বিনয় ঘোষ
'কলকেতা শহর রত্নাকর বিশেষ। এখানে যা না আছে, এমন জানোয়ার পৃথিবীর কোনো চিড়িয়াখানায় নাই।' হুতোম একথা বিলক্ষণ প্রতিপন্ন করেছেন। হুতোম প্যাঁচার জন্মের পর একশো বছর কেটে গিয়েছে, সুতরাং সেকালের হুতোম আর একালের শ্রীবৎসের নকশর মধ্যে পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক। হুতোমের কলকেতায় কি-ই বা ছিল এমন? এক শতাব্দী পার হয়ে গেলেও গা থেকে তার নবাবি আমলের খোশবায় যায়নি। তখন সবেমাত্র ইংরেজের ভাঁটিখানায় বাবু-চোলাই শুরু হয়েছে, কারণ তা না হলে সাম্রাজ্য চালানো যায় না। এই নব্যবাবুরা এক নতুন কালচার পত্তন করেছিলেন। একদিকে নবাবি আমলের আবর্জনা তরজা খেউড়, আর একদিকে ইংরেজি বণিকসভ্যতার জঞ্জাল, এই ছিল এই নব্য 'বাবু কালচারের' উপজীব্য।
কথাপ্রসঙ্গে এখানে বলে রাখা উচিত, ঊনবিংশ শতাব্দীর যে 'মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি' জাতীয় নব-জাগৃতির সহায় হয়েছিল, তার সঙ্গে এই 'বাবু-কালচারের' কোনো সম্পর্ক নেই। ভাবধারা ও আদর্শের ঘাতপ্রতিঘাতে যে আবর্তের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই আবর্ত-উৎক্ষিপ্ত ক্ষণস্থায়ী বুদবুদ হচ্ছে 'বাবু-কালচার'। কিন্তু এই বাবু-কালচার একেবারে লোপ পায়নি, যেমন সেই কালচারের প্রবর্তক 'বাবু শ্রেণি' আজও নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। মধ্যে মধ্যে যখন সমাজের বুকে আবর্তের সৃষ্টি হয়, তখনই এই বাবু-কালচারের বুদবুদ-উচ্ছ্বাস নজরে পড়ে। এই 'বাবু কালচারের' টিপিকাল নাম দেওয়া যেতে পারে 'কলকেতা-কালচার।' এখানে আমরা সেকাল আর একালের এই 'কলকেতা-কালচারের' চুম্বকালোচনা করব।
হুতোমার কালেই হুতোম বলছেন, এখন আর সেকাল নেই। বাঙালি বড়ো মানুষদের মধ্যে অনেকেই সভ্য হয়েছেন। গোলাপজল দিয়ে জলশৌচ, ঢাকাই কাপড়ের পাড় ছিঁড়ে পরা, মুক্তাভস্মের চুন দিয়ে পান খাওয়া, কুকুরের বিয়ের লাখটাকা খরচ করা, যাত্রায় নোট প্যালা, তেল মেখে চার ঘোড়ার গাড়ি চড়ে ভেঁপু বাজিয়ে স্নান করতে যাওয়া, শহরে অতি কম হয়ে পড়েছে। শহরে আমদানি হয়েছে চড়কপার্বণ, প্রদর্শনী আর বারোয়ারি পুজো, ছেলেধরা, মরাফেরা, ভূতনামানো, মহাপুরুষ হঠাৎ-অবতারের হুজুক আর বুজরুকি। সর্বাঙ্গে গয়না, মাথায় জরির টুপি, সিপাই-পেড়ে ঢাকাই শাড়ি মালকোচা করে পরা তারকেশ্বরের ছোপান গামছা হাতে, বিল্বপত্র বাঁধা সুতো গলায়, যত ছুতোর, গয়লা, গন্ধবেণে কাঁসারি চলছে— 'আমাদের বাবুদের বাড়ি গাজন।' বাবুর প্রপিতামহ হয়তো নিমকের দেওয়ান ছিলেন, লক্ষ লক্ষ টাকা উপায় করেছেন। তারপর থেকেই বাবুরা বংশ-পরম্পরায় বনেদি বড়মানুষ। চড়ক গেল, পুজো এল। আফিম গাঁজা মদের সঙ্গে হাফ-আখড়াইয়ের আসরে বাবুদের মৌতাত জমল। কেউ হয়তো ইয়ারের টেক্কা, কেউ রমণীর কাছে একেবারে চিড়িয়ার গোলাম, কেউ নেশায় ভোলা মহেশ্বরের বাবা। এসব পালপার্বণ ছাড়াও ছিল হুজুক আর বুজরুকি। যেমন, কাবুলি মেওয়াওয়ালারা ঘুরে ঘুরে ছেলে ধরে কাবুলে নিয়ে যায়। সেখানে মেওয়া খাইয়ে যখন তার দুধে-আলতা রং হয়, তখন তাকে গরম ঘিয়ের কড়ায় চড়িয়ে ভেজে খেয়ে ফেলে। অথবা বর্ধমানের রাজা প্রতাপচাঁদ একবার মরেছিলেন কিন্তু আবার ফিরে এসেছেন, বর্ধমানের রাজত্ব নেবার জন্যে নালিশ করেছেন, কিংবা ভূ-কৈলেসের রাজার বাড়ি একজন মহাপুরুষ এসেছেন, গায়ে বড়ো বড়ো অশথ গাছ ও উইয়ের ঢিপি হয়ে গিয়েছে, চোখ বুজে ধ্যান করছেন, চোখ খুললেই সব ভস্ম করে দেবেন ইত্যাদি নানারকমের হুজুকের আবির্ভাব হত সেকালের শহরে নিত্য নূতন। অথচ, যে-সময়ের কথা বলছি, অর্থাৎ একশতাব্দী আগেকার কলকেতা শহর, যে-সময় নবাবি বা জমিদারি বিলাসিতার রেওয়াজ প্রায় উঠে গিয়েছে, কারণ হুতোমই বলেছেন যে, গোলাপজল দিয়ে জলশৌচ আর কুকুরের বিয়ের লাখটাকা খরচ এসব প্রায় 'কখনওর' কোঠায় পড়েছে। সভ্য-শ্রেষ্ঠ ইংরেজ প্রভুর ফড়িয়াগিরি করে প্যান্ট-কোট পরে মুখে গো-টু-হেল-ড্যাম-রাস্কেল বলে যাঁরা 'বাবু' কালচারের বিউগল বাজিয়ে 'বঙ্গরণভূমে' অবতীর্ণ হয়েছিলেন, সেই নব্যবাবুদের কালচার তৈরির এই সব ছিল মালমশলা। পরিপার্শ্ব বলতে এককথায় বলা যায় যোব চার্নকের কলকেতা শহর তখনও আধুনিক অর্থে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় মহানগরীর বেশ ধারণ করেনি। সেনট্রাল অ্যাভিন্যু, রাসবিহারী অ্যাভিন্যু, সাদার্ণ অ্যাভিন্যু, সার্কাস অ্যাভিন্যু, গণেশ অ্যাভিন্যু, এসব অ্যাভিন্যু তখন মার্কিনী বা জার্মান স্থাপত্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে গড়ে ওঠেনি, কলকারখানার চিমনির ধোঁয়ায় শহরের আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে যায়নি। পুরোদমে ইংরেজ মনিবদের ভাঁটিখানায় বাঙালি বাবুর চোলাই শুরু হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ........সাম্রাজ্য-সূর্যকে পূর্বগগনে স্থির রাখতে হয় তা হলে শুধু বাবুদের একটিমাত্র বংশ চোলাই করলেই চলবে না। মজ্জায় মজ্জায়, শিরায় শিরায় বাবু-কালচারের বীজাণু সংক্রামিত করতে হবে। জীববিজ্ঞানের 'ল' অনুযায়ী যাতে ভবিষ্যতে বাবুদের চৌদ্দপুরুষ পর্যন ইংরেজ-প্রভুর মোসাহেবি করার বৃত্তি বলবৎ থাকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী অন্ধ দাসত্ব ও নির্বিচার মোসাহেবির ফলে আসলে যে-বৃত্তির বিকাশ হয় সে বৃত্তি আর ইংরেজসাপেক্ষ থাকে না, যে-কোনো প্রভু-মুখাপেক্ষী হয়ে ওঠে। তার সাক্ষী বর্তমানের 'বাবু-পলিটিক্স।'

পলিটিক্স থাক। যা বলছিলাম। একশতাব্দী আগেকার কলকেতার বাবুদের শিক্ষাদীক্ষা,হালচাল, আচার-সংস্কার ও কালচারের সঙ্গে আজকের কলকেতার বাবুদের আচার-ব্যবহার ও কালচারের ব্যবধান কতখানি একবার বিচার করে দেখতে কৌতূহল হয় নাকি? হয় বই কি। এই বিচার করার সময় এসেছে আজ। সেকালের কলকেতা আর একালের কলকেতার কত তফাত তা টেরিটিবাজার আর টলিউড, আহিরীটোলা আর আমীর আলি অ্যাভিন্যু, চিৎপুর আর চৌরঙ্গী পাশাপাশি দেখলেই বোঝা যাবে। কলকেতার কলাবাগান বস্তি আজও কলাবৌয়ের মতো ঘোমটা টেনে লজ্জায় মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে, থাক। তবু তো মানুষের স্বপ্নসৌধ কংক্রিট ও ইস্পাতের মূর্তি পরিগ্রহ করে সমুদ্ধত শিরে কলকেতার বুকে দাঁড়িয়ে আছে আজ? কে তাকে অস্বীকার করবে? শুধু চিমনির ধোঁয়ায় কেন, হুতোমের কাছে যা কল্পনাতীত ছিল, অনাহারে মৃত মানুষের চিতার ধোঁয়ায়, অ্যান্টি-এয়ারক্রাফটের গোলার ধোঁয়ায়, বোমার ধোঁয়ায়, কলকেতার আকাশ কি আচ্ছন্ন হয়ে যায় নি? সেকালের কলকেতায় দেওয়ানির ও দালালির অর্থ আর একালের কলকেতার কালো বাজারের দালালির কাঁচা টাকার সঙ্গে তুলনা হয় কি? একালের অন্নসত্র ও ফেনদানের কাছে সেকালের পালপার্বণের দান, উৎসব ম্লান হয়ে যায় না কি? সেকালের রাজা প্রতাপচাঁদ আর একালের ভাওয়াল সন্ন্যাসীর সঙ্গে পার্থক্য অনেক। ভূকৈলেসের রাজবাড়ির মহাপুরুষের সঙ্গে একালের ভূত-ভবিষ্যতের দিব্যদ্রষ্টা সাধু তারকনাথ ও চেতাবনীর তুলনাই হয় না। সেকালের বিবিবিলাস আর একালের হোটেলে হাফ-গেরস্ত-বিলাসে প্রভেদ অনেকখানি। সবার উপর সেকালের মানুষ, আর একালের মানুষ। একালে একদিকে money -র ইনফ্লেশন, আর একদিকে man-এর ডিফ্লেশন অতুলনীয়! হুতোম একথা বিলক্ষণ প্রতিপন্ন করেছিলেন : 'কলকেতা শহর রত্নাকর বিশেষ। এখানে যা না আছে, এমন জানোয়ার পৃথিবীর কোন চিড়িয়াখানায় নাই।' আমি বলব, চিড়িয়াখানায় থাকবে কোথা থেকে? চিড়িয়াখানায় যে-সব জানোয়ার থাকে তারা আজ পর্যন্ত খাদ্যের জন্যে আর এক জানোয়ারের সামনে 'কিউ' করে দাঁড়ায়নি, 'কিউ' করে শুয়ে থাকেনি এবং সবার শেষে নিষ্ফল আবেদনে ক্লান্ত হয়ে 'কিউ' করে মরেওনি। ক্ষুধার্ত জানোয়ার কোনো ভোজনবিলাসী জানোয়ারের বদান্যতার মুখচেয়ে ককিয়ে ককিয়ে কেঁদে মরেছে, এমন সৃষ্টিছাড়া ঘটনা জানোয়ারের ইতিহাস কলঙ্কিত করেছে কি কোনোদিন?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন