সৌম্য ভট্টাচার্য
চিরকালের সেই সোনার বাংলা ধূসর কুয়াশায় ঢেকে গেছে। হয়ে গেছে ধূসর বাংলা। সেখানে মানুষজন, পশুপাখি, গাছপালা, সবারই খুব দুর্দিন। দেশের বাতাসে বিষ, জলে বিষ, ডাঙায় বিষ। কিছুই সেখানে ফলে না। মানুষজন বড়ো দুঃখী সেখানে। তারা কখনো আধপেটা খেয়ে, কখনো অনাহারে দিন কাটায়। রোগে, ভোগে, শোকে, দুঃখে দেশটার কোথাও হাসি নেই, মজা নেই, আনন্দ নেই। আনন্দ থাকবে কী করে? বাংলার মা, যিনি সবার মা, তিনিই তো ভালো নেই। শ্বেতরাক্ষসেরা সেই যে তাঁর বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়ে চলে গেছে, সেই ঘা তো শুকোয়নি। মায়ের মৃত্যু নেই, তাই তিনি মরেননি। কিন্তু তিনি অসুস্থ, খুব অসুস্থ।
মকররাজের যক্ষপুরীর বিশাল প্রাসাদে, সাততলার এক কোণের ঘরে মা বন্দি হয়ে আছেন। মকররাজ প্রতিদিন সেই ঘরে বিষের ধোঁয়া ছেড়ে মা-কে মারতে চেষ্টা করে। মা-কে দেখভাল করার জন্য একটা ডাইনিকে রেখে দিয়েছে সে, যে প্রতিদিন ক্ষতটাকে পরিচর্যা করার নামে সেখানে বিষ ঢালে। সে বিষের জ্বালায় মায়ের জ্বর আসে। সারা শরীর থর থর করে কাঁপতে থাকে। তবু মা মরেন না। একলা ঘরে শুয়ে শুয়ে খালি চোখের জল ফেলেন।
আসলে সব কিছু খুব নিরাশাজনক মনে হলেও মা-র মনের কোণে এখনও অল্প একটু আশা রয়েছে। বহুদিন আগে এক ঋষি-কবি একটা জাদু গান লিখে গেছিলেন। তিনি বাংলা মায়ের একনিষ্ঠ সেবক ছিলেন। সারাটা জীবন প্রাণপণে বাংলা মায়ের সেবা করেছিলেন। শেষ বয়সে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, দেশের ভয়ংকর দুর্দিন আসছে। বাংলা মা-র বুক দু-খান হবেই হবে। কেউ তা আটকাতে পারবে না। উপায় কী? কীভাবে তা আটকানো যায়? কীভাবেই বা বাংলা মা-র ক্ষত সারিয়ে দেওয়া যায়?
কবি অনেক ভেবেছিলেন। ভেবে ভেবে প্রথমে কূলকিনারা পাননি। শেষে তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে। তাঁরই লেখা একটা গানে তিনি জাদুমন্ত্র ভরে দিয়ে যাবেন। চারজন নিষ্পাপ ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ে যদি বাংলা মা-র সামনে সুরে-তালে-লয়ে গানটা গাইতে পারে আর সেই সঙ্গে যদি বাংলা মায়ের হাতে পরিয়ে দিতে পারে দুটো জাদু রাখি, তাহলে মায়ের রোগ ভালো হয়ে যাবে। দেশের মঙ্গল হবে। কুয়াশা কেটে যাবে। দেশ আবার ধনে, ধান্যে, পুষ্পে ভরে উঠবে। সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা হয়ে উঠবে। দেশের মানুষের মুখে হাসি ফুটবে। জলের বিষ, ডাঙার বিষ, আকাশের বিষ, বাতাসের বিষও সেই জাদুমন্ত্রে কোথায় উবে যাবে।
দেশের পুরাণে এও লেখা আছে যে, একদিন চারটে ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ে আসবে। আসতে তাদের হবেই। না-এসে তারা পারবে না। তারা এসে বাংলা মা-র বুক জুড়িয়ে দেবে।
মকররাজ আর তার চ্যালা-চামুন্ডারা এই ভবিষ্যদবাণীর কথা বিলক্ষণ জানে। জানে বলেই তারা সারা দেশে এমন বিষ ছড়িয়েছে যে, নিষ্পাপ বাচ্চা নেই বললেই চলে। ইস্কুলে, পাঠশালায়, মাদ্রাসায়, মক্তবে ছোটো ছোটো বাচ্চাদের তারা বিষ খাওয়াচ্ছে। বাচ্চারা প্রথমে না-জেনে বিষ খায়। বিষ খেতে তাদের বেশ মজাদার লাগে। কিছুদিনের মধ্যেই তারা খোক্কোস হয়ে যায়। তখন সাধারণ ভাত, ডাল, মাছ, চচ্চড়ি তাদের মুখে রোচে না। তখন তাদের বিষ খাওয়াতেই আনন্দ। বিষে গলা নীল হয়ে যায় বলে তারা সর্বদা গলা ঢেকে চলে। নানা রকম রঙচঙে মোড়কে দেশের সব জায়গায় বিষের বড়ি বিক্রি হয়। অবশ্য সব্বাই বিষ খায়নি, তাহলে তো দেশের কোনো আশাই থাকত না। দেশের গাঁয়ে, গঞ্জে কিছু কিছু ভালো মানুষ এখনো পাওয়া যায়। তবে তারা খোক্কোসের দাপটে মাথা নীচু করে চলে। মিনমিনে সুরে কথা বলে। বাইরে বেরোতে সাহস পায় না।
পশুপাখি, জন্তুজানোয়ারদের মধ্যে বিষের বড়ির অতটা প্রচলন হয়নি। তবে খোক্কোসদের দাপট দেখে পশুপাখিদের কেউ কেউ তাদের দলে ভিড়েছে। শেয়ালপন্ডিত, যিনি আগে পাঠশালা চালাতেন, তিনি এখন মকররাজের সভাপন্ডিত। তা ছাড়া দেশের বিচারব্যবস্থার দেখাশোনার ভারও তাঁর হাতে। তাই তাঁর আরেক নাম ন্যায়াধীশ। শেয়ালপন্ডিত আজকাল চলাফেরা করতে পারেন না। সবসময়ে হুইল চেয়ারে বসে থাকেন। দুষ্টু লোকে বলে যে, এক তালগাছ থেকে আচমকা পড়ে গিয়ে কোমরে চোট খেয়ে তিনি হাঁটাচলার শক্তি হারিয়েছেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন