সৌম্য ভট্টাচার্য
শেয়ালপন্ডিত চারমূর্তিকে ক্রূরদৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন। তাঁর ছুঁচোলো মুখ থেকে ধূর্তামি আর নষ্টামি ঠিকরে বেরোতে লাগল। ডোরাদের ঘরে ঢুকতে দেখে হুইলচেয়ার বহনকারী দুই খোক্কোস সভয়ে অন্তর্ধান করেছে। অতএব শেয়ালপন্ডিত একেবারে একা। তিনি একদৃষ্টে সম্মিলিত বাচ্চা, সনাতন আর বিভীষণকে দেখতে লাগলেন। ধীরে ধীরে তাঁর মুখের ভাব কোমল হয়ে উঠল। বিগলিত হাসিতে শ্বাদন্ত বিকশিত হল। মধুর স্বরে তিনি বললেন, ‘বাচ্চারা! আহা কত দূর থেকে তোমরা এসেছ! কত মহৎ কাজ করবে বলে এসেছ!’
নীলু বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা রাখিসংগীত গেয়ে বাংলা মায়ের ভাঙা বুক জুড়িয়ে দেব। তাঁর হাতে প্রেমের রাখি পরিয়ে দেব। সারা দেশে প্রেমের আলো জ্বেলে দেব।’
শেয়ালপন্ডিত চোখ কপালে তুললেন। বললেন, ‘প্রেমের আলো! তার মেগাওয়াট তো অনেক বেশি! ব্যাণ্ডেল বা বক্রেশ্বরে তো এ-আলো মেলে না, ভাই!’
—আমরা এ-আলো তৈরি করব।
—কীভাবে করবে? তোমরা বাচ্চারা আবেগের বশে এগোচ্ছ। তোমাদের কর্মসূচির পেছনে কোনো স্থির আদর্শ আছে? আছে কোনো নিশ্চিত প্রত্যয়?
সনাতন বলল, ‘আপনাদের যক্ষপুরীর খোক্কোসদের কোনো স্থির আদর্শ বা প্রত্যয় আছে? আপনারা তো ঝাড়ুদারের দল!’
শেয়ালপন্ডিত তলে তলে চটলেন কিনা সেটা ওপর থেকে বোঝা গেল না। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘অবশ্যই আছে। আমাদের আদর্শ হল দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ!’
—সেটা কী বস্তু?
—সহজে বোঝা যাবে না। এ বুঝতে গেলে অনেক পড়াশোনা লাগে। আমরা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদীরা প্রচুর পড়াশোনা করি তো। তাই মহাকাশবিজ্ঞান থেকে যৌনবিজ্ঞান যে-কোনো বিষয়েই শেষ কথা বলবার আমরাই অধিকারী।
—কীরকম পড়াশোনা লাগে?
বিকট ভ্রূকুটি করে শেয়ালপন্ডিত নীলুর দিকে তাকালেন, ‘এনসাইক্লোপিডিক ক্যাটাস্ট্রফি বোঝ?’
শুনে তো নীলুর পিলে চমকে গেল। অন্য কেউও কোনো থই পেল বলে মনে হল না।
—প্রাণতোষিণী মহাপরিনির্বাণ তন্ত্রের পাতা উলটেছ কোনো দিন?
মিতুল আঁতকে উঠে বলল, ‘আজ্ঞে না। ওলটাতেও চাই না।’
—নেবুচাডনাজার আর পজিট্রনের কম্বিনেশন কী জানো?
—জানি না।
—থিয়োরি অব রিলেটিভিটির সঙ্গে অ্যাকোয়া টাইকোটিস যোগ করলে কী হয় বলতে পার?
ডোরা বলল, ‘খেয়েছে!’
মিটিমিটি হেসে শেয়ালপন্ডিত বললেন, ‘তা হলে তোমরা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ কী করে বুঝবে? তবে জেনে রাখো— দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ তা সত্য।’
ডোনা বলল, ‘আপনি সহজ করে বোঝাতে পারেন না? একটু উদাহরণ দিয়ে? একটু এগজাম্পল দিয়ে?’
শেয়ালপন্ডিত ভ্রূকুটি করে বেশ খানিক চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, ‘আচ্ছা, চেষ্টা করা যাক। আমি বাঘুয়ার উদাহরণই দিচ্ছি।’
—হ্যাঁ, বলুন।
—আমরা এতদিন বলতাম যে, বাঘুয়া পীতরাক্ষসের পা-চাটা কুকুর। বলতাম কিনা?
সনাতন বলল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই বলতেন। তাই তো আপনাদের মুখের বুলি ছিল।’
—কিন্তু যেই আমরা খবর পেয়েছি যে, বাঘুয়া দেশে ফিরেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বক্তব্য আমূল বদলে গেছে। আমরা বলছি—
—কী বলছেন?
—আমরা এখন সমস্বরে বলছি যে, বাঘুয়া মহান দেশপ্রেমিক!
—তাই নাকি?
—হ্যাঁ। এ ব্যাপারে দৈনিক মিথ্যাসংবাদ-এর সম্পাদককে বিশেষ সম্পাদকীয় লিখতে বলা হয়েছে। এবার থেকে বাঘুয়ার মূর্তিস্থাপন করে তাতে নিয়মিত ফুলের মালা চড়ানো হবে।
—বটে?
শেয়ালপন্ডিত বললেন, ‘এই যে আমাদের প্রাথমিক অবস্থান এবং আমাদের বর্তমান অবস্থান— নিশ্চয়ই মানবে যে, দুটোর মধ্যে আমূল পার্থক্য রয়েছে।’
—মানতেই হবে!
—এই পার্থক্য বা দ্বন্দ্বই দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মূল ভিত্তি।
—আর বস্তুবাদ?
শেয়ালপন্ডিত উচ্চাঙ্গের হাসি হাসলেন। বললেন, ‘যক্ষপুরীটা দেখছ? কী মনে হয়?’
—যেন রাজপ্রাসাদ। চোখ টেরিয়ে যায়!
—ঠিক বলেছ। এর দেয়াল খুঁড়লে তাল তাল সোনা মিলবে, বুঝলে হে। এই টাকাটা কি ধর্মতলার মোড়ে কৌটো ঝাঁকিয়ে উঠেছে বলে মনে করো?
—আজ্ঞে না। কৌটো ঝাঁকানোর টাকায় এ দালান উঠেছে বলে তো মনে হয় না।
—ঠিক! কত পকেট এর জন্য ফাঁকা করতে হয়েছে, কত তোলা এর জন্যে তুলতে হয়েছে, তার হিসেব রাখো, কমরেড? আমরা যদি ঘোরতর বস্তুবাদী না-হতাম, তাহলে কখনো এমন আলিশান যক্ষপুরী বানাতে পারতাম?
সনাতন বলল, ‘কিন্তু কেউ কেউ যে আপনাদের আদর্শকে ‘‘ধান্ধামূলক বস্তুবাদ’’ বলে থাকে?’
—কমরেড! ওসব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার! তোমরা দুষ্টু লোকেদের কথায় কান দিয়ো না।
শেয়ালপন্ডিতের মুখে তাঁর আদর্শের এমন অভিনব ব্যাখ্যা শুনে ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুলের মাথা গুলিয়ে গেছিল। হঠাৎ শেয়ালপন্ডিত তাদের ‘কমরেড’ বলে সম্বোধন করছেন কেন, সেটা নিয়েও তারা বিভ্রান্তিতে পড়ল।
তাদের বিমূঢ় অবস্থা দেখে শেয়ালপন্ডিত করুণার হাসি হাসলেন, ‘আহা! নাবালক! দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের সঙ্গে তোলা আদায়ের কী সম্পর্ক সেটা বুঝতে গিয়ে আমারই তিনদিন ধরে সমানে হিক্কা উঠেছিল, তো তোমরা কোন ছাড়!’
শেয়ালপন্ডিত বলে চললেন, ‘তোমরা বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা আবেগের বশে বাংলা মায়ের বুকের ঘা জুড়োতে বেরিয়েছ। কিন্তু বাছারা, দেশপ্রেমিক হবার আগে তো বিশ্বপ্রেমিক হতে হবে! বিশ্বের দুঃখ বুকের মধ্যে অনুভব না করলে কী করে তোমরা বাংলা মায়ের দুঃখ বুঝবে? তোমরা কি প্যালেস্টাইনের যন্ত্রণা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছ? শুনেছ কি সেখানকার নিপীড়িত মানুষের আর্তরব? নিকারাগুয়ার নেতা নেলসন ম্যাণ্ডেলার দীর্ঘ কারাবাস কি তোমাদের অনুপ্রাণিত করে না? তোমরা কি পড়েছ সমাজতান্ত্রিক মহাচিনের বিজয় বৈজয়ন্তীর কথা? তার মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা?’
মনে হল কথার তোড়ে শেয়ালপন্ডিত সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন। সে স্রোতের প্রাবল্যে ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল তাদের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে কোনো ধোঁয়াটে অন্ধ কানাগলির মধ্যে ঢুকে পড়বে।
শেয়ালপন্ডিত একটু দম নেওয়ার জন্য থামলেন। তারপর বললেন যে, ‘একটা আদর্শকে বুকে ধরে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলাম। মকররাজ আমাকে ‘দেশরত্ন’ খেতাব দেওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করছেন। কিন্তু সত্যিই কি আমি তার যোগ্য?’
সনাতন বলল, ‘অবশ্যই! ‘দেশরত্ন’ পাবার ব্যাপারে আপনার থেকে যোগ্যতর আর কে আছে?’
—না হে! আমি নিজে জানি আমার বিফলতার কথা। দেশের সব কর্মস্থলে, সব ইস্কুলে, সব কলেজে, সব শিক্ষাক্ষেত্রে কি দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদে বিশ্বাসী মধ্যমেধার খোক্কোস বা খ্যাঁকশেয়ালকে উচ্চপদে বসিয়ে দিতে পেরেছি?
পারিনি! পারিনি! পারিনি!
তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা—
আমার চেষ্টার অপূর্ণতা।
আমার প্রচেষ্টা, জানি আমি।
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।

মনে হল কথার তোড়ে শেয়ালপন্ডিত সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন।
তাই জীবন সায়াহ্নে এসে খ্যাঁকশেয়ালসুলভ বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করতেই হবে যে, সব জায়গায়, সব ক্ষেত্রে আমি সফল হতে পারিনি। সেই স্বীকারোক্তিই আমার পাথেয়। আমার শেষ পারানির কড়ি।
হঠাৎ নীলু হাত তুলে বলল, ‘আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই।’
শেয়ালপন্ডিত উদার হাসলেন। বললেন, ‘নিশ্চয়ই করবে। এই তো তোমাদের প্রশ্ন করবার বয়েস। তোমাদের আজকের প্রশ্নের অঙ্কুর-এর থেকেই তো আগামীদিনের উত্তরের বনস্পতি গজিয়ে উঠবে।’
আগেই বলেছি যে, নীলু খুব বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ। শেয়ালপন্ডিতের ব্যাপারে সে একবার দেঁতো কুমিরকে প্রশ্ন করেছিল, ‘আচ্ছা দেঁতো, শেয়ালপন্ডিত যে তোমার সাত-সাতটা ছানাকে বিলকুল জলখাবার করে ফেলল, তুমি কিছুটি টের পাওনি?’
শুনে দেঁতো কুমির দু-চোখে অশ্রুবর্ষণ করে বলেছিল, ‘হায় নীলু! ও একটা ছানা আমাকে বার বার করে দেখাত আর অবিরাম কথার জাল বুনে যেত। ও কথার জাদুকর। একবার কথা আরম্ভ করলে ওকে ঠেকানো মুশকিল। শব্দের ধূম্রজালে ও সব কিছু গুলিয়ে দেয়, আচ্ছন্ন করে দেয়। তবে কিছু প্রশ্ন করলে, কিছু প্রসঙ্গ তুললে ও বিচলিত হয়ে পড়ে। ওর কথার স্রোত স্তব্ধ হয়ে যায়। ওর শব্দের মায়াজাল ছিঁড়ে যায়। কিন্তু সে আমি পরে জেনেছিলাম। তখন সব শেষ হয়ে গেছে।’
—কী সে প্রশ্ন? কী সে প্রসঙ্গ?
দেঁতো কুমির তখন নীলুর কানে কানে সেই গোপন প্রশ্নগুলো জানিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘যদি কখনো শেয়ালপন্ডিতের পাল্লায় পড় আর দেখ ও এরকম কথার ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছে, তাহলে প্রশ্নগুলো ওকে করবে। দেখবে ও বিচলিত হয়ে পড়বে। কথার কুয়াশাও কেটে যাবে।’
নীলুও মেধাবী ছাত্রের মতো প্রশ্নগুলো মুখস্থ করে নিয়েছিল।
নীলু হাত তুলে দেঁতো কুমিরের শিখিয়ে দেওয়া সেই মোক্ষম প্রশ্নগুলোই শেয়ালপন্ডিতকে করল।
—আপনি চিন চিন করছেন।
—হ্যাঁ। অবশ্যই করছি। মহাচিনই তো আমাদের অনুপ্রেরণা! সেখানকার সমাজতান্ত্রিক অগ্রগতি! সেখানকার মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লব! চিনই তো আমাদের জীবনের ধ্রবতারা! জানো, চিনে বরফ পড়লে আমরা যক্ষপুরীতে কম্বল মুড়ি দিই। চিনে বৃষ্টি, বাদল হলে এখানে ছাতার দোকানে লাইন পড়ে।
—আর তিব্বতে চিনের নৃশংস সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন? সে-ব্যাপারে কিছু বলবেন না? দলাই লামার সঙ্গে তাদের অশোভন, অসংগত ব্যবহার? সে-বিষয়ে আলোকপাত করবেন না? দলাই লামার ন্যক্কারজনক চিরনির্বাসন? সে ব্যাপারে চুপ করে থাকবেন কেন? তিয়েন-আন-মেন স্কোয়ারে পাশবিক মানবনিধন?
নীলুর এই বেয়াড়া, বিটকেল প্রশ্নগুলো শুনে শিয়ালপন্ডিতের মুখভাবের আমূল পরিবর্তন ঘটল। যে দার্শনিক পরমহংসের মতো প্রশান্তি তাঁর মুখ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, তা কেটে গিয়ে এক উগ্র, খ্যাপাটে, খুনি ভাব ফুটে উঠল। ক্রোধে রক্তবর্ণ হয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বললেন, ‘ডেঁপো ছোকরা! কোন প্রতিক্রিয়াশীল পাতি বুর্জোয়া তোমাকে এসব শিখিয়েছে? কে তোমার কানে এসব বিষমন্তর ঢেলেছে?’
—কেন? দেঁতো কুমির যে বলল—
—দেঁতো? সেই তেঁএটে বদ, অশিক্ষিত, অসংস্কৃত প্রাণী? যার বংশ নির্বংশ করতে সাত-সাতটা ছানাকে আমি একসময় জলযোগ করেছিলাম, সে মহান চিন সম্পর্কে এইসব প্রতিক্রিয়াশীল মন্তব্য করেছে?
শেয়ালপন্ডিতের কথা শেষ হতে-না-হতেই দরজা ঠেলে যে ঢুকল, তাকে দেখে চমকে গেল সবাই। বিষকুন্ড চুমুকে সাফ করে দিয়ে দেঁতো আর তার দলবল শেয়ালপন্ডিতের খোঁজে হেলতে, দুলতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এসেছে। শেয়ালপন্ডিতের শেষ বাক্যগুলো শুনেছে সে।
বাচ্চাদের দেখে দেঁতো তাড়া দিল। বলল, ‘বাচ্চারা, এই শয়তানটার বোলচাল শুনে তোমরা সময় নষ্ট করছ কেন? বেলা যে বয়ে যায়। যাও, যাও, এখুনি বাংলা মায়ের কাছে যাও। ওখানেই তো আসল কাজ তোমাদের।’
বাচ্চাদের, সনাতন আর কম্বলমুড়ি দেওয়া বিভীষণকে ঘর থেকে দূর করে দিয়ে, দরজা ল্যাজ দিয়ে বন্ধ করে, একাকী হুইলচেয়ারে বন্দি শেয়ালপন্ডিতের দিকে তাকিয়ে, দেঁতো কুমির দংষ্ট্রাকরাল এক ভয়ংকর হাসি হাসল। বলল, ‘পন্ডিতমশাই, আপনার সঙ্গে যে আমার শেষ বোঝাপড়াটা বাকি আছে!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন