বিনয় ঘোষ
কপালের কালো দাগটা এখনও মিলিয়ে যায়নি। ঘুমন্ত নন্দর মুখের দিকে চেয়ে-চেয়ে দেখছিল লক্ষ্মণ। নন্দ— নন্দ— নন্দরানি! ভোরের ক্ষীণ আলো জানালার ফাঁক দিয়ে এসে পড়েছে নন্দর মুখের উপর। শিথিল বেণীর মাটিতে লোটানো মুখটা আলো-অন্ধকারে মনে হচ্ছে সাপের ফণা। পাশে শুয়ে রয়েছে লক্ষ্মণের পাঁচটি ছেলে কুণ্ডলি পাকিয়ে। কেউটের বাচ্চা। কার সাধ্যি স্পর্শ করে। একসঙ্গে ফণা তুলে তেড়ে আসবে সব— মায়ে বাচ্চায় মিলে। আহা! মিথ্যে একটা রডের বাড়ি মেরেছিললক্ষ্মণ কাল নন্দর কপালে। কিন্তু কি দরকার ছিল কাজ থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ওই কথা তাকে শোনানোর! রোজ সেই এক কথা, এক সুরে—
দিন নেই রাত নেই, সময় নেই অসময় নেই, সেই একঘেয়ে কথা। চাল নেই— কয়লা নেই— নুন নেই— সেই একসুর— মাঝরাতের বীভৎস 'বল-হরি-হরি-বোল'। দশ ঘণ্টা দুটো ঠ্যাং বনবন করে ঘুরিয়ে সন্ধের সময় ঘরে ফিরব— কিড়িং কিড়িং— অমনি খেকীর দল সব তেড়ে আসবে। তারপর সেই কেঁউ কেঁউ— সারারাত ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যানোর ঘ্যান, আর সারাদিন টক্কা-টক্কা-টরে-টরে—।
ভোরের আলো আরও একটু পরিষ্কার হয়েছে। নিজের দুর্ব্যবহারের উপর যুক্তির পট্টি লাগিয়ে স্বস্তি পেল লক্ষ্মণ। ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেল ভিতরের বারান্দার দিকে। ডানদিকের ঘেরা রান্নাঘরের দিকে চেয়ে দেখল বহুদিনের পুরোনো একমণি মাটির জালাটা অপরাধীর মতো কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, চারিদিকে তার শুকনো তেজপাতা আর সরষে ছড়ানো। লুলুর কীর্তি। লুলুর উপদ্রবে আর তিষ্ঠোবার জো নেই। পাতের ধারে বসে যাহোক সপ্তাহে দুটো দিন তবু মাছের কাঁটাটা-আঁশটা আড়দাঁতের ফাঁকে ফেলে চিবোনো চলত, কট কট করে ঊর্ধ্বমুখী লোমশ লেজটা গায়ে বুলিয়ে আব্দারে শ্লেষ্মা রুগির মতো ঘড় ঘড় করলেও বিরক্ত হত না কেউ— আজ লুলুর দৌরাত্ম্যের সীমা নেই। ভাত মেখে সামনে দিলে লুলু শুঁকে শুঁকে হয়রান হয়— থাবা দিয়ে ঘেঁটে ঘেঁটে দেখে— আধসিদ্ধ ডালের দানার দিকে চেয়ে চেয়ে লুলু ডাকতে থাকে—ম্যাউ—অ্যাউ—
নিমকহারাম হুলোটাকে বিদায় করতে হবে এবার— লক্ষ্মণ ভাবে। করুণভাবে লক্ষ্মণের মুখের দিকে চেয়ে জিব দিয়ে গোঁফটা একবার চেটে নিয়ে লুলু ডাকে 'ম্যাউ', লক্ষ্মণের মায়া হয়।
মাটির জালার মুখটা ফাঁক করা। উঁকি মেরে দেখতে ভয় হয়— ভিতরে হয়তো অগাধ অন্ধকার, সূর্যও হার মেনেছে, ঢুকতে পারেনি তার মধ্যে। সন্তর্পণে এগিয়ে এল লক্ষ্মণ। উঁকি দিয়ে দেখল ভাঁড়ে মা ভবানী। কি একটা তিড়িং করে লাফ দিয়ে পড়ল মাটিতে। ইঁদুর। উপরের ঝুলে-ভরা তেকাঠায় হাড়ির মুখে এতক্ষণ ওঁৎ পেতে বসে ছিল লুলু, সাড়াশব্দ দেয়নি। সশব্দে হাড়িকুড়ি মাটিতে ফেলে ভেঙেচুরে লাফ দিয়ে পড়ল লুলু, ধাওয়া করল ইঁদুরটাকে।
শূন্য হাঁড়িকুড়ি আর ঘরের গর্তগোদা পাহারা দেওয়া আজকাল লুলুর প্রধান কাজ। কাজ কঠিন। খালি পেটে অবসন্ন দেহমন নিয়ে লুলু তার দৈনন্দিন কাজ করে, বসে বসে ঝিমোয়, নন্দরানির বাচ্চাদের সঙ্গে তার মধ্যে খানিকটা ঝাঁপাঝাঁপিও করে। কিন্তু সকলের ঔদাসীন্য ক্রমেই লুলুর অসহ্য ঠেকছে।
লক্ষ্মণের নৈশাহারের সময় কাছে এলে লুলু গায়ে লেজ বুলিয়ে ঘড়ঘড় করে। কান ধরে লক্ষণ দূরে আছাড় দিয়ে ফেলে দেয়। ঝুপ করে খাবার উপর ভর দিয়ে বসে পড়ে লুলু করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে লক্ষ্মণের খাবার থালার দিকে। চোখ দুটো তার অন্ধকারে জ্বলে, না জলে ছল ছল করে, সেদিকে কেউ চেয়েও দেখে না।
এদিকে লুলুর হাঁড়িভাঙার শব্দে ঘুম ভেঙেছে নন্দরানির আর দুলালদের। মোড়া দিয়ে উঠেছে সব ঠেলে। ধনুকের মতো বেঁকে পানতা সুর টেনে বললে, 'ব্যাবা'—। বাবা লক্ষ্মণ তার অনুকরণে আর একবার 'ব্যাবা' বলে পানতার গর্দান ধরে নামাল মেঝের উপর। সব কটাকে নামিয়ে দাঁড় করাল একসারিতে।
'গা, গা, গান গা, আজ রবিবার মনে নেই? যেতে হবে এখনই'— লক্ষ্মণ বলল। হাতে তালি দিতে দিতে আরম্ভ হল গান :
তাই—তাই—তাই
সার দিয়ে দাঁড়াই
চাল নাই, তেল নাই
পোড়া চোখে ঘুম নাই
প্রাণ বলে পালাই পালাই
ভাই—ভাই—চল যাই—
(তাল-ফেরতা)
এক-দুই-তিন এক-দুই-তিন
চাল চাই, নুন চাই, চাই কেরোসিন
চার-পাঁচ-ছয় চার-পাঁচ-ছয়
আফ্রিকাতে ভুট্টা আছে, নেই আর ভয়।
ঘুম-ভাঙা ফোলা-ফোলা দুটো চোখের দৃষ্টি সজোরে লক্ষ্মণের মুখের উপর নিক্ষেপ করে নন্দরানি বলল : 'আ-হা-হা, রঙ্গ দ্যাখ— ধেড়ে সঙ সেজে ওদের নিয়ে রাস্তায় বেরোও— জেলেপাড়ার সঙকেও হার মানাবে— চাই কি গরমেন্টের লোক গান শুনে তোমাকেই আগে ডেকে চাল দেবে—'। কথা কটা বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল নন্দরানি।
লক্ষ্মণের মনটা ধোঁয়াচ্ছিল কদিন ধরে। কে যেন জল ঢেলে দিল তার উপর। নন্দ যে এত তাড়াতাড়ি সামলে উঠবে সে কল্পনাও করেনি। আর যাই হোক— নন্দর মনটা ভালো, খরস্রোতা নদীর পাড়ের মতো। মাড়িয়ে যাও, দাগ কেটে যাও, শাবল দিয়ে খুঁড়ে রাখো— আবার পরক্ষণেই স্রোতের জলে সব ধুয়ে মুছে যেমন তেমনি ভরাট হয়ে যাবে।
আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠল লক্ষ্মণ। দু-হাত দিয়ে নন্দর কানের পাশ দুটো চেপে ধরে ঝাঁকানি দিতে দিতে সুর টেনে বলে চলল—
ওগো আমার নন্দরানি, গাল-ফোলানি,
চুপটি করে শোন বলি,
বেঁচে থাকলে রেশন পাব,
মরে গেলে পেনশন পাব,
লড়াই চললে ভাতা পাব,
কিসের ভয়!—
ছেলেদের গান থামেনি, তারা গাইছে—
চার-পাঁচ-ছয় চার-পাঁচ-ছয়
জংলা দেশে ভুট্টা আছে, নেই আর ভয়—।
লক্ষ্মণ বলছে সুর করে— ভয় কি গো নন্দরানি, বলি শোন—
বিলেত থেকে আসছে উড়ে
খাস-বিলিতি ভোজন-দেড়ে
দিল্লীতে পাকাবে বসে লাড্ডু—
কসে গাও লাটের জয়, কিসের ভয়?
বাজাও গুপী— গাব গুবাগুব গাড্ডু।
'ছাড় ছাড়, আঃ'— নন্দ চেঁচিয়ে উঠল। ঘর থেকে বেরুবার সময় রুপোর ঝুমকো দুটো দুলিয়ে বলে গেল নন্দ : 'পাঁচছেলের বাপ— এখনও খোকামি গেল না— সঙ সেজে রঙ্গ করা হচ্ছে—'
ছেনো এতক্ষণ গান গাইতে গাইতে মিটমিট করে চেয়ে দেখছিল বাবা-মা'র কাণ্ডকারখানা। ভারি তুখড় ছেলে ছেনো, হাড়ে হাড়ে বদমায়েশি। লজ্জায় মাথা হেঁট করে ছেনো হাত তুলে বলল : 'আমাকে কর বাবা?' 'কী করব?' লক্ষ্মণ বলল। 'ওই যে মাকে করছিলে', ছেনো যেন লজ্জায় আধমরা হয়ে গেল। 'ও' বলে লক্ষ্মণ ছেনোর কানের পাশ দুটো চেপে ধরে চেঁড়ে তুলল উপরে, 'ছেনো— ছেনো— ছেনকু— ছেনো—'
'বেলা হচ্ছে না? রাত থেকে এসে বসে আছে সব, তোমার এখনও সময় হল না— দ্যাখোগে গিয়ে আধ মাইল লোকের লাইন হয়ে গিয়েছে— আজ আর কিছু জুটছে না কপালে—'
এতগুলো কথা নন্দর মুখ থেকে হঠাৎ তিরবেগে লক্ষ্মণের উপর বর্ষিত হবার পর লক্ষ্মণের সম্বিৎ ফিরে এল। ছেলেগুলোকে সঙ্গে নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাবার সময় লক্ষ্মণ বলল : 'ধনাকে কোলে করে তুমি যাও কয়লার ডিপোতে। আর শোন, তোমার সখের রূপোর ঝুমকোটা খুলে যেও, বুঝলে?' নন্দ সুধাল; 'চিলে ছোঁ মারতে পারে—' বলে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল লক্ষ্মণ।
এক কোণে একটি ইঁদুরের গর্তের ধারে বসে ঝিমুচ্ছিল লুলু। শব্দ পেয়ে ছেলেগুলোর পিছু পিছু গলিটার মাথা পর্যন্ত এগিয়ে গেল! কেউ ফিরেও চাইল না তার দিকে।
কয়লার ডিপোর পথে যাবার সময় নন্দ ভাবছিল : 'একেবারে পানতারও বাড়া— কোনো হুঁস নেই, কেবল হাসিঠাট্টা— লোক কেঁদে কূল পাচ্ছে না—'
কোলেতে ধনা তেলেভাজা ফুলুরি খাবার বায়না ধরেছে : 'খাব'— ঘ্যান, ঘ্যান খ্যানোর ঘ্যান—...
টক্কা-টক্কা-টরে-টরে—
একদফা টেলি-বিলি করে এসে লক্ষ্মণ একদিকে সাইকেলটা রেখে দাঁড়িয়েছিল চুপ করে। কেরানিবাবুরা একে একে ভিড় করছে নীচের তলার রেস্টুরেন্টে ও খাবারের দোকানে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সমাজনৈতিক কেরানি-মার্কা তর্কবিতর্ক চলছে। উপর থেকে নেমে এলেন টি-এম হরেনবাবু। লক্ষ্মণকে বিমর্ষ দেখে ডেকে বললেন: 'কি লক্ষ্মণ, ভাবছিস কী? আর ভাবনা কী? বিলেত থেকে ফুড স্পেশালিস্ট আসছে, আফ্রিকা থেকে ভুট্টা আসছে—'। তরমুজাকৃতি হরেনবাবু এ-কথাটা প্রায় রোজই একবার পরিচিত 'ডেলিভারি' পিয়নদের শুনিয়ে দেন। লক্ষ্মণ বলে : 'তা তো শুনছি বাবু, অদ্দিন বাঁচলে হয়—'। 'যা যাঃ, ভারি মাতব্বর হয়েছিস দেখছি, রেশন পাচ্ছিস আবার কি রে?' প্যান্টের পকেট থেকে কৌটো বার করে দুটো পান মুখে দিয়ে হরেনবাবু চলে গেলেন।
রেস্টুরেন্টে তুমুল তর্ক চলেছে কেরানিবাবুদের মধ্যে। তর্কের উৎস হচ্ছে দু-পয়সার পরোটার দাম দু-আনা। কে একজন চড়া গলায় বলছে : 'আরে ওসব ছেঁড়া কথা রাখুন মশাই— ছাপ বললেই নোট ছাপানো যায়, বাড়াও বললেই তো আর ফসল বাড়ে না— সেদিকে কারও হুঁস নেই, সব দিল্লির দিকে হাত পেতে আছে—'
অর্থনীতির অনার্স গ্র্যাজুয়েট যুবক কেরানি বিমানবিহারী বলল : 'ইনফ্লেশন, মশাই ইনফ্লেশন, যাতে জার্মানি সাবাড় হয়ে গেছল—'
প্রৌঢ় কেরানি তারিণীবাবু চায়ের পেয়ালায় একটা চুমুক দিয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে যুবকের দিকে ফিরে বললেন : 'তাহলে কি আর উপায় নেই মশাই?'
খাবার ঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে লক্ষ্মণ ভাবছে : 'পেনশন-রেশন-ইনফ্লেশন— জয় হোক ইউনাইটেড নেশন'। টক্কা-টক্কা-টরে-টরে— মাথার মধ্যে বোলতার চাকে ঢিল।
আজ ক'দিন লুলু নিখোঁজ হয়েছে।
দিনরাত পানতা প্যান প্যান করে, ভাবে বাবা বোধহয় বস্তায় বেঁধে ফেলে দিয়েছে কোথাও। ঘরের চারিদিক মাটি ও গর্তে ভরা। রাতেলক্ষ্মণের ঘুম ভেঙে যায়, গায়ের উপর দিয়ে লাফিয়ে যায় ছোটো নেংটিগুলো— সারারাত কিচিরমিচির হুড়ুমদাড়ুম শব্দ হয়—
লুলু নেই সেকথা জানিয়ে দিচ্ছে এরা।
চোখ বেঁধে, বস্তায় পুরে লুলুকে ছেড়ে দিয়ে এসেছে লক্ষ্মণ এ-রাস্তা সে-রাস্তার কোণে। পিচের গন্ধ, হাজার হাজার মানুষের পায়ের গন্ধ শুঁকে শুঁকে লুলু সন্ধ্যার আগেই হাজির হয়েছে লক্ষ্মণের ঘরে। খাবার সময় নন্দদুলালরা যখন পোঁ ধরে এটা খাব, ওটা কোথায়, লক্ষ্মণের সঙ্গে নন্দর নিত্য-কলহ শুরু হয়, মুখ ফিরিয়ে আঁচলের খুঁট দিয়ে নন্দ চোখের জল মোছে— লুলু তখন এককোণে চুপটি করে বসে কানখাড়া করে শোনে সব, আর ভাবুক দার্শনিকের মতো চোখ বুজে উপলব্ধি করে সংকটের স্বরূপ।
নন্দ বলে : 'আসবে না তো যাবে কোথায়? বেড়াল পোষার সখ নেই কারও এখন—'
লক্ষ্মণের মন ভারাক্রান্ত। জলভরা মেঘের মতো দুশ্চিন্তা থম থম করছে মনের কোণে। ঘরেতে নন্দরানি প্রায়-বিবসনা, ছেলেগুলোর আবদার ও প্যানপ্যানানি অসহ্য, বুকের তলায় পেট গর্তে গিয়েছে। গর্তের মধ্যে ইঁদুরের উঁকিঝুঁকিতে দুর্ভিক্ষের ঘন ঘন তার আসছে।
সন্ধ্যার সময় লক্ষ্মণ ঘরে ফিরছে, সঙ্গে আসছে ছেলেগুলো। ষ্টোর্স থেকে সপ্তাহের রেশন আনতে তারা গিয়েছিল বাবার অফিসে। রাস্তায় ছেনো বলছে : 'তুমি এত বড়ো অফিসে কাজ করো বাবা?' লক্ষ্মণ বলল , 'হুঁ'। ছেনোর বুকটা ফুলে উঠলে, বলল: 'ননতুর বাবার অফিস ছোটো, না বাবা?' লক্ষ্মণ বলল : 'হু'।
ছেনো উঠেছে বাবুর কাঁধে, কানু সাইকেলের সিটে, ভুলু রডের উপর। পানতা হেঁটে চলেছে আর মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াচ্ছে। অন্ধকারে বিড়ালের চোখ জ্বলছে এখানে ওখানে— লুলুর চোখ।
বড়ো বড়ো বাঘের মতো জ্বলজ্বলে চোখ বার করে হুস হুস করে ছুটে চলেছে মিলিটারি লরিগুলো।
লক্ষ্মণ বলল : 'গান না শুনি— আস্তে আস্তে গা—'।
চার-পাঁচ-ছয়, চার-পাঁচ-ছয়
জংলা দেশে ভুট্টা আছে, নেই আর ভয়।
অন্ধকারে শিশুকণ্ঠের ক্ষীণ কোরাস শুনতে লক্ষ্মণের আজ ভালো লাগছিল খুব। তন্ময় হয়ে শুনছিল লক্ষ্মণ।
অন্ধকারে গানের মৃদু গুঞ্জনের মধ্যে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল পানতা— 'ওই যে বাবা, লুলু—' লুলু? ছেনো লাফিয়ে পড়ল লক্ষ্মণের কাঁধ থেকে, কানু ভুলু সাইকেল থেকে মাটিতে। অন্ধকারে গলির মধ্যে বহু পুরাতন পাইস হোটেলের পাশে একটা আঁস্তাকুড়ে লুলু বসে বসে কী যেন চিবুচ্ছে, বোধহয় মাংসের হাড়। বাড়ির এত কাছে, দুবেলা যাওয়া আসার পথের উপর এত পরিচিত পাইস হোটেলে লুলু আশ্রয় নেবে একথা কেউ ভাবতেও পারেনি।
হোটেলের ভিতর থেকে উড়িয়া বালকের পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে : 'ভাত হাফ— ডাল— লটপটি—'
লক্ষ্মণ বলল : 'ফিরে আয় পানতা— লুলু আর আসবে না, চলে আয়—' লক্ষ্মণকে যেন সাপে ছোবল দিয়েছে, ছটফট করছে যন্ত্রণায়। লক্ষ্মণকে অপমান করেছে লুলু, প্রচণ্ড অপমান—
পানতা বলল : 'কেন আসবে না বাবা?'
হোটেলের ভিতর থেকে আবার শোনা গেল : 'চোদ্দো নম্বর, ভাত হাফ, ডাল, কুমড়োর কালিয়া—'
'শিগগির চলে আয় পানতা, রাত হয়েছে'। লক্ষ্মণ হন হন করে চলল ঘরের দিকে।
ছেলেগুলো তখন সকলে মিলে অন্ধকারে ঝুঁকে দেখছে লুলুকে। লুলুর হাড় গোনা যায়। গোল মুখখানার উপর আগুনের মতো চোখ দুটো জ্বলছে, একদৃষ্টে চেয়ে আছে লুলু কৌতূহলী দর্শকদের দিকে।
কারা এরা? কোন জাতের বংশধর? অন্ধকারে হাড়-লিকলিকে ছেনো-কানু-ভুলু- পানতাকে চেনা যায় না ঠিক—
জিব দিয়ে একবার গোঁফ চেটে হোটেলের হেঁসেলের দিকে ঘাড় হেঁট করে চলে গেল লুলু। নটে গাছটিও মুড়িয়ে গেল আঁস্তাকুড়ে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন