সূর্যপ্রণাম

বিনয় ঘোষ

সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত একটি রাতের ঘটনা।

অম্বিকার বিয়ের একরকম পাকাপাকিই ঠিক হয়েছে। এক প্রাচীন জমিদারবংশের মেয়ে। বংশে কেউ নেই। মেয়ের এক বৃদ্ধ কাকা শুধু জীবিত আছেন, ভাইঝিকে নিয়ে তিনি গ্রামেই বাস করেন। কাজকর্ম অর্থাৎ জমিদারি তদারক আজকাল আর করেন না, করবার ক্ষমতাও নেই। তবু আশৈশবের স্বভাব এখন তিনি ছাড়তে পারেননি। সেটাও তেমন কিছু নয় শিকার আর সংগীত। দিনের বেলা বন্দুক নিয়ে এই বৃদ্ধ বয়সে ভৃত্যের সঙ্গে এখনও তিনি বিলে বিলে আর চরে চরে পাখি শিকার করে বেড়ান। সূর্যাস্তের পর ঘরে ফেরেন। কোনোদিন শিকার মিললে হয়তো ভাইঝিকে ডাক দিয়ে বলেন : 'আজ একটা চখা পড়েছে মা ঘোলপুকুরের পাড়ে। একা একাই উড়ে বেড়াচ্ছিল, চখী বোধহয় নেই, আর সেইজন্যেই মারলাম। এরকম নিঃসঙ্গ না হলে আমি কখনো চখা-চখা শিকার করি নে।' 'ওরা বুঝি একসঙ্গেই থাকে কাকাবাবু?' ভাইঝি রেণু জিজ্ঞাসা করে। 'হ্যাঁ মা, ওরা একসঙ্গেই থাকে, একসঙ্গে এবিলে সেবিলে উড়ে বেড়ায়, কখনো ছাড়াছাড়ি হয় না। সেজন্যে ওদের কখনো একা ভিন্ন মারতে নেই—।' এই ধরনের কথাবার্তা হয়তো হয়। তারপর ইচ্ছা হলে তাঁর স্বর্গীয় পিতার সেতারটি নিয়ে মাঝে মাঝে সুরালাপ করেন, না হয় পুরাতন পিয়ানোটির সামনে বসে মামুলি গৎ বাজান। নাম রমাকান্ত দেব সরকার।

রমাকান্তবাবুর দূর সম্পর্কের এক ভাইপো রণেশ এই বিবাহের উদ্যোক্তা। ঠিক হল অম্বিকা, রণেশ ও তার আর এক বন্ধু অজয়, তিনজনে একদিন পাত্রী দেখতে যাবে। অনেক বাকবিতণ্ডার পর বন্ধুদের মধ্যে স্থির হল যে সংবাদ না দিয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়, কারণ এসব ব্যাপারে নাকি হঠাৎ উপস্থিতিই উপভোগ্য। অজয় বললে : এমন কি অসুবিধে হবে? স্টেশন থেকে বাস পাওয়া যাবে, বাস পাওয়া যাবে, বাস থেকে মাইল খানেক পথ, সন্ধ্যার পরই পৌঁছে যাব।' সকলেই সম্মতি জানাল।

নির্দিষ্ট দিনে সন্ধ্যার কিছু আগে ট্রেন ছাড়ল। ট্রেনে পূজার ছুটিতে দেশ-বিদেশাভিমুখী যাত্রীদের ভিড়। ঠেলাঠেলি করে তিনজনে তৃতীয় শ্রেণির কামরার এক কোণে কোনো মতে একটু বসবার জায়গা করে নিল। সঙ্গে জিনিস-পত্তরের বিশেষ কিছু উপদ্রব ছিল না। সহযাত্রীদের মধ্যে জনা পঁচিশ কুলি, এক পাশে একজন ভদ্রলোক শুয়ে শুয়ে হাঁপাচ্ছেন, হাঁপানি রোগী বোধহয়, মাথার কাছে বছর ছাব্বিশের একটি যুবক, পায়ের কাছে বছর আঠারোর একটি বিবাহিতা স্ত্রীলোক। সকলেই স্বস্তি ও স্বাস্থ্যের জন্য শহর ছেড়ে দেশে ফিরছেন, না হয় বিদেশে যাচ্ছেন।

কামরায় ভীষণ হট্টগোল কুলিদের। মাঝে মাঝে কেউ ট্রেনের জানালার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চেঁচিয়ে গান ধরেছে। সকলেরই খুব স্ফূর্তি। বহুদিন পরে নিজেদের জেলায় ফিরবার ছুটি মিলেছে, স্ফূর্তি হওয়াই স্বাভাবিক।

অম্বিকার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠল। অথচ প্রতিবাদ করবার উপায় নেই। করলেই সঙ্গে সঙ্গে পালটা জবাব আসবে যে মাশুল সে শুধু একা দেয়নি, তারাও দিয়েছে, অতএব অধিকার সকলের সমান। এ জবাবের বিশেষ অভিজ্ঞতা অম্বিকার আছে বলেই রণেশ কিছু বলবার জন্য অতিশয় ব্যস্ত হলেও অম্বিকাই বরং তাকে বাধা দিল। অজয় ইতিমধ্যে একটি কুলির সঙ্গে দিব্যি আলাপ জমিয়েছে। এ ব্যাপারে সে বিশেষ পটু। অপরিচিত লোক কয়েক মিনিটে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যায়, ক্ষণিক মিলনের পর বিচ্ছেদের দৃশ্য বাস্তবিকই করুণ হয়ে ওঠে। সে দৃশ্য অম্বিকা কয়েকবার অজয়ের সহযাত্রী হয়ে স্বচক্ষে দেখেছে।

অম্বিকার স্বভাব আশৈশব অন্তর্মুখী হলেও অজয়ের সরল বহির্মুখী চরিত্র তাকে চিরদিনই আকর্ষণ করেছে। অজয়ের উপর যেমন তার প্রীতি, তেমনি শ্রদ্ধা। ভয়, লজ্জা, মান, অপমান সবকিছুরই বিচারক অজয়ের খেয়াল। সাধারণ জীবনযাপনেই সে অতি সন্তুষ্ট। কোনো উদ্দেশ্য নেই, আকাঙ্ক্ষা নেই, অভিযোগ নেই। জীবন যেন তার কাছে প্রশস্ত পথের শামিল, পরিষ্কার আবর্জনাশূন্য, নিষ্কণ্টক, এগুলেই হল। রাতের পর রাত সে তার প্রতিবেশীর ঘরে রোগী সেবা করে, মুমূর্ষু যক্ষ্মারোগীর উদ্গারিত রক্ত দু-হাতে সে নিঃসংকোচে সাফ করে, হাসপাতালের বাসি মড়া দাহের জন্য সেই হয় প্রথম উৎসাহী, সার্বজনীন পূজায় সেই করে কর্তৃত্ব, আবার শীতের রাতে পথ চলতে চলতে ফুটপাথে ঘুমন্ত ভিখারির অনাবৃত দেহ সে নিজের গায়ের চাদর খুলে দিয়ে চুপি চুপি ঢেকে রেখে চলে যায়। অবশ্য দোষও আছে তার চরিত্রের। একরাত দুরাত বারাঙ্গনা গৃহেও সে যাপন করে থাকে, অনেক রাতে মাতাল হয়ে ফিরে বৃদ্ধা মাকে সে গালিগালাজ করে। কিন্তু তবু যেন অজয়কে ভালো না বেসে উপায় নেই। শুধু তাই নয়, তার সাহচর্যে সত্যিই শ্রদ্ধায় মন ভরে ওঠে। অজয়ের কথা মনে হলে অম্বিকার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি নদীর ছবি— এখানে সেখানে বালুর চর, কিন্তু মরা নদী নয়। বর্ষায় নদীর বুকে যখন বান ডাকে তখন কূল ছাপিয়ে জল ওঠে, চর মিলিয়ে যায় জলের তলায়। জীবন্ত নদীকে কখনো গ্রীষ্মের উত্তাপ-জনিত ক্ষণিকের বালুচর দিয়ে বিচার করা যায় না। কুলির সঙ্গে আলাপরত অজয়ের দিকে চেয়ে চেয়ে অম্বিকার আজ সেই কথাই মনে হল।

অজয়ের আলাপ বেশ নিবিড় হয়ে উঠেছে। রণেশ ডিটেকটিভ উপন্যাসে বেশ গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছে। এক পাশ থেকে অম্বিকার কানে কয়েকটি কথা স্পষ্ট ভেসে এল : 'মর গিয়্যা না বাঁচ গিয়্যা বাবু!'

বক্তার মুখের উপর অম্বিকা দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। অজয়ের নূতন কুলি বন্ধুটি বলছে: 'দাওয়াই নেই, ঘরে লোক নেই, একলা বাবু, মরবে না তো কি হবে?'

কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে বুঝতে না পেরে অম্বিকা বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইল অজয়ের মুখের দিকে। অজয় বলল : 'তোমার ছেলে পুলে নেই?' জবাব এল : 'না বাবু, সাদি করে কলকাত্তা চলে এনু কামে,— ঘর তো তিন বরষ যাইনি।'

আধা-বাংলা আধা-পশ্চিমা ভাষার মারফত অম্বিকা বুঝল যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছিল সে আর কেউ নয়, বক্তার স্ত্রী। তার স্ত্রী সম্প্রতি মারা গিয়েছে এবং বিয়ের পর তিন বছরের মধ্যে তার সঙ্গে আর সাক্ষাৎ হয়নি। বিয়ের তিনদিন পরেই তাকে দেশ ছাড়ে, সদ্য বিবাহিতা বধূকে ছেড়ে, কাজে বিদেশে আসতে হয়েছে।

কী অদ্ভুত, অম্বিকা ভাবে। স্বচক্ষে সে এই লোকটিকেই কিছুক্ষণ আগে সহকর্মীদের সঙ্গে স্ফূর্তি করতে দেখেছে, চলন্ত ট্রেনের জানলার ফাঁক দিয়ে ধাবমান মাঠ, গাছপালার দিক চেয়ে মুক্ত কণ্ঠে গান করতেও শুনেছে। তখন কল্পনা করতেও পারেনি, যে বহুদিন পরে ব্যথাতুর অন্তরে এই লোকটি তার বধূহীন শূন্য-ঘরে ফিরে যাচ্ছে। অম্বিকা মনে মনে ভাবে কি-ই বা আমরা এমন কল্পনা করতে পারি!

এরা কি মানুষ? হৃদয় নেই, অনুভূতি নেই, মাংসপিণ্ড, জড়পদার্থ—

ঊর্ধ্বশ্বাসে ট্রেন ছুটে চলেছে। অম্বিকা যেন রূপকথার রাজকুমার। ঘুমন্ত পুরীর রাজকন্যার সন্ধানে আজ যেন পক্ষীরাজ ঘোড়ার পিঠে সে সওয়ার। শূন্যে দুটো ডানা ছড়িয়ে দিয়ে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে পক্ষীরাজ চলেছে উড়ে। ডানার প্রতিশব্দে চারিদিক মুখর। কামরার ধারে হাতের উপর মুখ রেখে অম্বিকা বাইরের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইল।

কামরার মধ্যে হঠাৎ গোলমাল করে উঠল সকলে। সেই রুগণ বৃদ্ধ লোকটি দুটি চোখ বিস্ফারিত করে ভীষণ কাশছে, অজয় কখন উঠে গিয়ে দুহাতে তার বুক-পিঠ ধরে বসিয়েছে, যুবকটি বাতাস করছে মাথায়। কামরার অন্যান্য কুলি যাত্রীরা সকলেই দূরে সরে বসেছে, অনেকে পোঁটলা-পুঁটলির সঙ্গে বাঙ্কের উপরেও উঠেছে। এক কোণে সেই স্ত্রীলোকটি জড়সড়ভাবে কাঠের মতো নিস্পন্দ হয়ে বসে আছে।

যুবকটি বলল : 'ওষুধটা বার করে দাও তো মা—'

অম্বিকা শিউরে উঠল। বাইরের দিকে ফিরে চাইল সে, আকাশে মেঘ জমেছে। ট্রেনের-সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলেছে খণ্ডমেঘ। মেঘদূত আর লৌহদূতের দৌড়-প্রতিযোগিতা।

স্টেশনে যখন ট্রেন পৌঁছল তখন রাত প্রায় এক প্রহর হবে। স্টেশন থেকে জমিদারগৃহ ষোলো মাইল পথ। বাসে যেতে হয়। স্টেশনে নেমে অজয় খোঁজ নিয়ে জানল সে-রাতের মতো বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পরদিন সকাল ভিন্ন যাবার কোনো উপায় নেই। রণেশ স্টেশনে অপেক্ষা করার প্রস্তাব করল। অজয় বলল : তা কিছুতেই হয় না, বেরিয়েছি যখন তখন আজই পৌঁছতে হবে, ষোলো মাইল আর এমন কি পথ? রণেশ রাজি হল। অম্বিকাও আপত্তি করল না, পরদিন সন্ধ্যার মধ্যে তাকে ফিরতেই হবে। অফিসে নূতন ভার পড়েছে, কাজের কামাই করলে চলবে না।

স্টেশনেই তাদের একজন সঙ্গী মিলল। গ্রামেরই লোক, কিছুদূর পর্যন্ত তাদের সঙ্গী হবে। লোকটি জিজ্ঞাসা করল 'বাবুদের কাছে আলো আছে?' কাছে টর্চ ছিল, রণেশ বলল, 'হ্যাঁ'। পুনরায় প্রশ্ন হল : 'লাঠিগাছটা?' রণেশ বলল 'দরকার হবে নাকি?' 'না তা নয়, তিনজন আছেন, কিছু দরকার নেই। আর এখন কোনো ডর নেই বাবু, সোজা সড়ক চলে যাবেন, তবে একটা গাঁ পড়বে সামনে—' লোকটি একটু থমকালো। রণেশই উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল : 'সেখানে কিছু ভয়ের কারণ ঘটেছে না কি?' 'না, মানে তেমন কিছু না, সাঁওতালদের গাঁ— বানের জলে এবার এদিককার সব ভেসে গেছল— চাষাভুষোরা খেতে পায় না, মরে হেজে যাচ্ছে। তবে এখন আর তেমন ডর নেই, পুলিশে বাবু প্রায় ঠান্ডা করে দেছে। সাঁওতালরা মেয়ে মরদে মিলে দল বেঁধে গাঁয়ের মধ্যে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দিত— সড়ক দিয়ে চলবার জো ছিল না, পেছু থেকে বল্লম ছুড়ে মারত, তাকের বলিহারি যাই বাবু— আস্ত লোকও পুড়িয়ে খায়। ঘর ছেড়ে মাঠে জঙ্গলে সব থাকে, বাঁশি, মাদল-নাগরা বাজিয়ে খিদে-তেষ্টা ভুলে গিয়ে সারাদিন সব নেচে বেড়ায়, রাতে তির-ধনুক আর বল্লম নিয়ে মেয়ে-মরদে মিলে গাঁয়ে গাঁয়ে বেরোয় লুঠ করতে। মাদল-নাগরার শব্দ শুনলেই গাঁয়ের লোক ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। গোঁয়ার জাত বাবু—'

আতঙ্কে সমস্ত শরীর শিউরে উঠলেও, দুর্ভিক্ষের এমন রূপ প্রত্যক্ষভাবে দেখবার জন্য অম্বিকার লোভ হল খুব। অজয় উল্লসিত হয়ে বলল : 'ও কিছু ভয় নেই, সাঁওতালদের সঙ্গে বহুদিন আমি ছিলাম, ভারি সুন্দর জাত ওরা, আমি সব ঠিক করে নেব।' ভরসা হল। অজয়ের কথায় সকলেরই অগাধ বিশ্বাস। অজয়ের কাছে সত্যিই যেন অজেয় কিছু নেই। লোকটি যাবার সময় বলে গেল : 'গাছের দু-একটা ডাল ভেঙে নেবেন বাবু— চলে যান কোনো ভয় নেই।' অভয় দিলেও লোকটি বার বার বিপদের আভাষ দিতে ভুল করেনি।

তিনজনেই হন হন করে পথ চলতে লাগল। রাত ক্রমেই গভীর হল। চারিদিকে শুধু একটানা সোঁ সোঁ শব্দ। মাঝে মাঝে গাছের ডালে পাখির ডানা ঝাপটানি। উপরে ধীরে ধীরে আকাশে মেঘ জমাট বাঁধে। ঝিরঝিরিণি বৃষ্টি নামে। অজয় সকলের আগে আগে চলে— দীর্ঘ, বলিষ্ঠ দেহ ঈষৎ সঞ্চালিত করে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে মাঝে মাঝে মেঘের দিকে চেয়ে অজয় সুর করে সূর্যাস্তোত্র আবৃত্তি করে : জবাকুসুম সঙ্কাশম, কাশ্যপেয়ম মহাদ্যুতিম, ধান্তারিং সর্বপাপঘ্নম, প্রণতোস্মি দিবাকরম! এই স্তোত্র আবৃত্তি অজয়ের সহযাত্রীদের কাছে নূতন না হলেও নিস্তব্ধ অন্ধকার রাতে আজ তার মুখে এই আবৃত্তি শুনে অম্বিকার শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। দ্বিগুণ শক্তি ও উৎসাহে সে পথ চলতে লাগল।

আবৃত্তি করতে করতে অজয় জিজ্ঞাসা করল : 'তোরা সব ঠিক আসছিস তো রুণু?' রণেশ উত্তর দিল : 'আসছি, কিন্তু এখন তুমি সূর্য দেখলে কোথায়?' 'ভোর হলেই দেখতে পাবি' অজয় হেসে উঠল।

শুট-শাট করে অম্বিকার পাশ দিয়ে কি চলে যায়। একটি একটি করে এমনি কয়েকটি পাশে বনবাগানের মধ্যে অন্তর্ধান করে যায়। অম্বিকা জিজ্ঞাসা করে : 'কি রে রুণু?' রণেশ চুপ করে থাকে। দূরে দুটি চোখ জ্বল জ্বল করে উঠতেই দুজনেই থমকে দাঁড়ায়। অজয় অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে, তাকে চেঁচিয়ে ডাকে। অজয় টর্চ ফেলতেই দেখে শেয়াল। হো হো করে হেসে উঠে অজয় বলে : 'নিশ্বাস পড়ছে তো রে? শেয়াল দেখেই এই—'। 'দেখলে কি আর এই হত'— রণেশ বলল। 'বোঝা গেছে, তোরা আগে চল, আমি পিছনে যাচ্ছি।'

পিছনে অজয় আসছে, আর কোনো ভয় নেই। সামনের গাছ থেকে চারিদিক প্রতিধ্বনিত করে শব্দ হচ্ছে, তু-থু-লু, মু-থু-লু, বাতাসে অন্ধকারের উপর দিয়ে কে যেন গুম গুম করে পা ফেলে চলেছে। দূরে কে যেন কঁকিয়ে কঁকিয়ে কাঁদছে। দুজনেই আবার থমকে দাঁড়াল। অজয় বলল :'তুইথুলি মুইথুলি পাখি ডাকছে, ভয় নেই।' 'কাঁদছে কে?' অম্বিকা বলল। 'শকুনি' বলে অজয় আপন মনে স্তোত্র আবৃত্তি করতে করতে জোর হাঁটতে লাগল।

শকুনি কাঁদছে। করুণ একটি ক্ষীণ সুর বাতাসে ভেসে ঢেউ তুলে চলেছে। যেন প্রকৃতি কাঁদছে। স্নেহের সন্তান গ্রামগুলির এই মর্মস্পর্শী শ্রীহীন রূপ দেখে প্রকৃতি মা কাঁদছে। বন কাঁদছে, মাঠ কাঁদছে, আকাশে মেঘ কাঁদছে অজস্র ধারায়। গ্রামের সেই শ্যামলিমা, সই প্রশান্ত রূপ নেই। অনাবৃষ্টি আর অতিবৃষ্টিতে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। বন্যা আর দুর্ভিক্ষের ক্ষতচিহ্নে রূপ আজ বিকৃত, বীভৎস। গভীর রাতে সন্তানের মৃত্যুর দুঃস্বপ্ন দেখে শিউরে উঠে প্রকৃতি কাঁদছে, আর কঙ্কালসার গ্রাম ধুকছে শুয়ে শুয়ে।

দপ করে দূরে আগুন জ্বলে ওঠে। অজয় পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল। ভয়ে অম্বিকা ও রণেশ দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়ল। অজয় এগিয়ে এসে গায়ের জামা খুলে ফেলে, কাপড় গুটিয়ে আঁটসাঁট করে বেঁধে নিল। পাশের বাগান থেকে কতকগুলি ডাল আর লতা পাতা নিয়ে এল ছিঁড়ে। দু-হাতে, কোমরে, মাথায় সেগুলি বাঁধল। সমস্ত দেহ ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাসে ফুলিয়ে নিল, তারপর দু-হাতে দুটি পাতাভরা গাছের ডাল নিয়ে সেই দিকে এগিয়ে চলল।

আগুন ক্রমেই কাছে আসছে। আগুনের চারিদিকে কালো কালো ছায়া-মূর্তিরা বসে রয়েছে। অজয় হাত দুটি প্রসারিত করে পা তুলে চলতে লাগল। ক্রমে দ্রুত তালে তার পা পড়তে লাগল মাটিতে। তারপর 'হা-হই' করে বিকট শব্দ করে সে উন্মত্তের মতো নাচতে শুরু করল। সাঁওতালী ভাষায় গান গাইতে গাইতে নেচে চলল আগুনের দিকে—

হিঃ-হাঃ-হুনতা, হাঃ-হিঃ-হুনতা—

মাইঝান হামার ফুল—

কথার শেষে 'মাইঝান' বলে অজয় সুর টানে, কালো ছায়ামূর্তিরা সব সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায়, নড়ে ওঠে, তারপর চক্রাকারে নাচতে আরম্ভ করে। সঙ্গে সঙ্গে দূর থেকে মাদল-নাগরার শব্দ হয়, বাঁশি বাজে, ছায়ামূর্তিরা কলরবে কী ইঙ্গিত জানায়, দূর থেকে প্রত্যুত্তর আসে। অজয় তখন আগুনের পাশে ছায়ামূর্তিদের সঙ্গে নাচের তালে তালে মিলে গিয়েছে।

একদল সাঁওতাল মেয়ে চক্রাকারে অজয়কে ঘিরে নাচছে। মাঝখানে সে-ও নাচছে। অদ্ভুত দৃশ্য! কাছাকাছি একটিও পুরুষ-সাঁওতাল নেই। দূর থেকে যে-শব্দ শোনা গিয়েছিল তা পুরুষদের কণ্ঠস্বর। অম্বিকা ভাবল হয়তো কাছাকাছি সাঁওতাল মরদেরা কোথাও অপেক্ষা করছে।

এই কি দুর্ভিক্ষের রূপ? এর চেয়ে সুন্দর আর কি আছে তা হলে পৃথিবীতে? কোথায় সেই শুকনো হাড় আর বিবর্ণ রক্তের বীভৎসতা? কোথায় মুমূর্ষুর সেই কাতর গোঙানি, বুভুক্ষার সেই আদিম ভয়াল মূর্তি? মানুষের মাংস মানুষে গোগ্রাসে গেলে কই? গাছের ডালে ডালে এখন পাতা আছে, মাঠের সবুজ রং ফিকে হলেও কোথায় সেই সর্বগ্রাসী ধু ধু-ধূসরতা? কোমরে এক টুকরো কাপড় জড়িয়ে, বুকে এক টুকরো ফালি বেঁধে, কালো কালো মূর্তিগুলি নাচছে আর গান করছে। সুরে ও ছন্দে মিলে দুর্ভিক্ষের যে রূপ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল, অম্বিকা তাকে মনে মনে প্রণতি না জানিয়ে পারল না।

চক্র নৃত্য ভেঙে গেল। ইশারা করে অজয় তাদের দুজনকেই তাকে অনুসরণ করতে বলল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দুই বন্ধু তাকে অনুসরণ করল। দুজনেই নির্বাক। একদল সাঁওতাল মেয়ে মাঠের একপাশ দিয়ে দল ভেঙে নাচতে নাচতে চলল। আর একটি মেয়ের হাত ধরে নাচতে নাচতে চলল অজয়। মেয়েটি গাইছে :— 'মা-ঝি— তুই নি হামার পরাণ ফুল রে'— অজয় গাইছে— 'হা-রে মাইঝান— তড়াক-তড়াক-হাঃ'। ওদিকের মেয়েদের দল নাচের তালে তালে সুর ধরছে : 'হুন-তাক-হি-তাক'।

পাশেই গ্রাম। সামনে অন্ধকারের মধ্যে একটি কুঁড়ে ঘর। কালো কালো দুই লম্বা মূর্তি বল্লম নিয়ে কুঁড়ে থেকে বেরিয়ে এল। রণেশ অম্বিকাকে চুপি চুপি বলল : 'এইবার মরবে'। কথাটি অজয়কে লক্ষ্য করেই বলা হল। অজয়ের নাচ তখনও থামে নি। নাচতে নাচতে দুজনেই কুঁড়ের ভিতর অন্তর্ধান করল।

মর্মর মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে অম্বিকা ও রণেশ কুঁড়ের সামনেই দাঁড়িয়ে রইল। দূরে গাছতলায় বিরাট দুই কৃষ্ণমূর্তি। দুজন সাঁওতাল মাঝি। তাদের হাতের উদ্যত দুটি শাণিত বল্লম অন্ধকারের মধ্যে ঝক ঝক করে উঠল। মেঘে মেঘে সমস্ত আকাশ তখন আচ্ছন্ন।

কিছুক্ষণ পরেই দুজনে কুঁড়ের বাইরে এসে দাঁড়াল। অজয় এগিয়ে এসে বলল : 'আমাকে একটা টাকা দে তো অম্বু— আর আমার গায়ের চাদরটা।' কথার সুরে জড়তা মিশ্রিত।

টাকা ও চাদর নিয়ে অজয় ফিরে গেল সাঁওতাল মেয়েটির কাছে। অন্ধকারে অস্পষ্ট দেখা গেল মেয়েটি হাত পেতে সেগুলি নিলে, চাদরটি খুব কষে বুকে বাঁধল, তারপর দুজনেই অদ্ভুত শব্দ করে দু-হাত ধরে একবার লাফিয়ে উঠে কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত হেঁট করে ছেড়ে দিলে। অজয় ফিরে এল।

দুই বন্ধুর মুখ দিয়ে কোনো কথাই উচ্চারিত হল না। অন্ধকারের মধ্যে শুধু একটি কথা বার-বার অম্বিকার মনে হতে লাগল— দুর্ভিক্ষ!

জমিদারগৃহের বহিরঙ্গনে যখন সকলে পৌঁছল তখন রাত প্রায় তিন প্রহর। সামনে বহুদূরব্যাপী বৃহৎ অট্টালিকা অন্ধকারের মধ্যে ঝিম ঝিম করছে। কোনোদিকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। রণেশ হন হন করে এগিয়ে গেল। গৃহ উদ্যান, পুষ্করিণী, পূজামণ্ডপ, আস্তাবল, কাছারী বাড়ি পার হয়ে অন্দরমহলের ফটকের সামনে এল। ফটকের মাথায় বিরাট চুনবালিখসা সিংহমূর্তি। রণেশ খুব জোরে হাঁক দিল : 'বিহারী, বিহারী'। চারমহল অন্দর-ভবনের চতুষ্কোণ থেকে শব্দটি প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল, কোনো সাড়া মিলল না। কিছুক্ষণ পরে লণ্ঠন হাতে একজন প্রৌঢ় ভৃত্য বেরিয়ে এল। রণেশ বলল : 'কে হারাণ না কি?' জবাব এল : 'হ্যাঁ বাবু— এত রাত্তিরে?' 'কলকাতা থেকে আসছি, বিহারী এখানে আছে তো?' 'আর আছে দাদাবাবু! আজ দশ-বার দিন বিহারী মারা গেছে। রাঙাদিদির বিয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল খুব বুড়োর, দিনরাত বলত এইবার আমার রাঙাদিদির সঙ্গে শহরে চলে যাব আর ফিরব না— বুড়ো হাড় গঙ্গা পাবে—'। 'হুঁ' বলে রণেশ কয়েক মিনিট গুম হয়ে রইল, তারপর বলল : 'ভিতরে চল, দাঁড়িয়ে কথা বলবার শক্তি নেই।'

অম্বিকার চোখের সামনে পক্ককেশ, শিথিল-চর্ম এক বৃদ্ধের মূর্তি ভেসে উঠল, কৌতূহলী দৃষ্টিতে যেন তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। কোটরস্থ ঘোলাটে দুটি চোখ যেন অট্টালিকার চারকোণে জ্বল জ্বল করছে।

রমাকান্তবাবু সকলের আপ্যায়ন অভ্যর্থনার জন্য অত্যন্ত বিব্রত হয়ে উঠলেন। গরম জল, গরম দুধ প্রভৃতির তৎক্ষণাৎ বন্দোবস্ত হয়ে গেল। প্রকাণ্ড একটি হলঘরে ফরাস পাতা হল। ঘরে এসে তিনি বলে গেলেন সকলকে বিশ্রাম করতে। ঘণ্টাখানেক পর, তিনি নিজেই এসে সকলকে ডাক দিলেন, সামান্য কিছু আহার করে বিশ্রাম করবার অনুরোধ জানিয়ে। আহারের ঘরে তিনখানি রূপার থালার উপর চূড়া করে ছোটো ছোটো লুচি সাজান। চারিদিকে রেকাবিতে নানারকম ভাজা, মোরব্বা, আচার। রমাকান্তবাবু সামনে বসলেন।

অম্বিকা যেন যাদুমন্ত্রে বশীভূত হয়েছে। রমাকান্তবাবু হঠাৎ বললেন : 'রাণু আমার খুব কাজের মেয়ে, এ-সব তারই হাতে তৈরি'। অজয় বলল : 'অসময়ে আপনাদের বড় বিরক্ত করলাম— এটা অবশ্য আমারই গোঁয়ার্তুমিতে হয়েছে, স্টেশনে অপেক্ষা করলেও হত।' 'না-না-কিছু না— আপনাদের এ উদ্যম তো প্রশংসনীয়। আর আমার তো ওঠবারই সময় হয়েছিল প্রায়— এই সময় উঠে একটু পুজো আহ্নিক করি— তারপর একা একা একটু সুরচর্চা করি— ও অভ্যাসটা আজও ছাড়তে পারিনি। আর রাণু তো এর আগেই ওঠে, আমার পুজোর ফুল তোলে, রাজ্যেশ্বরের পুজোর জোগাড় করে, সবই তো ওই করে— আর কে আছে বলুন— বিহারী তার নাতনিটির ভার দিয়ে গেছে আমার ওপর— এখন সেই রাণুর একমাত্র সঙ্গিনী— দুজনেই সমবয়সি কি না?'

অম্বিকা আগে শুনেছিল রণেশের কাছে যে, রমাকান্তবাবু কথা বলতে আরম্ভ করলে সহজে থামেন না।

'আমাদের বংশের নিয়ম অতিথিকে ঘরের মেয়েরাই রেঁধে খাওয়াবে, রাঁধুনি-বামুনে নয়। আমার বাবা কোনো অতিথি এলে তাঁর খাওয়ার পর সেই পাতেই খেতেন— বলতেন অতিথি দেবতা। এটা আমাদের বংশের ধারা—' বলে রমাকান্তবাবু হাসলেন।

আহারান্তে অজয় বলল : 'ভোর প্রায় হয়ে এসেছে, একেবারে সকালে স্নান করে ঘুমুলেই হবে।' 'বেশ, বেশ, তাই ভালো, তা হলে আসুন, রুণু তুমি ভিতরে যাও'— বলে রমাকান্তবাবু দরজা দিয়ে আর একটি ঘরে প্রবেশ করলেন।

ঘরের মধ্যে ঢাল, তলোয়ার, খাঁড়া, সড়কি, বল্লম, হাতিয়ার, বন্দুক সব সাজান রয়েছে। অস্ত্রাগার। বল্লম আজ আর শাণিত নেই, মরচে পড়ে ভোঁতা হয়ে গেছে। সোনা-বাঁধানো একখানা তলোয়ারের দিকে আঙুল দেখিয়ে রমাকান্তবাবু বললেন, 'এটি নীলকুঠির সাহেব হ্যারিংটন আমার বাবাকে উপহার দিয়েছিলেন। বাবা তখন ছিলেন নীলকুঠির দেওয়ান। বাবার ক্ষমতাও ছিল অসীম। রাতারাতি হাজার বিঘে জমি দখল করলেন। সে এক আশ্চর্য ব্যাপার মশাই। রাতারাতি সব গ্রাম বেমালুম পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেল, দু-একশো লাঙল পড়ল জমির বুকে, জমি চষা হয়ে গেল। ভোরে প্রমাণ হল যে, সেখানে কোনো লোকের বাস ছিল না, জমি সাহেবের। রমাকান্তবাবুর চোখেমুখে উত্তেজনা ও আবেগ পরিস্ফুট। অম্বিকা অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে ছিল। অস্ত্রাগার পার হয়ে আর একটি ঘরে রমাকান্তবাবু ঢুকলেন। ঘরের চারিদিকে মর্মর মূর্তি, ব্রোঞ্জের মূর্তি, দেয়ালে ঘোড়ার পিঠে তলোয়ার-যুদ্ধের তৈলচিত্র। সে-ঘর পার হয়ে আর একটি ঘর। ঘরের মেঝে বাঘের চামড়া দিয়ে মোড়া। চারিদিকে বাঘ, ভল্লুক, হরিণ, কাঠের বড়ো বড়ো পাটাতনে বিদ্ধ। এদের শিকার করা হয়েছিল একসময়, এরা ছিল হিংস্র বন্য জন্তু। পাশেই আর একটি ঘর। বিরাট হলঘর, গালিচা পাতা, ঝাড় বাতি ঝুলছে। চারিদিকে নানারকম বাদ্যযন্ত্র। পিয়ানো, অর্গ্যান, সেতার, বেহালা, এসরাজ, তানপুরা, সারেঙ্গী, তবলা, মৃদঙ্গ, পাখওয়াজ। প্রমোদ কক্ষ। একদিন এই হলঘরের মেঝেতে রাতভোর নুপুরের শিঞ্জন শোনা যেত, গেলাসের পর গেলাস মদ উজাড় হত। আজ ঘরের কোটরে কোটরে শুধু পায়রার গুঞ্জন ধ্বনি, চড়ুইয়ের কিচিরমিচির।

মেঝের একধারে ফরাসের উপর রমাকান্তবাবু বসলেন। সকলেই বসল। রমাকান্তবাবু বললেন, 'এই দিকটা একটা বাস করার মতো করে রেখেছি— জীবনের গোনা দিনগুলো এইখানেই কাটিয়ে দেব, কোথাও যাব না। আর কোথায়ই বা যাব? কোনো দরকার নেই, এইটুকু একরকম থাকলেই হল। সব ধসে পড়েছে— আর পড়বেই বা না কেন, নীলকুঠির আমলের বাড়ি, নীলকুঠির আশপাশ দিয়ে গ্রামের লোকেরা হাঁটে না, বনজঙ্গল হয়ে গেছে বলে রাতে ঘোড়ার পিঠে চড়ে সাহেব ঘুরে বেড়ায়। সেদিন কাছারি বাড়ির ঘরের একটা ছাদ ধসে পড়ল, সাপ-ঘোগের বাসা, মিস্ত্রী লাগিয়ে ওদিকটা ভেঙে ফেলছি। আর কী আছে বলুন— রাণুর বিয়ের পর একা থাকতে হবে বলে, মনে করেছি বিহারীর নাতনিটির বিয়ে দিয়ে এখানেই রাখব— বড় লক্ষ্মী মেয়ে— বিহারীর শেষ কথা, রাখতে হবে বই কি—'

রমাকান্তবাবুর মুখের উপর মৃত্যুর ছায়া নামে। সামনে যেন তাঁর আসন্ন মৃত্যুর বিভীষিকা। অম্বিকা একদৃষ্টে সেই মুখের দিকে চেয়ে থাকে।

রমাকান্তবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন : 'আমার পুজোর সময় হয়েছে। ভোর প্রায় হয়ে এল। আপনারা একটু পায়চারি করুন। এদিকটা বরাবর ছাদের উপর বেড়াতে পারেন, পশ্চিম দিকে যাবেন না, ওদিকটা ভাঙা হচ্ছে। আর মেয়ে দেখাটা বিকেলেই সারা যাবে, কি বলুন?'

অজয় বলল : 'আজ্ঞে, যে যখন আপনার সুবিধা হবে ব্যবস্থা করবেন, তবে আজই বিকেলে আমাদের ফিরতে হবে, হঠাৎ এসেছি কি না?' 'তা বেশ, তা হলে একটু আগেই ব্যবস্থা করা যাবে।' রমাকান্তবাবু হাসতে হাসতে চলে গেলেন।

ভোর হল।

সেতারে ভৈঁরোর ঝঙ্কার শোনা গেল। রমাকান্তবাবু সুরালাপ করছেন।

অম্বিকা ও অজয় ছাদের চারিদিক ঘুরে জমিদার প্রাসাদ দেখছিল। ধুপধাপ করে শব্দ হল দূরে।

অজয় বলল : 'মিস্ত্রীরা কাজ করছে বোধহয়, ঘর ভাঙছে।' সেইদিকে সে এগিয়ে গেল। পশ্চিমদিকে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অম্বিকা ভাবতে লাগল, এই বৃহৎ অট্টালিকা, কত পরিশ্রমই না করতে হয়েছে একদিন গড়তে। এই মিস্ত্রীদের বাপঠাকুরদারা একদিন যত্ন করে এই অট্টালিকা গড়েছিল। আজ এরা তাকে গান গেয়ে গেয়ে ভাঙছে।

পুবাকাশ লাল রঙে রঞ্জিত হয়েছে। হঠাৎ ফিরে চাইতেই নীচে রমেশের দৃষ্টি পড়ল একটি বহু পুরাতন মন্দিরের উপর। গৃহদেবতা রাজেশ্বরের মন্দির। মন্দিরের ধাপে একটি তরুণী শাঁক হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে, সাদাসিধে পরিষ্কার একখানি শাড়ি পরণে। শাঁকটি মুখে উঠতেই চারিদিক তার শব্দে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। মন্দিরের ঘর থেকে আর একটি তরুণী বেরিয়ে এল, ফুলের সাজি হাতে। একরাশ চুল পিঠের উপর আলুথালুভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। পরণের রৌপ্যখচিত লাল শাড়ির উপর সূর্যের সোনালি কিরণ এসে পড়তে ঝলমল করে উঠল। ফুলের সাজি নামিয়ে উদীয়মান সূর্যের দিকে ফিরে নতশিরে তরুণীটি প্রণাম করল।

অম্বিকার চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে উঠল, সেই ট্রেনের সহযাত্রীদের মূর্তি, সেই বৃদ্ধ হাঁপানি রুগির পাণ্ডুর মুখ, তরুণীর মধুর শূন্য হতাশ দৃষ্টি, সাঁওতাল মাইঝানদের নৃত্য, কুঁড়ে ঘর, আর উদ্যত দুটি শাণিত বল্লম। মুমূর্ষু স্বামীর পাশে বসে তরুণী বধূটি এতক্ষণ হয়তো অজস্র ধারায় চোখের জল ফেলছে, জীবনের সূর্য তার অস্তাচলে। পশ্চিমা কুলিটি এতক্ষণ হয়তো তার শূন্য ঘরের দরজার সামনে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে আছে, ঘরে তার সূর্যের আলো এসে পড়েছে, শূন্য ঘর। আর সেই সাঁওতাল মেয়েটি? শাণিত বল্লম এতক্ষণ তার বুকে বিঁধেছে। দুর্ভিক্ষ তাকে ক্ষমা করে নি। বর্বর সাঁওতাল মাঝি তার মাইঝান ফুল-কে এতক্ষণ বল্লম-বিদ্ধ করেছে। আর এই অজয়! অন্ধকারে শকুনির কান্নার সঙ্গে তার সেই সূর্যস্তোত্র আবৃত্তি—

মিস্ত্রীরা একসঙ্গে গান করতে করতে পশ্চিম দিকে ঘরের খিলান ভাঙছে। লাল টুকটুকে সূর্যের দিকে ফিরে অম্বিকা মনে মনে বলল : প্রণতোহস্মি দিবাকরম।

১৯৪০
সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%