বাংলার মাটি, বাংলার জল

সৌম্য ভট্টাচার্য

নিরাভরণ ঘরে বাংলা মা শুয়ে আছেন। দগ দগ করছে বুকের ঘা। মায়ের মুখ অপরূপ সুন্দর, কিন্তু বিষাদ মাখা। ফ্যাকাশে গায়ের রং। যেন কেউ ব্লটিং পেপার দিয়ে সমস্ত রক্ত দেহ থেকে শুষে নিয়েছে। শীর্ণ, কঙ্কালসার দেহ। বুকের ঘা থেকে অবিরল বিষ আর পুঁজ ঝরছে।

মায়ের খাটের চারপাশ ঘিরে বাচ্চারা দাঁড়াল। ডোনা শিয়রে, মিতুল পায়ের কাছে, ডোরা আর নীলু দু-পাশে। তাদের এবার গান গাইতে হবে—রাখিসংগীত।

কে আরম্ভ করবে?

বাচ্চারা সংশয়ে পরস্পরের দিকে চাইতে লাগল। চাট্টিখানি কথা নয়, সুর ভুল হলে চলবে না, তাল ভুল হলে চলবে না, লয় ভুল হলে চলবে না, কথা হতে হবে নির্ভুল।

তারা কী পারবে? তারা কী পারবে?

ডোনা বলল, ‘নীলু, শুরুর সুরটা কীরে? স্টার্টিং নোট?’

নীলু বলল, ‘পা, পঞ্চম।’

—ঠিক জানিস?

—তাই তো! ময়নাবুড়ি তো তাই শেখাল।

মিতুল বলল, ‘না, মা, মধ্যম। মা, পা, পা।’

ডোনা মিতুলের কথায় সায় দিল।

স্টার্টিং নোট ভুল হলে সর্বনাশ। পুরো সুরটাই গুবলেট হয়ে যাবে। বাচ্চারা ধাঁধায় পড়ে গেল। কী করবে? কে তাদের সাহায্য করবে?

ডোরা বলল, ‘একবার মাত্র ময়নাবুড়ির কাছে তালিম নিয়েছি। ইশ! বারবার যদি বসা যেত?’

হঠাৎ সেই নিস্তব্ধ অন্ধকারের মধ্যে কেউ ফিসফিসে অশরীরী কন্ঠে বলে উঠল, ‘বাচ্চারা, তোমরা ‘মা’ লাগাও। মা পা পা। মা লাগাও বাচ্চারা। মধ্যম লাগাও।’

অন্তরীক্ষে সুর বাজছে—

II মা পা পা | -Y পা পধপা | মা পধা পা | মগা গা মা I

I মা পা পা | -Y পা পমা | পা ধা পধা | না না ধপা I

অনেকে গানটা গাইছে। জোর গলায় নয়, গুনগুনিয়ে। এরা কারা? বাংলা মায়ের ঘরটা যেন আচমকা একটা প্রেক্ষাগৃহে পরিণত হয়েছে। সাদা দেওয়ালে ছায়া ছায়া অবয়ব ভেসে উঠছে। অগণ্য মানুষ। তাদের কারো গলায় ফাঁসির দাগ। কারো বুকে অস্ত্রের ক্ষতচিহ্ন। না খেয়ে মরার যন্ত্রণা কারো মুখকে ক্লিষ্ট করেছে। বাচ্চারা দেখল, তাদের সামনে মৃত্যুর মিছিল। ‘ফ্যান দাও! আমার বাছারে এট্টু ফ্যান দাও!’ বলে চিৎকার করছে কেউ। সে চিৎকারে কোনো শব্দ নেই। রাতের কান্না, ভোরের কান্না ঘুরে ঘুরে বলছে, ‘অন্ন দাও! অন্ন দাও!’ সামান্য সম্বল ঝোলায় পুরে বালবাচ্চার হাত ধরে সীমান্ত পেরিয়ে নিরুদ্দেশের পথে চলেছে অগণিত ভাঙা মানুষের স্রোত। তাদের চোখ দিয়ে, মুখ দিয়ে, বুক দিয়ে অবিরত রক্ত আর অশ্রু ঝরছে। আর অসংখ্য নিরন্ন কঙ্কালসার মানুষ মুখ তুলে আশাভরা চোখে ডোরাদের দিকে তাকিয়ে গান গাইছে—

বাংলার মাটি, বাংলার জল।

সবার এই উৎসাহে, অনুপ্রেরণায় প্রণোদনায় ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল বুকে বল পেল।

তারা নির্ভুল সুরে, তালে, লয়ে গেয়ে উঠল :

বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—

পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।।

বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ—

পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান।।

বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা—

সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক, হে ভগবান।।

বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন—

এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।।

তাদের সাথে সাথে আর সবাই গেয়ে উঠল। লক্ষ কন্ঠে স্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি আকাশে, বাতাসে অণুরণিত হয়ে উঠল—‘বাংলার মাটি, বাংলার জল।’ সে-সুর, সে-কথা বাংলা মায়ের সামান্য ঘরের ছাদ ভেদ করে ঊর্ধ্বপানে উঠতে উঠতে উদীয়মান সূর্যের আলোর সঙ্গে মিশে গেল।

গাইতে গাইতে সবিস্ময়ে বাচ্চারা দেখল যে, বাংলা মায়ের বুকের ঘা শুকিয়ে যাচ্ছে। যে ডুমো ডুমো গুয়ে মাছি আর ক্রিমি-কীট ভন ভন করছিল, তারা কোথায় অদৃশ্য! মায়ের ফ্যাকাশে মুখে রক্ত সঞ্চার হচ্ছে। শীর্ণ হাতে-পায়ে জীবনের সাড়া জাগছে। মায়ের বিষণ্ণ, কষ্ট-ক্লীষ্ট মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটছে। সদ্য ওঠা সূর্যের আলো জানলা দিয়ে মায়ের মুখে এসে পড়েছে। সে আলোয় ঘরের ধোঁয়াশা সম্পূর্ণ কেটে যাচ্ছে।

গান শেষ করার পর ডোরা আর মিতুল মায়ের ডান হাতে রাখি দুটো যত্নে পরিয়ে দিল। মাকে স্পর্শ করতে তাদের সারা শরীর যেন জুড়িয়ে গেল। মা চোখ মেলে চাইলেন। মুখে মৃদু হাসি। ক্ষীণ স্বরে বললেন, ‘ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল! তোমরা তাহলে শেষ পর্যন্ত এলে! আমি জানতাম তোমরা আসবে! একদিন-না-একদিন তোমরা আসবেই! আমি তাই তো তোমাদের পথ চেয়েছিলাম।’

নীলু বলে উঠল, ‘ওরা কারা, মা?’

—কাদের কথা বলছ, নীলু?

—যারা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে গান গাইছিল? আমাদের সুর, তাল, লয়, কথা ঠিকঠাক ধরিয়ে দিচ্ছিল?

মা বললেন, ‘ওরা আমার দুঃখী সন্তান। কেউ আমার জন্যে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছে, কেউ গেছে দ্বীপান্তরে, কেউ মরেছে অস্ত্রাঘাতে। কেউ কেউ না-খেয়ে পোকামাকড়ের মতো মরেছে, কেউ মরেছে পথেঘাটে সহায়সম্বলহীন উদবাস্তুর মতো।’

—এত মানুষ?

—হ্যাঁ, নীলু। আমার যত ছেলেমেয়ে দুঃখ পেয়ে মরেছে, তার কি কোনো গোনাগুনতি আছে, ইয়ত্তা আছে?

—তারা সবাই এসেছিল?

—হ্যাঁ, নীলু। দেশ তাদের ভুলে গেলেও তারা তো দেশকে ভোলেনি। আমি যখন বিষের ঘোরে আচ্ছন্ন থাকতাম, তখন তারা এসে আমায় ফিসফিসিয়ে বলে যেত, ‘মা, চিন্তা কোরো না। বাচ্চারা যখন আসবে, তখন আমরা থাকব। আমরা দেখব যাতে কথা ভুল না হয়, সুর ভুল না হয়, লয় ভুল না হয়, তাল ভুল না হয়। এ সুযোগ তো বার বার আসবে না, মা।’

এটুকু বলে বাংলা মা ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তাঁর চোখ ঘুমে ঢুলে এল। তাঁর অপরূপ সুন্দর মুখ পদ্মফুলের মতো সাদা চাদরের মধ্য থেকে জেগে রইল। তিনি নীরব হলেন।

বাচ্চারা মাকে ক্লান্ত দেখে, ঘুমন্ত দেখে চুপিসারে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সনাতন আর বিভীষণ। বিভীষণ বলল, ‘চলো, বাচ্চারা— আরেকটা কাজ বাকি আছে। যে-যন্তর দিয়ে মকররাজ বিষের ধোঁয়া তৈরি করে, সেই যন্তরগুলো ভাঙতে হবে।’

সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%