সৌম্য ভট্টাচার্য
ডোনা যক্ষপুরীতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সে খবর মকররাজ এবং তার চ্যালাচামুন্ডাদের কাছে পৌঁছে গেছিল। গোপন সভাঘরে কালনেমি যখন গুপ্তচর প্রধানের সঙ্গে মকররাজকে তার কৃতিত্বের বর্ণনা দিল, হৃষ্ট, উদার মকররাজ সঙ্গে সঙ্গে সেখানেই দু-জনকে ‘দেশভূষণ’ খেতাব দিয়ে সম্মানিত করলেন।
তিনি আরো বললেন যে, দেশের এমন কৃতী সন্তানদের জন্যই চন্দ্র-সূর্য এখনো আকাশে উঠছে। সৃষ্টি, স্থিতি এখনো লয়প্রাপ্ত হয়নি। সভার খোক্কোসরা ঘন ঘন করতালি দিয়ে দেশের এই দুই বীর কৃতী সন্তানকে অভিনন্দিত করল।
মকররাজ বললেন, ‘সাধু! সাধু! তা কালনেমি, ডোনাকে বিষের বড়ি একটাও খাওয়াতে পেরেছ?’
—না, মহারাজ। এ ব্যাপারে বিফল হয়েছি।
—কেন?
—জঙ্গল থেকে ভুলিয়ে নিয়ে আসার সময় মেয়েটাকে বহুবার চকলেট বলে বিষের বড়ি খাওয়াতে চেয়েছি, কিন্তু পারিনি। চকলেট দেখলেই মেয়েটা কেমন শিউরে উঠছিল। বলছিল যে, ওর বমি পাচ্ছে।
—বটে? ডাইনিকে ডাকো।
যে বুড়ি ডাইনিকে ডোনার পরিচর্যার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল, তাকে এবার ডাকা হল।
শাল জড়ানো বুড়ি ডাইনি সভায় এসে অভিবাদন করল।
মকররাজ বললেন, ‘ডাইনি, ডোনাকে খাওয়াতে পেরেছ?’
—না, মহারাজ।
—সে কী? কী খাবার দেওয়া হয়েছিল?
আপনি যা বলেছিলেন—সবই। পোলাও, কালিয়া, বিরিয়ানি, চাপ, তেলেভাজা, ফুলুরি, কেক, প্যাস্ট্রি, সন্দেশ, রসগোল্লা—হেন কোনো সুখাদ্য নেই, যা রাখা হয়নি।
—খাবারগুলোতে ভালো করে বিষ মিশিয়ে ছিলে?
—হ্যাঁ, মহারাজ। সব খাবারেই অল্পবিস্তর বিষ আমি খুব যত্ন করে মিশিয়েছি।
—তো? মেয়েটা খেয়েছে কিছু?
—না, মহারাজ। খাবার দেখেই মেয়েটা বমি করতে লাগল। আমি ব্যস্ত হয়ে শরবত আনতে ঘরের বাইরে গেলাম। তখনই তো আপনার ডাক পেলাম।
ডাইনি আর কালনেমির বক্তব্য শোনার পর মকররাজ এবং অমাত্যদের মুখ গম্ভীর, বিষণ্ণ, চিন্তাসংকুল হয়ে উঠল।
ছোটো অমাত্য, যিনি কালাপাহাড়ের ইন্টারপ্রিটার, হাত তুললেন, ‘প্রভু কিছু বলতে চান।’
—বলো, কালাপাহাড় বলো। কী তোমার বক্তব্য?
উত্তরে সেই দীর্ঘ প্রলম্বিত ছায়া থেকে ফোঁস ফোঁস, হিস হিস শব্দ ভেসে উঠল। ছোটো অমাত্য বললেন, ‘প্রভুর মতে মেয়েটাকে জাদু করা হয়েছে। ওকে বিষ খাওয়ানো যাবে না।’
—মানে?
কালাপাহাড় আবার ক্রুদ্ধ ফোঁস ফোঁস শব্দ করল।
ছোটো অমাত্য বললেন, ‘প্রভুর মতে মেয়েটার সামনে খুব শক্তিশালী জাদুমন্ত্র পড়া হয়েছে, যাতে বিষমেশানো খাবার দেখলেই ওর বমি পায়, গা গুলিয়ে ওঠে, শীত শীত করে ওঠে।’
—কে করতে পারে এ জাদু?
সেই দীর্ঘ, প্রলম্বিত ছায়া থেকে এবার এক হিংস্র হুংকার ভেসে এল।
ছোটো অমাত্য ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘প্রভু বলছেন যে, এটা বাঘুয়ার কীর্তি। আমাদের শত্রুপক্ষে একমাত্র বাঘুয়ারই এই শক্তি রয়েছে।’
—তাহলে উপায়?
এবার কালাপাহাড় হায়নার হাসি হাসল।
ছোটো অমাত্য বললেন, ‘প্রভু বলছেন যে, তিনি কচি মেয়েটার বুকের রক্ত চুষতে চান।’
মকররাজ তৃপ্তির হাসি হাসলেন, ‘বেশ তো কালাপাহাড়! আমি তো জানি যে তুমি মানুষের, বিশেষ করে, কচি মেয়েদের রক্ত চুষে বড়ো আনন্দ পাও। যাও, আমি তোমায় উদার অনুমতি দিলাম। রক্ত চুষে তোমার বিষ মেয়েটার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে দাও। কবির স্বপ্ন ব্যর্থ হয়ে যাক।’
বলতে বলতেই মকররাজ দেখলেন যে, সেই ছায়া—সেই দীর্ঘ প্রলম্বিত ছায়া যা সভাঘরের এককোণ অন্ধকার করে রেখেছিল—তা অদৃশ্য হয়ে গেছে। মহারাজের অনুমতি পেয়ে হৃষ্ট কালাপাহাড় অবিলম্বে তার রক্ত-তৃষ্ণা মেটাতে ডোনার ঘরের দিকে ছুটেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন