বন্দি বাংলা মায়ের কাছে

সৌম্য ভট্টাচার্য

মকররাজের যক্ষপুরীর বিশাল প্রাসাদে, সাততলার এক কোণের ঘরে বাংলা মা বন্দি হয়ে আছেন। তাঁর সন্ধানে চলেছে চার বাচ্চা, বিভীষণ আর সনাতন। সেই তুমুল যুদ্ধের রাত্তিরে পথ চিনে চলা কি সহজ কথা? দিকে দিকে খোক্কোসদের সঙ্গে ছুঁচোদের সংঘর্ষ চলছে। উভয়ের আর্তচিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। মশালের আলো আর ধোঁয়ায় যক্ষপুরীর অলিগলিগুলো ভয়াল, রহস্যময় দেখাছে। এক জায়গায় ডোরারা দেখল যে, দধিকর্মা তার ত্রিশূলের আগায় এক খোক্কোসকে উঁচু করে তুলে নাচাচ্ছে। খোক্কোসটাকে দেখাচ্ছে যেন গিরগিটির ছা!

কে একজন তাদের পাশ দিয়ে সর সর করে পালাচ্ছিল। মুখটা চেনা চেনা মনে হল ডোনার। আরে? এ তো কালনেমি! সেই মাফলার জড়ানো মিথ্যেবাদী বৃদ্ধ ভামটা! ডোনা বলল, ‘ধর! ধর! কালনেমি পালাচ্ছে!’ ডোনার অনুপ্রেরণায় সঙ্গে সঙ্গে জনাতিনেক ক্রোধী ছুঁচো ত্রিশূল হাতে কালনেমির পশ্চাদ্ধাবন করল। ত্বরিত গতিতে কালনেমি সিঁড়ি দিয়ে নীচে পালাল। ছুঁচোরাও ল্যাজে মশাল বেঁধে তাকে তাড়া করল।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে বাচ্চারা বাংলা মায়ের ঘর খুঁজেই পেত না, যদি-না বিভীষণ থাকত। কম্বলমুড়ি দেওয়া খিদমদগার বিভীষণ এক নীরব কর্মী। বাংলা মায়ের ঘরে প্রতিদিন নিয়ম করে দু-বার বিষের ধোঁয়া ছাড়াই ছিল তার কাজ। আজ পরিস্থিতির পাকেচক্রে দল, মত পরিবর্তন করে সে বাঘুয়ার একনিষ্ঠ সেবক হয়েছে। সেই বিভ্রান্তিকর, অরাজক পরিস্থিতিতে বিভীষণ স্থির প্রত্যয়ে বাংলা মায়ের ঘরের দিকে বাচ্চাদের পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলল। মাঝে মাঝেই বিড় বিড় করছিল সে।

সনাতন বলল, ‘বিড় বিড় করে কী বলছ, বিভীষণ?’

—বলছি যে, ডাইনিটা আছে! ডাইনিটা আছে!

—কোন ডাইনি?

—কালাপাহাড়ের অনুচরী এক বীভৎস ডাইনি বাংলা মাকে দিনরাত পাহারা দেয় আর তাঁর বুকের ক্ষতে নিয়ম করে বিষ ঢালে। ওটাকে নিয়েই যত ভয়।

—দেখতে কেমন?

—কুলোর মতো কান, মুলোর মতো দাঁত, লকলকে জিভ। নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বিষের ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

বাংলা মায়ের ঘরের কাছে পৌঁছোতে পৌঁছোতে অবশ্য একটা অপ্রত্যাশিত সুখবর পাওয়া গেল। খবরটা দিল নান্দীমুখ। সেই ডাইনিটা নাকি হঠাৎ বুক ধড়ফড় করতে করতে অক্কা পেয়েছে।

শুনে বিভীষণ আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। বলল, ‘হঠাৎ মরেছে?’

—হ্যাঁ। হঠাৎ! আমাদের আসতে দেখে এক বিকট চিৎকার করে বুকে হাত দিয়ে ধপ করে মরে পড়ে গেল!

—তার মানে কালাপাহাড়ের খারাপ কিছু হয়েছে!

—কেন?

ডাইনিটার প্রাণ কালাপাহাড়ের সঙ্গে বাঁধা ছিল। যতদিন কালাপাহাড়ের বড়ো কোনো ক্ষতি না হবে, ততদিন ডাইনিটা মরবে না। বাঘুয়া তো কালাপাহাড়ের সাথে লড়ছে, না?

—হ্যাঁ।

—যাও! যাও! খবর নাও সে লড়াইয়ের কতদূর?

নান্দীমুখ তার সঙ্গী ছুঁচোদের নিয়ে ত্বরিতগতিতে বাঘুয়া আর কালাপাহাড়ের সন্ধানে দৌড়োল।

ডাইনিটা তার বিশাল দেহ নিয়ে অলিন্দের একপাশে কেতড়ে শুয়ে আছে। তার বিকট মুখটা হাঁ করা। চোখের তারা স্থির। মুখের হাবেভাবে মনে হয় মরার আগে সাংঘাতিক কোনো ভয়ের কারণ ঘটেছিল। তার রূপ দেখে প্রচন্ড বিতৃষ্ণা হল বাচ্চাদের। মৃতের মুখের ওপর ডুমো ডুমো নীল নীল মাছি ভন ভন করছে। সারা শরীর থেকে বীভৎস মরাপচা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

ডোনা, ডোরা, নীলু, মিতুল নাকে রুমাল দিল, ‘উহ! মা গো!’

সনাতন বিভীষণকে বলল—‘ও কী গন্ধ হে? আমার মৎস্যপ্রাশনের মাচ তো ঠেলে উঠে আসচে!’

বিভীষণ বলল, ‘এ আর কী শুঁকছ তোমরা? আসল গন্ধ তো বাংলা মায়ের ঘরে! সে ঘরে তো নিয়মিত দু-বার করে বিষের ধোঁয়া ছাড়া হয়!’

—তুমি যক্ষপুরী ছাড়ার পরও ধোঁয়া ছাড়া হচ্ছে?

—হবে না কেন? যক্ষপুরীতে খিদমদগারের কোনো অভাব আছে?

—তবে?

চার বাচ্চা, সনাতন আর বিভীষণ ততক্ষণে বাংলা মায়ের ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দরজা হালকা ভেজানো। সেই ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে যে সুবাস ভেসে আসছে, তাতেই তাদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম।

সনাতন বলল, ‘বিভীষণ! এই ঘরে ঢুকে বাচ্চারা গান গাইবে? সেটা কি সম্ভব? ওরা তো বিষের গন্ধেই অজ্ঞান হয়ে যাবে?’

হঠাৎ ডোনার মাথায় বুদ্ধি খেলল। সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘আমসত্ত্ব! আমসত্ত্ব!’

—আমসত্ত্ব?

—হ্যাঁ। বাঘুয়ার দেওয়া বাংলা মায়ের আমসত্ত্ব। যক্ষপুরীতে যখন বিষের গন্ধে বমি আসত, তখন ওই আমসত্ত্ব খেয়েই তো চাঙ্গা হয়ে উঠতাম। বমি ভাব কেটে যেত। মনে বল ফিরে আসত।

—সে আমসত্ত্ব আছে তোমার কাছে?

বুকের গোপন পকেট থেকে কাপড়ের মোড়কটা বের করল ডোনা। গুনে বলল, ‘প্রায় শেষ, তবে চারটে আমসত্ত্ব রয়েছে এখনো।’

ডোরারা চারটে আমসত্ত্ব ভাগ করে খেয়ে নিল। ডোনা ভুল বলেনি। মুখে পুরতেই পলকে মিলিয়ে গেল আমসত্ত্বগুলো। বাচ্চারা দেখল যে, ম্যাজিকের মতো তাদের বমি বমি ভাব কেটে গেছে। আশা আর আনন্দের উত্তাপ তাদের কলজেকে উষ্ণ করে তুলেছে।

এবার ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকার পালা। সনাতন আর বিভীষণ ঢুকবে না। কারণ চূড়ান্ত মুহূর্তে চার বাচ্চাকেই শুধু বাংলা মায়ের সামনে থাকতে হবে।

বিভীষণ সতর্ক করে দিল, ‘যতই আমসত্ত্ব খাও বাচ্চারা, ঘরে ঢুকেই সমস্ত জানলা খুলে বাইরের বাতাস ঢুকতে দিয়ো। এ যে-সে বিষের ধোঁয়া নয়। নইলে তোমরা হেঁচে, কেশে, বমি করেই মরবে! গান আর গাইতে পারবে না!’

সারা ঘরে যেন ধুনো জ্বালানো হয়েছে। সেই কুন্ডলীকৃত সাদা ধোঁয়ার রাজ্যে নিরাভরণ খাটের ওপর বাংলা মা শুয়ে। দেহ সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা। শুধু অপরূপ সুন্দর মায়ের মুখ একটা পদ্মফুলের মতো জেগে আছে।

সেই বিষাক্ত ধোঁয়াটে পরিবেশে চার বাচ্চাই প্রবল কাশতে লাগল। ডোরা, মিতুল আর নীলু ত্বরিতে ঘরের তিনটে জানলা খুলে দিল। হাওয়া চাই। বাইরের বাতাস চাই। নইলে এ পরিমন্ডলে তারা দম আটকে মরে যাবে।

বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস এসে আর সবাইকে চাঙ্গা করে তুললেও ডোরা সামলাতে পারল না। হড় হড় করে একপেট বমি সে করে ফেলল। অবশ্য ঘরের মধ্যে করেনি। ঘরের লাগোয়া টয়লেটে বেসিনের মধ্যে। ডোনা, মিতুল, নীলু ব্যস্ত হয়ে ঠাণ্ডা জল দিয়ে ডোরার মাথা আর পিঠ থাবড়াতে লাগল। ডোরা একটু ধাতস্থ হতে ডোনা সহানুভূতির সুরে বলল, ‘ডোরাদিদি! তুমি কত বমি করলে!’

ডোরা, ডোনা পিঠোপিঠি বোন। দু-বছর মাত্র বয়েসের তফাত। দু-জনের মধ্যে ভাব-ভালোবাসা যেমন, ঝগড়া-খুনসুটিও তেমনই। ডোরার মনে হল যে ডোনা তাকে ব্যঙ্গ করছে। সে ওই অবস্থাতেই ক্ষীণ স্বরে চিঁচিঁ করে বলে উঠল, ‘ইউ শাট আপ, ডোনা! ইউ মাইণ্ড ইয়োর ঔন বিজনেস!’

মিতুল আর নীলু ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘ডোরা, ডোনা এটা আমাদের ঝগড়া-বিবাদের সময় নয়। আমাদের আসল কাজই বাকি।’

ততক্ষণে চার বাচ্চা টয়লেট থেকে বেরিয়ে এসেছে। জানলা খুলে দেওয়ায় ঘরের বিষের ধোঁয়াটা কেটে গিয়ে পরিস্থিতি অনেকটা নির্মল হয়ে উঠেছে। রাত্রির অন্ধকারও কেটে যাচ্ছে। পুবের আকাশে লালচে আভা। মিষ্টি ঠাণ্ডা বাতাস বইছে।

বাংলা মা আচ্ছন্নের মতো তাঁর খাটে শুয়ে। ছোট্ট ঘর। কোনো আসবাবপত্র নেই।

মিতুল যত্ন করে বাংলা মায়ের গায়ের চাদর সরিয়ে দিল। দিয়েই চার বাচ্চা চমকে উঠল।

এ কী বীভৎস ঘা বুকের ওপর লম্বালম্বি, গলা থেকে নাভি পর্যন্ত নেমে এসেছে! হৃৎপিন্ড ধক ধক করে লাফাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যকৃৎ, ফুসফুস, পাকস্থলী। সেই ঘা থেকে অবিরল ধারায় বিষ আর পুঁজ ঝরছে। মায়ের মুখ অপরূপ সুন্দর, কিন্তু দুঃখ ও গাঢ় বিষণ্ণতা সেই মুখে স্থায়ীভাবে দাগ রেখে গেছে। সারা দেহ শীর্ণ, কঙ্কালসার। দীর্ঘ দিনের রোগে, শোকে, অপুষ্টিতে, অনাহারে মা শুকিয়ে গেছেন। পরনের শতচ্ছিন্ন শস্তা শাড়ি কোনোক্রমে লজ্জা নিবারণ করছে। বুকের ঘায়ে ভন ভন করছে অজস্র গুয়েমাছি আর ক্রিমি-কীট।

মিতুল বলল, ‘শ্বেতরাক্ষসরা বাংলা মায়ের এ কী হাল করেছে? মা এত আঘাত আর কষ্ট সহ্য করে বেঁচে আছেন কীভাবে?’

নীলু বলল, ‘খোক্কোসদেরই বা বাদ দিচ্ছ কেন? তারাও তো কিছু কম যায় না!’

ডোনা বলল, ‘শুধু গান গেয়ে আর রাখি বেঁধে এই ঘা, এই অসুখ সারিয়ে দেওয়া যাবে?’

ডোরা বলল, ‘চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী। রাখি দুটো আছে তো? আর গানটা ঠিকঠাক গাইতে হবে। কথা, সুর, তাল, লয় কিছু যেন ভুল না হয়।’

বাচ্চারা যখন এইসব জল্পনা করছে, তখন ঘরের বাইরে সনাতন আর বিভীষণও কম সংশয়ে ভুগছিল না।

সনাতন বলল, ‘বাচ্চারা কি এত বড়ো কাজটা পারবে? যুগ যুগ ধরে বাংলা মায়ের বুকের এই ঘা। ওরা শুধু গান গেয়ে সে-ঘা সারাতে পারবে? বাঙালির যা পাথরচাপা কপাল!’

বিভীষণ বলল, ‘ওরা মাত্র একবারই ময়নাবুড়ির কাছে তালিম নিয়েছে। যদি কোথাও ভুল হয়? কথায়? সুরে? তালে? লয়ে?’

হঠাৎ তাদের চমকে দিয়ে কে যেন বলে উঠল, ‘চুপ করো, অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না!’

কে বলল কথাটা? কে বলল কথাটা? সনাতন আর বিভীষণ বিস্ময়ে ঘাড় ঘুড়িয়ে চারদিকে দেখতে লাগল।

আবার সে-অশরীরী কন্ঠ ভেসে এল, ‘চুপ করো, অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না! চুপ করো, অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না!’

যক্ষপুরীর অন্ধকার ধোঁয়া ঘেরা অলিন্দে সেই শব্দ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, ‘চুপ করো, অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না! চুপ করো, অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না! চুপ করো, অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না!’

সেই সতর্কবাণীতে সনাতন আর বিভীষণ নীরব হয়ে গেল। চুপ করে প্রতীক্ষা করতে লাগল।

সকল অধ্যায়
১.
গরমের ছুটিতে
২.
ডায়েরি আর রাখি
৩.
দাদুর বাগানে
৪.
এলেম নতুন দেশে
৫.
ভোঁদড় বাহাদুর
৬.
কুমিরের ডেরায় বাঘুয়ার গল্প
৭.
বাঘুয়ার আবির্ভাব
৮.
কালাপাহাড়ের আক্রমণ
৯.
পুরাণের ভবিষ্যদবাণী
১০.
মকররাজের মন্ত্রণাসভা
১১.
পর্তুগিজ কেল্লায়
১২.
খোক্কোসদের চক্রান্ত
১৩.
ছুঁচোর ফৌজ
১৪.
বাঘুয়া ও বাচ্চারা
১৫.
ময়নাবুড়ির কাছে
১৬.
কালনেমির কবলে
১৭.
নটসূর্য নাড়ুগোপাল
১৮.
হারিয়ে গেল ডোনা
১৯.
যক্ষপুরীতে ডোনা
২০.
বিভীষণ
২১.
কালাপাহাড়ের ফন্দি
২২.
যক্ষপুরীর নন্দিনী
২৩.
ডোনার গান ও শেয়ালপন্ডিতের আবির্ভাব
২৪.
যুদ্ধযাত্রা
২৫.
শেয়ালপন্ডিতের সিদ্ধিলাভ
২৬.
বন্দি বাংলা মায়ের কাছে
২৭.
বাংলার মাটি, বাংলার জল
২৮.
বাঘুয়া বনাম কালাপাহাড়
২৯.
বাংলা মায়ের সভা
৩০.
সবপেয়েছির দেশে
৩১.
ঘরে ফেরা
৩২.
আবার আসিব ফিরে
৩৩.
উত্তরকথন
৩৪.
লেখকের কথা
৩৫.
দেশভাগ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ*

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%