বিভীষণ

সৌম্য ভট্টাচার্য

ডোনার অন্তর্ধানের পর পর্তুগিজ কেল্লায় জোরদার এক মন্ত্রণাসভা বসেছিল। বাঘুয়া, দধিকর্মা, দেঁতো কুমির, সনাতন, সূচিমুখ, নান্দীমুখ, ডোরা, মিতুল, নীলু সবাই সেখানে উপস্থিত। হাতি, জলহস্তী, ইঁদুর, বাদুড়, ভাম, বেজি, গুলেবাঘ, চিতাবাঘ, হরিণও অ্যাটেনড্যান্স দিয়েছে।

আলোচনার বিষয়—আশু কর্তব্য কী? কীভাবে ডোনাকে উদ্ধার করা যায়? কীভাবে যক্ষপুরী আক্রমণ করা যায়?

একটা ব্যাপারে সবাই একমত হল যে, দধিকর্মার সুশিক্ষিত এক অক্ষৌহিণী সশস্ত্র ছুঁচোর ফৌজ খোক্কোসদের মহড়া নিতে পারবে। তা ছাড়া গুলেবাঘ, চিতাবাঘ, হাতি, জলহস্তী বা গন্ডারের সম্মিলিত শক্তি তো আছেই। বাঘুয়া কালাপাহাড়কে সামলাতে পারবে, যদি-না সে বিষের কুন্ডে স্নান করে মেঘলোকে অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রশ্ন হল, সেই বিষের কুন্ডের কী ব্যবস্থা হবে? সুতরাং যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে গিয়ে শত্রুর সেই পরম সম্পদ, সেই অক্ষয় বিষকুন্ডকে অবলুপ্ত করার নানা ফন্দি আঁটা হতে লাগল।

বাঘুয়া দেঁতো কুমিরের দিকে তাকাল, ‘কী হে দেঁতো, খোক্কোসদের বিষে তো তোমাদের কিছু হয় না?’

—ঠিক বাঘুয়া, ও বিষ আমরা হজম করতে পারি।

—তাহলে? চুমুক দিয়ে সে-কুন্ড সাফ করে দিতে পারবে না?

শুনে দেঁতো দু-চোখে অশ্রুপাত করে বলল, ‘বাঘুয়া, আমার সাত-সাতটা ছানাকে শয়তান শেয়ালপন্ডিত যদি সাবাড় না করত, তাহলে কি আজ কোনো চিন্তা ছিল? এতদিনে তারা ধাড়ি আর লায়েক হয়ে উঠত। আমি গিন্নি আর আমার সাত ছেলেই চুমুক দিয়ে খোক্কোসদের বিষকুন্ড বিলকুল সাফ করে দিতাম। আর কাউকে বলতে হত না।’

—তাহলে? খাঁড়ির জলে তোমার আর কোনো কুমিরবন্ধু নেই?

—আছে, বাঘুয়া। ঈশ্বরের দয়ায় খাঁড়ির জলে আরো জনাবিশেক অতিকায় কুমির আছে। আমরা একজোট হলে খোক্কোসদের বিষকুন্ডের দফারফা করতে সময় বেশি লাগবে না।

—তাহলে?

—কিন্তু আমরা যক্ষপুরীতে ঢুকব কী করে, বাঘুয়া? আমাদের তো চুপিসাড়ে ঢুকতে হবে। কালাপাহাড় আগে-ভাগে টের পেলেই সর্বনাশ!

দেঁতো কুমিরের এই অত্যন্ত সংগত সংশয়ে বাঘুয়াসহ সবাই নীরব হয়ে রইল। সত্যিই তো! চিৎকার, চেঁচামেচি করে যমপুরীতে শোরগোল তুলে যদি সম্মুখ আক্রমণ করা হয়, তাহলে সতর্ক কালাপাহাড় নিমেষে কুন্ডে স্নান করে অদৃশ্য হয়ে যাবে। তখন সমস্ত প্রচেষ্টাই পন্ডশ্রমে পরিণত হবে।

বাঘুয়া, সনাতন, দেঁতো কুমির, সূচিমুখ, নান্দীমুখ সবাই মুখ অত্যন্ত গম্ভীর করে বিষণ্ণবদনে মাথা চুলকোতে লাগল। গুলেবাঘ আর চিতাবাঘ ল্যাজ নেড়ে, ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ শব্দে তাদের দুশ্চিন্তা প্রকাশ করল। ছুঁচোদের সঙ্গে ইঁদুরদের আরেকপ্রস্থ মারপিট বাধার উপক্রম হল।

এমন সময় সভায় একটা শোরগোল উঠল।

—কী ব্যাপার? কী ব্যাপার?

দধিকর্মার ফৌজ একজন খোক্কোসকে ধরে-বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে আসছে। খোক্কোসটার খুব গোবেচারা চেহারা। সে নাকি কম্বল মুড়ি দিয়ে গুটিশুটি মেরে ভিড়ের মধ্যে বসেছিল।

বাঘুয়ার সামনে এনে তাকে ফেলে দিয়ে দধিকর্মা আস্ফালন করে বলল, ‘ব্যাটা মকররাজের গুপ্তচর! লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের শলাপরামর্শ শুনছিস! ত্রিশূল দিয়ে এখনই তোর ভুঁড়ি ফুটো করছি।’

শুনে সে বেচারা খোক্কোসটা ভেউ ভেউ করে কেঁদে বাঘুয়ার পায়ের ওপর আছড়ে পড়ল, ‘বাঘুয়া! রক্ষা করো! রক্ষা করো! আমি তোমার শরণাগত!’

জিগ্যেস করল বাঘুয়া, ‘কে তুমি? কী করা হয়? নিবাস কোথায়?’

—আমি এক নেহাতই গোবেচারা, সর্বহারা খোক্কোস বাঘুয়া। যমপুরীর খিদমদগার।

—কাজ কী করতে সেখানে?

—প্রতিদিন দু-বেলা নিয়ম করে বাংলা মায়ের ঘরে বিষের ধোঁয়া ছাড়তাম!

খোক্কোসের এই সরল স্বীকারোক্তিতে সভায় প্রচন্ড হট্টগোল শুরু হল। মন্ত্রণাকারীরা ক্রোধে অধীর হয়ে ততক্ষণাৎ সেই খোক্কোসকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার দাবি জানাতে লাগল। দধিকর্মা আর তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা দারুণ তড়পাতে লাগল। পারলে তক্ষুণি সেই খিদমদগারের ভুঁড়ি ফুটো করে!

নান্দীমুখ বলল, ‘বাঘুয়াবাবু এই দুরাত্মাকে আপনি অবিলম্বে জলযোগ করে ফেলুন। শাস্ত্রে আছে যে, শত্রুর শেষ রাখতে নেই।’

তখন ধীমান, স্থিতধী বাঘুয়া তাদের শান্ত করে বলল, ‘বটে! বাংলা মায়ের ঘরে প্রতিদিন বিষের ধোঁয়া ছাড়তে? তুমি এরকম দুরাচার, দুর্মতি কেন? কোন অভিসন্ধিতে তুমি আমাদের কাছে এসেছ? কোন গোপন অভিপ্রায়ে তুমি কম্বল মুড়ি দিয়ে লুক্কায়িত থেকে আমাদের মন্ত্রণা শুনছিলে?’

—পেটের দায়ে, বাঘুয়া, পেটের দায়ে আমি এই পাপ কাজ করতে বাধ্য হয়েছি। আমি অনুতপ্ত।

—পেটের দায়? যক্ষপুরীতে তো তাল তাল সোনা। অভাবী খোক্কোস কেউ আছে নাকি?

—এ তোমার একেবারেই ভুল ধারণা, বাঘুয়া। যক্ষপুরীর সোনা আসলে কিছু মুষ্টিমেয় ধনবান, পুঁজিপতি খোক্কোস কুক্ষিগত করে রেখেছে। তারাও সে-সোনা দেশে রাখে না। আইরাক্ষস-কাইরাক্ষসের দেশে তাদের গোপন অ্যাকাউন্টে জমা রাখে। এদের বাদ দিলে গরিষ্ঠসংখ্যক খোক্কোসই সর্বহারা। শৃঙ্খল ছাড়া তাদের হারানোর কিছু নেই।

—বটে? তোমার নাম কী?

—বিভীষণ, বাঘুয়া!

—তা বিভীষণ, তুমি এখানে কেন? কী মনে করে?

বাঘুয়া তুমি যে হুংকার ছেড়েছিলে— ‘তোমরা আমায় রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’—সে হুংকারে যক্ষপুরীর ভিত থর থর করে কেঁপে উঠেছে। বহু খোক্কোসেরই ভয়ে বাহ্যে হয়ে গেছে। আর আমার প্রাণে এমন কাঁপুনি ধরেছে যে, তিন-তিনটে কম্বলমুড়ি দিয়েও সে কাঁপুনি থামছে না।

—তো?

—আমি আমার পাপস্খালন করতে তোমার দলে যোগ দিতে চাই, বাঘুয়া। তোমায় সাহায্য করতে চাই। দস্যু রত্নাকরও তো একসময় বাল্মীকি হয়েছিলেন?

এবার সভার সবাই একযোগে চেঁচিয়ে উঠল, ‘বাঘুয়া! সাধু সাবধান! বিভীষণের ছলনায় ভুলো না। কালনেমির মতো এ-ও মকররাজের গুপ্তচর। আমাদের সর্বনাশ করতে একে মকররাজ পাঠিয়েছে।’

বিভীষণ বলল, ‘আমি যে বিশ্বাসঘাতক নই, তার হাতে-নাতে প্রমাণ দেব।’

বাঘুয়া বলল, ‘কী প্রমাণ?’

—তোমরা গোপনে যক্ষপুরীতে ঢুকতে চাও, তাই তো?

—হ্যাঁ। তোমার কোনো পথ জানা আছে?

—আছে বাঘুয়া। অত্যন্ত গোপন সে-পথ।

—কীরকম?

—যক্ষপুরীতে পানীয় জলের জোগান দিতে খোক্কোসরা মাটির নীচ দিয়ে এক খাল কেটেছে। সে-খাল যক্ষপুরী থেকে দুই ক্রোশ দূরে নদীতে এসে মিশেছে। বাইরে থেকে কিছু ঠাহর করা যায় না।

—তো?

—নদী থেকে সেই খাল বেয়ে কুমিররা অনায়াসে যক্ষপুরীতে ঢুকতে পারে। আর সে-খাল যক্ষপুরীর একদম ভেতরে, ঠিক যেখানে বিষের কুন্ড তার পাশেই একটা বিশাল জলাধারে গিয়ে শেষ হয়েছে।

—বাহ! খাল কেটে কুমির আনার ব্যবস্থা খোক্কোসরা নিজেরাই করে রেখেছে?

—হ্যাঁ, বাঘুয়া।

সনাতন বলল, ‘তুমি যে সত্যি কথা বলছ, মিথ্যা ছলনা করছ না, তার কী প্রমাণ?’

বিভীষণ বলল, ‘তোমরা আমায় বন্দি করে রাখো আর কাউকে পাঠাও। সে সরেজমিনে গিয়ে দেখে আসুক, আমি সত্যি বলছি কিনা।’

তখন বাঘুয়ার নির্দেশে দেঁতো কুমির আর কুমিরগিন্নি বিভীষণের তথ্যের সত্যি-মিথ্যে অনুসন্ধান করতে গেল। কয়েক প্রহর পর ফিরে এসে তারা জানাল যে, বিভীষণ ভুল বলেনি। সত্যিই একটা গোপন কাটা খাল মাটির নীচ দিয়ে নদী থেকে যক্ষপুরীর ভেতরে চলে গেছে।

বিভীষণকে এতক্ষণ দড়ি দিয়ে বেঁধে বন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল। বাঘুয়ার নির্দেশে তার বাঁধন খুলে দেওয়া হল। বাঘুয়া তাকে আলিঙ্গন করে বলল, ‘বিভীষণ! আজ থেকে আমরা বন্ধু! কিন্তু তুমি আমায় বলো যে, কেন তুমি মকররাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাও? কী তোমার স্বার্থ?’

বাঘুয়া, মকররাজ আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা কি দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে না? এ দেশের আকাশে বিষ, বাতাসে বিষ, জলে বিষ, ডাঙায় বিষ! কিছুই এখানে ফলে না। সারা দেশ এতদিন কুয়াশায় ঢাকা ছিল। দেশের সব সোনা ওরা রাতের অন্ধকারে বাইরে পাচার করে দিত। দেশের সমস্ত জীব অনাহারে, অর্ধাহারে, রোগে, শোকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে দিন কাটাত। যে খোক্কোসের মধ্যে কিছুমাত্র মনুষ্যত্ব টিকে আছে, সে-ই তো এ ব্যাপারে দুঃখ পাবে, কষ্ট পাবে, প্রতিবাদ জানাবে।

—তাই তুমি আমাদের দলে যোগ দিতে চাও?

—হ্যাঁ, বাঘুয়া। খোক্কোসদের পাপ অল্প হলেও আমি স্খালন করতে চাই। দিনের পর দিন বাংলা মায়ের ঘরে বিষের ধোঁয়া ছেড়ে যে পাপ আমি করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।

বিভীষণের এই বক্তব্যের পর সভা ভঙ্গ হল। বাঘুয়া তার শীর্ষ সেনাপতিদের নিয়ে এক অতি গোপন রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসল। যক্ষপুরীর অভিযান শুরু হতে আর দেরি নেই।

সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%