সৌম্য ভট্টাচার্য
শিমুল, পারুল, আম, জাম, বট, অশ্বত্থ— সব গাছে একই ইস্তাহার। কুয়াশার মধ্যে গাছের ডালে ডালে দুলতে থাকা সাদা সাদা কাগজগুলো যেন দাঁত খিঁচিয়ে তাদের ভয় দেখাচ্ছে।
—ডোরাদিদি! ডোনাদিদি! মিতুলদিদি!
নীলুর চাপা গলার চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল সবার।
—কী হয়েছে রে, নীলু?
—হোয়ার্টস আপ?
চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল বাকি তিনজন।
—আমাদের ভীষণ বিপদ!
—কীসের বিপদ?
—লুক অ্যাট দিস!
নীলুর কথামতো বাকি তিনজনেই ইস্তাহারটা পড়ল। পড়ে তো তাদের চক্ষু চড়কগাছ।
—সে কী রে! এরা কি আমাদের কথা বলছে?
—তাই তো মনে হয়?
—কী করবি? পালাবি? প্যাঁচাটা ঠিকই বলেছিল কাল রাতে।
তাদের চারপাশে পাক খাচ্ছে কুয়াশা। ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুর খুব শীত করতে লাগল। খিদেও পেল যথেষ্ট। ঘুম থেকে উঠেই প্রতিদিন ব্রেকফাস্ট খাওয়ার অভ্যাস তাদের। ডোরা-ডোনা তো আবার প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করে। ভোর পৌনে সাতটায় কাঁটায় কাঁটায় তাদের স্কুলবাস চলে আসে।
হঠাৎ তাদের পেছন থেকে খুব নরম গলায় কে যেন বলল,
‘বাচ্চারা, তোমরা ভয় পেয়েচ? খিদে পেয়েচে তোমাদের?’
ডোনা ঘুরে দেখল যে, বেশ পুরুষ্টু একটা ভোঁদড় ল্যাজের ওপর ভর দিয়ে তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ভোঁদড় হলেও মুখটা ভালোমানুষি মাখা।
ডোরা, ডোনা, নীলুকে সে দন্ডবৎ হয়ে প্রণাম করল।
—সুষমা আমাকে তোমাদের কথা বলে গ্যাচে। দূর দেশ থেকে ছোটো ছোটো বাচ্চারা তোমরা এয়েচ।
ভোঁদড়টার আচার, ব্যবহার, কথাবার্তায় এমন কিছু ছিল, যাতে বাচ্চারা একটু ভরসা পেল।
ইস্তাহারটার দিকে আঙুল দেখাল নীলু—‘এটা কে লিখেছে?’
ভোঁদড়টা লেজের ওপর ভর দিয়ে ইস্তাহারটা একবার দেখল।
—গতকাল খোক্কোসের সর্দার এসে এই তল্লাটে সব গাচে এই কাগজ সেঁটে গ্যাচে। ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে ঘোষণাও করে গ্যাচে।
—এরা কী আমাদের কথা বলছে?
—হ্যাঁ, তোমাদের কতা। তোমাদের কতাই তো বোলচে বলে মনে হয়।
বলতে বলতে ভোঁদড়টা বেশ অস্থির হয়ে উঠল।
—বাচ্চারা, তোমরা সাংঘাতিক বিপদের মধ্যে আচ। আমি ওদের গন্ধ পাচ্চি। ওরা আসচে।
—কারা?
—তোমাদের যারা ধরতে চায়। শিগগির তোমরা আমার সাথে এসো। দেরি কোরো না, আমাদের হাতে সময় নেই।
দূরে কারো পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। একটা অদ্ভুত আওয়াজ থেকে থেকে ভেসে উঠছে। সাপের ফোঁস-ফোঁস, বেড়ালের মিউ-মিউ আর হায়নার হাসি একসঙ্গে মিললে যে ভয়াল, ভৌতিক শব্দের সৃষ্টি হয়, তাই যেন মাঝে মাঝে তল্লাটটাকে আতঙ্কিত করে তুলছে। ভোঁদড়টা কান খাড়া করে শুনতে শুনতে শিউরে উঠল।
—খোক্কোস আর কালাপাহাড়! অন্ধকারের জীবেরা সব দিনের আলোয় বেরিয়েচে গো! বাচ্চারা দেরি কোরো না। তোমরা আমার পেচু পেচু চলে এসো।
বলেই সে মিলিয়ে গেল ঘন ঝোপের মধ্যে।
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুও ভোঁদড়টার পেছন পেছন চলল।
ঘন ঝোপের মধ্যে দিয়ে সুঁড়িপথ। এঁকে বেঁকে সেই পথ নদীর ধারে গিয়ে একটু উজানে পৌঁছেছে।
চলতে চলতে ডোনা বলে উঠল—‘উঃ’!
—কী হল ডোনা?
—কাঁটার খোঁচা খেলাম, ডোরাদিদি।
এরপর ডোরা, মিতুল, নীলুও পর্যায়ক্রমে ‘উঃ! উঃ!’ করতে লাগল।
ভোঁদড়টা থেমে গিয়ে বলল, ‘এটা শেয়ালকাঁটার জঙ্গল। বাচ্চারা একটু-আধটু খোঁচা খাবে। কিচু মনে কোরো না, ভাই! এ ছাড়া পথ ছিল না।’
নদীটা এখানে একটু পাড়ের ভেতরে ঢুকে এসেছে। যেন শান্ত, ছোট্ট একটু পুকুর। সেই ঢালু পাড় বেয়ে ভোঁদড়টা দ্রুত নেমে চলল। একটা বড়ো-সড়ো পাথর পাড় থেকে উঠে অনেকটা জলের ওপর বেরিয়ে রয়েছে। নদীর জলে তার কালো ছায়া পড়েছে। সেই পাথরের কাছে এসে ভোঁদড়টা চাপা গলায় বলল, ‘এসো এসো, বাচ্চারা! ঢুকে পড়ো!’
ঢুকে পড়ো! —ডোরা, ডোনারা অবাক হয়ে গেল। কোথায় ঢুকবে? কীভাবে ঢুকবে?
ভোঁদড় অবশ্য চুপ করে বসে নেই। নখ দিয়ে পাথরের নীচের জায়গাটা আঁচড়াচ্ছে, ল্যাজ দিয়ে ধুলো ওড়াচ্ছে। দেখতে দেখতে একটা কাঠের পাল্লা দেওয়া সুড়ঙ্গের মুখ ফুটে উঠল। ভোঁদড়টা খুট খুট কিছু করতেই পাল্লাটা হুট করে খুলে গেল। তার নীচে অন্ধকার কালো গর্ত হাঁ করে আছে।
ল্যাজ তুলে ভোঁদড় বলল, ‘বাচ্চারা এসো! এসো! এসো! দেরি কোরো না!’
ভোঁদড়টার কথাবার্তা, আচার-আচরণে এমন কিছু ছিল, যা ডোরা-ডোনাদের বিশ্বাস আকর্ষণ করল। সকালটা তাদের কাছে বিভীষিকার মতো কেটেছে। একদিকে গাছের ডালে ডালে দোলানো ইস্তাহার। অন্যদিকে দূরাগত রহস্যময় শব্দ। কুয়াশা ভেদ করে সে আওয়াজ তাদের প্রাণ কাঁপিয়ে দিচ্ছে—সাপের ফোঁস-ফোঁস, বেড়ালের মিউ-মিউ, হায়নার হাসি একসঙ্গে মিললে যে ভয়াবহ শব্দের জন্ম হয়, সেই শব্দ যেন তাদের ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলছে।
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু তাই আর অপেক্ষা করল না। খোলা গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ল একে একে। সবার শেষে ভোঁদড়টা ঢুকেই ল্যাজ দিয়ে কাঠের পাল্লাটা ফেলে দিল। খুট করে পাল্লাটা বন্ধও করে দিল সে।
নিকষ কালো অন্ধকার। তার মধ্যে চিমসে মেছো গন্ধ।
ডোনা দিদিকে চিমটি কাটল, ‘ডোরাদিদি, এ আমরা কোথায় এলাম?’
—লেটস ওয়েট অ্যাণ্ড ওয়াচ।
—উই আর হ্যাভিং আ নাইস হলিডে!
দুই বোন যখন ফিস ফিস করছে, ভোঁদড় তখন ফস করে একটা মোমবাতি জ্বালিয়েছে।
—বাচ্চারা! অন্ধকারে, গন্ধে তোমাদের কষ্ট হচ্চে, তাই না? চলো! চলো! তোমাদের এর চেয়ে অনেক ভালো জায়গায় নিয়ে যাব।
মোমবাতি ল্যাজে গুঁজে, সেই ল্যাজ পতাকার মতো খাড়া করে ভোঁদড় অন্ধকার সুড়ঙ্গ বেয়ে এগোতে লাগল। তার পেছন পেছন চার বাচ্চা।
পথটা অনেক দূর এঁকে-বেঁকে গিয়েছে। কখনো চড়াই, কখনো উতরাই। উতরাই-ই বেশি। ডোরা-ডোনার মনে হল তারা যেন অনেকটা নেমে যাচ্ছে পাতালের মধ্যে। সুড়ঙ্গটা ভীষণ স্যাঁৎসেঁতে। জায়গায় জায়গায় ছাদ বা দেওয়াল থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে জল পড়ছে। পায়ের তলাটা কাদা-কাদা, আঠালো। এ ছাড়া প্রবল মেছো গন্ধ তো আছেই।

ভোঁদড় হলেও মুখটা ভালোমানুষি মাথা।
নাকে রুমাল চেপে বাচ্চারা প্রাণপণে ভোঁদড়কে অনুসরণ করতে লাগল। ভোঁদড়টা এদিকে লাফাতে লাফাতে চলেছে। তার ল্যাজের ডগায় ঝুলতে থাকা মোমবাতির শিখা অল্প হলেও পথটাকে আলো দিচ্ছে।
অনেকক্ষণ চলে তারা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তখনই সরু সুড়ঙ্গটা চওড়া হয়ে গেল। দেওয়ালে, আরেকটা কাঠের পাল্লা। ভোঁদড় খুটুশ খুটুশ করে সে পাল্লাটাও খুলে ফেলল, তারপর দন্ডবৎ হয়ে প্রণাম করে বলল, ‘বাচ্চারা, আহা কী কষ্টই না তোমাদের দিলাম। এসো, এই আমার ঘর।’
ছোট্ট গর্ত দিয়ে সাবধানে, মাথা বাঁচিয়ে ঢুকে ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু তো অবাক। তারা বড়ো-সড়ো একটা ড্রয়িংরুম-এর মতো জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। ড্রয়িংরুম-টা বেশ সাজানো। অনেকগুলো বেতের চেয়ার। একটা ছোট্ট টেবিলও রয়েছে মাঝখানে। একটা চেয়ারে এক বুড়ি-ভোঁদড় শুয়ে শুয়ে নাক ডাকাচ্ছে। তিনটে ভোঁদড় ছানা ঘরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ভোঁদড়কে ঢুকতে দেখে তারা ‘বাবা’, ‘বাবা’ করে অনেক সোহাগ জানাতে লাগল। কেউ বাবার মাথায় বিলি কাটে, কেউ পিঠ চুলকে দেয়, কেউ ল্যাজ ধরে ঝুলতে থাকে।
তাদের আদরে অতিষ্ঠ হয়ে বাবা ভোঁদড় বলল, ‘ওরে থাম! থাম! ঘরে অতিথি এয়েচে। তাদের খাওয়াবি চল।’
অতিথিদের কথা শুনে ভোঁদড় ছানারা ল্যাজে ভর দিয়ে উঠে অবাক চোখে চেয়ে রইল।
ভোঁদড় হাঁক দিল, ‘গিন্নি, বলি মাচ-টাচ কিচু আছে? অতিথি এয়েচে ঘরে।’
‘মাচ-টাচ কিছু নেই গো। সকালে বাচ্চারা সব শেষ করেচে।’ সরু গলায় জবাব এল।
‘রাক্কোস! সব রাক্কোস জুটেচে!’ ভোঁদড় রাগত গলায় বলল, ‘খালি খাই-খাই!’
এর মধ্যে ভোঁদড়গিন্নি ঘরে ঢুকেছে। তার গায়ের অ্যাপ্রনে হলুদের ছোপ। মুখ থেকে ঘাম ঝরছে। বোঝা-ই যায়, সে রান্নায় ব্যস্ত ছিল।
—এ কাদের নিয়ে এলে গো? আহা কী সুন্দর সুন্দর ছেলে-মেয়ে? এরা কাদের বাছা? বোসো বোসো, বাবারা। আরাম করো। চা করে দিই?
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু পরম আপ্যায়িত হয়ে বেতের চেয়ারে বসে পড়ল। সামনের দেয়ালটা স্বচ্ছ কাচের স্ক্রিনের মতো। সেখান থেকে নদীর তলাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অনেকটা অ্যাকোরিয়ামের কাচের মধ্য দিয়ে চেয়ে দেখার মতো।
ডোরা বলল, ‘ফ্যাবুলাস!’
ডোনা বলল, ‘ডোরাদিদি, ইট রিমাইণ্ডস মি অব সামথিং।’
—ঠিক বলেছিস, ডোনা! ইট ইজ লাইক দ্য ওয়াটার ওয়ার্ল্ড!
ছোটোবেলায়, বিলেতে থাকতে, বাবা-মা-র সঙ্গে তারা এ রকম অ্যাকোয়ারিয়াম দেখেছে। কাচ ঘেরা সেই বিশাল চৌবাচ্চায় খেলে বেড়ায় হাঙর, পিরানহা প্রভৃতি মাছ। লোকে পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে হাঙরদের নানান কীর্তিকলাপ দেখে।
এখানে সেই কাচের মতো স্বচ্ছ স্ক্রিন দিয়ে নদীর তলাটা দেখতে দেখতে ডোরা-ডোনাদের বিলেতের কথা মনে পড়ে গেল। মিতুল, নীলুও অবাক হয়ে দেখছে। ভোঁদড় গিন্নি এর মধ্যে ছোটো ছোটো চারটে কাপে ধোঁয়া ওঠা চা আর বিস্কুট রেখে গেছে। কাচের স্ক্রিনের মধ্যে দিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে আছে বাচ্চারা। তাদের সামনে গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের বাষ্প। বিস্কুটগুলো বেশ খেতে— নোনতা-মিষ্টি, চা-টাও বেশ মজাদার। নদীর যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তা বিলেতের অ্যাকোরিয়ামের মতো নয়। ঘোলা জল, সেখানে মাঝে মাঝে চাঞ্চল্য জাগছে। ছোটো-বড়ো বেশ কিছু মাছ খেলে বেড়াচ্ছে। সাপের মতো সরসরিয়ে কী একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে গেল। একটা কাছিম দেখা গেল— নদীর তলার মাটিতে গুটিশুটি মেরে লতাপাতা খাচ্ছে।
হঠাৎই ভোঁদড় আর তার তিন ছানাকে দেখতে পাওয়া গেল। কোন ফাঁকে তারা নদীতে নেমেছে। মাছের একটা ঝাঁকের মধ্যে খপাৎ খপাৎ করে লাফাতে লাফাতে মাছ ধরছে। ধরছে আর একটা বস্তায় পুরছে।
ভোঁদড়গিন্নি এর মধ্যে মুখ-টুখ মুছে, হাত ধুয়ে, ফিটফাট হয়ে ড্রইংরুমে এসে বসেছে। স্বামী ও তিন সন্তানের কীর্তিকলাপ দেখছে একমনে।
সে বলল, ‘সনাতনের বড়ো কষ্ট।’
—সনাতন কে?
—কেন আমার সোয়ামি গো, যে তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এল।
—তোমার ছেলেদের নাম কী?
—আহা! তিন তিনটে হিরের টুকরো ছেলে—হ্যাংলা, ল্যাংড়া আর খাই-খাই।
নাম শুনে ডোরা-ডোনাদের হাসি পেয়ে গেল।
‘হ্যাংলা আর খাই-খাইটার খিদে একটু বেশি। বেচারা ল্যাংড়াটাকে নিয়েই আমার চিন্তা,’ ভোঁদড়-গিন্নি বলে চলল।
ভোঁদড় ছানাদের একজন একটু খুঁড়িয়ে চলে। তারই নাম সম্ভবত ল্যাংড়া।
—ল্যাংড়ার কী হয়েছে?
মিতুলের প্রশ্ন শুনে রাগে ভোঁদড়গিন্নির চোখে আগুন ঠিকরোতে লাগল। ল্যাজের রোম খাড়া হয়ে উঠল।
ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘শয়তান শেয়াল পন্ডিত!’
—শেয়াল পন্ডিত?
—হ্যাঁ গো, ভেকধারী পন্ডিত। বাচ্চাদের পাঠশালা খুলে পন্ডিতি করত। পন্ডিতি তো নামেই। আসলে কুমিরছানা, ভোঁদড় ছানা ধরে ধরে খাবার মতলব। আমাদের পড়শি দেঁতো কুমির। আহা, তার সাত-সাতটা ছানাকে খেয়ে নিলে গো? কোনো মায়াদয়া নেই।
—সেই কি ল্যাংড়াকে খেতে গেছিল?
—হ্যাঁ। ‘আয় তোকে আঁক শেখাই’ বলে ডেকে নিয়ে ল্যাংড়ার ঠ্যাঙে কামড় দিয়েছে। নেহাৎ ল্যাংড়া আমার চালাক ছেলে। হাত ফসকে জলে নেমে চম্পট দিয়েছে। কিন্তু পা-টা সেই থেকে খুঁতো।
—তোমরা কিছু করলে না?
—সনাতন, আমার বর, শেয়াল পন্ডিতের খোঁজে গেছিল। কিন্তু সে এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। খোক্কোসদের সভাপন্ডিত হয়ে বসে আছে। তার ভীষণ প্রতাপ।
—খোক্কোস, খোক্কোস—এই কথাটা খুব শুনেছি। খোক্কোসরা কারা?
ভোঁদড়-গিন্নি উত্তর দিতে যাচ্ছিল। এর মধ্যে সনাতন ও তার তিন ছেলে এক বস্তা মাছ নিয়ে ফিরে এল। খিড়কির দরজা দিয়ে তারা জলে নেমেছিল, সেই পথেই ফিরে আসা।
ফিরেই সনাতন হ্যাংলাকে এক চাঁটি কষাল, ‘রাক্কোস! অতিথিদের দু-দুটো মাচ সাবাড় করেচিস?’
বাবার চাঁটি খেয়ে হ্যাংলা মুখ নীচু করে গোমরা মুখে বসে রইল।
‘গিন্নি! ভালো তোপসে মাচ পেয়ে গেলাম গো। গরম গরম ভাজো তো।’
তোপসে মাছের কথায় ভোঁদড়গিন্নি উল্লসিত হয়ে লাফাতে লাফাতে রান্নাঘরে ছুটল।
গরম গরম টাটকা তোপসে মাছ ভাজা। আহা! যেন অমৃত! ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু তো খেয়েই চলেছে। খাচ্ছে আর ভোঁদড়গিন্নি প্লেটে করে বারে বারে দিয়ে যাচ্ছে।
সনাতন মেঝেতে শুয়ে একটু গা শুকিয়ে নিচ্ছিল। তিন ছেলে খুব বাধ্য হয়ে গুটিশুটি মেরে, কেউ বাবার বগলের তলায়, কেউ ঠ্যাঙের ফাঁকে আশ্রয় নিয়েছে।
খোক্কোস কারা? —এই প্রশ্নের জবাবে সনাতন বলল, ‘আমি তো জন্ম ইস্তক দেখচি যে, এদেশে মানুষের বদলে খোক্কোসেরই রাজত্ব। খোক্কোসরা হল মানুষ আর রাক্ষসের মাঝামাঝি জীব। দেখতে অনেকটা মানুষের মতো, চট করে তফাত করা যায় না, কিন্তু আচার-আচরণ একদম রাক্ষসদের মতো গো।’
—তাদের দেখতে কীরকম?
—মানুষের মতোই। একই রকম চালচলন, হাবভাব। তবে বুক আর গলা নীল বন্ন। সেটা ঢাকতে সবসময় জামা, কোট, মাফলার পরে থাকে।
—নীল রঙের? কেন?
—বিষে গো, বিষে! এক খ্যানখেনে গলা শোনা গেল।
চেয়ারে শোয়া বুড়ি-ভোঁদড়ের ঘুম ভেঙেছে, ‘শ্বেতরাক্কোসের বিষে!’
পেট ভরতি তোপসে মাছ ভাজা খেয়ে বেতের চেয়ারে বসেছে চারজন। সনাতন, তার ছানাপোনা, ভোঁদড়-গিন্নি, বুড়ি ভোঁদড়ও খাওয়া-দাওয়া সেরেছে। সনাতন আরামে ঘরের মেঝেতে শুয়ে। ভোঁদড় গিন্নি তার চুলে বিলি কাটছে। কাচের স্ক্রিন দিয়ে দেখা যাচ্ছে নানারকম মাছের খেলা। ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু ঘন আরামে ভোঁদড়-বুড়ির গল্প শুনতে লাগল।
—এই যে দেশ দেকচো, এ কি আর দেশ আছে? এ তো শ্মশান! সোনার বাংলা শ্মশান হয়ে গ্যাচে!
—কেন?
সনাতনের মা, বুড়ি-ভোঁদড়, উদাস হয়ে গেল।
—এই বাংলা এককালে কী বাংলাই না ছিল! খেতে খেতে সোনার ধান ঝলমল করত গো। বারোমাসে ছিল তেরো পার্বণ। জলে খেলে বেড়াত মাচ। গোয়ালে দুধেল গাই। গাচে অঢেল ফল-ফুল। লোকে সুখে ছিল গো। আমরা ভোঁদড়রাই কত ভালো ছিলাম!
—তারপর?
—কোন দূর দেশ থেকে শ্বেতরাক্কোস এসে দেশটা দখল করল। দেশের বুকের ওপর বসে তার রক্ত চুষতে লাগল। দেশটা শ্মশান হয়ে গেল গো।
—তারপর কী হল?
—অ্যামন অত্যাচার লোকে কত কাল সইবে বলো দিকি, বাছারা? তারা একসময় জোট বাঁধল শ্বেতরাক্কোসকে তাড়াতে।
—তখন কী হল?
শ্বেতরাক্কোসরা ভারি চালাক। তারা দেশের মানুষের মধ্যে বিষ ছড়িয়ে দিল। মানুষ সেই বিষে নীল হয়ে, বেভ্রম হয়ে পরস্পর মারপিট, কাটাকাটি, হানাহানি করতে লাগল। ভাই ভায়ের বুকে ছুরি বসিয়ে দিতে লাগল। ভায়ে ভায়ে এ লড়াইয়ে কত মানুষ যে মরল, তার ল্যাকাজোকা নেই গো। পথে পথে তকন হাড়ের পাহাড়, হাড়ের জাঙ্গাল। লোকে ঘর ছেড়ে, বসত ছেড়ে উদবাস্তু হয়ে দিগবিদিকে পালিয়ে যেতে লাগল। এল মন্বন্তর।
ডোরা-ডোনারা এতক্ষণ খুব মন দিয়ে ভোঁদড়বুড়ির আখ্যান শুনছিল। এবার ডোনা জিগ্যেস করল, ‘মন্বন্তর কী জিনিস?’
—দেশে খাবার নেই, কারো ঘরে অন্ন নেই, সবখানে হাহাকার।
ডোরা বলল, ‘ডোনা, শি ইজ টকিং অ্যাবাউট আ ফেমিন’।
—সে মন্বন্তরে, দুর্ভিক্কে কত লোক মরল গো—তার কি ঠিকঠিকানা আচে? শুধু লোক কেন? ইঁদুর, বাদুড়, ভোঁদড় সব মরে উজাড় হয়ে গেল। বাংলার ঘরে ঘরে কান্নার রোল উঠল। দেশজুড়ে ডাকিনীযোগিনীর নেত্য চলতে লাগল।
—তা তো হল, কিন্তু খোক্কোসরা এল কীভাবে?
—আসলে শ্বেতরাক্কোসদের নিজেদের দ্বীপে লেগেছিল আগুন। পীতরাক্কোসরা সে দ্বীপ দখল করতে হামলে পড়েছিল। নিজেদের দেশ বাঁচাতে শ্বেতরাক্কোসরা বাংলা ছেড়ে চম্পট দিল। যাবার আগে কিছু মানুষকে অ্যামন বিষ খাওয়াল যে, তারা আর মানুষ রইল না গো। বিষে তাদের বুক আর গলা নীলবন্ন হয়ে গেল। দেখতে যেন মানুষ আর চালচলন যেন রাক্কোসের। সেই খোক্কোসদের হাতে দেশ ছেড়ে শ্বেতরাক্কোসরা নিজেদের দেশে পালিয়ে গেল। আর যাবার আগে শেষ মারটা দিয়ে গেল।
—শেষ মার?
সনাতন এতক্ষণ ঘরের মেঝেতে আরামে শুয়ে গল্প শুনছিল।
‘শেষ মার’-এর কথায় ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। রাগে তার চোখ জ্বলছে।
—বাংলা মা-র বুক শ্বেতরাক্কোসরা ছুরি চালিয়ে দু-ফাল করে দিয়েচে। বাংলা মা-র বুকে ছুরি বসিয়ে শ্বেতরাক্কোসরা নিজেদের দেশে ফিরে গ্যাচে।
—কেউ বাধা দিল না?
—কে বাধা দেবে গো? শ্বেতরাক্কোসরা অ্যামন বিষ ছড়িয়েচে যে, ভায়ে ভায়ে মারপিট, লড়াই, কাজিয়া। ভায়ে ভায়ে যদি মারপিট করে তাহলে মা-কে কে দেখবে? তাই তো দেশে খোক্কোসের রাজত্ব। খোক্কোসরা দেশের বুকে চেপে রক্ত চুষচে। আর দুখিনী বাংলা মা-কে এক গোপন প্রাসাদে বন্দি করে রেখেচে। ছুরির ঘা বুকে নিয়ে মা অ্যাকোনো বেঁচে আচে গো, তবে পরানটা তার ধড়ফর ধড়ফর করচে।
সনাতনের কথা শেষ হতে-না-হতেই বুড়ি ভোঁদড়ের খ্যানখ্যানে গলা শোনা গেল।
—সবখানে বিষ, বাবারা। জলে বিষ, ডাঙায় বিষ, আকাশে বিষ, বাতাসে বিষ। বিষের ধোঁয়ায় চাদ্দিক অন্ধকার। যবে থেকে বাংলা মা-র বুক চিরে দু-ফাল হয়েচে, দেশে খোক্কোসের রাজত্ব হয়েচে, তবে থেকে দেশটা এক ঘন কুয়াশায় ঢেকে গ্যাচে। এ তো আর সোনার বাংলা নেই গো। ধূসর বাংলা হয়ে গ্যাচে।
বলতে বলতেই সনাতনের আস্তানায় ঘন হলুদ ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে গল গল করে ঢুকতে লাগল।
ঘন হলুদ ধোঁয়া, তাতে তীব্র, কটু দুর্গন্ধ।
সনাতন লাফিয়ে উঠল, ‘খোক্কোসরা আমার আস্তানার খোঁজ পেয়েচে গো! বিষের ধোঁয়া ছাড়চে! পালাও, পালাও সব্বাই!’
এ দিকে গল গল করে ধোঁয়া ঢুকছে। নিশ্বাস প্রায় নেওয়া যাচ্ছে না। এমন সময় ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু সেই অদ্ভুত আওয়াজটা শুনতে পেল—সাপের ফোঁস-ফোঁস, বেড়ালের মিউ-মিউ আর হায়নার হাসি একসঙ্গে মিললে যে ভয়াবহ, ভৌতিক শব্দের সৃষ্টি হয়, তা-ই যেন তাদের একদম মাথার ওপর থেকে ভেসে আসছে। সনাতন সেশব্দ শুনে ভয়ে সাদা হয়ে গেল।
একলাফে ল্যাজের ধাক্কায় খিড়কির দরজা খুলে দিল সে। প্রবল জলের স্রোত হু হু করে ঢুকতে লাগল।
সেই জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে সনাতনের গলা শোনা গেল—
—বাচ্চারা, জলে ডুব-সাঁতার দাও! মাথা তুলো না একদম! মাথা তুলো না!
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুকে বলতে হল না। চারজনেই ওস্তাদ সাঁতারু। মাছের মতোই তারা স্বচ্ছন্দে সাঁতার কাটতে পারে।
এদিকে ভোঁদড়গিন্নি, ভোঁদড়বুড়ি, আর তিন ছেলে—হ্যাংলা, ল্যাংড়া আর খাই-খাইও জলে নেমে পড়েছে। যথাসম্ভব নি:শব্দে ডুব-সাঁতার কেটে তারা পালাচ্ছে। পথ দেখিয়ে এগিয়ে চলেছে সনাতন।
খানিকটা গিয়ে মিতুল দম নেওয়ার জন্য মাথা তুলতেই শন শন করে দু-তিনটে তির তার মাথা ঘেঁষে জলে ছপাৎ ছপাৎ শব্দে পড়ল। নৌকোয় বসে থাকা খোক্কোসরা তির ছুড়ছে।
খোক্কোসরা দুটো নৌকোয় এসেছে। সংখ্যায় জনা সাতেক হবে। কেউ মাথা তুললেই তির ছুড়ছে। সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। কিছু পরেই রাত্রি নেমে আসবে। একবার রাত্রি নেমে গেলে ডোরা-ডোনাদের বিপদ বাড়বে, কারণ খোক্কোসরা রাতে বলবান হয়ে ওঠে। প্রায় আধঘণ্টা ধরে খোক্কোসদের সঙ্গে এই লুকোচুরি চলতে লাগল। মাথা তুললেই তির ধেয়ে আসছে। ভাগ্যক্রমে কারো গায়েই চোট-আঘাত লাগল না।
নদী থেকে মাঝে মাঝেই ছোটো ছোটো খাঁড়ি বেরিয়েছে। নানা শাখাপ্রশাখায় নদীটা ছড়ানো। সনাতন তিরবেগে ল্যাজের আন্দোলনে সেরকম একটা ছোট্ট খাঁড়ির মধ্যে ঢুকল। পেছন পেছন বাচ্চারা আর ভোঁদড় পরিবার।
খোক্কোসদের নৌকো ঢুকতে যেতেই এক কান্ড ঘটল। এক প্রকান্ড কুমির খাঁড়ির জলে অপেক্ষা করছিল। ল্যাজের দুই ধাক্কায় খোক্কোসদের নৌকো উলটে দিল সে। খোক্কোসগুলো আকারে বিশেষ বড়ো নয়। ভালো যে সাঁতার কাটতে পারে, তা-ও নয়। হাঁচড়-পাঁচড় করে হাবুডুবু খেতে খেতে সব ক-জনই কুমিরের পেটে গেল। খাঁড়ির জল নীল হয়ে উঠল।
ডোরা-ডোনারা ততক্ষণে কোনোক্রমে পাড়ে উঠেছে। ঘাসের ওপর বসে দম নিচ্ছে আর জলে খোক্কোসদের সঙ্গে কুমিরের অসম লড়াই দেখছে। একটা নয়, দুটো বড়ো-সড়ো কুমির। তারা কপাৎ কপাৎ করে খোক্কোসদের জলখাবার করে ফেলল। মরার আগে খোক্কোসরা বিকট চিৎকার করে উঠল। অনেকটা কুকুরের ঘেউ ঘেউয়ের মতো।
‘ওদের রক্ত নীল কেন?’ জিগ্যেস করল নীলু।
‘বিষে গো, বিষে। ওদের বুক ভর্তি বিষ। সারা শরীরে বিষ।’—জবাব দিল সনাতন।
বিষে কুমিরদের কিছু হল না?
—না, কুমিররা এ বিষ হজম করতে পারে। দেঁতো কুমিরকে আগেই খবর দিয়ে রেখেছিলাম। ওর তো খোক্কোসদের ওপর বিশেষ রাগ।
—কেন?
—আমাদের বনগাঁয়ের শেয়ালরাজা এখন খোক্কোসদের সভাপন্ডিত। সেই তো দেঁতো কুমিরের সাত-সাতটা ছানাকে লেখাপড়া শেখাবার নাম করে সাবাড় করেচে। দেঁতো কুমির খোক্কোসদের রাজদরবারে গেছিল।
—কেন?
—সাত-সাতটা ছানাকে শেয়াল পন্ডিত খেয়েছে, সেই অভিযোগ জানাতে।
—কী হল?
—রাজসভায় শেয়াল পন্ডিতের ভীষণ দাপট। তার কথায় সব্বাই ওঠে-বসে। খোক্কোসরা দেঁতো কুমিরকে দড়ি দিয়ে বেঁধে বেদম মার দিয়েছিল। মেরে মেরে আধমরা করে নদীর চরে ফেলে রেখে গেছিল। খোক্কোসদের ওপর কুমিরের রাগ কি সাধে?
—এ দেশে তাহলে কোনো আইন নেই?
—না, সবই গায়ের জোর। এ হচ্ছে শিবঠাকুরের আপন দেশ। এখানে আইনকানুন সর্বনেশে।
খোক্কোসদের জলখাবার করে কুমির দুটো দুলতে দুলতে নদীর পারে উঠেছে। তাদের দেঁতো মুখে অকৃত্রিম হাসি।
ডোরা, ডোনারা ভয় পেয়ে গেল।
বড়ো কুমিরটা বোধহয় বাচ্চাদের ভয়ের কথা আন্দাজ করেছে। প্রকান্ড হাঁ করে একগাল হাসল সে। তারপর সুর করে বলল—
ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমাদের আমি মারব না
সত্যি বলছি কুস্তি করে তোমাদের সঙ্গে পারব না।
দেঁতো কুমিরের প্রকান্ড হাঁয়ের মধ্যে যেন কেউ একরাশ মুলোর দোকান সাজিয়ে বসেছে। প্রতিটা শ্বাসে বিকট দুর্গন্ধ আসছে। বাচ্চাদের ভয় পাওয়ারই কথা।
কুমিরটা সনাতনের দিকে ফিরেছে, ‘যাক প্রাণে বেঁচেছ তাহলে।’
—হ্যাঁ। খোক্কোসরা বিষের ধোঁয়া ঘরের মধ্যে ছেড়ে দিয়েছিল। তাড়াতাড়ি না পালালে দম আটকে মরতাম।
—এসবই মকররাজের কীর্তি। যক্ষপুরীতে বসে বসে বিষের ধোঁয়া বানাচ্ছে আর ভালো ভালো মানুষজন, পশুপাখিকে মেরে ফেলছে।
নীলু জিগ্যেস করল, ‘মকররাজ কে?’
—খোক্কোসদের রাজা গো, এক বিশাল প্রাসাদ বানিয়েচে সে। তার নাম যক্ষপুরী। বাংলা মা-কে তো সেখানেই বন্দি করে রেখেচে। দেশের সব ধনরত্ন লুঠ হয়ে সেখানে জমচে। মকররাজ মাটির নীচে এক গোপন ঘরে বসে তাল তাল সোনা বানাচ্চে আর দেশের বাইরে সে-সোনা পাচার করচে। দেশে অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, মানুষ খেতে না পেয়ে কাঁদচে আর দেশের সব ধনদৌলত তাল তাল সোনা হয়ে আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসদের দ্বীপে চলে যাচ্ছে। দেশ দেউলে হয়ে যাচ্ছে।
সনাতনের কথা শেষ না হতেই দেঁতো কুমির বলল, ‘মকররাজের সমস্ত শয়তানির এক শাগরেদও জুটেছে। তার কথা বলবে না?
—কে?
—কেন, কালাপাহাড়।
—কালাপাহাড়? সে কে?
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু দেখল যে, কালাপাহাড়ের নাম শুনে সনাতন, তার বউ, বুড়ি মা আর তিন ছেলে ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছে।
কুমির বলল, ‘তোমরা কি কোনো অদ্ভুত আওয়াজ কখনো শুনেছ?’
—কীরকম?
—সাপের ফোঁস ফোঁস, বেড়ালের মিউ মিউ আর হায়নার হাসি একসঙ্গে মিশলে যে শব্দ হয়?
—হ্যাঁ, মাঝে মাঝেই তো শুনছি।
—ওটা হল কালাপাহাড়ের ডাক। ও যখন গন্ধ শুঁকে শুঁকে শিকার ধরতে ছোটে, তখন ওই ডাকটা ছাড়ে।
—কালাপাহাড় কে?
—এক ভয়ংকর দানব।
—দেখতে কেমন তাকে?
—কেউ ভালো করে জানে না।
—কেন?
—ওর আওয়াজ শুনেই ভয়ে সবার প্রাণ উড়ে যায়। তারপর যেখানে ও যায়, ওর আগে আগে একটা বিশাল কালো ছায়া গিয়ে সব কিছু ঢেকে ফেলে। সে-ছায়ায় ভালো করে কিছু দেখাও যায় না।
‘ওর নিশ্বাসে বিষ, কামড়ে বিষ—কাঁকড়া বিছে আর কেউটে সাপের মতো ও বিষাক্ত গো! মকররাজের বিষ তো ওই সবার মধ্যে ছড়িয়ে সব্বাইকে মেরে ফেলচে!’ আর্তস্বরে বলল সনাতন।
—মকররাজ ওকে বানিয়েছে। ওর সমস্ত শয়তানির শাগরেদ হল কালাপাহাড়।
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুরা এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল।
নীলু জিগ্যেস করল, ‘খোক্কোসদের পেছন পেছন কালাপাহাড় এখানে এল না কেন? পালাবার আগে তো মনে হয় তারই ডাক শুনছিলাম?’
দেঁতো কুমির আকর্ণবিস্তৃত হাসি হাসল, ‘এই খাঁড়ি সুন্দরবনের আওতায়। এখানে কালাপাহাড় ঢুকবে না। তারও ভয় আছে।’
—তা খোক্কোসরা ঢুকল যে?
—ওরা অত ঝানু হয়নি। পথ ভুল করে ঢুকেছে।
—কেন? কালাপাহাড় বা খোক্কোসরা এখানে ঢুকতে চায় না কেন?
ইতিমধ্যে তিন ভোঁদড় ছানা—হ্যাংলা, ল্যাংড়া আর খাই-খাই-এর মধ্যে বেশ তর্ক জমে উঠেছে। খাই-খাই কিছু বলছে। হ্যাংলা আর ল্যাংড়া দু-জনেই জোর গলায় তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করছে।
ভোঁদড়গিন্নি তিনজনকেই আদর করে ল্যাজের ঝাপট দিল, ‘কীসের হল্লা করচিস রে তোরা?’
খাই-খাই কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, ‘মা, দ্যাকো, দ্যাকো, ওরা আমার কতা বিশ্বাস করচে না।’
—কী কতা?
এতে হ্যাংলা আর ল্যাংড়া আরও জোর গলায় চেঁচাতে লাগল, ‘মা, ও মিচে কতা বলচে। বানিয়ে বানিয়ে বলচে।’
—কী বলচ?
—ও বলচে—ও নাকি সেদিন বাঘুয়াকে দেকতে পেয়েচে। বাঘুয়াকে কী করে ও দেকবে মা? বাঘুয়া তো কবে মরে গ্যাচে। বাঘুয়া তো আকাশের তারা হয়ে গ্যাচে।
খাই-খাই ভাইদের কথা শুনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
—মা! ওরা আমায় মিত্যেবাদী বলচে মা! আমি কি মিচে কতা বলি? আমি কি তোমার মিচে কতা বলার ছেলে?
—হ্যাঁ, হরদম বলিস।
—না-গো মা, সেদিন বোয়াল মাচ খেতে খাঁড়ির জলে ঢুকেচি, দেকি এক বিরাট ডোরা কাটা ল্যাজ ঝোঁপের মধ্যে চট করে মিলিয়ে গেল। অ্যাত্তো বড়ো ল্যাজ আর কার হতে পারে? এ বাঘুয়া না হয়ে যায় না।
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু ভোঁদড়দের গল্প মন দিয়ে শুনছিল। ওরা এও লক্ষ করল যে বাঘুয়ার নাম উঠতেই পরিবেশটা কেমন পাল্টে গেছে। সনাতনের মুখের ভাব প্রসন্ন হয়ে উঠেছে। কুমির দুটোও উৎসাহিত। কালাপাহাড়, খোক্কোস, মকররাজদের আলোচনায় পরিস্থিতি যেমন ভারী, বিষণ্ণ, শঙ্কাকুল হয়ে উঠেছিল, তা যেন এক লহমায় অন্তর্হিত।
সনাতন হাসি হাসি মুখে বলল, ‘খাই-খাই! তুই হরদম মিচে কতা বলিস। ঠিক করে বল। সত্যি সত্যি বাঘুয়াকে দেকেচিস? মিচে বললে টেনে তোর কান ছিঁড়ে দেব।’
বাবার প্রশ্নে খাই-খাই অনেক ধানাই-পানাই করে জানাল যে, বাঘুয়াকে পুরোপুরি সে দেখেনি, তবে বোয়াল মাছ খেতে গিয়ে সে যে একটা বিশাল ল্যাজ দেখতে পেয়েছে এবং সে-ল্যাজের মালিক যে বিদ্যুৎগতিতে গরান ঝোপের জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে, সে-ব্যাপারে সে নিশ্চিত।
ডোরা সনাতনকে জিগ্যেস করল, ‘বাঘুয়া কে?’
—বনের রাজা গো? আমাদের সব্বাইকার রাজা সে—এক বিশাল বাঘ—রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার!
—তাকে কি অনেক দিন দেখা যায়নি?
ভোঁদড়বুড়ি এতক্ষণ ঝিমোচ্ছিল। বাঘুয়ার কথায় তারও ঘুম ভেঙেছে। সে নড়েচড়ে বসেছে। সে বলল, ‘আহা! কী কথাই না শোনালি খাই-খাই! আয় বাপধন আমার কোলে আয়! তোর মুকে তোপসে মাচের ভাজা পড়ুক! বাঘুয়া কি ফিরতে পারে? সে কি বেঁচে আচে? আহা, আমি তাকে নিজের চোকে দেকেচি গো! কী ভালো! কী সুন্দর! কী তার তেজ! কী তার সহবত! যখন চলত, তখন সত্যিই মনে হত একটা রাজা হেঁটে যাচ্চে, আর সব্বাই মেনি বেড়াল!
দেঁতো কুমিরও বাঘুয়ার প্রসঙ্গে আকর্ণবিস্তৃত হাসি হাসল। বলল, ‘খাই-খাই! তোর কথাই সত্যি হোক। বাঘুয়া দেশে ফিরুক। তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’
কুমিরগিন্নি বলল, ‘বাঘুয়া এলে দুষ্টের দমন হবে, শিষ্টের পালন হবে। দেশের লোকের মুখে অন্ন জুটবে, হাসি ফুটবে। দেশের কুয়াশা কাটবে। বাঘুয়ার ভয়েই তো কালাপাহাড় এ-দিকে আসে না, বুঝলে? ওদের ভয় আছে যে, বাঘুয়া না কোনোদিন ফিরে আসে।’
দেঁতো কুমির ব্যস্ত হয়ে উঠল, ‘গিন্নি, দেখো দেখি। ঘরে অতিথি আর আমরা বকে মরছি। বাঘুয়ার গল্প আরম্ভ হলে আর শেষ হবে না। যাও, ভালো ভালো খাবার বানাও দেখি।’
—কী বানাব?
—কেন? ইলিশ-খলিশের চচ্চড়ি, রুই-কাতলার গড়গড়ি, চিতল-বোয়ালের মড়মড়ি। সব ভালো করে তেল-মশলা দিয়ে রাঁধো দেখি।
—শুনে কুমির গিন্নির দু-চোখ বেয়ে জল গড়াতে লাগল।
—আহা, আমার বাছারা থাকলে কী আনন্দ করে যে খেত!
সনাতন ফিস ফিস করে বলল, ‘কুমির, কুমির গিন্নির সাত-সাতটা ছানাকেই শয়তান শেয়ালপন্ডিত সাবাড় করেচে।’
দেঁতো কুমিরেরও চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ বাদে আত্মসংবরণ করে ডোরা, লীনাদের দিকে চেয়ে ভাঙা গলায় সে সুর করে বলল,
এসো এসো গর্তে এসো বাস করে যাও চাট্টি দিন।
আদর করে, শিকেয় তুলে রাখব আমি রাত্রি দিন।
কুমিরের সাদর আমন্ত্রণে সাড়া দিতে কেমন যেন ভয় পাচ্ছিল ডোরা, ডোনারা। ওইরকম মারাত্মক দাঁত। বিরাট দেহ। বিশাল ল্যাজ। মাছের রান্নাও মনঃপুত নয় তাদের। ডোরা-ডোনারা স্পেনসার-এর ফিশ-ফিঙ্গার খেতে ভালোবাসে। ফিশ অ্যাণ্ড চিপস তাদের প্রিয়। ফিশ বলসও মন্দ নয়। তাই বলে ইলিশ-খলিশের চচ্চড়ি? রুই-কাতলার গড়গড়ি? চিতল-বোয়ালের মড়মড়ি?
ওদের দ্বিধা লক্ষ করছিল সনাতন। ল্যাজের মৃদু ঝাপটে আদর করে সে বলল, ‘বাচ্চারা ভয় পেয়ো না। কুমির, কুমির-গিন্নি খুব ভালো। কুমির-গিন্নির রান্নার হাতটাও খাসা। তোমাদের কোনো ভয় নেই। এসো, এসো, চলে এসো।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন