ে মেধাবী অংশকে যদি গায়ের জোরে দেশছাড়া করা হয়, তাহলে দেশের কি উন্নতি প্রত্যাশা করা যেতে পারে?

১৯৪৭ সালের পরে ঠিক কত বাঙালি হিন্দু সর্বস্ব খুইয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে ভিটেমাটি-ছাড়া হয়ে দেশান্তরি হয়েছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সংখ্যাটা ষাট লক্ষ থেকে এককোটি—যা খুশি হতে পারে। তবে এ কথা নানা জায়গায় গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হতে শুনেছি যে, বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দুরা শতকরা দশ শতাংশ মাত্র। যখন দেখি যে, ১৯৪৭ সালে তাঁরা জনসংখ্যার ত্রিশ শতাংশ ছিলেন তখন এক অকল্পনীয় বিয়োগাত্মক মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হই আমরা। ইতিহাসে ইহুদি ছাড়া আর কোনো জনগোষ্ঠী এমন ব্যাপক ধারাবাহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানা নেই। ইহুদিরা সারা পৃথিবী জুড়ে সমবেদনা পেয়েছেন। তাঁদের ক্ষতির উপর, আত্মত্যাগের উপর স্মৃতিসৌধ রচিত হয়েছে। সর্বহারা হিন্দু বাঙালি উদ্বাস্তুরা ইতিহাসে অবজ্ঞাত রয়ে গেলেন। এই আধুনিক হলোকাস্টের কোনো হিসেব-নিকেশ হল না। অবশ্য রিফিউজি ক্যাম্পে, দন্ডকারণ্যে, মরিচঝাঁপিতে তাঁদের নি:শব্দ মৃত্যু মহাকালের অক্ষিপটল পুস্তিকায় অনপনেয় কলঙ্কের দাগ যে স্থায়ীভাবে রেখে গেল—সে বিষয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যে বাংলার বামপন্থীরা, যাঁরা চৌত্রিশ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিলেন এবং কাজে বড়ো না হয়ে, কথায় বড়ো হওয়ার নিরন্তর সাধনা করে গেছেন—তাঁরা এই ব্যাপক হিন্দু বিতারণ নিয়ে টুঁ শব্দটি করলেন না। যাঁরা নিকারাগুয়ার দুঃখে কাতর, নেলসন ম্যাণ্ডেলার প্রেরণায় প্রাণিত, প্যালেস্টিনীয় জনগোষ্ঠীর অনুভাবনায় ভাবিত, তাঁদের চোখের সামনের এত বড়ো একটা মানবিক দুর্যোগ নজর এড়িয়ে গেল কীভাবে? দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কোন সৃজনশীল উপধারায় তাঁরা এই ঔদাসীন্য ব্যাখ্যা করবেন—জানি না।

বাংলা ভাষার সঞ্জীবনী শক্তি ও একুশে ফেব্রুয়ারি

পূর্ব পাকিস্তান যখন প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমের কলোনিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, বাংলা ভাষার উর্দু রূপান্তরকরণ চলছে, বাঙালি সংস্কৃতি যখন সেখানে আসন্ন বিনাশের মুখোমুখি, তখনই ঘটল এক আশ্চর্য উদয়। আমি বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের কথা বলছি। বলছি একুশে ফেব্রুয়ারির কথা। বলছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আত্মবিসর্জনকারী তরুণদের কথা। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির ইতিহাসে এক মহান, কালোত্তীর্ণ দিন এবং এর শক্তি বাংলা ভাষার দুর্জয়, অবিনাশী, অমিত সম্ভাবনার মধ্যে সংগুপ্ত ছিল। এই প্রসঙ্গে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সুনন্দর জার্নাল থেকে বক্তব্য তুলে ধর^িছ:

লিখতে লিখতে চোখ তুলেছি। সামনের দেওয়ালে ক্যালেণ্ডার। একটা আসন্ন তারিখ হঠাৎ যেন ঠিকরে বেরিয়ে এল তার থেকে।

একুশে ফেব্রুয়ারি।

একুশে ফেব্রুয়ারি।

রক্ত ঝন ঝন করে উঠল। হঠাৎ মনে হল প্রলাপ বকে যাচ্ছি এতক্ষণ। এসব কিছুই লেখার দরকার ছিল না। ওই তারিখটা আমার সব চিন্তার জবাব দিয়েছে।

একুশে ফেব্রুয়ারি—পূর্ববাংলা! ঢাকা-বরিশাল-ফরিদপুর-রাজশাহী! মাতৃভাষার সম্মান রাখবার জন্য সর্বাত্মক হরতাল, বিক্ষোভ মিছিল, ছাত্র-শোভাযাত্রা, লাঠি, গুলি, রক্তস্নান, কিন্তু কোনো শক্তিই তো বাঙালির মাতৃভাষাকে কেড়ে নিতে পারল না।

আমরা অহোরাত্রি রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা করছি, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বই লিখছি, অথচ রবীন্দ্রনাথের সম্মান তো ওরাই রাখল। বাঙালির প্রয়োজনে একখানা বাঙলা চিঠিও যাদের সরকার লিখতে পারে না—তাদের ডি-ল্যুক্স ‘রবীন্দ্রসদনে’র চাইতে পূর্ববাংলার অস্থায়ী ওই শহিদ স্তম্ভগুলো অনেক বেশি মূল্যবান।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ভুল লেখেননি। একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন, এই উপমহাদেশের এক দিগদর্শী আন্দোলন, যা পূর্ণ পরিণতি গেল বাহাত্তর সালে ধর্মনিরপেক্ষ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে। এই রক্তস্নাত অভ্যুদয় চিরকালের জন্য জিন্না-ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রান্তি ও অসারতা প্রমাণ করল। পাকিস্তানি খান সেনা, রাজাকার এবং আলবদরের হাতে ন্যূনাধিক ত্রিশ লাখ হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি খতম হলেন। নাৎসিদের ইহুদিনিধনের পর এত ব্যাপক হারে আর কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর Genocide সংগঠিত হয়নি। ধর্ষিতা হলেন অগণিত বাঙালি রমণী। প্রায় এককোটি বাঙালি সীমান্ত পার হয়ে চলে এলেন ভারতে। মুসলমানরা সবিস্ময়ে দেখলেন যে, তথাকথিত হিন্দু দুশমনের দেশ ভারত, চিরশত্রুর দেশ ভারত তাঁদের বুকে তুলে নিল, শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ ও সাহায্যের ব্যবস্থা করল। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রণোদনায় বাংলাদেশ স্বাধীন হল। যে-কোনো নিরিখেই এটা যুগান্তকারী ঘটনা এবং এর সঞ্চালক হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি, ভারতীয় সেনাবাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা গোষ্ঠী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রনায়ক শেখ মুজিবর রহমানের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত শ্রেণির আত্মিক অবসাদ

সাতচল্লিশের স্বাধীনতার পর পূর্ব বাংলার তথা পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস যতটা ঘটনাবহুল, নাটকীয় ও রক্তস্নাত, পশ্চিমবঙ্গের ততটা নয়। অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও মোটামুটি সুস্থিত গণতান্ত্রিক পরিবেশ আমরা উপভোগ করেছি। উদ্বাস্তু সমস্যা ও মূলগত দারিদ্র্য আমাদের বিক্ষত করলেও, স্বাধীনতার পর অন্তত প্রথম পনেরো বছর নানা কর্মকান্ড আমাদের জাতীয় জীবনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এছাড়া নানা সরকারি কর্মকান্ডের ফলে স্বাধীনতার পর দরিদ্র মানুষদের যে কিছুটা উপকার হয়েছে, দারিদ্র্য যে কিছুটা হলেও দূর হয়েছে, সাক্ষরতার হার যে অনেকটাই বেড়েছে, সেটাও অনস্বীকার্য। দুর্গাপুর ও কল্যাণীতে নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠল। সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে পুরোনোদের সাথে সাথে শক্তিমান নবীনদের উত্থান ঘটল। সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণালের হাতে বাংলা চলচ্চিত্র এবং শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশের নির্দেশনায় বাংলা নাটক উৎকর্ষের শিখর স্পর্শ করল। IPTA অনুপ্রাণিত বামপন্থীরা নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখলেন। মার্গসংগীতে রবিশঙ্কর, আলি আকবর এবং বাংলা গানের ক্ষেত্রে হেমন্ত, সলিল, শ্যামল, সুধীন, শচীনদেব, নচিকেতা ঘোষ ফুল ফোটাতে লাগলেন। তবু, এই আপাত সমৃদ্ধির মধ্যে পতনের বীজ লুকিয়ে ছিল, যা ষাটের দশকের মাঝামাঝি স্পষ্ট হয়ে উঠল—তা হল সমাজের মূল চালিকাশক্তি মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালির ক্রমবর্ধমান আত্মিক অবসাদ।

সুনন্দর জার্নাল থেকে আবার উদ্ধৃতি দিই:

বহুদিন আগে একজন বিদেশি কবি বিশেষ অর্থে একটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন—‘Ennui’ যার বাংলা পরিভাষা করা যেতে পারে; ‘আত্মিক অবসাদ’। সেই কবি সখেদে বলেছিলেন পৃথিবীর সব হিংস্র জন্তুর চাইতেও তা দন্তুর এবং নিষ্ঠুর, সশব্দে লাফিয়ে পড়ে না, গর্জনও করে না, কিন্তু নি:শব্দে নীরবে বিশ্ব-সংসার সে গ্রাস করে নেয়।...

কিন্তু এই অবসাদ যখন নি:শব্দে একটা জাতিকে নিজের মধ্যে আকর্ষণ করে নিতে থাকে, তখন তার মধ্যে আর শিল্পী ব্যক্তিত্বের বিদ্যুৎস্ফুরণ নয়, ঘনাতে থাকে এক নিশ্ছিদ্র মেঘান্ধকার। মানুষ ক্রমশ তার লক্ষ্য হারাতে থাকে, তারপর নিরুপায় অন্তর্জ্বলায় শুরু হয় তার আত্মঘাত। বাইরে থেকে আত্মিক অবসাদের এই আক্রমণটাকে ভালো করে অনুভব করা যায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে জীর্ণতা, হীনম্মন্যতা আর শূন্যতার বোধ তাকে আচ্ছন্ন করে, তারপর যে-কোনো একটা উপলক্ষ্যকে আশ্রয় করে অ্যানার্কির বিস্ফোরণ ঘটে।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আত্মিক সম্পদে ভরপুর হিন্দু বাঙালি পরাধীনতার শত প্রতিকূলতার মধ্যেও অন্তত আট-দশটা আন্তর্জাতিক মানের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করেছিল, সৃজন করেছিল গীতাঞ্জলি-র মতো অমর কাব্য, জন্ম দিয়েছিল অনবদ্য কাব্যগীতির, তৈরি করেছিল একের পর এক বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান। সেই পর্বের মহত্তম প্রতিভা ঘোষণা করেছিলেন যে, পূর্ব ও পশ্চিমের মিলনের ভার বাঙালির উপর পড়েছে। নিজের জাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর এতটাই বিশ্বাস তাঁর ছিল। এই বাঙালিদের প্রেরণা কী ছিল? কী ছিল তাঁদের কর্মোদ্যমের চালিকাশক্তি?

বন্ধুবর রবীন্দ্রনাথকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে লেখা জগদীশচন্দ্রের চিঠি থেকে একটা উদ্ধৃতি তুলে দিই।

জগদীশের প্রতিভামুগ্ধ ব্রিটিশরা তাঁকে ইংলণ্ডে মোটা মাইনের এবং বহু সুবিধার প্রোফেসর পদে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন:

Can’t you come over to England? Suitable chairs fall seldom vacant here and there are many candidates. But there is just now a very good appointment and should you care to accept it, no one else will get it.

আত্মিক সঙ্কটে ভোগা জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন:

এখন বলুন কী করি? একদিকে আমি যে কাজ আরম্ভ করিয়াছি...তাহার জন্য অসীম পরিশ্রম ও বহু অনুকূল অবস্থার প্রয়োজন। অন্যদিকে আমার সমস্ত মন প্রাণ দুঃখিনী মাতৃভূমির আকর্ষণ ছেদন করিতে পারে না। আমি কী করিব কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না। আমার সমস্ত inspiration এর মূলে আমার স্বদেশীয় লোকের স্নেহ—সেই স্নেহবন্ধন ছিন্ন হইলে আমার আর কী রহিল?

জগদীশচন্দ্র সিদ্ধান্ত নিলেন:

আমার হৃদয়ের মূল ভারতবর্ষ। যদি সেখানে থাকিয়া কিছু করিতে পারি তাহা হইলেই আমার জীবন ধন্য হইবে। দেশে ফিরিয়া আসিলে যে সব বাধা পড়িবে তাহা বুঝিতে পারিতেছি। যদি আমার অভীষ্ট অপূর্ণ থাকিয়া যায় তাহাও সহ্য করিব।

সেই পর্বের বাঙালিরা তৈরি করলেন—রামকৃষ্ণ মিশন, বিশ্বভারতী, বেঙ্গল কেমিক্যাল, বসুবিজ্ঞান মন্দির, সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, ইণ্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটের মতো বিশ্ববন্দিত প্রতিষ্ঠান। পরাধীন দেশে কতটুকু সরকারি সাহায্য পেয়েছিলেন তাঁরা? অদম্য পুরুষকার ও সুগভীর স্বাদেশিকতাই জন্ম দিয়েছিল বাঙালির গর্বের এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে।

বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ছেলেমেয়েদের উজ্জ্বল চোখের আলো ম্লান হতে শুরু করল। বাঙালি বুদ্ধিজীবীর চিন্তায় এল শিথিল অবসাদ। সাহিত্যে এল আশ্চর্য নিরক্ততা। রাজনৈতিক চিন্তার রেখাগুলো ক্রমেই হয়ে উঠল অস্পষ্ট। নেতৃত্ব হয়ে উঠল দুর্বলতর। এই সময় থেকে রবীন্দ্র-জগদীশ-বিবেকানন্দের উত্তরসূরীরা দলে দলে দেশান্তরি হতে শুরু করলেন। নিবতে শুরু করল বাঙালি মনীষার দীপ্তি। সঙ্গে সঙ্গে নিবতে শুরু করল পশ্চিমবঙ্গের প্রাণপ্রদীপ কলকাতা মহানগরী।

কেন এত দীন, এত হীন হয়ে গেল কলকাতা?

বিজ্ঞজনেরা নানা কথা বলবেন, নানা যুক্তি দেবেন, যার কোনোটাই ফেলনা নয়। বন্দর কলকাতার অধোগতি, কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণ, বামপন্থীদের কান্ডজ্ঞানহীন জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলন—সবেরই নি:সন্দেহে গুরুত্ব রয়েছে। তবে সবচেয়ে মুখ্য কারণ আমার মতে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির ঘনায়মান আত্মিক অবসাদ, যা তাকে ‘বড়ো’র সাধনা ছেড়ে, ক্ষণিকের সাধনায়, সুলভের সাধনায়, মধ্যমেধার সাধনায় প্রবৃত্ত করল। যে আলো আমাদের জীবনকে দীপ্ত করে রেখেছিল, দান করেছিল বেঁচে থাকার পাথেয়, তা আমাদের চিরতরে ছেড়ে গেল। দেশের স্বার্থ আমাদের কাছে গৌণ হয়ে গেল। টাকার পাহাড় জমানোতেই দেখা গেল জীবনের চরিতার্থতা খোঁজার প্রয়াস। বিদেশের নিশ্চিন্ত, স্বচ্ছন্দ, স্বচ্ছল জীবনযাত্রাই হয়ে উঠল কাম্য। বিদেশের হাততালিতে কৃতার্থ বোধ করাই হয়ে উঠল জীবনের উদ্দেশ্য।

তবু এক মৃত্যুহীন মানে ছিল এই ভূখন্ডের

দুই বাংলা মিলিয়ে প্রায় কোটি বিশেক বাঙালি আছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর ব-দ্বীপে বাস করি আমরা। ওপরে উত্যুঙ্গ হিমালয়। নীচে সফেন বঙ্গোপসাগর। অপরিসীম জীববৈচিত্র্য ভরপুর এই ভূখন্ডের পূর্বদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার, পশ্চিমে লোহা ও কয়লার অফুরন্ত উৎস।

এখানকার অধিবাসীরা ধীমান ও পরিশ্রমী। একসময় এই দেশ, এই অঞ্চল ছিল বিশ্বে সবচেয়ে সমৃদ্ধ। আর আজ?...সারা বিশ্বে আজ বাঙালির কী পরিচয়? আমাদের সমৃদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতির কী আন্তর্জাতিক মূল্য আছে? যারা রাজা হতে পারত, তাদের এমন অকিঞ্চন, ভিখারির বেশ কেন? কেন এই ভূখন্ড এক দীপ্তিনাশা, কীর্তিনাশা কুয়াশায় আবৃত হয়ে আছে? কেন সে জগৎসভায় কোনো বরেণ্য আসন গ্রহণ করতে পারছে না?

বাঙালির আত্মচ্ছেদ ও তার বিষময় ফল

যখন বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতিত হন বা মারা যান, তখন কাগজে পড়ি হিন্দু মারা গেছে। এটা পড়ি না যে, একজন বাঙালি মারা গেছে। একই ভাবে যখন আসামের নেল্লীতে বীভৎস গণহত্যা হল, আমরা খবরের কাগজে সারি সারি বিদীর্ণ-কন্ঠ শিশুর শব পড়ে থাকতে দেখলাম, তখন কাগজের সম্পাদকরা ঢোঁক গিলে লিখলেন—কিছু মুসলমান মারা গেছে। একইভাবে সীমান্তে যদি কোনো বাংলাদেশি তরুণের গুলিতে অপমৃত্যু হয়—আমরা বলি বাংলাদেশির মৃত্যু, বলি না বাঙালির মৃত্যু। বাংলাদেশে ঝড়ে, জলে, বন্যায় অজস্র মানুষের মৃত্যু আমাদের কাছে বাংলাদেশির মৃত্যু বলে প্রতিভাত হয়, বাঙালির মৃত্যু বলে নয়। বিজ্ঞরা বলবেন যে, সেটাই তো ঠিক, সেটাই তো স্বাভাবিক। বাংলাদেশ তো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। তাঁদের সঙ্গে সম্মতি জানিয়েও আমি সবিনয়ে বলব যে, এই ঘটনাগুলো জাতি হিসেবে আমাদের দুর্বলতার পরিচায়ক। সংযুক্ত হলে, একত্রিত হলে যে জাতি দুর্জয় শক্তিধর হতে পারত, সেই জাতি তার আত্মজদের বিনাশে যে ব্যাকুল বা উৎকন্ঠিত হতে পারে না, তা দুঁদে সাম্রাজ্যবাদী হারবার্ট রিজলের ভবিষ্যৎবাণীকেই প্রমাণিত করে—'Bengal united is a power; Bengal divided will pull in several different ways.'

আমাদের জাতিগত অকৃতার্থতার, অকৃতকার্যতার নমুনা দেখে এই পরলোকগত সাম্রাজ্যবাদীদের বিদেহী আত্মারা নিশ্চয়ই অট্টহাস্য করছে। অট্টহাস্য করছেন কার্জন ও উইনস্টন চার্চিল। আমাদের বিভক্ত ও খন্ডিত করে আমাদের শক্তিনাশ করার স্বপ্ন তাঁদের ফলবতী হয়েছে! আনন্দ তো তাঁরা করবেনই!

ভারত মহাদেশের মিলন ও একীকরণ

নানাদিক পর্যালোচনা করে আমার অন্তত মনে হয় যে, বাংলা তথা ভারতের উজ্জীবনের ক্ষেত্রে এই উপমহাদেশের মিলন ও একীকরণ একান্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি বহু বছর ইংল্যাণ্ডে কাটিয়েছি। একটা জিনিস লক্ষ করতাম যে, ইংরেজদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা কঠিন হলেও, বাংলাদেশি বা পাকিস্তানিদের সঙ্গে অতি সহজে খাতির, আলাপ পরিচয় হয়ে যেত। মনে হত যেন প্রবাসে নিজের ভাইয়ের সংস্পর্শে এসেছি। যেন কোনো নিগূঢ় আত্মিক বন্ধনে এই উপমহাদেশের মানুষ জড়িত হয়ে রয়েছেন।

জহরলাল নেহরুর The Discovery of India গ্রন্থেও এই উপলব্ধির সমর্থন পাই। ভারত উপমহাদেশের অসাধারণ বৈচিত্র্য নেহরু স্বীকার করেছেন :

The diversity of India is tremedous; it is obvious; it lies on the surface and anybody can see it....There is little in common, to outward seeming, between the Pathan of the North-West and the Tamil in the far South.

কিন্তু নেহরু এটাও অস্বীকার করেন নি:

Some kind of a dream of unity has occupied the mind of India since the dawn of civilization....At almost any time in recorded history an Indian would have felt more or less at home in any part of India, and would have felt as a stranger and alien in any other country.

নেহরু The Discovery of India অবশ্য স্বাধীনতা-প্রাপ্তির পূর্বে লিখেছেন। কিন্তু স্বাধীনতা-প্রাপ্তি ও ভারত উপমহাদেশের বিভক্তিকরণের পরেও এই মূলগত সত্য যে বাতিল হয়নি, আমার বিদেশের অভিজ্ঞতা তারই সাক্ষী।

আরেকটা কথাও এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। আমি কোন একীকৃত ভারত চাইছি? আমি কি এমন সংযুক্তি কল্পনা করছি, যেখানে আপামর ভারতীয় জনতা বলিউডি স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকবে? শাহরুখ খান বড়ো না অমিতাভ বচ্চন বড়ো— এই সান্ধ্য তর্কে উত্তাল হবে? হিন্দি গানের তালে তালে টুইস্ট নেচে এবং বছরে একবার ‘জানা গানা মানা’ গেয়ে রবীন্দ্রনাথ ট্যাগোরকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে ভারতীয়ত্ব ঘোষণা করবে?

আমি চাইছি, ভারতের সমস্ত প্রদেশ তাদের অপরিসীম সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়েই সংযুক্ত হোক। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল যেমন থাকবেন, তেমনই থাকবেন সুব্রহ্মনিয়া ভারতী, ভাল্লাথোল বা ইকবাল। ভারতের এই অপরিসীম বৈচিত্র্য তার ইতিহাসেই নিহিত আছে। নানা কারণে ভারতবর্ষে মহাচিনের মতো দীর্ঘস্থায়ী কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা ছিল না। সেজন্য ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের সংস্কৃতি স্বকীয়তার দীপ্তিতে উজ্জ্বল। সে কারণেই রাষ্ট্রকূটদের আমলে ইলোরায় অনুপম ভাস্কর্য খোদিত হয়েছিল। চোলেদের আমলে তৈরি হয়েছিল মাদুরাই-এর মীনাক্ষ্মী মন্দির। গঙ্গা রাজবংশের রাজত্বে নির্মিত হয়েছিল কোনারক। এই বৈচিত্র্য আমাদের শক্তি। এই বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে অখন্ড ভারতীয়ত্বের বৈশিষ্ট্যবিহীন ঘ্যাঁট পাকানো আমাদের জাতীয়তার লক্ষ্য হতে পারে না। অবশ্য, এই প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথাও স্মরণীয়। ভারত উপমহাদেশে আঞ্চলিক সংস্কৃতির সমৃদ্ধি ঘটেছে সমগ্র ভারতের আবহমান কৃষ্টির থেকেই প্রাণরস শোষণ করে। সে ঋণ অশেষ। উদাহরণস্বরূপ, বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদ রবীন্দ্রসংগীতের উল্লেখ করা যায়। হিন্দুস্থানি মার্গসংগীতের সুরের ঐশ্বর্যের সঙ্গে কালজয়ী বাণীর সংমিশ্রণ ঘটিয়েই এই অপূর্ব সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। বাল্যে ও কৈশোরে কবি যদি হিন্দুস্থানি কালোয়াতি গান নিয়মিত না শুনতেন, তাহলে এরকম সুরসংযোগ করা পারতেন কিনা সন্দেহ।

তাছাড়া, জবরদস্ত কেন্দ্রের শাসন প্রদেশগুলোর পক্ষে কল্যাণকর না হতে পারে। আকবরের বঙ্গবিজয়ে বাঙালির দুরবস্থার আক্ষেপ বঙ্কিম নিজেই করে গেছেন। অশোকের কলিঙ্গবিজয়ে কলিঙ্গবাসীর কোনো লাভ হয়েছিল কিনা, তা-ও তর্কসাপেক্ষ। অর্থাৎ, ইতিহাসের যে স্বল্পস্থায়ী সময়গুলো আমাদের দেশে স্বর্ণযুগ বলে প্রচারিত হয়, যেমন, অশোক, চন্দ্রগুপ্ত, আকবর প্রমুখ—যে আমলে কেন্দ্রীয় শক্তি সারা আর্যাবর্তে প্রসারিত হয়েছিল, সেই আধিপত্য অঙ্গরাজ্যগুলোর সার্বিক আর্থিক বা সাংস্কৃতিক কল্যাণসাধন করেছিল কিনা, সেটাও বিচার্য বিষয়।

গোরা উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

একটা আলো চাই। উজ্জ্বল আলো, সুন্দর আলো! যেন আর সমস্ত উপকরণ প্রস্তুত আছে, যেন হীরামানিক, সোনারূপা দুর্মূল্য নয়, যেন লৌহ, বস্ত্র, বর্ম, চর্ম, দুর্লভ নয়—কেবল আশা ও সান্ত্বনায় উদ্ভাসিত স্নিগ্ধসুন্দর অরুণরাগমন্ডিত আলো কোথায়?

গোরা সে আলো সুচরিতার প্রেমের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল।

আমাদের জীবনের এই তিমিরবিনাশী আলো দুই বাংলার একীকরণ এবং বিভক্ত সমগ্র ভারত উপমহাদেশের সংযুক্তির মধ্যে লুকিয়ে আছে। সেটা সম্ভব হলে আসবে এক আশ্চর্য উদ্ভাস, এক অত্যাশ্চর্য উত্তরণ। যে সমস্যাগুলোকে আমরা আজ বড়ো বলে মনে করছি—সাম্প্রদায়িকতা, অশিক্ষা, অস্বাস্থ্য, পশ্চাৎপদতা—তা মিলনের মহামন্ত্রে উধাও হয়ে মিলিয়ে যাবে।

মনে রাখতে হবে যে, ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং তৎপরবর্তী মুসলিম লিগের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ বাংলার মাটিতেই প্রথমে সযত্নে রোপিত হয়েছিল। সেই বিষবৃক্ষ উৎপাটনে বাঙালিকেই অগ্রণী হতে হবে। যদি দুই বঙ্গের সংযুক্তিকরণ ঘটানো যায় কোনো উপায়ে, তাহলেই সেটা সম্ভব।

শক্তির পথ না প্রেমের পথ?

শক্তির পথে এই সংযুক্তি সম্ভব হতে পারে। সেটা হবে বিসমার্কের Blood and Iron নীতির ফলিত প্রয়োগ। এই পদ্ধতিতে, বিসমার্ক প্রুশিয়ার অজেয় সৈন্যবাহিনীর সহায়তায় একের পর এক যুদ্ধ জিতে জার্মানির ঐক্যসাধন করেন। কিন্তু এই বিসমার্কীয় সিদ্ধিই পরে ব্যর্থতার কারণ হয়। যে সাম্রাজ্যবাদী জয়লিপ্সা তিনি জাতির মধ্যে সঞ্চারিত করলেন, তা পর পর দুটো বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবীব্যাপী মারণযজ্ঞের সূচনা করল। পরিশেষে হিটলারের বিধ্বস্ত বার্লিনে জার্মানির সমরলব্ধ ঐক্য অন্তত অর্ধশতাব্দীর জন্য বিলয়প্রাপ্ত হল। বিসমার্কীয় কীর্তি নিমজ্জিত হল অতল সাগরে। লক্ষণীয়, অর্ধশতাব্দী পরে জার্মানি যখন তার বহু বাঞ্ছিত ঐক্য ফিরে পেল, তা এল শক্তির পথে নয়; এল প্রেমের পথে, মৈত্রীর পথে, ভালোবাসার পথে।

যদি ধ্বংসের আগুনে আর ভ্রাতৃহত্যার রক্তপঙ্কশয্যায় আমাদের দেশকে আমরা ভাগ করে থাকি, তাহলে তার একীকরণ করতে হবে মহত্বের পথে, প্রেমের পথে, শান্তির পথে—চৈতন্যদেবের প্রেমপন্থায়, গান্ধীজির অহিংসায়, রবীন্দ্রনাথের রাখিবন্ধনে। আস্থা রাখতে হবে গণতান্ত্রিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতায়। কোনো স্বাধীন দেশ স্বেচ্ছায় তার অর্জিত স্বাধীনতা ছেড়ে দিল্লির তাঁবেদার বা অন্নদাস হতে চাইবে না। আমাদের ঐক্য হতে হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুসারী— যেখানে বাঙালি, পঞ্জাবি, তামিল, তেলেগু, মারাঠি প্রভৃতি সমস্ত জাতিসত্তা স্বাধীন, পূর্ণ বিকাশের অধিকার পাবে।

ইউরোপের এই বিবদমান জাতিগুলো যদি তাদের সহস্রাব্দ প্রাচীন যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস বিস্মৃত হয়ে পারস্পরিক সীমানা বিলুপ্ত করে ফেলতে পারে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যেকার সীমানাও বিলুপ্ত হবে না কেন? কেন বাঙালিকে তার নিজের দেশে যেতে ভিসা দরকার হবে? যেভাবে আমরা অনায়াসে কলকাতা থেকে দিল্লি যাই, সেভাবেই যেন যেতে পারি ঢাকায়, চট্টগ্রামে। যেভাবে জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের আতিথ্য গ্রহণ করতেন শিলাইদহে, সেভাবেই যেন একদৌড়ে কলকাতা থেকে গিয়ে ভাসতে পারি পদ্মার বুকে। একজন বাংলাদেশিও তেমনই আসুন দার্জিলিং-এ, শান্তিনিকেতনে, দিঘায়। উগ্রপন্থীরা অনুপ্রবেশ করবে? চাইলে তারা এমনিতেও করবে। প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাবিহীন হাজার হাজার মাইল সীমান্ত শুধু কাঁটাতারের বেড়া আর প্রযুক্তি দিয়ে ঘিরে রাখা যায় না।

কে করতে পারে এই কাজ?

ছোটোবেলায় স্যার গ্যালাহাডের উপাখ্যান পড়েছিলাম। খ্রিস্টানদের ‘হোলি গ্রেইল’ বা পবিত্র পাত্র সন্ধানের ভার পড়েছিল স্যার গ্যালাহাডের উপর। রাজা আর্থারের রাউণ্ড টেবলের নাইটদের মধ্যে তিনিই ছিলেন মহত্তম এবং পবিত্রতম।

বাঙালির জাতীয় জীবনের ‘হোলি গ্রেইল’ বা পবিত্র পাত্র হল দুই বঙ্গের ঐক্যসাধন—আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মহত্তম ও নিষ্পাপ প্রতিভূরাই এই কাজে অগ্রণী হতে পারে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের দুর্জয় ছাত্রসমাজের ওপর আমার অনেক আশা। এই আত্মত্যাগী তরুণরা বিজ্ঞের মতো তর্ক করেনি, প্রবীণের মতো ঘরে বসে পুঁথি আওড়ায়নি। তারা কাজ করেছে, ইচ্ছা করেছে এবং আদর্শের জন্য নি:শেষে প্রাণ দিতে পরা'খ হয়নি। তাদেরই আত্মত্যাগে একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন সফল হয়েছে। তাদেরই রক্তস্রোতে স্নাত হয়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বারংবার সামরিক অভ্যুত্থান বিড়ম্বিত বাংলাদেশে গণতন্ত্রও এনেছে তারাই। সর্বশেষ শাহবাগ আন্দোলনেও তাদেরই উজ্জ্বল উপস্থিতি।

আমি স্বপ্ন দেখি যে, দুই বাংলার ছাত্রসমাজ রবীন্দ্রনাথের রাখিসংগীত ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ গাইতে গাইতে পারস্পরিক সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের হাতে রাখি আর ফুলের মালা। প্রেমের শক্তিতে চুর চুর হয়ে ভেঙে পড়ছে মধ্যের অপ্রাসঙ্গিক বিভেদরেখা, ঠিক যেভাবে দু-দশক আগে পতন ঘটেছিল বার্লিন প্রাচীরের।

দিবাস্বপ্ন? কল্পনা? খোয়াব?

আমি সবিনয়ে বলব যে, ইতিহাসের শেষ হাসিটা সচরাচর কবি-সাহিত্যিকরাই হেসে থাকেন, কেজো, সবজান্তা রাজনীতিকরা নন। স্বপ্ন অনেক সময়ই সত্যি হয়ে ওঠে।

_____________________

* এই উপন্যাসের অন্যতম প্রেরণাদাতা শুভঙ্কর চির কুয়াশার দেশে-র পান্ডুলিপি পড়ে আমায় জিগ্যেস করেছিল— ‘স্যার, দেশভাগ সম্বন্ধে আপনি কী মনে করেন?’ শুভঙ্করের প্রশ্নের উত্তর দিতে এই প্রবন্ধটা লিখেছিলাম। জানি না, একটা ফ্যান্টাসি-স্যাটায়ারধর্মী লেখার সঙ্গে এই গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ খাপ খাবে কিনা। এ বিষয়ে আমার নিজেরই সংশয় রয়েছে। যাই হোক, শুভঙ্করের বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা রেখে এই প্রবন্ধ সংযুক্ত করছি।

অধ্যায় ৩৫ / ৩৫
সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%