সৌম্য ভট্টাচার্য
সনাতনের কথায় আশ্বস্ত হয়ে ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু সনাতনদের পিছু পিছু কুমিরের গর্তে ঢুকে পড়ল। বাইরে থেকে গর্ত বলে মনে হলেও আসলে এটা একটা বিরাট গুহা। ভেতরটা অন্ধকার হলেও বেশ চওড়া এবং আরামদায়ক। রেড়ির তেলের প্রদীপের মৃদু আলোয় এক ভৌতিক আবছায়া পরিবেশ। কুমির-গিন্নির রান্নার হাতটাও সত্যিই খাসা। ইলিশ-খলিশের চচ্চড়ি, রুই-কাতলার গড়গড়ি, চিতল-বোয়ালের মড়মড়ি তো হলই। সঙ্গে কুমির-গিন্নি লোইট্যা মাছের ভর্তা আর লোইট্যার বড়াও চটপট তৈরি করে ফেলল।
দেঁতো কুমির তার ল্যাজের আগায় প্লেটে প্লেটে সাজিয়ে যখন ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুর সামনে এইসব খাবার আনতে লাগল, তখন কেউ না করতে পারল না।
এমনিতে ডোরা, ডোনা এসব খাবার ছুঁয়েও দেখে না, কিন্তু কালাপাহাড় আর খোক্কোসদের তাড়া খেয়ে, নদীতে সাঁতরে তাদের সবার খিদেও পেয়েছিল সাংঘাতিক। কুমির ল্যাজের ডগায় করে প্লেট আনে আর মুহূর্তে সে-খাবার উড়ে যায়। সনাতন, সনাতন-গিন্নি, মা-ভোঁদড়, হ্যাংলা, ল্যাংড়া আর খাই-খাই-ও আকন্ঠ খেয়ে হাঁসফাঁস করতে লাগল। খাবারপর্ব শেষ হতে, কুমির-গিন্নি সব বাসন ঘষে-মেজে পরিষ্কার করে, গামছায় মুখ মুছে, দাঁতন দিয়ে দাঁত মেজে, ভব্য-সভ্য, পরিপাটি হয়ে জিরোতে বসল।
খাওয়া চলাকালীন বাঘুয়ার প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। এখন ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুর মনে হল যে, আবার সে-ব্যাপারে কথা তোলে। আসলে বাঘুয়ার নাম শুনলেই সবার মধ্যে কেমন যেন একটা সুখ, আনন্দ আর ভরসার বোধ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন খুব বিশ্বাসী, খুব ভালো অথচ খুবই শক্তিমান কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রসঙ্গে তারা কথা বলছে। তা ছাড়া চারপাশে ছড়িয়ে থাকা যে-ভয় আর শঙ্কার পরিবেশ তাদের দম বন্ধ করে দিচ্ছিল, যে-পরিবেশে মকররাজ, খোক্কোস আর কালাপাহাড়ের কালো ছায়া সব কিছু ঘিরে রেখেছে, সব কিছু গ্রাস করে রেখেছে, সেখানে বাঘুয়ার নাম করলেই যেন একঝলক টাটকা বাতাস বয়ে আসে।
ডোনা তাই ভোঁদড়বুড়িকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি বাঘুয়াকে নিজের চোখে দেখেছিলে?’
—হ্যাঁ গো, যেমন তোমায় দেকচি। তেমনই স্পষ্ট। আহা কী তার রূপ! কী তার গুণ!
—বলো না মাসি, তার গল্প বলো না?
—বাঘুয়া থাকলে কি দেশের এই হাঁড়ির হাল হয়? খোক্কোসদের এত রমরমা হয়?
—বাঘুয়া কোথায় গেল?
—কেউ জানে না। সে এক্কেবারে উধাও হয়ে গ্যাচে।
তারপর সবার অনুরোধে বুড়িভোঁদর এই গল্প করল। মিটমিটে রেড়ির তেলের বাতিতে আলোকিত কুমিরের গুহায় বসে ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু, ভোঁদড়-পরিবার আর দুই কুমির কান খাড়া করে বাঘুয়ার গল্প শুনল,
দেশের তকন খুব দুর্দিন। শ্বেতরাক্কোসের রাজত্ব। দুর্ভিক্কে দেশ উজাড় হয়ে গ্যাচে। শ্বেতরাক্কোসের বিষে পাগল হয়ে মানুষ খোক্কোস হয়ে যাচ্চে। ভাই ভাইয়ের বুকে ছুরি চালাচ্চে। দুখিনী বাংলা মা-কে দেকার কেউ নেই।
তখন দুখিনী বাংলা মা, বনের রাজা বাঘুয়াকে ডেকে বলল, ‘বাঘুয়া, আমাকে তো দেকার কেউ নেই। তুই কিচু কর।’
বাঘুয়া মাকে প্রণাম করে বলল, ‘বলো, মা, কী কত্তে পারি।’
—তুই শ্বেতরাক্কোসদের তাড়িয়ে দে। ওদের বিষেই দেশের সব্বোনাশ হচ্চে।
বাঘুয়া মাকে প্রণাম করে বলল, ‘মা, আমার তো একার সে জোর নেইকো। শ্বেতরাক্কোসদের অনেক যন্তর, অনেক মন্তর, অনেক সেপাই, অনেক সান্ত্রী, অনেক দড়া, অনেক দড়ি, অনেক অশ্ব, অনেক করী। তারাই তো দুনিয়াটাকে দখল করে রেকেচে, মা।’
মা তকন কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘বাঘুয়া, আমায় কি তবে কেউ দেকবে না? কেউ কিচু করবে না?’
বাঘুয়া বলল, ‘মা, আমি একা পারব না। আমি পীতরাক্কোসের দেশ থেকে সাহায্য আনব। তারা শ্বেতরাক্কোসদের শত্তুর।’
—এক রাক্কোস তাড়াতে আরেক রাক্কোসের সাহায্য নিবি? সেটা কি ভালো হবে? সে রাক্কোসরা যদি দেশের বুকে চেপে বসে?
—তোমায় বাঁচাতে দরকার হলে নরকে গিয়ে শয়তানের সাহায্য নেব, মা। তুমি ভেব না, আমি যেমনি করে পারি, তোমায় উদ্ধার করব।
বলে তো বাঘুয়া দেশ ছেড়ে চলে গেল। বচরখানেক বাদে যকন ফিরল, তকন তার সঙ্গে এক বিরাট সৈন্যদল। পীতরাক্কোসদের সঙ্গে তকন শ্বেতরাক্কোসদের ধুন্ধুমার যুদ্ধু চলচে। পীতরাক্কোসরা বাঘুয়াকে অস্তর দিয়েছে। সেপাই দিয়েচে। সৈন্য দিয়েচে।
ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলু রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল। তারা সমস্বরে বলল, ‘তারপর?’
বাঘুয়া যুদ্ধু করেচিল বটে। কী তার দাপট! কী তার গর্জন! কী তার ল্যাজের ঝাপটানি! শ্বেতরাক্কোসরা তো প্রথমে হেরেই যাচ্চিল। শেষপর্যন্ত নানা ছলেবলেকৌশলে তারা জিতে গেল। বাঘুয়া আর পীতরাক্কোসরা হেরে গেল।
বাঘুয়ার কী হল?
সব যকন শেষ, আহত বাঘুয়ার সারা গা থেকে রক্ত ঝরচে, ঘা চাটতে চাটতে সে শেষবার বাংলা মা-র কাচে এল। বলল, ‘মা, পারলাম না। এবারের মতো হেরে গেলাম।’
—তবে কী উপায় বাঘুয়া?
—মা, আমি হাল ছাড়চি না। এবার আইরাক্কোস, কাইরাক্কোসদের দেশে যাব। তারাও শ্বেতরাক্কোসের শত্তুর। তাদের কাচে সাহায্য চাইব। তুমি ভেব না, মা। তোমায় আমি উদ্ধার করবই।
বলে বাঘুয়া সেই যে চলে গেল, আর সে ফিরল না। আর তার দেকা পাওয়া গেল না।
—বাঘুয়া কোথায় গেল?
‘সে যে কোতায় গ্যাচে, কোতায় আচে, কেউ তা জানে না’—ভোঁদড়বুড়ি কান্নাভেজা গলায় বলে চলল, ‘কেউ বলে সে পীতরাক্কোসের দেশে আচে। কেউ বলে যে, আইরাক্কোস, কাইরাক্কোস তাকে বন্দি করে রেকেচে। কেউ বলে যে, সাঁতরাতে গিয়ে সে মাঝদরিয়ায় ডুবে মারা গ্যাচে—বাঘুয়া ঘরে ফেরে নাই! বাঘুয়া ঘরে ফেরে নাই! বাঘুয়া ঘরে ফেরে নাই!’
—ভোঁদড়বুড়ি চোখের জলে বুক ভাসিয়ে কাঁদতে লাগল।
—তুমি তাকে নিজের চোখে দেখেছিলে?
—হ্যাঁ গো। তোমায় যেমন দেকচি।
—কবে? কখন?
—শেষবারের মতন যকন বাঘুয়া সৈন্যসামন্ত সাজিয়ে শ্বেতরাক্কোসদের সঙ্গে যুদ্ধু করতে যাচ্চে, তকন একঝলক তাকে দেকেচিলাম গো। কী ভালো! কী সুন্দর! কী তার তেজ! কী তার সহবত! সৈন্যদের সামনে সে পা ফেলে ফেলে এগোচ্চিল। বাঘুয়া থাকলে কি দেশের এই হাঁড়ির হাল হয়? কালাপাহাড়, খোক্কোস আর মকররাজের এত রমরমা হয়?
ভোঁদড়বুড়ির উপাখ্যান শেষ হওয়ার পর কুমিরের গুহায় স্তিমিত আলোয় এক জোরদার তর্ক জমে উঠল। তর্কের বিষয় বাঘুয়া আদৌ বেঁচে আছে কিনা। থাকলে সে কোথায় আছে এবং তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা কতটা।
ভোঁদড়বুড়ি, দেঁতো কুমির ও কুমিরগিন্নির বিশ্বাস, বাঘুয়া এখনো বেঁচে আছে। দেশের দুর্দিনে সে ফিরে আসবেই। হ্যাংলা ও ল্যাংড়ার মতো অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্মের ভোঁদড়রা অবশ্য বাঘুয়ার বেঁচে থাকার গল্পে বিশ্বাস করে না। ওরা স্পষ্টই ভাবে যে, এসব বুড়োদের মতিভ্রম।
ল্যাংড়া তো স্পষ্ট বলেই ফেলল, ‘তোমরা বাঘুয়া বাঘুয়া করে যতই লাফাও, বাঘুয়া আর ফিরচে না। সে অনেকদিন হল অক্কা পেয়েচে।’
হ্যাংলাও সায় দিল, ‘এতদিনেও তার টিকি দেকা যায়নি। সে নির্ঘাৎ মরেচে।’
সনাতন অবশ্য আশাবাদী, ‘তোরা দেকিস, বাঘুয়া ফিরবেই। দেশের দুঃকে সে কি স্থির থাকতে পারবে?’
বাঘুয়া বেঁচে থাকলে সে কোথায় আছে, তা নিয়েও প্রবল মতভেদ হল। বাঘুয়া যে দরিয়ায় ডুবে মরেছে, সেটা কেউই বিশ্বাস করে না। দেঁতো কুমির বলল, ‘ও সব শ্বেতরাক্ষসদের বানানো গল্প। আসল কথা হল মকররাজ আর কালাপাহাড় মিলে শ্বেতরাক্ষসদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে বাঘুয়াকে কোথাও বন্দি করে রেখেছে।’
—কেন?
—মকররাজ দেশের তাল তাল সোনা বিদেশে পাচার করছে। দেশের বুকের রক্ত চুষছে। বাঘুয়া ফিরলে সে কি এসব করতে পারত? বাঘুয়ার এক থাপ্পরে ঠাণ্ডা হয়ে যেত।
—বাঘুয়াকে কি আইরাক্ষস, কাইরাক্ষস বন্দি করে রেখেছে?
—রাখতে পারে। কিছুই আশ্চর্য নয়।
সনাতন বলল, ‘আমার মনে হয় খাই-খাই, তুই ঠিকই দেকেচিস।’
—কেন বাবা?
—আমার মন বলচে যে, বাঘুয়ার ফেরার সময় হয়েচে।
—কেন?
—পুরাণের কতাটা ভুলে গেলি? আজকালের ছেলে-ছোকরারা কেউ পুরাণ পড়ে না।
নীলু জিগ্যেস করল, ‘কেন পুরাণে কী লিখেছে?’
—আমাদের এক পুরোনো ঋষি কবি ছিলেন গো! তিনি ভূত, ভবিষ্যৎ সব দেখতে পেতেন। তিনি এক ভবিষ্যদবাণী করে গ্যাচেন।
—কী সে ভবিষ্যদবাণী?
—দেশের খুব দুর্দিন আসবে। কুয়াশায় ঢেকে যাবে সারাদেশ। খোক্কোসের রাজত্ব হবে। জলে বিষ, বাতাসে বিষ, সব জায়গায় বিষ ছড়িয়ে যাবে। সাগরের জল ফুলে উঠে দেশকে ডুবিয়ে দিতে চাইবে।
ডোরা, ডোনা স্কুলে এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশন পড়েছে। ডোনা ডোরাকে ফিস ফিস করে জিগ্যেস করল, ‘ডোরাদিদি, ইজ হি টকিং অব আর্সেনিক পয়জনিং অব গ্রাউণ্ড ওয়াটার?’
—প্রোব্যাবলি।
—আওয়ার বুকস টেল আস দ্যাট গ্লোবাল ওয়ার্মিং উইল ওয়ান ডে রেইজ সি লেভেলস অ্যাণ্ড কজ ফ্লাডস।
—কুড বি। আই থিংক ইউ আর অনটু সামথিং।
ডোরা-ডোনার ফিসফিসানি সনাতন শুনতে পেল না। সে বলে চলল, ‘সেই দুর্দিনে আমাদের কবি পুরাণে লিকে গ্যাচেন যে, চার-চারটে ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ে আসবে। তাদের সঙ্গে সঙ্গে বাঘুয়াও ফিরবে। তকনই দেশের দুর্দিন ঘুচবে, সুদিন ফিরবে।’
ডোরা, ডোনাদের দিকে তাকিয়ে সনাতন বলে চলল, ‘আমার তো স্থির বিশ্বাস যে, তোমরাই সে বাচ্চারা। দেকচো না, খোক্কোসরাও তোমাদের ভয় পায়। তাই আসতে-না-আসতেই ইস্তাহার টাঙিয়েচে। তোমাদের ধরবার জন্য কালাপাহাড়কে লেলিয়ে দিয়েচে।’
দেঁতো কুমির বলল, ‘তোমরা যে আসছ, তা বাতাসে কানাকানি হয়ে ছড়িয়ে গেছে। আমাকে তো সুষমা বলল।’
সনাতন উৎসাহিত হয়ে উঠল, ‘ঠিক! ঠিক! সুষমা তো আমাকেও বলল। বলল, ‘সনাতন, যাও। শিগগির যাও। চার চারটে বাচ্চা দূর দেশ থেকে এয়েচে। তাদের খুব বিপদ!’
সুষমা মানে গত রাতের প্যাঁচাটা? ডোরা-ডোনাদের তার কথা মনে করে হাসি পেয়ে গেল।
দেঁতো কুমির বলল, ‘তা সনাতন, তোমার অত সুন্দর বাড়ির তো বারোটা বাজল।’
—হ্যাঁ, কত কষ্টে, কত দুঃখে, না খেয়ে, না দেয়ে ঘরটা করেচিলাম। খোক্কোসরা বিষের ধোঁয়া ছেড়ে সব নষ্ট করল। যাক কী আর করব। বাঘুয়া ফিরলে ওকে বলব ঘরটা আবার বানিয়ে দিতে।
ভোঁদড়বুড়ি ঘর আর বাঘুয়ার শোকে আর্তস্বরে বলে উঠল, ‘বাঘুয়া ঘরে ফেরে নাই! বাঘুয়া ঘরে ফেরে নাই! বাঘুয়া ঘরে ফেরে নাই! সে ফিরলে তবে তো আমাদের ঘর হবে!’
বলতে বলতে রেড়ির তেলের আলো দপ করে নিবে গেল। কুমিরের গুহায় ঝপ করে নেমে এল ঘন রাতের অন্ধকার। গুহাটা বিশাল। এককোণে ভোঁদড়পরিবার শুয়ে পড়ল। কুমির, কুমির-গিন্নি আরেক দিকে। ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুও এককোণ খুঁজে গুটিশুটি মেরে ঘুমের আয়োজন করল।
গুহার মধ্যে বিচিত্র নাসিকাধ্বনি শুরু হল। ভোঁদড়বুড়ির—ফোঁৎ, ফোঁৎ। কুমির, কুমিরগিন্নির—ঘড় ঘড়াৎ! সনাতনের—ঘুড়ুৎ! খাই-খাইয়ের—ফুড়ুৎ! এত সব শব্দের মধ্যে ডোরা, ডোনাদের ঘুম সহজে এল না। নানা চিন্তা খেলছে তাদের মাথায়। বাবা-মার কাছ থেকে কোন জাদুমন্ত্রে তারা চলে এসেছে এক আশ্চর্য দেশে, সেখানে ভোঁদড়, প্যাঁচা, কুমির কথা বলে! কুয়াশায় ঢাকা সে-দেশে মকররাজ, খোক্কোস আর কালাপাহাড়ের রাজত্ব। কেমন একটা দমবন্ধ, ভীত, সন্ত্রস্ত পরিবেশ। কুমির আর কুমির-গিন্নি খুব খাতির করছে বটে, কিন্তু বাগে পেলে তাদের যে জলখাবার করে ফেলবে না, তাই-বা কে বলতে পারে? আর বাঘুয়া! সেই আশ্চর্য বাঘ! সারা জঙ্গল যার পথ চেয়ে বসে রয়েছে। সে কি ফিরবে? সে কি সত্যিই ফিরবে?
নীলু মিতুলকে ঠেলা দিল, ‘মিতুলদিদি, বাঘুয়া কি ফিরবে?’
‘কে জানে?’ ঘুম জড়ানো গলায় বলল মিতুল।
হঠাৎ ডোরার খেয়াল হল— ‘ডোনা! নীলু!—তোদের রাখিদুটো আর গান লেখা কাগজটা কোথায় রে?’
শুনে তো ডোনা আর নীলুর চক্ষু চড়কগাছ। তাই তো! ওগুলো ঠিকঠাক আছে তো!
চারজনেই ধড়মড় করে উঠে বসে অন্ধকারে পকেট হাতড়াতে লাগল। ডোনা আর নীলুর পকেট থেকে জলে ভেজা, চোপসানো রাখিদুটো বেরোল। খোক্কোসদের তাড়া খেয়ে সাঁতরাতে গিয়ে তাদের এই দশা হয়েছে। কিন্তু গান লেখা কাগজটা? সেটা কোথায়? সেটা কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না।
ডোনা বলল, ‘নীলু, গান লেখা কাগজটা কোথায় রাখলি?’
নীলু বলল, ‘তুই তো রাখলি?’
ডোনা—ডোরাদিদি, নীলু আমার নামে মিছিমিছি দোষ দিচ্ছে। আই অ্যাম নট রেসপন্সিবল। আমি কিছু করিনি।
নীলু—দেন হু ইজ রেসপন্সিবল? কে করেছে?
দু-জনের মধ্যে ঝগড়াটা বেশ জমে উঠল। খুব একটা জোরে তারা চ্যাঁচাতে পারল না, কারণ কুমির আর ভোঁদড়দের ঘুম ভেঙে যাবে। তবে অন্ধকারেই পরস্পরের দিকে দাঁত খিঁচোতে এবং ভেংচি কাটতে লাগল তারা।
ডোনা বলল, ‘নীলু, ইউ আর আ লায়ার!’
নীলু—লায়ার! লায়ার!
প্যান্টস অন ফায়ার!
ডোরা আর মিতুল দু-জনের ঝগড়া মিষ্টি কথায় মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।
তারপর সবার মধ্যে আলোচনা শুরু হল গানটা গেল কোথায় তা নিয়ে।
কল্যাণীতে দাদুর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে লেখা গানটা শেষবার পড়েছিল ডোনা। অনন্তলাল ভট্টাচার্যের ডায়েরিটা পড়েছিল মিতুল। তারপর ওদের মধ্যে তর্ক জমে উঠেছিল রাখি দুটো, ডায়েরি আর কাগজ নিয়ে কী করবে তা নিয়ে। এমন সময় বৃষ্টি থেমে গিয়ে আকাশে একটা জাদুকরী রামধনু ওঠে। তখন রাখিদুটো পকেটে ভরে ওরা পায়ে পায়ে নেমে এসেছিল বাগানে। ওদের মনে পড়ল যে, গান লেখা কাগজটা ভাঁজ করে ডায়েরির ভেতর রেখে নিজেদের ঘরে ফেলে এসেছিল ওরা।
ঠাণ্ডা মাথায় আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তে এসে সবার কপালেই চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
ডোরা বলল, ‘আই থিংক দ্যাট সং ইজ ভেরি ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট।’
ডোনা বলল, ‘ইয়েস! ইয়েস! আই টু ফিল দ্যাট ইট ইজ ইন্টিমেটলি কানেক্টেড উইথ আওয়ার অ্যাডভেঞ্চারস।’
মিতুল বলল, ‘তবে কি ফিরে গিয়ে গানের কাগজ আর ডায়েরিটা নিয়ে আসব?’
ডোনা বলল, ‘ইয়েস! বাট হাউ ক্যান উই গো ব্যাক?’
সত্যিই তো বাগানের পুকুরের ফোকর গলে যে নদীর চরে এসে পৌঁছেছিল, খোক্কোসদের তাড়া খেয়ে তার থেকে বহুদূর চলে এসেছে তারা। কীভাবে ফিরে যাবে সেই নদীর চরে? কীভাবে ফিরে যাবে কল্যাণীর আদর-ঘেরা দাদু-দিদুনের বাড়ি, বাবা-মার কাছে? সারাটা জীবন কি খোক্কোসদের আতঙ্কে, মকররাজ আর কালাপাহাড়ের ভয়ে ভীত হয়ে, এই বিজন বিভুঁইতে তাদের কেটে যাবে? ভোঁদড় আর কুমির ছাড়া আর কারো মুখ দেখবে না?
ভাবতে ভাবতে সেই অন্ধকার, আরামদায়ক গুহারও মধ্যে ডোরা, ডোনা, মিতুল, নীলুর খুব শীত করতে লাগল। দুঃখে চোখ ফেটে জল এল তাদের।
ডোনা কান্নাভেজা গলায় বলল, ‘ডোরাদিদি, ক্যান উই নেভার গেট ব্যাক?’
—আই থিংক ইট উড বি ভেরি টাফ, ডোনা।
এমন সময় নীলুর মাথায় একটা ব্রেনওয়েভ খেলে গেল। আগেই বলেছি যে, নীলু খুব মেধাবী। শুনে শুনে অনেক কিছু সে মনে রাখতে পারে।
নীলু বলল, ‘লিসেন অল। গানটা তো খুব সহজ, সিম্পল গান। লেটস ট্রাই টু রিমেমবার দ্য ওয়ার্ডস। আমার তো প্রথম দুটো লাইন দিব্যি মনে পড়ছে।’
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।।
শুনে মিতুল লাফিয়ে উঠল—‘ঠিক! ঠিক! আমার পরের দুটো লাইনও মাথায় আসছে।’
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ—
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান।।
ডোরা বলল, ‘আশ্চর্য, আমার মাথায় এসে যাচ্ছে পরের লাইনদুটো!’
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা—
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।।
ডোনা বলল, ‘অ্যাণ্ড আই ডিসটিংকটলি রিমেমবার দ্য লাস্ট টু লাইনস!’
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।।
জাদুগানের এই আটটা লাইন স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে ওদের চারজনেরই মনে আবার বল-ভরসা ফিরে এল। একটু আগে যে হতাশা ওদের ঘিরে পাক খাচ্ছিল, তা কেটে গিয়ে যেন আশার আলো দেখতে পেল চারজনেই।
ডোনা বলল, ‘ডোরাদিদি, আই ফিল বেটার। আই ফিল অ্যাজ ইফ আ হিউজ লোড হ্যাজ বিন লিফটেড ফ্রম মাই শোলডারস।’
ডোরা বলল, ‘আই ফিল বেটার টু।’
নীলু বলল, ‘চল আমরা গানটা মুখস্থ করে নিই। লেটস মেমোরাইজ দ্য লাইনস। যাতে ভবিষ্যতে না ভুলি।’
গ্রেট আইডিয়া।
তখন সেই অন্ধকার কুমিরের গুহায় বসে, গহীন রাত্রে, ছোটো ছোটো চারটি ছেলে-মেয়ে রবীন্দ্রনাথের রাখিসংগীত আবৃত্তি করতে লাগল। বেশি জোর গলায় নয়, কারণ তাহলে অন্যদের ঘুম ভেঙে যাবে; তাই যথাসম্ভব নি:শব্দে, ফিসফিসে গলায়।
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবানশ
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ—
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবানশ
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা—
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবানশ
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন—
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবানশ
বারবার আবৃত্তি করে যখন গানটা মুখস্থ হয়ে গেল, তখন চারজনেরই বেজায় ঘুম পেয়েছে। গুটিশুটি মেরে কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল তারা। বাইরে অন্ধকার আকাশে তখন একটা একটা করে অসংখ্য তারা ফুটে উঠেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন