বিনয় ঘোষ
এই সেই খেত!
সব শ্যামলিমা আজ তার ম্লান হয়ে গিয়েছে। ঘাড় দুলিয়ে দুলিয়ে হাজার হাজার ধানের শীষ আজ আর দূর থেকে অভিনন্দন জানায় না। ভদ্রার আর সেই কলোচ্ছ্বাস নেই, নেই তার সেই ছোটো ছোটো তরঙ্গের নূপুরধ্বনি প্রবাহের পথে। ভুঁই নিড়োতে নিড়োতে ক্লান্ত হয়ে কতদিন সে আলের উপর বসে চেয়ে দেখেছে এই ভদ্রাকে— মনে মনে বলেছে 'ভদ্রা! খেতগুলোকে আর বানের জলে ভাসিয়ে দিসনে, দিসনে।' কোথাকার সর্বনেশে লোনাজল এসে জমিটার জান নিয়ে চলে যায়— দু-তিন বছর ধানের মুখ আর দেখা যায় না। ভদ্রা বয়ে চলে যায় আপন মনে। সেই সর্বনাশই ডেকে আনে। ফলে না জমি। বোবা মাটি লাঙলের ফলার দিকে চেয়ে থাকে— খেতমজুরের দল মাথা খুঁড়ে মরলেও মুখে তার কথা ফোটে না। দুর্ভিক্ষ আসে। গাছের পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ে মাটির উপর। শুকনো কড়কড়ে পাতা রোদে-পোড়া বুকফাটা মাটির উপর সশব্দে ঝরে পড়ে— যেন মৃতমাটির কঙ্কাল দাঁত কিড়মিড় করছে।
আগাছায় ভরা আলোর উপর দাঁড়িয়ে শক্ত হাড়ের মুঠোয় শান-দেওয়া কাস্তের হাতল ধরে একসঙ্গে তে-হাজারি গ্রামের তিনশো কিষাণ ভদ্রাকে শাসিয়ে দেয় : 'বাঁধব তোকে— বাঁধবই তো।' শুকনো মাটির বুকটা শিউরে ওঠে।
জমিদার রঘুনন্দন চৌধুরী তাঁর কাছারির হলঘরে ফরাসের উপর তাকিয়া ঠেস দিয়ে বসে আলবোলায় তামাক খাচ্ছেন। হলঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বহু পুরাতন ভৃত্য রামলক্ষ্মণ, বাইরে সিঁড়ির কাছে বিরাটকায় দোবেজি লাঠি কাঁধে তা-দিচ্ছে গোঁফে। নায়েব সিদ্ধেশ্বরবাবু তেহাজারির অবস্থা বর্ণনা করছেন, খাজাঞ্চিবাবু দাঁড়িয়ে আছেন পাশে। দু-বছর কোনো ফলন নেই— খাবার নেই চাষিদের ঘরে— খাজনা তামাদি হবার উপক্রম।
'তামাদি ঠেকাতেই হবে নায়েব— এক সনের খাজনা আমার চাইই। ঘোড়ার ঘাস কাটতে কি এতগুলো আমলা পুষছি?' 'আজ্ঞে না হুজুর! চোখে দেখেছি—' 'চুপ, চুপ করো সিদ্ধেশ্বর!' নলটি তিনবার তাকিয়ার উপর জোরে জোরে ঠুকে রঘুনন্দনবাবু বললেন : 'সিপাই পাঠিয়ে বেঁধে নিয়ে এস সব কাছারিতে— আটকে রাখ আস্তাবলে— তারপর মেয়েছেলেরা এসে যখন কাঁদাকাটি করবে তখন বোলে দিও খাজনা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে—'
হঠাৎ দূর থেকে মিলিত কণ্ঠের আওয়াজ শোনা গেল : 'ভদ্রাকে বাঁধতে হবে।' তড়াক করে লাফ দিয়ে হলঘরের দরজার সামনে গিয়ে দোবেজি জানিয়ে দিল, একদল প্রজা, মেয়ে পুরুষ মিলে আসছে কাছারির দিকে। নায়েববাবু চক্ষু বিস্ফারিত করে বললেন :'রোখো, রোখো'। হাতের তেলোর খইনিটা জিবের তলায় গুঁজে দিয়ে লাঠিটা মাথার উপর ঘুরিয়ে দোবেজি ছুটল অগ্রগামী জনতার দিকে।
একপা একপা করে পিছু হটতে হটতে দোবেজি কাছারির সিঁড়িতে এসে ধাক্কা খেল। সিদ্ধেশ্বর বারান্দার উপর দাঁড়িয়ে ঠক-ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ভাঙা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন : 'কী চাই তোদের?'
সমস্বরে উত্তর এল 'ভদ্রাকে বাঁধতে হবে।' নায়েববাবু এগিয়ে এসে সিঁড়ির উপর দাঁড়ালেন। জনতার ভিতর থেকে একজন বললেন, 'আমরা বাঁধ চাই— না হলে হুকুম চাই হুজুরের— আমরাই বেঁধে নেব।'
হলঘরে এতক্ষণ রঘুনন্দনবাবু গুম হয়ে তাকিয়া ঠেস দিয়ে বসেছিলেন। কথাটা তাঁর কানে গিয়ে শিকারির বাণের মতো বিঁধল। বাণবিদ্ধ ব্যাঘ্রের মতো হুংকার দিয়ে বৃদ্ধ রঘুনন্দন বেরিয়ে এলেন— 'কে-ও-নায়েব? কে? কে বলছে বেঁধে নেবে? বেঁধে নিয়ে আয় এদিকে— দোবে—।'
দোবে প্রস্তুত।
অসহায় জনতার মিনতি মানল না নথনি দোবে। হুকুম হুজুরের। হলধরকে বেঁধে নিয়ে চলে গেল ভিতরে। হলধরের বউ নায়েবের পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে পড়ল। স্তব্ধ হয়ে রইল জনতা।
নায়েবের কণ্ঠস্বরের কাঁপুনি কমেছে। তিনি বললেন, 'ফিরে যা তোরা— সাত দিনের মধ্যে খাজনা দিয়ে যাবি এক সনের, তারপর তোদের বাঁধের কথা শুনব।'
'হলধরকে ছেড়ে দেন, হুজুর!' আওয়াজ এল।
'মুখের উপর কথার জবাব দেয়— এত বড় স্পর্ধা তার— ছোটো মুখে বড়ো কথা— বিচার হবে তারপর ছেড়ে দেব— যা তোরা এখন, হল্লা করিস নে।'
নিরুপায় জনতা ফিরে গেল ঘরে।
পথের মধ্যে সুন্দর রুখে দাঁড়িয়ে বললে, 'চলে যাব ভিটে ছেড়ে ভিন গাঁয়ে।' শ্রীধর বুড়ো এতক্ষণ চুপ করে ছিল— একগাল পাকা দাড়ি একবার চুমুরে নিয়ে বলে, 'জান থাকতে না—। গাঁয়ের উপর দরদ নেই, গাঁ বাড়বে কোত্থেকে? রজনির জোয়ান ছেলেটা হালচষা ছেড়ে দিয়ে গেল। চট্টলে হাওয়াই জাহাজের ঘাঁটি গড়তে— গাঁয়ের আর দোষ কি?'
তেহাজারি গ্রামটাকে অশ্বখুরের মতো বেড় দিয়ে ভদ্রা পুব দিকে প্রায় একমাইল এঁকে বেঁকে গিয়ে মিশেছে বেণী নদীর সঙ্গে। গ্রামে কয়েক ঘর অবস্থাপন্ন জেলে বাস করে— জমিদারের তারা মোটা খাজনা জোগায় এবং গ্রামের শান্তিরক্ষার জন্যে জমিদারের সিপাইয়ের কাজ করতেও পিছপা হয় না। গ্রামের আভ্যন্তরীণ শাসনের ভার একরকম তাদের উপরেই থাকে বলা চলে। ভদ্রার পাড়ে কোঁচবিদ্ধ বা ভদ্রার জলে ভাসমান দু-একজন চাষির মৃতদেহ প্রায়ই দেখা যায়। হেঁসোর টানে পেটচেরা দু-একজন জেলে নির্জন মাঠের কোণে গর্তের মধ্যে মুখ থুবড়ে মরে পড়ে থাকে।
ভদ্রার বুকে সারিসারি জেলেডিঙির উপর টিমটিম করে আলো জ্বলে রাতে। জাল ফেলার শপ-শপ শব্দ হয়। গ্রামের বুকে প্রায় একশ ঘর নিরুপায় নিঃস্ব চাষি ভদ্রার দিকে চেয়ে আক্রোশে ফুলতে থাকে। মনে হয় ডিঙিগুলো নদীর মধ্যে গোর দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে ভদ্রাকে রাতারাতি বেঁধে ফেলে দেয়। কিন্তু একশো ঘর খেতমজুর কিছুতেই পঞ্চাশ ঘর জেলেদের বাগে আনতে পারে না। পঞ্চাশের পিছনে আছে একাই একলক্ষ রঘুনন্দন চৌধুরী। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এমনি করেই কাটে।
ভদ্রাকে বাঁধার আওয়াজ জেলেদের কানেও পৌঁছে গেল। একজোট হয়ে তারা জমিদারকেই একরকম শাসিয়ে এল, ভদ্রায় যদি বাঁধ পড়ে, সমস্ত গ্রাম তারা আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেবে।
রাত্রি একপ্রহরের সময় শিমুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে হলধর ঢাকে বাড়ি দেয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে পঞ্চাশ-ষাটজন লোক এসে জমা হয় গাছতলায়। হলধর বলে : 'জমিদার ভয় দেখিয়ে আমাদের বাঁধ তোলা বন্ধ করতে চায়। আরং ফৌজ ঘুরে বেড়ায় গাঁয়ে— ভাড়াটে সিপাইরা ঘরে ঢুকে মেয়েদের উপর জুলুম করে। কাছারি বাড়ি ধরে নিয়ে গিয়ে তিন চারদিন না খাইয়ে বেঁধে রাখে। আজ সুন্দরের ঘরে আগুন লেগেছে, কাল লাগবে আমার ঘরে। এইবার আমাদের একজোট হতে হবে— ডাক দিলে যেন গাঁয়ের তিনশ ছেলেমেয়ে পুরুষ আমরা এক জায়গায় এক হয়ে দাঁড়াতে পারি।'
'জমিদার যদি লাঠিয়াল পাঠায়?'
'লাঠি দিয়ে ঠেকাব?'
'ঘর পুড়িয়ে দেয়?'
'গাছতলায় থাকব, গাঁ ছেড়ে কেউ এক পা নড়ব না।'
'বাঁধ?'
হলধরের মুখে আর কথা জোগায় না। সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আসল প্রশ্নের কাছে এসে হলধর আর উত্তর পায় না খুঁজে।
তেহাজারির কথা শুনে জেলা থেকে বিষ্টুঠাকুর গ্রাম দেখতে এলেন। শিমুলতলায় ছোট্ট একটি সভা হল। আদ্যোপান্ত বিবরণ শুনে ঠাকুর বললেন, 'মহকুমা হাকিমের কাছে তোমাদের নিয়ে যাব। তাঁর কাছে বুঝিয়ে বলবে তোমাদের কথা। তোমরাই বলবে—'
পরদিন ভোরে জন পনেরো লোক নিয়ে বিষ্টুঠাকুর তিন মাইল হেঁটে গিয়ে হাকিমের বাংলোয় উপস্থিত হলেন। প্রাতঃরাশ শেষ করে মহকুমা হাকিম আবদার রহমান চারজনকে ডেকে পাঠালেন তার ঘরে। সকলে তাদের বক্তব্য বলে হাকিম সাহেবকে একবার গ্রামটা সফর করার জন্যে অনুরোধ করল। ঠাকুর এদের দাবি আরও পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলেন।
রহমান সাহেব বললেন, তিনি কয়েকদিনের মধ্যে সফরে যাবেন।
ফিরবার পথে বিষ্টুঠাকুর বললেন, 'তোমরা গ্রামের সব চাষি মিলে একটা সমিতি গড়ো হলধর! তুমিই তার দায়িত্ব নাও। সমিতি থাকলে তোমাদের মেলামেশার সুবিধা হবে, একসঙ্গে তোমরা কাজ করতে পারবে— তোমাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে লড়তে পারবে—'
রহমান সাহেব সফর করে বললেন, 'জেলেরা যদি রাজি হয় তোমরা বাঁধ দিতে পার। তবে একবার ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি আমি এনে দেব। কিন্তু কি হবে এখন বাঁধ দিয়ে— গ্রাম তো তোমাদের যে কোনোদিন ছাড়তে হতে পারে।'
'কেন ছাড়তে হবে?' হলধর প্রশ্ন করল।
'যুদ্ধের জন্যে। তোমাদের এই গ্রামে সৈন্যদের ঘাঁটি হবার কথা হচ্ছে। জেলেদের নৌকোও আর এ নদীতে রাখা চলবে না।'
'যুদ্ধ কি এখানেও হবে? জার্মানিতে হচ্ছে, বিলেতে হচ্ছে, জাপানে হচ্ছে— এখানে কী?'
হাকিম সাহেব ঘোড়ার লাগাম ধরে একটা টান দিয়ে পেটে একটা ঠোক্কর মারেন।
'কবে আমরা জানব, হুজুর।'
'এক সপ্তাহের মধ্যেই' বলে রহমান সাহেব পথের বাঁকে ঘোড়ার পিঠে অদৃশ্য হয়ে যান।
ওসব ভয় রে ভয়! যুদ্ধ যখন হবে তখন দেখা যাবে, বাঁধ আমরা বাঁধবই!
এক দুই করে তিন সপ্তাহ চলে গেল। গ্রামের লোকেরা হাকিমের বাংলোর ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পরে রঘুনন্দন চৌধুরী দুই সিপাইসহ বেরিয়ে আসেন, আড়চোখে তাদের দিকে চেয়ে চলে যান। জমিদারের কাছারির প্রাঙ্গণে গিয়ে তারা জড়ো হয়। কিছুক্ষণ পরে হাকিম সাহেব গট-গট করে বেরিয়ে এসে লাফ দিয়ে ঘোড়ায় উঠে চলে যান। এ-ওর মুখের দিকে চেয়ে ব্যাপারটা বুঝে নেয়। ফিরে আসে গ্রামে। রঘুনন্দন চৌধুরী বুঝিয়েছেন হাকিম সাহেবকে যে নদীতে বাঁধ দিলে গ্রামের মধ্যে একটা ছোটোখাটো খণ্ডযুদ্ধ হয়ে যাবে। তার প্রতিক্রিয়া আশেপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়বে। এই শান্তিভঙ্গের দায়িত্ব হাকিম সাহেবের না নেওয়াই উচিত।
ঠাকুরের কথাতে শিমুলতলায় বসে সকলে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল— 'রাতারাতি আমাদের বাঁধ দিতেই হবে। সন্ধ্যায় জেলেরা যখন ঘাট থেকে নৌকা ছেড়ে দেবে তখন কাজ আরম্ভ হবে। রাতের মধ্যে কোনোরকমে যদি বাঁধ বাঁধতে পারি, ভোরে হাকিম সাহেবের কাছে বলব— বাঁধ আমরা বেঁধে ফেলেছি। পুবদিকে আমরাই একটা ছোটো খাল কেটে জেলেদের নৌকো রাখার ব্যবস্থা করে দেব। জেলেদের বুঝিয়ে বললে সব মিটে যাবে।'
পরদিন সন্ধ্যার পর দলে দলে গ্রামের কৃষকরা হাজির হল নদীর বাঁকের কাছে। হাতে লাঠি ও লণ্ঠন, কোদাল, সাবোল, কুড়ুল, মাথায় ছেঁড়া চাটাই, কাঁথা, মাদুর, ন্যাকড়া, নারকেল দড়ি, পাঁজা-পাঁজা বাঁশ এল জমিদারের বাঁশঝাড় থেকে।
ছোটো ছোটো পোস্টে লণ্ঠন ঝুলছে চারিদিকে। হেঁই-হেঁই ঝপ ঝপ শব্দে একশখানা কোদাল চলছে দূরে মাটির উপর। তৃতীয়বার চাঁদ উঁকি দিচ্ছে মেঘের কোণ থেকে। ক্ষীণস্রোতা ভদ্রার স্বচ্ছ জলে কোমর ডুবিয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে কপনি-আঁটা বিশজন জোয়ান এপার থেকে ওপার। বাঁশ বিঁধছে ভদ্রার বুকে। ভদ্রার স্রোত এদিকটাতে ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
হাতের মাংসপেশিগুলো অবশ হয়ে আসে। শিরগুলো ফুলে ওঠে নারকেল দড়ির মতো। গোরুর খুরের মতো শক্ত হাত ফুঁড়েও দু-এক ফোঁটা রক্ত পড়ে নদীর জলে— হয়তো লাল হয় না। কোদালের বাঁটের উপর মাথা দিয়ে বসে থাকে ওরা— দরদর করে গা দিয়ে ঘাম পড়ে শক্ত মাটির বুকে।
বাঁধ উঠেছে পেট পর্যন্ত। বাঁ দিকের একটা পাড় ধসিয়ে নিয়ে ক্ষীণস্রোতা শীর্ণকায়া ভদ্রা প্রচণ্ড ঔদ্ধত্যে আবার কুল-কুল করে চলে যায়। দ্বিপ্রহরের ডাক ডেকে শৃগালের দল থেমে যায় দূরে।
এতগুলো জোয়ান হয়রাণ হয়ে পড়ে থাকে মাঠের উপর, মাটির উপর। জেগে থাকে হলধর, ওসমান, সুন্দর, লতিফ, আবদুল আর বিষ্টুঠাকুর।
ঠাকুরের কথায় ছুটে যায় সব গ্রামের মধ্যে। মা-বউ-নানি-চাচি- ছেলে-মেয়েদের ডেকে আনে দলে দলে। অর্ধেক রাত্রের মধ্যে ভদ্রাকে বাঁধতেই হবে।
সুন্দরের উৎসাহ অপরিসীম। সুন্দর ও ওসমান এক আওয়াজে নদীর পাড় কাঁপিয়ে জাগিয়ে তোলে সকলকে। মেয়েরা এবার কোমর বেঁধে বাঁশের চাঁচ কাটতে থাকে— ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা ঝুড়ি মাথায় করে মাটি বয়ে নিয়ে যায়। ছেঁড়া চাটাই, ন্যাকড়া ও চাঁচে তাল পাকিয়ে ধপাধপ মাটি ফেলতে থাকে, বাঁশে ঘা মেরে মেরে বসিয়ে দেয় নদীর বুকে কয়েক হাত, দলনে মর্দনে নদীর জল ঘোলাটে কাদা হয়ে যায়।
ভদ্রা হার মেনে বাঁধের ওপাশে ফুলে ফুঁপিয়ে ওঠে, চূর্ণ জলস্রোতে আবার মিলিয়ে যায়!
ক্যালিফোর্ণিয়ার বোল্ডার, উক্রেইনের নীপার থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে তেহাজারি। ইলেকট্রিসিটি, ক্রেন-ক্র্যাকার, লিফট, স্টিলের মতো হাজারগুণ শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক মজুর এর চতুঃসীমানায় নেই। ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্ল্যানিং-এর কলা-কৌশলও যা আর জলপড়া মন্ত্রপড়াও তাই। মাটি আর চাটাই দিয়ে, পেশি আর ঘাম দিয়ে গড়া এই ভদ্রার বাঁধ মানুষের বুকের বাঁধ, মুষ্ঠির বাঁধ।
দারোগাবাবু পরদিন সকালে এসে মুষ্ঠি তুলে শাসিয়ে বললেন : 'ভাঙতে হবে বাঁধ'।
'ভাঙব না'- জবাব এল।
'হুকুম—'
'মানব না—'
বিষ্টু ঠাকুর, হলধর ও ওসমানের হাতে হাতকড়া পড়ল। রঘুনন্দন চৌধুরী নালিশ করেছেন আদালতে। সাক্ষী জেলেরা, আর সাক্ষী এই গর্বোদ্ধত ভদ্রার বাঁধ।
সমিতির খড়ের ঘরে ছেঁড়া চাটাইয়ের উপর বসে দুঃসাহসী সুন্দর হাতমুখ নেড়ে সকলকে জানিয়ে দিল— 'ঠাকুরের কথা— ভলান্টিয়ার চাই— লাঠিয়াল ভলান্টিয়ার। গ্রামের সব পথ রাতদিন পাহারা দিতে হবে। জেলেদের বুঝিয়ে বলতে হবে— যেমন বাঁধ বেঁধেছি এক রাতে জান দিয়ে— অমনি করে আবার সবাই মিলে এক রাতে খাল কেটে নৌকা ভেড়াবার ঘাট করে দেব— আদালতে জমিদারের পক্ষে সাক্ষী দিতে পারবে না— তাহলে ভদ্রার জলে তোমাদের ধড় ভেসে যাবে বেণীর দিকে'—
আদালতে জমিদারের সাক্ষী নেই। ইউনিয়ন বোর্ডের বৃদ্ধ প্রেসিডেন্ট একা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আবোলতাবোল মুখস্থ বলে যায়। ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রুকুঁচকে বলেন— 'ষ্টপ'—
জেলেরা জানিয়ে দেয়, নৌকা ভেড়াবার নূতন ঘাট তারা পেয়েছে— থাক বাঁধ— সাক্ষী তারা দেবে না—
বিষণ্ণবদনে রঘুনন্দন চৌধুরী কাছারি ঘরে বসে হাঁক দেন। বৃদ্ধ সিদ্ধেশ্বর বলির পাঁঠার মতো সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকেন। চৌধুরী মশাই বলেন : 'নায়েব! তিন দিনের মধ্যে কাগজপত্তর দিয়ে, তুমি দেশে রওয়ানা হবে— যাও— যাও বলছি সামনে থেকে—'
কয়েকমাস পরের কথা। সোনালি ধানের শীষগুলো ধানের ভারে নতশির। বাঁধবন্ধ ভদ্রা আর সিঁদ কেটে মাঠে ঢুকে ফসল খেতে পারে না। চিক চিক করছে রোদে। ফসল কাটার সময় এল। চাষিদের মুখে হাসি ফোটে, আবার ম্লান হয়ে যায়। কি হবে এই কটা ধানে— যে মাগগির দিন! দেশে অরাজকতা এল কি?
গ্রামের পথে কথা হয়— 'কী হল?' খবরের কাগজে নাকি বলছে নুন তেলের গাড়ি করে কামান আসছে, বন্দুক আসছে, সেপাই আসছে। জাপানিরা নাকি এসেছে দেশের দরজা পর্যন্ত— চট্টলের কোল বরাবর। ফ্যাকাসে মুখে আর কথা যোগায় না।
ফিসফিস কথা হয়। হাওয়াই জাহাজ উড়ে যায় তেহাজারির মাথার উপর দিয়ে। হাত থেকে কাস্তে এলিয়ে পড়ে মাটির উপর, লাঙলের বলদ থেমে যায়— কাৎ হয়ে হুঁকোর জল গড়িয়ে পড়ে, চেয়ে থাকে সব আকাশের দিকে— কে আসছে?
আকাশে বিরাট পাখা ছড়িয়ে উড়ে আসছে সাগরপারের দেশ থেকে এক অতিকায় দানব— বড়ো বড়ো নখ, বড়ো বড়ো থাবা— করাতের মতো দাঁতের পাটি— আগুনের মতো লকলকে জিব—। সোনার দেশ, সোনার মাটি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
পরওয়ানা এল একদিন ভোরে— গ্রাম ছাড়তে হবে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে। চাটগাঁয়ে বোমা পড়েছে—। মাত্র দুটো নদীর ব্যবধান। তেহাজারিতে তাঁবু বসবে সৈন্যদের— অস্ত্রশস্ত্র গুলিগোলা জমা হবে।
বৃদ্ধদের হাহাকার, বউ-ঝিদের কান্নার রোলে ফেটে গেল আকাশ। আকাশ তবু স্তব্ধ, নীরেট নীল।
হাকিম সাহেবের বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে সকলে সমস্বরে কেঁদে উঠল— 'সাত দিন সময় চাই— হুজুর।' রহমান সাহেব বেরিয়ে এসে বললেন— 'তোমাদের তো আগেই বলেছিলাম— বাঁধ বাঁধার আগে—। তা হবে না— কাল ভোরেই গ্রাম তোমাদের ছাড়তে হবে—'
গ্রামের জেলেরাও দাঁড়িয়ে ছিল পাশে। নৌকা তাদের ঘাটে নেই, ভদ্রায় নেই, বেণীতে নেই— কেড়ে নিয়েছে সৈন্যরা। সকলে : 'খাব কি হুজুর? যাব কোথায়? বিদেশে কে দেবে ফসল খেত, বাসের ভিটে?'
'দূরের গ্রামে যাও— তোমরা সকলেই টাকা পাবে— ভয় নেই!'
বাংলো থেকে বিশ মাইল হেঁটে জেলার শহরে গেল তারা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। বললে : 'সাতদিন সময় চাই হুজুর।' তিন দিনের সময় ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুর করলেন।
সেই খেত। সেই বাঁধ। সেই ভদ্রা।
মক্কা-মেদিনা-গয়া-কাশী-জগন্নাথের তীর্থযাত্রী কি এরা? তিন দিনে মাঠের ফসল অর্ধেক কাটা হয়েছে— বাকি অর্ধেক পড়ে রয়েছে মাঠে। আজ আর তারা দুলছে না বাতাসে। বাতাস রুদ্ধ।
ওরা লুঠ করবে ধান, লুঠ করবে ঘরের বউ, পুড়িয়ে দেবে ঘর—। দেব না একটা ধান— চলার পথে হেঁকে বললে সুন্দর আর ওসমান।
ছেঁড়া কাঁথা আর ন্যাকড়ার উপর কেরোসিন ছড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দিল ওসমান ধানের খেতে।
'খেতে আগুন— হা আল্লা!' আকাশের দিকে চেয়ে বুক চাপড়ে কেঁদে উঠল ওসমানের বৃদ্ধ চাচা জমির।
'ভদ্রার বাঁধ ভাঙতে হবে!' সুন্দর রুখে গেল। হলধরের বুক ফেটে জল এল চোখে। নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সুন্দর— হাতে লাঠি, সাবল।
ভদ্রার নির্মম প্রতিশোধ!
গোরুর পাল চলেছে সামনে—। হাম্বা ডাকে কেঁপে উঠছে গাছপালা।
পিছনে বৌ-ঝি ছেলে-মেয়েদের কান্না দূর গ্রাম পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
জেলেরা চলেছে জাল কাঁধে। সাক্ষী তারা দেয়নি।
তার পিছনে চলেছে বৃদ্ধ জমির বুক চাপড়াতে চাপড়াতে, আর হলধর আকাশের দিকে চেয়ে বার বার বলছে— 'একি হল ভগবান! কোন রসাতলে যাচ্ছি?'
সুন্দর ও ওসমান আর সকলকে দলে টেনে আওয়াজ তুলে বলছে: আবার বাঁধ বাঁধব— জমি চষব— ফসল কাটব— এই গাঁয়ে— কল দিয়ে, বিদ্যুৎ দিয়ে— ইস্পাত দিয়ে— দেব না আজ দুশমনকে কিছু—। জোরে জোরে পা ফেল ভাই— পা ফেল— জোরে চল—
সুদীর্ঘ দিগ্বলয়লীন প্রান্তরে মেঠো পথের উপর তেহাজারি গ্রাম মানুষের কাঁধে, পিঠে ও মাথায় মিলিয়ে গেল সামনে। পিছনে রইল ভাঙা বাঁধ, পোড়া মাঠ ও গ্রামভরা ছাই, আকাশে উড্ডীন দৈত্যের মুখের গ্রাস।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন