বিনয় ঘোষ
সকাল থেকে কানু মুখভার করে রয়েছে। পাশের ঘরে প্রতিবেশী ললিতবাবুর ছোটো মেয়ে মিনু রোয়াকে বসে পদ্যপাঠ পড়তে পড়তে দু-একবার কানুর মুখের দিকে চেয়ে হেসেছে, কানু বোধহয় কালকের কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলার সময় তার দুষ্টুমির কথা ভুলতে পারেনি, রাগ করেছে। মানকে, হাবু, পেঁচো, হরি সবাই এক-একবার হাত চোখ ইশারা করে ডেকেছে কানুকে বাইরে এসে দু-চার দান মার্বেল খেলার জন্যে, কানু সাড়াশব্দ দেয়নি।
রুদ্ধ ঘরে বাবার প্রাণটা ক্রমবিলীয়মান দীপশিখার মতো টিম টিম করে জ্বলছে, হঠাৎ কখন নিভে যাবে চারিদিকে অন্ধকারে ডুবিয়ে— জানে না কেউ। ঝড়ের আভাস বুঝতে পারে কানু, নীড়ে বসে আধ-ফোটা চোখ দিয়ে আসন্ন ঝড়কে পাখির ছানা যেমন বোঝে তেমনি। ঠিক স্পষ্ট নয়, তাই আরও ভয়ংকর। রোগশয্যা থেকে কাতরকণ্ঠে বাবা ডাকলেন :
'কানু, কী হয়েছে বাবা তোমার?'
ঘরের মধ্যে কানু ঘাড় হেঁট করে দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে। মা বললেন, 'ভোর থেকে উঠে মুখ হাঁড়ি করে রয়েছে, আদিখ্যেতা। আদর দিয়ে দিয়ে বাঁদর তৈরি করেছে, হাড়েনাড়ে জ্বালিয়ে খেলে একেবারে।' কানু চুপ করে রইল।
আদর! পেট থেকে পড়ে পর্যন্ত কেবল দূর ছাই, আর লাথি-ঝাঁটার মধ্যে মানুষ ওরা। শুয়ে শুয়ে ভাবেন রামবাবু। জিলজিলে বুকখানা চিরে দু-এক ফোঁটা জল চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে ময়লা বালিশটার ওপর। একবার শুধু বলেন,— 'অমন করে ওদের দূর ছাই করো না গো, করো না।'
এতক্ষণে কানুর নীরবতা ভাঙে। বাঁধভাঙা বন্যার মতো হঠাৎ কান্না ফুলে ওঠে বুক থেকে। হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় কানু।
ব্যাপারটা অতি সামান্য। আজ কিছুতেই কানু স্কুলে যাবে না। কেন যাবে না, মরে গেলেও বলবে না সে। পাড়ার দিদিমা কানিবুড়ি দূর থেকে একবার কানুর বাবার সংবাদ নিতে এসেছিলেন। কানুকে চড়াতে দেখে কানুর মাকে তিনি বললেন,— 'মেরোনা বউমা, আজ যখন যেতে চাচ্ছে না তখন থাক, আজ আর পাঠিও না ইস্কুলে। থাক না আজ বাপের কাছে। হাজার হোক ওই তো বড়ো। বলা তো যায় না— আর ছোটো ছেলের মন, ওরা ঠিক বোঝে মা, ঠিক বোঝে।' কথাগুলো কানে শ্মশানস্তব্ধ দ্বিপ্রহরে দাঁড়কাকের 'খা, খা' ডাকের মতো শোনায়।
কথার ইঙ্গিত স্পষ্ট। মুখ অন্ধকার করে কানুর মা উঠে চলে যান ঘরে— জবাব দেন না কথার। এ-পাড়ায় কি মানুষ থাকে?
ছল ছল চোখে স্কুল গেল কানু। গলির মুখে আগে থেকে দাঁড়িয়েছিল মিনু, ভেবেছিল কিছু বলবে, সাহস হল না।
স্বর্গীয় পিতার আত্মার উদ্দেশে স্কুলের সেক্রেটারি কিছু দান করবেন মনস্থ করেছেন। ঠিক হয়েছে 'পুওর ফান্ডের টাকায় যে সব গরিব ছেলে স্কুলে পড়ে তাদের তিনি একটা করে খাকির হাফপ্যান্ট ও হাফ শাট দেবেন, একমাত্র শর্ত তাদের স্কাউট হতে হবে। দানান্তে তাঁর গৃহে আজ এই গরিব ছাত্রদের পৃথক ভোজের ব্যবস্থাও হয়েছে।
যথাসময়ে প্রধান শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে ক্লাস থ্রিতে প্রবেশ করলেন সেক্রেটারি ভবানীবাবু। দারোয়ানের হাতে প্যান্ট-শাটের বোচকা। হেড-মাস্টার মশাই গরিব ছাত্রদের নাম ডেকে দাঁড়াতে বললেন। আরও দশজনের সঙ্গে দাঁড়াল কানু, ঘাড় হেঁট করে। 'পুওর ফন্ডের' অর্থে সে পড়ে কিনা! আগে ছিল হাফ-ফ্রি, মাস ছয় হল বাবার দুরারোগ্য ব্যাধির কথা বলে ফ্রি হয়েছে। একে একে সকলে দান গ্রহণ করল ভবানীবাবুর হাত থেকে। সকলকে তিনি বলে দিলেন, ঘরে ফিরে পোশাক বদলে এই পোশাক পরে যেন সন্ধ্যার আগেই সকলে তাঁর গৃহে হাজিরা হয়। আহ্লাদে খুশি হয়ে সকলেই সম্মতি জানিয়ে যায়। আজ হাফ-হলিডে।
এবারে ডাক পড়ল কানুর। কানু নড়ল না একটুও, দাঁড়িয়ে রইল ঠিক তেমনিভাবে ঘাড় হেঁট করে। হেড-মাস্টার বললেন : 'বেরিয়ে এসো কানাই!' কানু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁতে ঠোঁট কামড়ে পা ঘষতে থাকে। হেড-মাস্টার ধমক দিয়ে ডাকলেন : 'নিয়ে যাও তোমার প্যান্ট শাট, কী হয়েছে কী তোমার?' কানু হেড-মাস্টারের দিকে একবার অনেক কষ্টে মুখ তুলে বলে— 'নেব না।' দুই চোখ দিয়ে তার ঝর ঝর করে জল গড়িয়ে পড়ে কাঠের বেঞ্চের ওপর। আজ সকাল থেকে তার মুখ কি এইজন্যেই মেঘলা হয়েছিল?
কানুর সহপাঠীরা সকলে বলছিল, কানুর নাকি শাস্তি হবে 'বেত্রাঘাত', আর ছুটির পর একঘণ্টা আটক। হয়েছিলও তাই। এ রকম একগুঁয়ে ছেলে নাকি ভূ-ভারতে নেই।
সেক্রেটারি ভবানীচরণ ফ্রি লিস্ট থেকে কানুর নাম অবিলম্বে কেটে দেবার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নাকি বলেছিলেন— 'গরিবের বদমায়েস ছেলেদের যদি বিনা পয়সায় লেখাপড়া শেখাতে হয় তাহলে গুন্ডা-ভিখিরিদের ছেলেদের শিক্ষার জন্য অবৈতনিক শিক্ষালয়ের ব্যবস্থা করতে হয় আগে। গরিব হলেই তার শিক্ষার অধিকার থাকবে না, তাকে ভদ্র, শান্তশিষ্ট, বাধ্য হতে হবে।'
বেতের বাড়িতে হাত-পিঠ ব্যথায় টন টন করছে। বাবা যদি ছেলের হয়ে ক্ষমা না চায় তাহলে কাল থেকে স্কুলের গেট বন্ধ। ঘরে ফিরছে কানু। শতেক তালি দেওয়া ময়লা প্যান্টটাতে মাঝে মাঝে হাত দিয়ে চোখের জল রগড়ে মুছছে। তার বাবা কেরানি, গরিব। জানে সে। তার ওপর প্রায় একবছর কি এক কঠিন রোগে শয্যাশায়ী— পাড়ার সকলে তাদের একরকম একঘরে করে দিয়েছে। পাড়ার অন্য ছেলেমেয়েরা তার সঙ্গে খেলে বলে তারা কি তাদের বাপ-মায়ের কাছে কম মার খায়। আট বছরের মেয়ে মিনুকে সেদিন তার মা ঘরে হাতে পায়ে দড়ি বেঁধে রেখেছিল, কানুর সঙ্গে কানামাছি খেলেছিল— তাই। পাড়ার দিদিমাবুড়ি তাকে বলেছিল 'অসভ্য'—।
দূর থেকে পাড়ার গলিটার মুখে গ্যাসপোস্টটাকে ধোঁয়া আর অন্ধকারের মধ্যে মনে হল কঙ্কালের মতো। পিসিমার কাছে শোনা সেই অন্ধকার প্রেতপুরীর বিকট প্রহরী যেন! অজানা ভয়ে শিউরে উঠল কানু।
চারিদিক ধোঁয়ায় ধোঁয়া। সন্ধ্যায় উনুন জ্বলছে। মৌনীবাবার মুখরা উপাসক কানিবুড়ির সন্ধ্যারতির কাঁসর ঘণ্টা বাজছে রোজকার মতো আজও। গলিটা যেন সেই প্রেতপুরীর সুড়ঙ্গ, যেখান দিয়ে কোটালপুত্র একাই নেমে গিয়েছিল তলোয়ার নিয়ে দৈত্য বধ করতে!
সন্তর্পণে ঢুকল কানু অন্ধকার গলির ভিতর। বাইরের দরজা থেকে দেখল তাদের ঘরের উঠোনে ভিড়। পাড়ার মেয়েরা যার যার কাজ সেরে উনুনে আঁচ দিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে ভিড় করে। কানুকে দেখে কে একজন বললে, 'একবার চোখের দেখা দেখতে পেলে না গা! কি কাতরানিটাই না কাতরেছে কানু কানু করে— হাজার হোক বাপের প্রাণতো— আহা!'
অসহায়ের মতো একবার ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখল কানু চারিদিকে। শীর্ণশান্ত বাবাকে ওরা টান টান করে শুইয়ে দিয়েছে মেঝের ওপর। মা কেঁদে লুটোচ্ছে মাটিতে, পিসিমা তার ছোটো ভাইবোন দুটোকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছে।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে কারা? কাঠের মানুষ, শুকনো মানুষ, বাঁশের মতো ফাঁপা, কারা ওরা?
একদিকে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কানুর খেলার সাথীরা, হাতে লোহার চাকা আর ডান্ডাগুলি। পাড়াসুদ্ধু লোক কাঁদছে না কেন আজ? কানুর একবার মনে হল। চোখে পড়ল এককোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছে শুধু মিনু। ডুকরে কেঁদে উঠল কানু। কি যেন খুঁজে পেয়েছে সে তার খেলার সঙ্গিনী মিনুর চোখের জলে। থর থর করে কানুর জলভরা চোখে বাড়িটা কেঁপে উঠল, পাড়াটাকে মনে হল অন্ধকার প্রেতপুরী। আলোক শুধু ওই মিনুর চোখের অশ্রুকণা। স্কুল আর এ পাড়ার মরুভূমির মধ্যে সমবেদনাতুর মিনুর চোখ দুটো যেন মরূদ্যান। মাথার কোঁকড়া চুলগুলো উঠোনে লুটোচ্ছে— কাঁদছে কানু, দৈত্য-পরিবেষ্টিত, নিরস্ত্র কোটালপুত্র।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন