দাদুর বাগানে

সৌম্য ভট্টাচার্য

ডোরা বলল, ‘নীলু? রাখি দুটো কোথায় রেখেছিস?’

—একটা আমার কাছে। একটা ডোনার কাছে।

—দাদুকে ফেরত দিয়ে দিই, চল।

ওদের মধ্যে তর্ক শুরু হল। মিতুল, নীলু চাইছে রাখি-দুটো আর ডায়েরি, কাগজ নিজেদের কাছে রাখতে। ডোরা, ডোনা চাইছে দিয়ে দিতে। তর্কের মধ্যেই ডোনা হঠাৎ বলল, ‘ডোরাদিদি, বৃষ্টি থেমে গেছে।’

সত্যিই বৃষ্টি থেমে গেছে। জানলা দিয়ে আকাশে চমৎকার একটা রামধনু দেখা যাচ্ছে। গোধূলির নরম আলোয় ছেয়ে গেছে চারদিক।

মিতুল বলল, ‘ওসব পরে হবেখন। চল আমরা বাগানে যাই।’

বাচ্চারা সিঁড়ি বেয়ে বাগানে নেমে এল। নরম, সবুজ ঘাসের ওপর জলের ফোঁটায় রোদ পড়ে চিকচিক করছে। পাখি ডাকছে। মৌমাছিরা গুন গুন করছে। পুকুরটা কানায় কানায় ভর্তি। তার পাশে সেই আদ্যিকালের বুড়ো বটগাছ। অদ্ভুতভাবে পুকুর থেকে উঠে আবার পুকুরের মধ্যেই আদ্দেক হেলে রয়েছে। তখন একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। জানি না সেটা নানা ঘটনার অভিঘাতে কিনা। সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি পড়েছে। সারাদিন ওরা লুকোচুরি খেলেছে। তারপর গুপ্তধনের মতো ডায়েরি আর রাখি আবিষ্কার। দুপুরে খিচুড়ি, ডিমভাজা, ইলিশমাছ ভাজা পেটে পড়েছে গরম গরম। ওরা লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছে বাবা আর দাদুর কথাবার্তা। তারও পরে বৃষ্টি থেমে রোদ ঝলমলিয়ে উঠেছে। আকাশে উঠেছে এক জাদুকরি, মায়াবী রামধনু।

বাগানে বেড়াতে বেড়াতে ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুর মনে হল যে, পৃথিবীটা যেন তাদের অনেক কাছে চলে এসেছে। তার রূপ, স্পর্শ, বর্ণ, গন্ধ যেন তাদের কাছে আরো নিবিড়ভাবে, গভীরভাবে ধরা দিচ্ছে। বাতাসে তারা শুনতে পাচ্ছে কীসের কানাকানি।

বুড়ো বটগাছের ডালে বিশাল মৌচাকটা ঝুলে রয়েছে। অজস্র মৌমাছি গুনগুন করে উড়ছে। তাদের কেউ কেউ উড়ে আসছে পুকুরের এপারে।

ডোনা বলল, ‘ডোরাদিদি, মৌমাছিগুলো কিছু বলছে?’

—পাগল নাকি? কী বলছে?

—ওরা কিছু বলছে, ডোরাদিদি? শুনতে পাচ্ছ না?

—কী বলছে?

—বলছে, ‘ডুব দে রে মন কালী বলে। ভরা ডুব একটা শুধু দাও। দাও ডুব, ডুব, দাও।’

বাচ্চারা আগের দিন রাতে টিভিতে ‘আশিতে আসিও না’ বলে এক ভারি মজার সিনেমা দেখেছে। তাতে এমন একটা গান ছিল।

—তুই কি নেশা করেছিস, ডোনা? আমরা তো গত রাতে টিভিতে এ গানটা শুনেছি।

—না, ডোরাদিদি, মৌমাছিরা সত্যিই গাইছে। আমি তো শুনতে পাচ্ছি। তোমরা মন দিয়ে শোনো।

ওরা সবাই শুনতে লাগল। খুব কনসেনট্রেট করে শুনতে গিয়ে বুঝল— তাই তো! মৌমাছিদের গুনগুনানির মধ্যে যেন একটা সুর আছে।

তারপর তাদের কানে স্পষ্ট হয়ে সে-সুর ধরা দিল। মৌমাছিগুলো সত্যিই গুনগুনিয়ে গান গাইছে—

ডুব দে রে মন কালী বলে।

ভরা ডুব একটা শুধু দাও।

দাও ডুব, ডুব দাও।

ঝাঁকে ঝাঁকে তারা গাইতে গাইতে বটগাছ থেকে পুকুরের এপারে আসছে। আবার গাইতে গাইতে ওপারে মৌচাকে ফিরে যাচ্ছে।

এখন যদি বড়োরা তাদের সঙ্গে থাকত, যেমন বাবা, মা, দাদু, দিদুন—তারা হয়তো কিছুই শুনতে পেত না। কারণ বড়ো হলে মন, প্রাণ, কান, বুদ্ধি সবই অন্যরকম হয়ে যায়। তাই বাচ্চারা অনেক কিছু শুনতে পায়, বুঝতে পারে, যা তাদের বাবা-মা-র জ্ঞানগম্যিতে কুলোয় না।

তা ছাড়া বাচ্চাদের পকেটে ছিল জাদু রাখি। হয়তো তার প্রভাবেই তারা কীটপতঙ্গ, পশুপাখির ভাষা সেদিন বুঝতে পারছিল। একটা সোনা ব্যাং গাল ফুলিয়ে তুড়ি লাফ খেতে খেতে যাচ্ছিল। গ্যাঙর গ্যাঙ শব্দে নিজের অস্তিত্ব জাহির করছিল সে। বাচ্চাদের মনে হল, সেও বলছে—

ডুব দে রে মন কালী বলে।

ভরা ডুব একটা শুধু দাও।

দাও ডুব, ডুব দাও।

বলেই ব্যাংটা একলাফে পুকুরের জলে গিয়ে পড়ল। তিন তুড়িলাফে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল সে।

এই সময় ডোনা একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেলল। বড়োরা বলবে বোকামি, নির্বুদ্ধিতা। তবে ছোটোরা অনেকসময় আবেগের বশে অনেক কাজ করে বসে, যা থেকে ভালো-মন্দ দুই-ই হতে পারে। ছোটোরা তো বড়োদের মতো অত ভেবে-চিন্তে হিসেব করে কাজ করে না। মৌমাছিরা ডুব দিতে বলছে। সোনা ব্যাং মুচকি হেসে ডুব দিতে বলল। পুকুরের স্বচ্ছ জলে খেলে বেড়াচ্ছে ছোটো-বড়ো মাছ। ডোনার মনে হল যে, পুকুরের জল, পুকুরের মাছ তাকে ডাকছে। তাকে ডুব দিতে বলছে, ঝাঁপ দিতে বলছে।

সেই ডাক তার কাছে এতটাই জোরালো হয়ে উঠল যে, কিছু না ভেবেই সটান সে লাফিয়ে পড়ল জলে। ডোনা অবশ্য চমৎকার সাঁতার জানে। ডুবে যাওয়ার ভয় নেই তার।

তবে জলে পড়েই ডোনা বুঝল যে, ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো। আগেই বলেছি যে, আদ্যিকালের বুড়ো বটগাছটা জলের ভেতর থেকে আদ্দেক হেলে আছে। জলের নীচে তার গায়ে একটা বিশাল, অন্ধকার, কালো গর্ত— যেখানে ছোটোখাটো ঘূর্ণি তৈরি হয়েছে। পাক খেয়ে খেয়ে জল ঢুকছে। জলের সঙ্গে ছোটোখাটো মাছও ঢুকছে অনেক। ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু কেউই এতদিন কোটরটা দেখেনি। গর্তটা কি রাতারাতি গজিয়ে উঠল?

ডোনা অবশ্য অত ভাববার সময় পেল না। স্রোতের প্রবল টান তাকে গর্তের দিকে টেনে নিয়ে চলল। ডোনা ওস্তাদ সাঁতারু কিন্তু হাজার হাত-পা ছুড়েও সেই প্রচন্ড আকর্ষণের হাত থেকে রেহাই পেল না সে। ক্ষীণ কন্ঠে চিৎকার করার চেষ্টা করল ডোনা, ‘ডোরাদিদি, মিতুলদিদি, নীলু—বাঁচাও! বাঁচাও! হেল্প! হেল্প!’ কিন্তু কেউ কিছু করার আগেই দেখতে দেখতে সেই বিশাল গহ্বরের মধ্যে ডোনা অদৃশ্য হয়ে গেল।

গর্তের মধ্যে ডোনা অদৃশ্য হয়ে গেছে। বটগাছের কান্ডটা ঘিরে পাক খাচ্ছে ঘোলাজল। অন্য বাচ্চারা কি স্থির থাকতে পারে? তারা নিজেরা পাকা সাঁতারু। প্রায়ই কাপ, মেডেল পায়। ডোনা তাদের প্রিয় বন্ধু। ডোরা, মিতুল, নীলু—ভাবনা-চিন্তারও সময় পেল না।

—ভয় পাস না, ডোনা! আমরা আসছি! তোকে বাঁচাব!

একে একে ডাইভ দিয়ে তিনজনই জলে পড়ল। ঠাণ্ডা পুকুরের জল—সদ্য বৃষ্টির টাটকা জলে গা জুড়িয়ে গেল সবার। কিন্তু জলে মারাত্মক টান। এক আদিম আকর্ষণ তাদের গর্তটার দিকে টানছে। হাঁ-করা বিশাল গহ্বরটার দিকে কে যেন তাদের জোরে ঠেলে দিল। ডোরা, নীলু, মিতুল হাত-পা ছুড়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, চেষ্টা করল সেই প্রচন্ড টান থেকে মুক্তি পাওয়ার। কিন্তু বৃথা তাদের চেষ্টা। বৃথা তাদের সাঁতার শেখা। ডোনার রাস্তা ধরেই তারা তিনজন একে একে গহ্বরের মধ্যে ঢুকে এক সীমাহীন অতলের মধ্যে গড়িয়ে পড়ল।

শোঁ শোঁ করে নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্য দিয়ে তারা নেমে চলেছে কোনো পাতালপুরীতে। দম আটকে মরে যাওয়ার কথা। ডোরা, নীলু বা মিতুলের কিন্তু কোনো কষ্ট হল না। ভয়, ভাবনা সব কিছু যেন অতীত হয়ে গেছে। কোনো কষ্ট নেই। কোনো শঙ্কা নেই। এক গাঢ় তন্দ্রায় তারা আচ্ছন্ন হয়ে গেল। ছোটোবেলায় মায়ের মুখে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ার যে মজা বা দূরদেশে এরোপ্লেনে করে যেতে যেতে ভরপেট খেয়ে সিনেমা দেখতে দেখতে আধোঘুম, আধো জাগার যে তৃপ্তি, তা-ই তাদের আবিষ্ট করে রাখল। তাদের মনে হল না, তারা ঘোর বিপদে পড়েছে। মনে হল যেন অনেক আনন্দ, অনেক মজা, অনেক তৃপ্তি নিয়ে তারা কোনো অচিন দেশে বেড়াতে যাচ্ছে।

প্রথম ঝাঁপ দিয়েছিল ডোনা। তার কী মনে হল? ডোনার মনে হল, সে যেন ট্রেনে চেপে কোথাও বেড়াতে চলেছে। রাজধানী এক্সপ্রেসে চড়লে যেমন সবসময় ভালো ভালো খাবার দেয়, তেমনই ভালো ভালো খাবারে তার পেট ভর্তি। তার ট্রেনটা একটা বিশাল লম্বা, অন্ধকার টানেলের মধ্যে দিয়ে চলেছে। কোনো শব্দ নেই। তেলের মতো মসৃণ সে চলা। কিন্তু টানেলটা যেন শেষ হয় না। অন্ধকার যেন কাটতে চায় না।

তারপর ডোনা অনুভব করল, খুব নরম, মোলায়েম পালকের মতো বিছানায় সে এসে পড়েছে। কেমন কুয়াশায় ঢাকা চারদিক। তার ফাঁক দিয়ে হালকা চাঁদের আলো এসে পড়েছে। পাশে কুল কুল করে জলের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%