সৌম্য ভট্টাচার্য
যেদিন বাঘুয়া প্রথম সবার কাছে দেখা দেয়, সেই দিনই মেঘের আড়াল থেকে কালাপাহাড় আক্রমণ করেছিল। তখন বাঘুয়ার পিঠে চেপে ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু গভীর জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে পালায় জমায়েত হওয়া জন্তুরা— ইঁদুর, বাদুর, সজারু, ছুঁচো, বেজি, ভাম, শিয়াল, ভাল্লুক, গন্ডার এমনকী হাতি পর্যন্ত। বাঘুয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছোটে গুলেবাঘ আর চিতাবাঘ।
গহীন জঙ্গলের সবুজ গাছের চাঁদোয়ার ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। সেখানে অদৃশ্য হয়ে গেলে, মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শত্রুও হদিশ পাবে না।
জঙ্গল খুব ঘন হলেও মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গা আছে। জন্তুজানোয়াররা হাতের তেলোর মতো সবকিছু চেনে। শাল, শিমুল, জারুল, অর্জুন আর সুন্দরী গাছের বন। গরানের ঝোপও রয়েছে। মাঝে মাঝে খাঁড়ির জল। সেখানে ডুবে রয়েছে কুমির আর কামট। খোক্কোসরা ভয়ে এই গহীন জঙ্গলের ভেতরে ঢোকে না। এখানে জন্তুজানোয়ারেরই রাজত্ব। এছাড়া মকররাজের অত্যাচারে কিছু কিছু মানুষও পালিয়ে এসে বনের মধ্যে বাসা নিয়েছে।
অনেকটা দৌড়ে বাঘুয়া এক জায়গায় থামল। জঙ্গল এখানে একটু পাতলা হয়ে এসেছে। একটা পুরোনো ভাঙাচোরা কেল্লার সামনে তারা এসে দাঁড়িয়েছে। কেল্লার সামনে একটা সরু জলের খাঁড়ি। বাঘুয়া একলাফে সেই খাঁড়ি পেরিয়ে কেল্লার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল।
ডোরা, ডোনা দেখল যে, তারা একটা বিরাট দশ-হাত উঁচু পাঁচিলের সামনে এসে পড়েছে। পাঁচিলের জায়গায় জায়গায় ইট, পলেস্তারা খসে গেছে। কোথাও-বা ফাটল দিয়ে অশ্বত্থগাছের চারা বেরোচ্ছে।
দরজা বলতে কিছু নেই। সব কিছু হা হা করছে। পাঁচিলের পর একটা ফাঁকা মাঠ। তার ওপারে ভাঙা কেল্লাটা দেখা যাচ্ছে।
বাঘুয়ার পিঠে চড়ে আসার অভিজ্ঞতা কেমন? বলে বোঝানো মুশকিল। যেন একটা এরোপ্লেন চলছে। কোনো ঝাঁকুনি নেই। যেন তারা নরম কোনো তোশকে আরামে বসে আছে। তাদের মুখের ওপর, চুলের ওপর বাতাস খেলছে। সে বাতাস খুব ঠাণ্ডাও নয়, খুব গরমও নয়—বরং ভারি আরামদায়ক।
রোদটা বেশ চড়চড়িয়ে উঠে গেছে। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুর বেশ খিদে পেয়ে গেল। অবশ্য লজ্জায় তারা সেকথা বাঘুয়াকে বলতে পারল না।
বাঘুয়া বোধহয় অন্তর্যামী। মানুষের মন সে পড়তে পারে। ডোরা, ডোনাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল সে। বলল, ‘বাচ্চারা! খিদে পেয়েছে? সকাল থেকে কিচ্ছুটি খাওনি?’
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু মাথা নাড়ল।
তারা কেল্লার দেয়াল পেরিয়ে বাইরের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গী বলতে বাঘুয়া। অন্য যেসব সঙ্গীরা সঙ্গে সঙ্গে দৌড়োচ্ছিল, তারা অদৃশ্য হয়ে গেছে।
‘বাকিরা সব গেল কোথায়?’ জিগ্যেস করল নীলু।
—তারা চরতে গেছে। সকাল থেকে আমার লেকচার শুনে তাদেরও খিদে পেয়েছে।
বাঘুয়া হাতে তালি বাজাল। নিমেষে এক আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। ফাঁকা মাঠে চারটি সুন্দর আসন পাতা হয়ে গেল। কী তার কারুকাজ! কী তার জেল্লা!
—বাচ্চারা কী খাবে?—লুচি? তরকারি? কচুরি? রাধাবল্লভি?
ডোনা বলল, ‘ন্যুডলস খেলে হয় না? কিংবা পাস্তা?’
—ছি:, ডোনা। তোমরা বাংলায় এসেছ। একটু বাঙালি খাবার খাও। লুচি-তরকারি হয়ে যাক? সঙ্গে একটু মিষ্টি?
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু ঘাড় নাড়তেই বাঘুয়া আবার তালি বাজাল।
আসনের সামনে খাগড়াই কাঁসার থালায় এসে গেল ফুলকো লুচি, ধোঁয়া ওঠা আলুর দম, ছোলার ডাল। সঙ্গে বাটিতে নলেন গুড়ের রসগোল্লা আর পায়েস।
ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল এই আজব দেশে আসা ইস্তক খালি মেছো খাবারই খেয়েছে। সে সনাতনের বাড়িতে তোপসে মাছ ভাজাই বল আর দেঁতো কুমিরের গুহায় ইলিশ-খলিশের চচ্চড়ি, রুই-কাতলার গড়গড়ি বা চিতল-বোয়ালের মড়মড়িই বল।
চোখের সামনে জাদু থালায় একে একে সুখাদ্য আসতে দেখে তারা আর স্থির থাকতে পারল না। মুহূর্তে গিয়ে জাদু আসনে বসে পড়ল।
ওঃ! এত চমৎকার খাবার তারা বহুদিন খায়নি। না, বাড়িতেও নয়। কল্যাণীতে দিদুনের হাতেও নয়।
খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচির স্বাদ আর গন্ধই আলাদা। সঙ্গে গরম গরম নারকেল দেওয়া ছোলার ডাল আর ধোঁয়া ওঠা আলুর দম। আহা! যেন অমৃত!
ডোরা একটু আপত্তি করতে যাচ্ছিল, ‘ডোনা! দিস অ্যাপিয়ার্স টু বি আ হাই-ক্যালরি ডায়েট!’
বাঘুয়া শুনতে পেয়ে বলল, ‘ডোরা, ডোনা! ক্যালরির চিন্তা কোরো না! এই তো তোমাদের খাওয়ার বয়েস! এখন ডায়েটিং করার কথা ভুলেও ভাববে না! আর পাস্তা, পিৎজা, বার্গারের থেকে লুচি, তরকারি ঢের ভালো।’
ঢের যে ভালো, সেটা বাচ্চাদের খাওয়া দেখেই বোঝা গেল। দিস্তে দিস্তে লুচি আসে আর উড়ে যায়। নীলু একাই কুড়িটা লুচি, দু-বাটি আলুর দম, দু-বাটি ছোলার ডাল, ছ-টা রসগোল্লা আর তিন-তিন বাটি পায়েস খেল। ডোরা, ডোনা, মিতুল কতটা খেল, সেটা লিখে তাদের আর লজ্জা দিতে চাই না।
খাবার শেষ হওয়ার পর সুগন্ধি কর্পূর দেওয়া জল খেয়ে এবং মুখ-হাত ধুয়ে তারা একটু জিরোচ্ছে। ডোরাও বসেছে, তবে তার প্রাণটা একটু আনচান করছে।
বাঘুয়া হাসল। সে অন্তর্যামী। মানুষের মনের কথা পড়তে পারে।
—ডোরা! এই বয়েসে চায়ের অভ্যেস করে ফেলেছ?
ডোরা সলজ্জ হেসে সম্মতি জানাল।
—আর কেউ খাবে?
মিতুল বলল, ‘আমাকেও দাও। সকালে চা না-খেলে আমার মাথা ধরে।’
বাঘুয়া তালি বাজাতেই এসে গেল দু-গ্লাস গরম গরম মশলাদার মালাই চা। এক চুমুক দিয়েই ডোরা আর মিতুলের মালুম হল যে, এত চমৎকার চা তারা কলকাতা বা কল্যাণীতেও কখনো খায়নি।
নীলু বলল, ‘আমরা এত খেলাম। পেট প্রায় ফেটে যাবার উপক্রম। বাঘুয়া, তুমি কিছু খাবে না?’
—আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের গুহায় কম খেয়ে, না-খেয়ে ওটাই অভ্যেস হয়ে গেছে, নীলু। আমার জন্য ভেব না। আমি পরে কিছু খেয়ে নেব।
মিতুল বলল, ‘আচ্ছা বাঘুয়া তোমার তো এত শক্তি, এত ক্ষমতা! তুমি তো ইচ্ছে করলেই আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের ডেরায় ভালোমন্দ খেতে পারতে?’
বাঘুয়া বিষণ্ণ হাসল, ‘কী জান, মিতুল, বন্দি থেকে থেকে আমার শক্তিও কমে গেছিল, ইচ্ছেও চলে গেছিল। এখন দেশের মাটিতে এসে পুরোনো শক্তি ফিরে পেয়েছি। কিন্তু খাবার ইচ্ছে আর নেই। বরং অন্যকে খাইয়েই এখন আনন্দ।’
বাচ্চারা দেখল—বাঘুয়ার চোখের কোণে জল টলটল করছে।
ডোনা বলল, ‘বাঘুয়া? এটা কাদের কেল্লা? কে থাকত এখানে?’
—পোর্তুগিজ বোম্বেটে।
—মানে?
—বাংলায় একসময় পোর্তুগিজ জলদস্যুদের খুব অত্যাচার ছিল।
—ওহ! ইউ মিন পাইরেটস?
—ঠিক, ডোনা! ওদেরই বলত বোম্বেটে।
—কী করত ওরা?
—লুঠতরাজ করত। গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিত। বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়েকে মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গিয়ে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিত।
—ক্রীতদাস মানে?
মিতুল বলল, ‘ক্রীতদাস মানে স্লেভ, ডোনা।’
—তাহলে তো তারা ভীষণ খারাপ লোক ছিল?
—ঠিক ডোনা। কেউ ওদের সম্বন্ধে ভালো কথা বলে না। ওরাই সুবিধেমতো গভীর জঙ্গলে একটা কেল্লা বানিয়ে রেখেছিল। এখানে ওরা লুকিয়ে থাকত। গুপ্তধন লুকিয়ে রাখত।
—গুপ্তধন, মানে ট্রেজার?
—হ্যাঁ।
চার বাচ্চারই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
‘ক্যান উই ডু আ ট্রেজার হান্ট?’ জিগ্যেস করল ডোরা।
বাঘুয়া হাসল, ‘না, এখন নয়। করতে যেয়ো না।’
—কেন?
—কারণ আছে, ডোরা। সময় হলেই জানতে পারবে। বরং তোমরা খেয়েচ-দেয়েচ, একটু ঘুরতে যাবে না কি?
—কোথায়?
—কেল্লার পাশেই তো ধানখেত। তোমরা ধানখেত দেখেছ? দেখেছ সর্ষেখেত? শুনেছ ধানখেতের গান?
—না, শুনিনি কখনো। বনের মধ্যে ধানখেত কী করে এল?
—মকররাজ আর কালাপাহাড়ের অত্যাচারে বেশ কিছু মানুষ বনের মধ্যে পালিয়ে এসেছে। বন কেটে বসত করছে। তারা আমার আশ্রিত, ডোরা। চলো, আমরা ধানখেত দেখি। ধানের খেত, সর্ষের খেত না দেখলে তোমরা দেশকে কী করে জানবে, ডোরা-ডোনা-নীলু-মিতুল? কী করে চিনবে?
—কালাপাহাড় আসবে না এখানে?
—সে ভয় কোরো না। এখানে আসতে কালাপাহাড়ও সাহস পাবে না। এটা আমার এলাকা।
বাঘুয়ার চলন, গমন, আচার, আচরণ, কথায়, বার্তায় যেমন একটা প্রবল শক্তি আছে, তেমনই আছে নির্ভরতা। তার কাছে এলে কেউ ভয় পায় না, বরং স্বস্তি পায়। বাচ্চারা নির্ভয়ে, নি:সঙ্কোচে বাঘুয়ার প্রশস্ত পিঠে উঠে বসল, যেন খুব কোমল, নরম কার্পেটের ওপর বসেছে। চার বাচ্চাকে পিঠে নিয়ে পলকে কেল্লার পাশের ধানখেতের মধ্যে ঢুকে পড়ল বাঘুয়া।
আকাশে ঝলমল করছে রোদ। কুয়াশা কেটে গেছে একেবারে। বাতাসের দোলা লেগে ধানের শিষ একটার পর আরেকটা আছড়ে পড়ছে এর ওর গায়ে আর মধুর ঝমঝমঝম শব্দ করছে।
মিতুল জিগ্যেস করল, ‘বাঘুয়া? এটাই কি ধানখেতের গান?’
—হ্যাঁ, মিতুল—এ দেশ ধানের দেশ! গানের দেশ! বাংলাদেশ!
—গানের দেশ?
—হ্যাঁ, মিতুল। পৃথিবীতে আর কোনো দেশে এত মিষ্টি গান লেখা হয়নি।
—সত্যি!
—সত্যি, মিতুল। বাঙালি যত গান লিখেছে, যত মিষ্টি, যত সুন্দর গান লিখেছে, পৃথিবীর আর কোনো জাত তা পারেনি। বাঙালি গানের রাজা। এ দেশ যদি শেষ হয়ে যায়, এ জাত যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলে সবচেয়ে সুন্দর গান দুনিয়া থেকে মুছে যাবে।
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু দেখল যে, বাঘুয়ার চোখে জল, তার দৃষ্টি উদাস।
নীলু একটু আগেই ছ-টা নলেন গুড়ের রসগোল্লা আর তিনবাটি পায়েস খেয়েছে। সে বলল, ‘সত্যি, বাঘুয়া! এত সুন্দর মিষ্টিও আর কোনো জাত বানাতে পারেনি!’
বাঘুয়ার চটকা ভেঙে গেল। সে বলল, ‘বাচ্চারা, এই দেশের ভবিষ্যৎ তোমাদের হাতে। এই দেশের জল, মাটি, বাতাস যদি বিষিয়ে যায়, সাগরের জল ফুলে উঠে যদি এই দেশকে বন্যায় ডুবিয়ে দেয়, তা-ই কি এই দেশের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত? এই দেশের মানুষের ভবিতব্য হওয়া উচিত?
ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল বাঘুয়াকে আগে কখনো এত গম্ভীর, এত বিষণ্ণ দেখেনি।
‘এ দেশের ভবিষ্যৎ সুতোয় ঝুলছে বলল বাঘুয়া, ‘তোমরাই একমাত্র আশা। যদি কোনো উপায়ে বাংলা মায়ের বুকের ঘা সারিয়ে দিতে পার, তাহলেই সবার পরিত্রাণ।’
ডোনা থাকতে পারল না। বলে উঠল, ‘আচ্ছা, বাঘুয়া? বেছে-বেছে আমাদের কথাই-বা কেন বলা হচ্ছে? আমরা তো ছোটো। আমাদের কী-ই বা শক্তি আছে?
—কারণ তোমাদের মধ্যে পাপ নেই?
—মানে?
—ডোনা, এ দেশের সবচেয়ে গভীর সমস্যা হল একটা পাপ যা বহুদিন ধরে দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে।
—কী সে পাপ?
—ভাইকে ভাই বলে মনে না-করার পাপ। মানুষকে মানুষ বলে মনে না-করার পাপ। মানুষকে ঘেন্না করার পাপ।
ডোরা বলল, ‘এটা কি শ্বেতরাক্ষসরা ছড়িয়েছে?’
—কতকটা তাই বটে, তবে এ পাপ শ্বেতরাক্ষসরা আসার আগেও দেশের বুকের ভেতরে ছিল। শ্বেতরাক্ষসরা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে মাত্র।
সব্বার মধ্যে এ পাপ আছে? আমাদের বাবা-মা-র মধ্যেও এই পাপ আছে?
—হ্যাঁ ডোরা, শুনলে দুঃখ পাবে, কিন্তু তোমার বাবা, মায়ের মধ্যেও এই পাপ আছে। এ পাপ দেশের মজ্জার মধ্যে ঢুকে গেছে। আর এই পাপের জন্যই দেশের মানুষ এত শাস্তি, এত কষ্ট পাচ্ছে।
ডোনা বলল, ‘বিশ্বাস করি না।’
বাঘুয়া হাসল, বলল, ‘আচ্ছা, তবে দেখাই।’
তখন বাঘুয়ার কৃপায় ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল সত্যদৃষ্টি পেল। তাদের চোখের সামনে অগণ্য, কোটি কোটি দেশবাসী সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে। এমন কেউ নেই, যার মধ্যে পাপ নেই। এমন কেউ নেই, যার শরীর পাপের বিষে নীল নয়। কোথাও-না-কোথাও বিষ আছেই। কারো পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত বিষাক্ত। কারো দু-কষ বেয়ে বিষের ঝোরা নেমেছে। কারো বুক থেকে গলা পর্যন্ত বিষের নীলে নীল—তারা খোক্কোস হয়ে গেছে। দেশশুদ্ধ সবার মধ্যে বিষের প্রকোপ দেখে ডোরা, ডোনারা শিউরে উঠল। তারপর তারা যখন নিজেদের দিকে তাকাল, দেখল তাদের চারজনের গায়েই কোনো বিষ নেই। শরীরের এতকটু অংশও নীল নয়। বাঘুয়ার গা-ও পরিষ্কার। সে-ও বিষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে বাচ্চারা একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। শেষে মিতুল ক্ষীণকন্ঠে শুধোল, ‘এত পাপ কেন? সবার মধ্যে এত বিষ কেন?’
বাঘুয়া বিষণ্ণ হাসল, ‘এ পাপ অনেক আগে থেকেই আমাদের মধ্যে ছিল। শ্বেতরাক্ষসরা বাড়িয়ে দিয়েছে। তারপর মকররাজ আর কালাপাহাড় মিলে দেশের মধ্যে বিষের বড়ি বিনেপয়সায় বিলিয়ে বিলিয়ে, গিলিয়ে গিলিয়ে বিষ আর পাপ এই পর্যায়ে নিয়ে গেছে।’
মিতুল বলল, ‘যাদের মধ্যে বিষ আছে, পাপ আছে, তারা কবির গান গাইলে কোনো ফল হবে না?’
—ঠিক, মিতুল! তুমি খুব বুদ্ধিমতী। ঠিক ধরেছ! পাপমনে ও গান গাইলে কোনো ফল হবে না। বাংলা মায়ের বুকের ঘা-ও সারবে না। তাই আমাদের পুরাণে লিখেছে যে, সম্পূর্ণ নিষ্পাপ চারটি বাচ্চা যদি বাংলা মায়ের সামনে রাখি সংগীত গাইতে পারে—নির্ভুল সুর, তাল, লয়ে আর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা মায়ের হাতে পরিয়ে দিতে পারে জাদু-রাখি, তাহলে, একমাত্র তাহলেই, বাংলা মায়ের বুকের ঘা সারবে, দেশ থেকে বিষ আর পাপও চলে যাবে।
বাঘুয়ার পিঠ থেকে নেমে বাচ্চারা তখন সর্ষেখেতের হলুদ ফুলের মধ্যে দাঁড়িয়ে। ওপরে ঝলমল করছে সূর্য। বইছে মিহি বাতাস।
মিতুল বলল, ‘বাঘুয়া, আমরা এত বড়ো কাজ কি পারব?’
—কেন পারবে না? পারতে তোমাদের হবেই। গানটা তোমাদের মুখস্থ আছে তো?
—হ্যাঁ।
—আবৃত্তি করো দেখি—
কুমিরের গুহায় বসে গহীন রাত্রে ডোরা, ডোনারা যে-গান মুখস্থ করেছিল, সেই স্মৃতি আবার তাদের মনে ভেসে উঠল। বাচ্চারা সমস্বরে বলল—
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।।
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ—
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান।।
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা—
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।।
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন—
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।।
আবৃত্তি শেষ করে ডোনা বলল, ‘কিন্তু আমরা তো সুর, তাল, লয় কিছুই জানি না, বাঘুয়া।’
বাঘুয়া বলল, ‘বা:, বেশ মুখস্থ হয়েছে। সুর, তাল, লয় নিয়ে তোমরা চিন্তা কোরো না। সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন