ইয়াকুব

বিনয় ঘোষ

কয়েকটি বাড়ন্ত জীবন বাত্যাহত ছিন্নপত্রের মতো অকস্মাৎ এখানে এসে মিলিত হয়েছে। শহরটা সকলের কাছেই বিভুঁই, সকলকেই আসতে হয়েছে জীবনের নাগরিক তাগিদে। সেকথা বোধহয় আর কারও মনে নেই। শিক্ষা, অর্থ, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা এমনি আরও অনেক সেরা-সেরা জীবনের লক্ষ্য পদে-পদে ব্যর্থতার স্তূপের তলায় সমাধিস্থ হয়েছে। আজ কেউ শহরটাকে ভাবছে ঘোড়দৌড়ের মাঠ, বরাত ঠুকে টিপ ধরে বসে থাক, তিনে-চারে বারোটা খুরে একদিন মিললেই, 'ট্রিপল টোট', জীবনে আর নড়ে বসতে হবে না। কেউ ভাবছে, শহরের মতো এমন একটা পিচ্ছিল পদার্থ আর নেই— সবকিছুই এখানে তেলা— টাকাপয়সাও। লাখ লাখ টাকা পিছলে যাচ্ছে হাতের তলা দিয়ে, একবার যদি ঘা দেওয়া যায় তাহলে মুঠোর মধ্যে যা আসবে তাতেই জীবন কেটে যাবে। দালালি ছাড়া আর কিই বা আছে দুনিয়ায়। বিদ্যার্থী আজ প্রেমের কবি, দীর্ঘশ্বাসের কবি আর প্রাইভেট টিউটর। প্রতিভার বিকাশ যদি বিদ্যায়তনের দেওয়ালের মধ্যে নাই হয়ে থাকে, ক্ষতি কি? সুধীসমাজে একদিন তার খ্যাতির গুঞ্জরণ এই শহর থেকেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে। প্রতিভার উন্মেষ যদি চাও, দারিদ্র্যের বোঝা মাথায় করে নীরবে শহরে বসে সাধনা করো। কেউ ভাবছে শহর বৃন্দাবন, জীবন লীলাখেলা, জীবনের দু-চারটে যুযুৎসুর প্যাঁচ বা জানো শহরে দেখিয়ে যাও। টাকা চাও? জীবন্ত নারীদেহ একহাটে কিনে মাথায় করে আর একহাটে শূন্য করে দাও, কাঁচা চামড়ার ডমরু বাজাও, বাঁদরও নাচবে, টাকাও মিলবে। কেউ ভাবছে যন্ত্রবৎ জীবন চালু রাখতে হলে এই শহর ভিন্ন আর উপায় নেই—। অফিস-ঘর, ঘর আর অফিসের ঘর্ঘরানি যদি কানে কর্কশ শোনায়, সিনেমায় যাও, থিয়েটারে যাও, স্নায়ুগুলো আলগা হবে, চাকা আবার চলবে।

রবিবারের সকাল। কালকের রেসে পাঁচ টাকায় প্লেসে পঞ্চাশ টাকা পেমেন্ট পেয়ে বেণীমাধব রাত তিনটের ঘরে ফিরেছে। আজ বেলা আটটা বাজল, এখনও তার ঘুম ভাঙেনি। ভাঙা খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে গায়ের উপর রোদ এসে পড়েছে, সাড়া নেই। পাশের সিটে পরিমল অকাতরে ঘুমুচ্ছে, মাথার কাছে কয়েকটা মোমবাতি, মেঝের উপর একরাশ টুকরো পোড়া বিড়ি, টিপয়ের উপর রঙের প্লেট ও তুলি এবং খাটিয়ার পাশে অর্ধ-সমাপ্ত একটা পোট্রেট, দেখলেই বোঝা যায় রাত জেগে ছবি আঁকতে আঁকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। তিন-চারটে আরশুলা চেপটে মরে রয়েছে বালিশের পাশে। কোণে আরেকটি সিটে থাকে কবি ক্ষিতীশ, ভোরে উঠে পড়াতে গিয়েছে, সপ্তাহের একদিন কামাই রবিবারে হাজরে দিয়ে পূরণ করতে হয়। বারান্দায় তিনটি সিটে থাকে ইনসিওরেন্স কোম্পানির কেরানি সুধাকান্ত, নূরজাহান হোটেলের এজেন্ট রামপদ, আর শেয়ার মার্কেটের দালাল শশীকান্ত। এরা সকলেই ঘুম থেকে উঠে চা পান করতে করতে বাক্যালাপে ব্যস্ত। খাবার মেনু ঠিক করে সুধাকান্ত বাজারে যাবার উদ্যোগ করছে।

আজ feast হোক, ম্যানেজার : রামপদ বললে। ভারিক্কি চালে যুদ্ধের সম্বন্ধে একটি মন্তব্য করে শশীকান্ত বললে : টাটার শেয়ার একশো টাকায় দশ হাজার টাকা দর উঠেছে মশাই, আছেন কোথায়? একখানা শেয়ার থাকলে আজ মেয়েমানুষের পেছনে ঘুরে বেড়াতে হত না, বুঝলেন? কথাটা রামপদর গায়ে বিঁধল! রামপদ বললে : 'যুদ্ধের বাজারে সবই তো চড়া, আমার বাজারই মন্দা মশাই— কারবারে ঘেন্না ধরে গেছে— আর এখন কিই বা করি— ভাবছি নেভিতে নাম লিখিয়ে এইবার সমুদ্রে পাড়ি দেব—'

—কেন, হল কী আপনার?

সুধাকান্তর প্রস্থানের অপেক্ষা করছিল রামপদ। তার উপার্জনের এই পন্থার সঙ্গে পরিচিত শুধু শশীকান্ত, বাকি সকলে জানে হাওড়ার হাটে সে কাপড়ের ব্যবসা করে, কাপড়ের গুদাম আছে চিৎপুরে। সুধাকান্ত রওনা হলে রামপদ গলার সুর নামিয়ে বললে :

—হবে কি মশাই। অনেক কষ্টে একটির খোঁজ পেলাম— বিশ বয়স বাইশ— গিধধোড় ব্যাটা মাড়ুয়া বলে কি জানেন? দশ টাকা— হাফ নয় মশাই, পুরো গেরস্ত—

পুরোনো লোহালক্কড় খুঁজে বেড়ান রামবাবু— ওজন দরে বেচলেও কিছু পাবেন।

—ওসব জ্যান্তমালের ব্যবসা যুদ্ধের সময় চলে না— লোহা-লক্কড়-তামাপিতল- অ্যালুমিনিয়াম-এর কাছে মেয়েমানুষ?

দরজার কাছে কার পায়ের শব্দ শুনে শশীকান্ত থামল। আগন্তুক ভদ্রলোক চৌকাঠে পা দিয়ে নমস্কার জানিয়ে বললে :

'শশীকান্তবাবু কার নাম?' 'আমার, কেন বলুন তো?' ভদ্রলোক একখানা চিঠি তার হাতে দিয়ে বললে : সুধীরবাবু দিয়েছেন।

চিঠিখানা পড়ে শশীকান্ত একবার ভদ্রলোকের পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিলে। সাদাসিধে পোশাক, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। হাড়সার দেহের চওড়া কাঠামোটা আজও অতীত স্বাস্থ্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে, তীক্ষ্ন দৃষ্টি যেন ভাঙা বাড়িটার ভিতরের ইটগুলো পর্যন্ত স্পর্শ করছে, অমায়িক কথাবার্তা, চালচলন।

—সিট তো আমাদের একটাও খালি নেই। ঘর একটা আর এই বারান্দা— আমরা ছজন থাকি। উপরের সিঁড়ির ঘরটাতে আপনি যদি থাকতে পারেন তাহলে ব্যবস্থা করা যায়। খাওয়াদাওয়া কিন্তু খুব কষ্ট হবে আপনার। শশীকান্ত বলল।

অমায়িকভাবে হেসে ভদ্রলোক বললেন : না— কষ্ট হবে কেন? আপনারা যখন আছেন, আমার একার আর কষ্ট কি হবে?

—কী করেন আপনি জিজ্ঞেস করতে পারি কি? এবার রামপদ প্রশ্ন করল, এদিকে তার কৌতূহলই বেশি। 'সিগারেট ফ্যাক্টরিতে কাজ করি—'

বেণীমাধবের চোখের ঘোর কেটেছে। চোখ রগড়াতে রগড়াতে ঘরের ভিতর থেকে বলল : বেশ! বেশ! আসুন মশাই— নরক গুলজার করা যাবে— দু-চারটে সিগারেট রোজ পাওয়া যাবে তো—?

ভদ্রলোক আবার অমায়িকভাবে হাসলেন। ঠিক হল তিনি সেদিন সন্ধ্যাতেই আসবেন, খাওয়া-থাকার জন্যে মাসে আট টাকা দিতে হবে। মধ্যাহ্নভোজের সময়। রামপদ বিরক্তির সুরে বলল :

—অজ্ঞাতকুলশীলকে কেন মশাই ঢোকান এর মধ্যে?

শশীকান্ত বলল : নিরীহ ভদ্রলোক— মনে হয় না মতলববাজ, সিঁড়ির ঘরে থাকবেন, দুবেলা খাবেন, তাতে আমাদের আর কি অসুবিধে হবে? তাছাড়া সুধীরের পরিচিত—

আর ও দুদিনেই আমি ভজিয়ে নেব দেখো— থাক না— ভদ্রলোক তো আর ক্ষতি করছে না কিছু— আর আমাদেরই মতো একজন হতভাগা যখন— বেণীমাধব ঢেঁকুর তুলে বলল।

বাকি তিনজন একরকম উদাসীন।

শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটা বড় রাস্তার পাশেই বাড়িটা। পঞ্চাশ বছর আগেও নবাব হাজি কাসিমের পুত্র মীরকাশিম এখানে বাইজি নাচিয়েছেন, শরাব পান করেছেন। তখন এই অঞ্চলের নাম ছিল হাজি কাসিমবাজার। বাইরে থেকে বাড়িটাকে ভগ্নস্তূপের মতো মনে হয়। বিরাট ভাঙা গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে চওড়া চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই দুপাশে দুই বহির্মুখী গোলাকৃতি ঘর, মধ্যে মোটা থামের সারি, দুইদিকে দুটি বড়ো বড়ো হলঘর— পিছনে অর্ধবৃত্তাকার বড়ো বারান্দা— তারপর সিঁড়ি ও বাগান।

বারান্দা ও একটি হলঘরকে দুভাগ করে শশীকান্তর প্রাইভেট মেস। বাইরের গোলাকৃতি দুটি ঘরে জনকয়েক রিকশাওয়ালা রাত্রিযাপন করে। বাগানে বুনো ঘাস গজিয়েছে, তারই উপর চারিদিকে ভাঙা মাডগার্ড ও ছেঁড়া নারকেল ছোবড়ার গদি ছড়ানো। আগে ছিল মোটরের কারখানা, কেউ বলে তারও আগে নাকি এটা টাকা ও নোট জালের গুপ্ত ঘাঁটি ছিল।

আজ মাসখানেক হল সেই ভদ্রলোক এসেছেন। মেসের সকলে তাঁকে ভোলাদা বলে। এমন আত্মভোলা লোক নাকি তারা জীবনে দেখেনি।

ভোলাদা ভোরে উঠে বেরিয়ে যায়, দুপুরে কোনোদিন ফেরে, কোনোদিন ফেরে না। সন্ধ্যার পর ফিরে আসে মেসে। সিঁড়ির ঘরটাতে গিয়ে ছোটো একটি লণ্ঠন জ্বেলে পড়াশুনা করে। একটু রাত হলে এক এক করে আট-দশ জন লোক আসে ভোলাদার কাছে। কেউ ভদ্রলোক নয়। কালো কালো চোয়াড়ে চেহারা, লুঙ্গি পরা। বিড়িওয়ালা হবে, কিংবা গাড়োয়ান।

একটা ভাঙা মাডগার্ডের উপর বসে সামনের বাগানটায় ভোলাদা রাত প্রায় দুপুর পর্যন্ত ওই লোকগুলোর সঙ্গে বিড় বিড় করে আলাপ করে। জিজ্ঞাসা করলে বলে : 'ফ্যাক্টরিতে কাজ করে, আমারই আন্ডারে। জেলারল রিট্রেঞ্চমেন্টে চাকরি গেছে তাই আসে আমাকে দিয়ে সাহেবকে বলাবার জন্যে।' ভোলাদার কথা অবিশ্বাস করা যায় না।

বেণীমাধবের ঘোলাটে দৃষ্টি কিন্তু সর্বদাই মাডগার্ডের উপর বসা লোকটির উপর নিবদ্ধ থাকে। চোখের সামনে বিড়ির আগুনের ফুলকি ওড়ে, আকাশ থেকে তারা খসে যায়। গেঁজেল, মাতাল আর জুয়াড়ি চরিয়ে তার জীবন গেল, একজনের চোখ দেখে তার চোদ্দোপুরুষের খবর বলে দিতে পারে, অথচ এই লোকটা এত সরল হয়েও এত জটিল মনে হয় কেন? বেণীমাধব ঘুমিয়ে পড়ে।

শশীকান্ত বারান্দায় পায়চারী করতে করতে আড়চোখে চেয়ে দেখে। 'লোকটা অ্যানার্কিষ্ট নাকি?' মনে মনে ভাবে। কিন্তু এত অন্তরঙ্গভাবে কি সকলের সঙ্গে মেশা যায়?

সত্যই তো! রামপদ কোনোদিন গভীররাতে ফিরে ভোলাদাকে বিছানা থেকে তুলে তার হোটেলের কাহিনি বলে : ভোলাদা! কলকাতার শহরটা মেয়েমানুষের জোরেই চলছে। পনেরদিন যদি সব মেয়েদের বাইরে চালান করে দেওয়া যায়, শহরের আর অস্তিত্ব থাকবে না। ব্যবসা চলছে নারীদেহের ভোলাদা— ওপরের কলকবজা তো ঠাট। আছে নাকি সন্ধানে কেউ—?

ভোলাদা হাসিমুখে এরও জবাব দেয়। বলে : আমার সঙ্গে ভাই কারও আলাপ নেই। আমাকে দেখলে মেয়েরা পালিয়ে যায়— আমি নাকি কাঠখোট্টা লোক।

পরিমল ছবির আলাপ করে, ভোলাদা উত্তর দেয়। ক্ষিতীশ কবিতা পড়িয়ে শোনায়, ভোলাদা চোখ বুঁজে শোনে। বেণীমাধবকে মাঝে মাঝে পাঁচ আনা পয়সা দিতে হয় রেসের জন্যে, এক আধ প্যাকেট সিগ্রেটও কিনে আনতে হয়— ফ্যাক্টরির লোক কিনা?

কাশতে কাশতে ভোলাদা বিছানার উপর উঠে বসল। নিশুতি রাত। আজ আর ভোলাদার ঘুম হয়নি। অসহ্য যন্ত্রণা বুকের মধ্যে। ফুসফুস দুটো দিন দিন ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। মেসের সামান্য কটা টাকা অতি কষ্টে জোগাড় হয়— চিকিৎসা করবে কে? দু-হাতে বুকটা চেপে ধরে ছাদের উপর পায়চারি করে ভোলাদা। বাইরের ঘরে রিকশাওয়ালারা ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে অকাতরে ঘুমুচ্ছে। রাস্তা জনমানবহীন। কেঁউ কেঁউ করে কয়েকটা নেড়ি কুকুরের ছানা ডাকছে বাড়িটার কোনো গর্তের মধ্যে।

নীচে খুব জোরে হঠাৎ 'ওয়াক' 'ওয়াক' শব্দ শোনা গেল। সিঁড়ির উপর এসে দাঁড়াল ভোলাদা। শব্দটা আর কিছু নয়, বমির। বেণীমাধব নেশায় চুর হয়ে ঘরে ফিরে বমি করছে, আর কাতরাচ্ছে। জ্বরে ছটফট করছে সুধাকান্ত বাইরের বারান্দায়।

ঘুটঘুটে অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে ভোলাদা নেমে এল নীচে। ডানহাত দিয়ে বেণীমাধবকে বেষ্টন করে বললে : আসুন বাইরে চমকে উঠল বেণীমাধব— গরম একখানা হাত লোহার মতো কঠিন। অন্ধকারে যেন বেণীমাধবকে চূর্ণ করে ফেলবে।

দু-বালতি জল মাথায় ঢেলে দিয়ে ভোলাদা বেণীমাধবকে শুইয়ে দিলে বিছানায়। জোরে জোরে মাথায় হাওয়া দিয়ে বললে : ঘুমোন বেণীবাবু।

—আপনি আমার আরজন্মের মায়ের পেটের ভাই ছিলেন ভোলাদা— স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বেণীমাধব বললে।

—এজন্মেও আছি ভাই— এখন একটু ঘুমোন।

চোখ দুটো জড়িয়ে আসে। সুরা-ক্লান্ত চোখ দুটো তুলে বেণীমাধব একবার ঘরের চারিদিকে চেয়ে দেখে। অন্ধকার ঘরে ভোলাদা বসে আছে শিয়রের কাছে, লোহার মতো কড়া-পড়া দু-খানা হাত মাথার উপর চেপে বসানো। ঘুম আসে।

অন্ধকার বাইরের বারান্দায় বেডের ওপর জ্বরে অচৈতন্য সুধাকান্ত চমকে ওঠে : কে! কে!

ভারী গলায় কানের কাছে শোনা যায় : আমি, ভোলাদা! কষ্ট হচ্ছে খুব?

মাথার চুলের মধ্যে একখানা হাত, আর একখানা হাত বুকের উপর। সুধাকান্তর চোখে জল এল। এ আবার কী? বহুদিনের অনাস্বাদিত জীবনের এ আস্বাদ আবার কেন? অন্তরের এই গাঢ় স্পর্শ, এই গভীর অনুভূতির প্রয়োজন কী? কে ভোলাদা? বাড়িটার ভাঙা ইটের পাঁজরে পাঁজরে খোদা আছে জীবনের কলঙ্ক। পীড়িত, দলিত সেই জীবনের কান্নার ধ্বনি আজও শোনা যায় এই জীর্ণ বাড়িটার কঙ্কালের ভিতর থেকে। আমাদের জীবনও তো বাড়িটার এই পুরোনো ভাঙা ইটের মতো। তাই তো যন্ত্রের মতো। তাই তো যন্ত্রের মতো শ্বাসপ্রশ্বাস টানতে টানতে শ্বাসযন্ত্রের প্রক্রিয়া একদিন বন্ধ হয়ে যাবে জানি।

চিন্তাধারায় সুধাকান্তর ক্লান্তি আসে। ঘুম আসে শুশ্রূষার প্রশান্তিতে।

বারান্দায় সংলগ্ন বন্য তৃণোদ্যানে ভোলাদা দু-হাতে বুকটা চেপে ধরে পায়চারি করতে থাকে। আকাশে চাঁদ নেই। কৃষ্ণপক্ষের রাত। বুকের ভিতর কে যেন সুঁচ দিয়ে সেলাই করছে। রাস্তায় হোসপাইপের শব্দ হবে কখন?

একদিন নয়, একরাত নয়, এরকম অনেক রাত, অনেক দিন যায়। বিস্বাদ কয়েকটা জীবনের সঙ্গে ভোলাদার এই নিবিড় যোগাযোগের মধ্যে সকলেই বুঝতে পারে কোথায় যেন একটা বিশাল ব্যবধান রয়েছে। পরিমলের ইঁদুরকাটা পটের উপর 'অভিসারিকার' অর্ধসমাপ্ত মুখের পাশে ভোলাদার মুখ ভেসে ওঠে। প্রাইভেট টিউটর যখন কবির কল্পনায় রহস্যের যবনিকা তুলে ধরে তখন ভোলাদাকে মনে হয় পলাতক খুনি। শশীকান্তর দালালি বুদ্ধি ও যুক্তিতে ভোলাদা অ্যানার্কিস্ট— সকলকে না হাজতে যেতে হয় শেষপর্যন্ত। রামপদ ভাবে, ভোলাদা ব্যর্থ প্রেমিক। সুধাকান্তর মনে হয়, ভোলাদা নিরীহ লোক, উদার মন, শ্রদ্ধেয়। বেণীমাধবের সুরা-ক্লান্ত চোখের সামনে বার-বার ভোলাদার সেই মূর্তি ভেসে ওঠে, চারিদিকে তার সেই কালো-কালো চোয়াড়ে মুখ আর বিড়ির আগুনের ফুলকি।

ভোলাদার বুকের যন্ত্রণা বেড়ে যায়। সকলে জানে ভোলাদার অসুখ হয় না, অসুখ হলেও কাতর হয় না। ভোলাদার হাড় দিয়ে রাইফেলের বুলেট তৈরি করা যায়।

আজ রাত্রে ভোলাদার কাতর আর্তনাদ ক্ষীণ হলেও সকলে শুনেছে। বুলেট বিঁধেছে ভোলাদার হাড়ে, পাঁজরে, ফুসফুসে। রাইফেলের নয়, টিউবার্কল ব্যাসিলির। সেই চোয়াড় কালো-কালো একদল লোক ভোলাদাকে ধরে ঘিরে বসে আছে। সকলে দাঁড়িয়ে আছে পাশে। গ্যালপ করে ছুটেছে যক্ষ্মা। কাটা পাঁঠার ছিন্নমুণ্ড ধড়ের মতো ভোলাদা ছিটকে পড়ল সিঁড়ির উপর। একজোড়া মত্ত বলগাহীন অশ্বের শক্তি ভোলাদার, টেনে রাখা যায় না। অনর্গল রক্তবমিতে চোখ দুটো নিস্তেজ হয়ে এল।

দিনের আলো দেখা গেল দূরে। হোসপাইপের শব্দ হল রাস্তায়। ভোলাদাকে বারান্দায় নামানো হয়েছে।

কালো-কালো চোয়াড়ে মুখগুলোর উপর যেন কালি জমাট বেঁধে গিয়েছে। রুক্ষ্মদৃষ্টি রুক্ষ্মতর হয়ে ভোলাদার বিবর্ণ মুখের উপর নিবদ্ধ। রুক্ষ্মতা ভেদ করে বড়ো বড়ো জলের ফোঁটা পড়ছে কালো চামড়া বেয়ে। কালো জল নয়, কালো-কালো নির্বাক মুখ। বেণীমাধবের বিড়ির আগুনের ফুলকি গিয়েছে আজ মুখ থেকে এদের চোখে। কাল সারারাত মদ্যপানের পর বেণীমাধব অঘোরে ঘুমুচ্ছে।

ভোর হল। বারান্দার ওপরে 'খট খট' জুতোর শব্দ শোনা গেল। আগন্তুক ভদ্রলোক ভোলাদা নয়, পুলিশ ইনসপেক্টর, পিছনে জমাদার, হাতে বিড়িওয়ার্কস ইউনিয়নের সেক্রেটারি মহম্মদ ইয়াকুবকে গ্রেপ্তার করার পরোয়ানা। মীরকাসিমের জীর্ণ প্রমোদ-ভবন ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে লাঠিয়াল পুলিশ। রাস্তায় কৌতূহলী জনতা নয়, প্রায় তিনশো কালো কালো চোয়াড়ে লোক, রুক্ষ্মদৃষ্টি, আর তারই মধ্যে ঊর্ধ্বে উড্ডীন একটি পতাকা, লাল রঙের।

ভাঙা বাড়ির গর্তগুলি তল্লাস করে ভোলাদার শেষ সম্বল যা কিছু ছিল পাঁজা করে নিয়ে চলল পুলিশ। ইনসপেক্টর বললেন, শবযাত্রাখানা ঘুরে যাবে গোরস্থানে।

ইয়াকুবের মৃতদেহ ঘিরে পুলিশবেষ্টিত শবযাত্রীরা চলল থানা হয়ে গোরস্থানের দিকে। সুধাকান্ত একবার সকলের হতবাক মুখের দিকে চেয়ে বললে : মহম্মদ ইয়াকুব! সকলের চোখে তখন জল টলমল করছে।

ভাঙা বাড়িটাকে আজ সত্যিই মনে হল জীর্ণ, পরিত্যক্ত একটা খোলস। জীবন গিয়েছে গোরস্থানের দিকে। নতশির শবযাত্রীরা কারা? কালো-কালো চোয়াড়ে মুখের উপর বেদনার মূর্তি যেন আজ খুদে দিয়েছে কে। কালো মুখ আরও কালো হয়েছে।

বেণীমাধবের নেশার ঘোর তখনও কাটেনি। সবকিছু যেন দুর্বোধ্য দুঃস্বপ্ন, দৈত্য এল আর গেল। ভোলাদার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করে অর্ধমাতাল বেণীমাধবের জড়িত কণ্ঠস্বর তখনও নিঝুম বাড়িটার জীর্ণ-পাঁজরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে : 'ছোড় দেও— হামারা ভাই হ্যায়— ছোড় দেও—'

১৯৪২
সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%