আবার আসিব ফিরে

সৌম্য ভট্টাচার্য

ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল যে এত বড়ো অ্যাডভেঞ্চার করে এল, সেটা কি তাদের মধ্যেই গুপ্ত থাকবে নাকি লোককে সেটা জানাতে হবে? বাচ্চারা একটু ভাবনায় পড়ে গিয়েছিল। এত বড়ো একটা ব্যাপার! বাংলা মায়ের ভাঙা বুক জুড়ে গেল। দেশের কুয়াশা কেটে গেল। মকররাজ, শেয়ালপন্ডিত, কালাপাহাড়ের মতো মারাত্মক দুষ্টুরা সব জব্দ হয়ে গেল—এমন একটা গল্প দেশের মানুষকে না জানালে চলে? কিন্তু জানাবে কীভাবে?

আগেই বলেছি যে, ডোরা, ডোনা বাংলায় তেমন দড় নয়। দু-লাইন বাংলা লিখতেই তাদের দুটো কলম ভেঙে যায়। নীলু আর মিতুলও পড়াশোনায় সদাব্যস্ত। উপন্যাস লেখার সময় কোথায় তাদের?

ডোরা-ডোনা প্রথমে ভাবল যে, বাবাকে ধরবে। বাংলা মায়ের কাছে তারা শুনেছে যে, বাবা ডাক্তার হলেও লুকিয়ে লুকিয়ে উপন্যাস লেখে! কিন্তু বাবাটা যেন কীরকম? সব শুনে যদি তাদের চটকে দেয় বা ধমকে ওঠে? তা ছাড়া বাবা যা লিখবে, তা যদি অপাঠ্য হয়? তিন কপিও যদি বিক্রি না হয়?

মা-কে বলার সাহস নেই। তাকে না জানিয়ে ডোরা, ডোনারা এত বড়ো অ্যাডভেঞ্চার করে এসেছে—সেটা জানতে পারলে মা টেনে তাদের কান লম্বা করে দেবে।

তাই ডোরা, ডোনা, নীলু, মিতুল বাধ্য হয়ে অগতির গতি তিলকমামাকে ধরল। এখন তিলকমামা ডোরা, ডোনাদের গাড়ি চালালে কী হবে; সে আসলে মনেপ্রাণে কবি! এমনকী ফাঁক পেলেই সে গাড়ির লগবুকে লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লেখে! গল্পটা শুনে সে তো খুব উৎসাহিত হয়ে পড়ল। তক্ষুনি লিখে ফেলে আর কী!

ডোনা তাকে থামাল। ডোনা ছোটোবেলা থেকেই খুব উদার প্রকৃতির। যখন সে টলমল পায়ে চলত, আধো আধো সুরে কথা বলত, তখনই সে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিত—‘বাবা, আমি তোমাকে একটা ভালো গাড়ি কিনে দেব! মা, আমি তোমাকে একটা ভালো শাড়ি কিনে দেব!’ এখন কিছুটা বড়ো হলেও তার মনের ঔদার্য কিছুমাত্র কমেনি। সে বলল, ‘তিলকমামা, তুমি খবরদার গাড়ির লগবুকে উপন্যাসটা লিখতে যেয়ো না! বাবা জানতে পারলে খুব রাগ করবে! আমি তোমাকে এক দিস্তে ভালো কাগজ কিনে দেব! তাতে তুমি লিখবে!’

উপন্যাসটা লেখার পর ওরা কলেজ স্ট্রিটে শুভঙ্করকাকু, পিনাকীকাকু আর গৌরদাস জেঠুর সঙ্গে গোপনে দেখা করল। শুভঙ্করকাকু কী ভীষণ ভালো লোক! কোনো লেখাই তার খারাপ লাগে না! পান্ডুলিপি পড়ে সে তো ‘সুপার্ব’, ‘এক্সেলেন্ট’, ‘ওয়াণ্ডারফুল’ ইত্যাদি অনেক ভালো ভালো বিশেষণ ব্যবহার করতে শুরু করল।

পিনাকীকাকু ঝটপট আট মিনিটে আটটা ছবি এঁকে ফেলল আর অসাধারণ একটা প্রচ্ছদ আঁকল ঠিক সাত মিনিট সতেরো সেকেণ্ডে আর প্রকাশক গৌরদাসজেঠুর তো কোনো তুলনাই হয় না। উনি বললেন, ‘পোলাপানেরা এ বই তো ছাপাতেই হইব। দশ হাজার কপি ফার্স্ট এডিশন ছাপুম!’

দশ হাজার কপি ফার্স্ট এডিশন! শুনে তো শুভঙ্করকাকু অজ্ঞান হয়ে পড়েই যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে মাথায় ঠাণ্ডা জল ঢেলে তার জ্ঞান ফেরাতে হল। গৌরজেঠু দৃপ্তকন্ঠে বললেন, ‘লস হইলে হইব! তোমরা দশ হাজার কপিই ছাপবা!’

ডোরা, ডোনারা কলকাতার পাটালির ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছে। গরমের ছুটি চলছে। ওরা প্রোজেক্ট নিয়ে খুব ব্যস্ত। বায়োলজিতে একটা খুব বিটকেল প্রোজেক্ট দিয়েছে। এক গাছে কীভাবে জাম, জামরুল আর গোলাপজাম ফলানো যায়, তাই নিয়ে তিরিশ পাতার একটা এসে লিখতে হবে। সেটা নিয়ে ওরা চোখে সর্ষেফুল দেখছে। ফুল এসি চালিয়েও দর দর করে ঘামছে। ইন্টারনেট থেকেও কোনো সাহায্য পাচ্ছে না।

ওরা আশা করছে যে, পুজোর ছুটিতে ওরা কল্যাণীতে দাদু, দিদুনের কাছে আবার যেতে পারবে। আবার মিলতে পারবে নীলু আর মিতুলের সঙ্গে। তখন যদি ওরা চারজন আবার চুপি চুপি বাংলা মায়ের কাছ থেকে ঘুরে আসে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বাঘুয়ার পিঠে চড়ে সবপেয়েছির দেশটা এবার ভালো মতো ঘুরে নেবে। যে যে মিষ্টি সেবার তাড়াহুড়োয় খেতে পারেনি, সেগুলো খেয়ে নেবে। আর ভাঙা পর্তুগিজ কেল্লাটা তো ভালো করে এক্সপ্লোরই করা হয়নি! সেখানে না-জানি কত না সোনা-দানা, হিরে-জহরত, মণিমাণিক্য লুকানো আছে! একটা ট্রেজার হান্ট করলে কেমন হয়? ওরা তাই চুপি চুপি প্ল্যান করছে। একটা বিরাট সুবিধা অবশ্য আছে। বাংলা মায়ের কাছে যেতে তো পাসপোর্ট, ভিসা লাগে না! খুব সহজেই একটা মন্তর বলে নিমেষে তাঁর কোলে, তাঁর বুকে ফিরে যাওয়া যায়। তবে বাংলা মায়ের দেওয়া হোম টাস্ক ওদের করা হয়নি। সে ব্যাপারে ওরা একটু লজ্জিত হয়ে রয়েছে।

সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%