দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন

বিনয় ঘোষ

বাংলা দেশের কবি দুঃখ করে বলেছেন :

মোদের মুক্তি? আধখানা তার

পীরদরগার এখনো সিন্নি মাঝে

পাদোদক আর তাবিজ মাদুলি শান্তি

স্ব্যস্তয়ন;

বাকি আধখানা গ্যানোর ফিজিক্স

চরক-সংহিতায়।

বিজ্ঞান আর দৈবে মিলিয়া প্রায়

মাঝামাঝি

বিংশ শতাব্দীতে

ঘরে ও বাহিরে অদ্ভুত খেলা খেলিছে

বঙ্গদেশে—

বঙ্গদেশে 'খেলা' খুবই স্বাভাবিক, কারণ আজও এখানে পূর্বোক্ত উকিল মশাই, আমার তালুইমা ও বিকলমিয়ার সংখ্যাই বেশি। বাংলাদেশে দৈব আর বিজ্ঞানের কোলাকুলি আশ্চর্য নয়। রামন ও মেঘনাদ সাহার বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখানে পোকায় কাটবে কাঠের আলামারিতে, হু হু করে বিকোবে লক্ষ লক্ষ কপি 'চেতাবনী'। পাদোদক আর তাবিজমাদুলির বড় বড় ব্যারিস্টারেরা বসে আছেন অনেক ফরাসি রাজ্যের আশ্রমে, সুতরাং চেতাবনীরই জয়। তা ছাড়া, বিজ্ঞানের সামাজিক প্রয়োগ আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের কৃপায় সম্ভব হয়নি। যতটা তাঁদের শোষণ ও শাসনব্যবস্থা কায়েম করার জন্যে প্রয়োজন ততটা উন্নতি সাধন করেই তাঁরা হাত গুটিয়েছেন। দেশীয় ধনতন্ত্রের বিকাশ হয়নি, ভ্রূণহত্যা করার চেষ্টা হয়েছে। আমাদের দেশের শিল্প-বাণিজ্যের ইতিহাসে তার প্রমাণ রয়েছে যথেষ্ট। ধনপতি বালচাঁদ হীরাচাঁদের মোটরের কারখানা এবং বিমান তৈরির কারখানা গড়ার প্রয়াসের করুণ পরিণতিই তার প্রমাণ। সিন্ধিয়া স্টিম ন্যাভিগেশন কোম্পানি এবং চিনির কলের ইতিহাস আরও করুণ। আমরা যদি তাই আজও মাদুলি-তাবিজ পরি, চেতাবনী পড়ি, ফুটপাথের উপর লণ্ঠনের ধারে বসে হাতের তেলোটা বার করে চট করে জীবনটা চুম্বকে জেনে নিই, তা হলে আমাদের বাপান্ত করা চলে না। জীবনের সামনে আমরা বিজ্ঞানের জয় সদম্ভে ঘোষিত হতে দেখিনি আজও, কলকারখানা আমাদের চারিদিকে মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। আজও প্রায় শতকরা আশি জন আমাদের দেশের লোক ঘুরেফিরে চাষ করে বেঁচে থাকে। অবশ্য এটা ঠিক, বৈজ্ঞানিক প্রগতি যতটুকু আমাদের সমাজব্যবস্থাকে আঘাত করেছে, জীবনকে বদলেছে ও বদলাচ্ছে, তার পরিচয় আমাদের মনোবৃত্তিতে, শিল্পে ও সাহিত্যে খুব কমই আছে। তা হলেও, 'বঙ্গদেশ' বা ভারতবর্ষকে পর্যন্ত ক্ষমা করা যায়। কিন্তু পশ্চিমে বৈজ্ঞানিক সভ্যতার সৌধ গড়ে উঠেছে যেখানে, সেখানেও যখন কনানডয়েল লক্ষ লক্ষ কপি বিকোয়, প্ল্যানচেট চলতে থাকে, কোষ্ঠী ও গণৎকারের গবেষণা-সম্বলিত পত্রিকা স্টলে ভিড় করে, তখন কৈফিয়ত কী? ‘Aye, there’s the rub...’

হ্যামলেটের মতো ‘To be or not to be’ সমস্যা আজ বৈজ্ঞানিকের জীবনের সামনে, কারণ রাজত্বটা বৈজ্ঞানিকের নয়, ধনকুবেরদের। একদিন এই কুবেরদের সিন্দুক ও ব্যাংকের তহবিল ভারি করার জন্যে, সাম্রাজ্য-সম্পত্তি বাড়াবার জন্যে প্রয়োজন হয়েছিল বৈজ্ঞানিকদের আবিষ্কার, বৈজ্ঞানিকরা সেদিন আবিষ্কারের আনন্দে, গবেষণার আনন্দে মশগুল হয়েছিলেন। তাঁরা সেদিন দেখেছিলেন তাঁদের সাধনার ফলে বাইরের পৃথিবীতে মানুষের জীবন কি দ্রুত বদলাচ্ছে, সমাজ কি বৈদ্যুতিক গতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। সেদিনের বাস্তব সত্য ছিল সৃষ্টি, প্রসার, প্রগতি, আর জীবনের ধ্রুবতারা ছিল ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। কিন্তু আজকের বাস্তব সত্য কী? অপচয় (waste) ও মৃত্যু (death)। শুধু অপচয় ও মৃত্যু নয়। সামগ্রিক যুদ্ধের সঙ্গে সামগ্রিক অপচয় (total death)। একদিন যে-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ধনপতি, যখন সেই বিজ্ঞান ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মূর্তি ধরে তাঁকে ধ্বংস করতে চাইল, তখন তিনি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীকেই বন্দি করে বললেন : 'যে শক্তি তুমি সৃষ্টি করেছ সে আজ শাণিত বল্লম তুলেছে আমার দিকে— তাকে ধ্বংস করার জন্যে এবার তুমিই গবেষণা করো।' অর্থাৎ যে শান্তির বাণী, প্রাচুর্যের বাণী বহন করে এনেছে বিজ্ঞান তার দীর্ঘ দিনের দুরূহ সাধনার ফলে তাকে ধ্বংস করার হুকুম এল বিজ্ঞানীর উপর। ডান্ডাবেড়ি পরে বৈজ্ঞানিক এগিয়ে গেলেন তাঁর ল্যাবরেটরির দিকে— সামনে বোর্ডের উপর লেখা ‘War Research Laboratory’..........

মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে শিশু যে দৈত্যের রূপকথা শোনে, সেই দৈত্য যদি দুঃস্বপ্নের ঘোরে তার কপালে চুমু খেয়ে যায়, তা হলে শিশু যেমন আতঙ্কে ককিয়ে উঠে আড়ষ্ট হয়ে থাকে, বৈজ্ঞানিক তেমনি তাঁর নিজের রচিত রূপকথার দানবকে দেখে আতঙ্কে শিউরে উঠলেন। তিনি দেখলেন যে, স্বর্গ থেকে তিনি নির্বাসিত হয়েছেন, শয়তান তাঁর হাত ধরে নিয়ে চলেছে 'ইনফার্ণোর' মধ্যে। চারিদিকে তাঁর আগুন জ্বলছে, মাথার উপরে, আশেপাশে। শিশুর কাকলি, মানুষের কণ্ঠস্বর কোথাও শোনা যায় না। সবুজ ফসল-ভরা খেত, সুরম্য অট্টালিকা দেখা যায় না। শুধু কঙ্কাল আর কঙ্কাল, নানা দেশের মানুষের কঙ্কালের এক বীভৎস ঐকতান আকাশে বাতাসে। ইঞ্জিনিয়ারের ইস্পাত ও কংক্রিটের স্বপ্ন সৌধ ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে বোমারু বিমান, কেমিস্ট-ফিজিসিস্ট- জিওলজিস্টের আশা ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে ইস্পাতের কেটার-পিলার, বায়োলোজিস্টদের গৌরব ও সোনালি স্বপ্ন নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে মৃত্যুর আতঙ্ক, দুর্ভিক্ষের বিভীষিকা, আর বাতাসে আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত বিষাক্ত গ্যাস ও ব্যাকটেরিয়া। আর নরকঙ্কালের কাঞ্চনজঙ্ঘার উপর অতিরিক্ত রক্তপানে ক্লান্ত ভাইকার্স-স্নাইদার-ক্রু্যজট-ক্রুপস- মিৎসুই-ফোর্ড প্রমুখ ভুড়িয়াল ঘড়িয়ালরা বসে বসে হাঁপ ছাড়ছেন।

ধনকুবেরের ক্রীতদাস অন্ধ বৈজ্ঞানিক তাই করজোড়ে প্রকৃতির দিকে ফিরে বললেন: 'ক্ষমা করো অবুঝ শিশুকে! খোদার ওপর খোদকারি করতে গিয়েছিলাম, কঠিন শিক্ষা হয়েছে, আর নয়!' প্রতিপালকের ষড়যন্ত্রকে বৈজ্ঞানিক ভুল করলেন প্রকৃতির লীলাখেলা বলে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন কৃপণ কুবের। ধর্ম-যাজক ও বৈজ্ঞানিক গলা জড়াজড়ি করে কুবের-রাজের সভায় এলেন বয়স্য সেজে। ফিরে এল পুরাতন অ্যানিমিজম (Animism), ম্যাজিক, রিলিজিয়ন। বেঁচে উঠল আদ্যিকালের বদ্যিবুড়োর দল; ভূতের ওঝা, গণৎকার ও ত্রিকালজ্ঞ মহা-পুরুষরা। ভগবান যদি নেমে আসেন গণিতের, রসায়নের পদার্থবিজ্ঞানের ফরমূলা ও গবেষণালব্ধ সত্যের মধ্যে— তা হলে দোষ কী আজ আমাদের ওই প্রবীণ উকিল মশাইয়ের? দোষ কী, আজ পৃথিবীর মেয়েরা যদি ম্যাদাম কুরি হবার স্বপ্ন না দেখে তালুইমা বনে যায়। কিন্তু কী বিরাট ব্যবধান! টেমস নদীর ব্রিজ জখম হলে অস্ত্রপতি ও ধনকুবেরদের ভাড়াটে বৈজ্ঞানিকরা চোখে 'সরষের ফুল' দেখেন— যার ইংরেজি নাম ‘cosmic ray’— আবার নিপার বাঁধ নিঃসংকোচে ধূলিসাৎ করে দিয়ে, স্বপ্ন শহর স্ট্যালিনগ্রাদকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে কোনো দেশের বৈজ্ঞানিক লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে এক হাতে ইস্পাত আর এক হাতে বিদ্যুৎ নিয়ে শপথ করেন : নরঘাতক ও নরখাদক পিশাচদের এই ধ্বংসাভিযান আমরা চূর্ণ করবই, আমরা বৈজ্ঞানিকরা মানুষের যুগযুগান্তরের শান্তি ও প্রাচুর্যের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেবই।' একেই বলে বৈজ্ঞানিক মনোভাব (scientific spirit)।

এই বৈজ্ঞানিক মনোভাবের বিকাশ যদি না হয় তা হলে এ-যুগের নিষ্ঠুর সত্য নরঘাতীর ষড়যন্ত্রকে কেউ ভাববেন নিয়তির হেঁয়ালি, কেউ ভাববেন কল্কি অবতারের বোধন, কেউ ভাববেন প্রকৃতির খেয়াল— যার উপর মানুষের হাত নেই। ভুড়িয়াল ঘড়িয়ালরা নিশ্চিন্তে এই ঘোড়ার ডিম 'ভাবনা'য় তা দেবে। ডিম ফুটলে দেখা যাবে বাচ্চা হয়েছে নিয়তির দুলাল হিটলার, প্রকৃতির খেয়ালি ছেলে মুসোলিনী আর কল্কি অবতার তোজো। আজ তাই নিজেরা বাঁচতে হলে, সভ্যতাকে বাঁচাতে হলে দরকার এই— ‘scientific spirit’ জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে, প্রত্যেক পদে এই বৈজ্ঞানিক মনোভাব। একজন বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিকের সুচিন্তিত দু-একটি কথা এখানে উদ্ধৃত করে শেষ করি :

Just as old machinery becomes obsolete and is scrapped, so false traditions and baseless superstitions must be discarded and eliminated from the social heritage. If education is to fulfil its task, it will require to be permeated with the scientific spirit... (H.levy).

আমাদের দেশের বৈজ্ঞানিকেরা আলসে হয়ে বসে না থেকে কবে এই কাজের দায়িত্ব নেবেন? স্বাধীন ভারত, ভাবী ভারতের বনিয়াদ তো আজ তাঁদেরই গড়তে হবে। কিন্তু কোথায় তাঁরা ক্রুসোর দ্বীপে আত্মাভিমানে প্রবাসী, আর কোথায় ভারতবর্ষ ও ভারতবাসী!

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%