যুদ্ধযাত্রা

সৌম্য ভট্টাচার্য

বিভীষণ যক্ষপুরীতে ঢোকার গোপন পথ বাতলে দেওয়ার পর বাঘুয়াদের তরফে অবিলম্বে এক গোপন রণপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল যে, রাতের অন্ধকারে অভিযান হবে। দেঁতো কুমির তার সঙ্গে আরো জনা বিশেক অতিকায় খাঁড়ির কুমিরকে নিয়ে খোক্কোসদের কাটা খাল ধরে যক্ষপুরীতে ঢুকেই বিষকুন্ড চুমুক দিয়ে সাফ করে দেবে। এদিকে স্থলপথে নেতৃত্ব দেবে বাঘুয়া। তার সঙ্গে থাকবে ডোরা, মিতুল, নীলু, বনের পশুপাখি আর দধিকর্মার অজেয় এক অক্ষৌহিণী ছুঁচোর ফৌজ।

সেই মতো কুচকাওয়াজ করতে করতে তারা বনের সীমানা পেরিয়ে যক্ষপুরীর দিকে এগিয়ে চলল। লক্ষ্মীপ্যাঁচা সুষমা তাদের আগে আগে উড়ছিল, পথ বাতলাচ্ছিল, বিপদ-আপদের সন্ধান দিচ্ছিল।

সেএক আশ্চর্য শোভাযাত্রা। দধিকর্মার ছুঁচোর ফৌজ মার্চ করতে করতে যাচ্ছে। পেছনে বাঘুয়া হাঁটছে রাজার মতো। তার পিঠে বসে চলেছে ডোরা, মিতুল আর নীলু। যেন খুব কোমল, নরম কার্পেটের ওপর বসেছে। মাঝে মাঝে বাঘুয়া মৃদু গরগর শব্দে বাচ্চাদের আশ্বস্ত করছে। সঙ্গে সঙ্গে চলেছে ইঁদুর, বাদুড়, সজারু, বেজি, ভোঁদড়, ভাল্লুক, গন্ডার, জলহস্তী, হাতি, গুলেবাঘ, চিতাবাঘ।

বিভীষণও কম্বলমুড়ি দিয়ে বাঘুয়ার পেছন পেছন চলছিল।

রাস্তা অনেকটা। নদীর তিনটে বাঁক তাদের পেরোতে হল। প্রথম দুটো বাঁকের পর জঙ্গল শেষ হয়ে এল। ডোরা, নীলু, মিতুল দেখল যে, এক রুক্ষ, শস্যবিরল প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে তারা চলেছে। পাথর ছড়ানো সে প্রান্তরে মাঝে মাঝে কাঁটা ঝোপ। গাছপালা নেই। গাঢ় অন্ধকার। ওপরে শন শন শব্দে বইছে ঠাণ্ডা বাতাস। এরপর নদীটা চওড়া হয়ে এল। ডোরারা দেখল যে, তাদের সামনে এক বিশাল সাঁকো। বিশালদেহী খোক্কোস প্রহরীরা মশাল হাতে সে সাঁকো পাহারা দিচ্ছে।

‘কে যায়?’ গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন এল।

ডোরা, মিতুল, নীলু দেখল যে, বাঘুয়ার চেহারা বদলে গেছে। তার চলনে, বলনে এক বলদৃপ্ত ভাব। রাগে তার শরীরের সমস্ত রোঁয়া ফুলে উঠেছে। সশব্দে ল্যাজ আছড়িয়ে, আকর্ণবিস্তৃত হাঁ করে ভয়ংকর শ্বাদন্ত বের করে সে প্রবল গর্জন করে উঠল।

এরকম আওয়াজ ডোরা, মিতুল, নীলু আগে কখনো শোনেনি। যেন একসঙ্গে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত আর ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। সে গর্জনে যক্ষপুরীর বিশ হাত উঁচু পাঁচিলের বেশ কয়েকটা পাথর খসে গেল। সিং-দরজার ওপর বসা যক্ষপুরীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী নিকষা, সেই প্রকান্ড পাথরের শকুন প্রবল আর্তচিৎকার করে উঠল। তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে রক্ত ঝরতে শুরু করল। যে শয়ে শয়ে সশস্ত্র খোক্কোস পাঁচিলের সামনে-পেছনে এবং মাথায় পাহারা দিচ্ছিল, তারা ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে শুরু করল। তাদের কেঁপে ওঠার যথেষ্ট কারণ ছিল। দেশের পুরাণে ভবিষ্যদবাণী ছিল যে, যেদিন যক্ষপুরীর অধিষ্ঠাত্রী নিকষার চোখ দিয়ে রক্ত ঝরবে, সেদিন যক্ষপুরীর তথা মকররাজের পতন হবে।

যক্ষপুরীর নিভৃত ডেরায় বসে আহত কালাপাহাড় বিশ্রাম নিচ্ছিল। নন্দিনীর কুঠারের ঘায়ে তার দুটো শুঁড় জখম হয়েছে। বাঘুয়ার গর্জনে সে ব্যস্ত হয়ে ডেরা থেকে বেরিয়ে বিষকুন্ডের দিকে ধেয়ে গেল। সেও বুঝেছে যে, একটা চরম সংগ্রাম, একটা অন্তিম যুদ্ধের মাহেন্দ্রক্ষণ এসে গেছে।

সেই সময় বাঘুয়া ডোরা, মিতুল আর নীলুর দিকে তাকিয়ে ফিস ফিস করে বলল, ‘বাচ্চারা! ভয় পেয়ো না! আমায় শক্ত করে ধরো।’

ডোরা, মিতুল আর নীলু বাঘুয়ার পিঠ আঁকড়ে ধরতেই বাঘুয়া গর্জন করে, গুঁড়ি মেরে, পিঠ বাঁকিয়ে এক প্রচন্ড লাফ দিল।

সে তো লাফ নয়, সে যে ডানা মেলে উড়ে চলা! বাচ্চাদের মনে হল যেন মাধ্যাকর্ষণ লুপ্ত হয়ে গেছে! প্রবল গতিতে তারা মহাশূন্যের মধ্যে দিয়ে ভেসে চলেছে। ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপট লাগছে মুখে। কানের পাশে শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। সে উড়ান যেন শেষ হওয়ার নয়! তারপর বাঘুয়া এরোপ্লেনের মতো নেমে এল। সাঁকো পেরিয়ে, যক্ষপুরীর বিশাল পাঁচিল ডিঙিয়ে সে সটান যক্ষপুরীর বিস্তৃত প্রাঙ্গণে এসে নামল। নেমেই সে আবার গর্জন করে উঠল।

বাঘুয়ার গর্জনে বহু খোক্কোসই অজ্ঞান হয়ে গেছিল। তার থাবার ঘায়ে তৎক্ষণাৎ বেশ কিছু প্রহরী অক্কা পেল। কাঁধের এক প্রবল ধাক্কায় বাঘুয়া যক্ষপুরীর সিং-দরজা ভেঙে ফেলল।

দধিকর্মার ছুঁচোর ফৌজ বাইরে অপেক্ষা করছিল। বাঘুয়ার অতর্কিত আক্রমণে যক্ষপুরীর সিং-দরজা ভেঙে যেতেই সেই সুশৃঙ্খল ত্রিশূলধারী ছুঁচোর দল পিল পিল করে যক্ষপুরীর মধ্যে ঢুকে পড়ল। খোক্কোসদের সঙ্গে ছুঁচোদের মরণপণ সংগ্রাম শুরু হল।

ডোরা, মিতুল, নীলু একপাশে অপেক্ষা করছিল। সিং-দরজা দিয়ে সনাতন ভোঁদড় আর বিভীষণ ঢুকে পড়েছে। ওদের দু-জনকে কাছে ডাকল বাঘুয়া।

বিভীষণ তুমি আমায় বিষকুন্ডের পথটা দেখিয়ে দাও, কেন না আমার মন বলছে যে, কালাপাহাড়ের সঙ্গে শেষ লড়াইটা আমার ওখানেই হবে। আর তোমাদের একটা খুব বড়ো কাজের ভার দিচ্ছি।

‘কী কাজ, বাঘুয়া?’ সমস্বরে জিগ্যেস করল সনাতন আর বিভীষণ।

—সবচেয়ে বড়ো, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ডোনাকে খুঁজে বের করো। তারপর চার বাচ্চাকে নিরাপদে পথ চিনিয়ে বাংলা মায়ের ঘরে পৌঁছে দাও। ওদের আজ রাখিসংগীত গাইতে হবে।

বাঘুয়াকে বিষকুন্ডের পথ বাতলে দিয়ে সনাতন আর বিভীষণ ডোরা, মিতুল আর নীলুকে নিয়ে তাদের আরব্ধ দায়িত্ব পালন করতে ব্যস্ত হয়ে উঠল।

দায়িত্ব ছোটোখাটো নয়। এই বিশাল পুরীতে কোথায় ডোনা বন্দি হয়ে আছে, তা খুঁজে বের করাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। বিভীষণ বাংলা মায়ের ঘরে প্রতিদিন নিয়ম করে বিষের ধোঁয়া ছাড়ত। সুতরাং সে-ঘর খুঁজে পাওয়াটা কোনো সমস্যাই নয় তার কাছে। তাই প্রথম প্রশ্ন হল, ডোনাকে কী করে খুঁজে পাওয়া যাবে?

সেই রাত্রে বাঘুয়াদের আক্রমণে প্রবল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অন্ধকারে মশাল হাতে খোক্কোসরা দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক দৌড়োচ্ছে। দূর থেকে যুদ্ধের শব্দ ভেসে আসছে। বাঘুয়ার হুংকার, হাতির বৃংহিত, খোক্কোসদের আর্তনাদ, ছুঁচোদের কিচমিচ মিলেমিশে এক মিশ্র কোলাহলের সৃষ্টি করছে।

যক্ষপুরীর একতলায় বিশাল হলঘর। সেখান থেকে ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে। সেই হলঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে বিভীষণ, সনাতন আর তিন বাচ্চা শলাপরামর্শ করতে লাগল, কী করা যায়? কী করা যায়?

হঠাৎ সনাতন ভোঁদড়ের মুখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল। তার কান খুব তীক্ষ্ণ। সে বলল, ‘কোথায় যেন শেয়ালের ডাক শুনছি? শেয়ালপন্ডিত কী ডাক পাড়ছে?’

শেয়ালের ডাক?—কণা, মিতুল, নীলু আর বিভীষণ ব্যস্ত হয়ে সে-আওয়াজ শোনার চেষ্টা করতে লাগল।

বিভীষণ বলল, ‘এ তো শেয়ালপন্ডিতের গলার শব্দ নয়। তার গলার আওয়াজ আমি বিলক্ষণ চিনি।’

ডোরা খুব মন দিয়ে চোখ বুজে শুনছিল। এতক্ষণে সে চোখ মেলে তাকাল। তার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত। হাসতে হাসতে সে বলল, ‘এটা শেয়ালের ডাক নয়! ডোনা গান গাইছে! ওকে আমরা খুঁজে পাব! ও বেঁচে আছে!’

সনাতন বলল, ‘ঠিক জানো, এটা শেয়ালের ডাক নয়? বনে বাদাড়ে খ্যাঁকশেয়ালরা প্রেমে পড়লে এরকমই ডাক ছাড়ে!’

ডোরা সাংঘাতিক চটে গেল। বলল, ‘সবজান্তার মতো ফট ফট করে এঁড়ে তক্কো কোরো না তো, সনাতন! যাকে শেয়ালের ডাক বলছ, সেটা আসলে একটা গান, একটা বিখ্যাত গান! ক্রিসটিনা অ্যাগুইলেরার ‘ফাইটার’! আমার আর ডোনার খুব প্রিয় গান এটা! আমি আর ডোনা প্রতিদিন দেশে থাকতে এই গান গাইতাম!’

বলতে বলতে ডোরা সেই গানের উৎসমুখকে লক্ষ করে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে দুড়দাড় করে উঠতে লাগল। তার পেছনে পেছনে লাফাতে লাফাতে উঠতে লাগল সনাতন ভোঁদড়, বিভীষণ, নীলু আর মিতুল। তারপর তারা কীভাবে ডোনার ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল, সে-গল্প তো আগেই করে নিয়েছি।

সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%