কসাইখানা

বিনয় ঘোষ

আরামপ্রিয় নাগরিক তখন ঘুমে অচেতন।

মোহনচাঁদের লৌহ ও ইস্পাতের কারখানার প্রথম জাগরণের ভোঁ নিঝুম বস্তিটিকে ঝাকুনি দিয়ে জাগিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত বস্তিটা চলাফেরায়, কথাবার্তায়, কচি শিশুদের অকস্মাৎ ঘুম ভাঙার কান্নার স্বরে মুখর হয়ে উঠল।

বাইরের ধোঁয়াটে আবহাওয়া ভেদ করে ভোরের আলো বস্তির কুঠুরিতে তখনও পৌঁছয়নি।

লক্ষ্মী কোলের দশ মাসের সপ্তম শিশুকে স্তন্যপান করাতে করাতে সানকিতে রুটি সাজাচ্ছিল। দশ মাসের শিশু অক্লান্ত শোষণ করেও দুধের বদলে স্তন থেকে ঠান্ডা চামড়ার আস্বাদ ভিন্ন কিছু পায় না, কঁকিয়ে কেঁদে ওঠে।

দূরে কসাইখানা থেকে জবাই-প্রস্তুত পশুদের কম্পমান ক্ষীণ রব কানে ভেসে আসে।

লক্ষ্মী কোলের শিশুটির মুখে চোখে ঘনঘন চুমু খেয়ে বুকের ভিতর জড়িয়ে ধরে। শিশুর কান্না থামে না। বুকভরা স্নেহে দশ-মাসের শিশুরও ক্ষুধা নিবৃত্তি হয় না। ডুকরে ডুকরে সে কেঁদে ওঠে আর মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো কচি হাত দুখানা মুঠো করে পেটটা কুচকে হাঁটু দুটো বুক পর্যন্ত টেনে এনে চোখ বুজে খুব জোরে চিৎকার করে ওঠে। মনে হয় সে যেন এখুনি তার মায়ের কোল থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এর প্রতিবিধান করবে। এ পৃথিবীর এই দশ মাসের অভিজ্ঞতা তার কাছে এত তীব্র মনে হয়েছে যে মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে সে তার প্রতিবাদ করেছে। সামান্য একটু দুধ বইতো আর কিছু নয়!

কারও পোষা বেড়ালে দুধ খায়, খাচায় বসে সখের পাখিও দুধ খায়। অপর্যাপ্ত দুধ। সে কেন দুধ পায় না তবে?

প্রাণপণ জোরে সে তার মায়ের স্তন কামড়ে ধরে ছেড়ে দিয়ে চিৎকার করে ওঠে। লক্ষ্মী একবারটি শুধু 'উঃ' করে ওঠে, তারপর কোলের শিশুকে জড়িয়ে ধরে আসন্ন শিশুর কথা স্মরণ করে নিজের বুকের দিকে ঘাড় নিচু করে থাকে একদৃষ্টে।

চেয়ে চেয়ে ভাবে কেন এমন হল! যে-দুধ তার স্তন থেকে অজস্র ধারায় ঝরে পড়ত রাতদিন, শুধু যে বুকের দুধ খাইয়ে সে অন্য ছটি শিশুকে বাঁচিয়ে তুলেছে, সে দুধ গেল কোথায়! বুকের দুধ ছিনিয়ে নেওয়া যায় কি? যায় না বলেই তো সে প্রাণভরে নিজের ক্ষুধার্ত শিশুদের খাইয়ে মানুষ করতে পেরেছে, বুকের দুধ ঝরে ঝরে কত নষ্ট হয়েছে। আজ তার সম্বল মাত্র কেয়েক ফোঁটা শরীরের রক্ত, কচি শিশুর দুধে দাঁত আর চিকণ জিবের টানাটানিতে সেটুকুর নিঃসরণ কেমন করে সম্ভব হবে। কিন্তু সেটুকুও যদি তার নীরস স্তনাগ্রে এসে পৌঁছয় তাতেও তার এতটুকু দুঃখ নেই। কিন্তু রক্ত যে! রক্ত তো আর দুধ নয়! হলই বা মায়ের বুকের রক্ত, তবুও তো সে মানুষের রক্ত। লবণাক্ত রক্ত কি কখনো বুভুক্ষু দশ মাসের শিশুর কাছে সুস্বাদু লাগে!

দুধ আর রক্ত! কারখানা আর কসাইখানা আর তার মাঝখানে এক বস্তির কুঠুরিতে বসে লক্ষ্মী ভাবে— দুধ আর রক্ত, রং সাদা আর লাল, স্বাদ মিষ্টি আর লোনা—

এ কি করলে ভগবান! লক্ষ্মী মনে মনে বলে ছোটো জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে। কারখানার ধোঁয়ার পুরু আস্তরণে আকাশ তখন ঢাকা!

শিশু আবার ডুকরে কেঁদে ওঠে। লক্ষ্মী একান্ত নিরুপায় হয়ে আঙুল দিয়ে একটুখানি গুড় স্তনাগ্রে মাখিয়ে শিশুর মুখের মধ্যে চেপে ধরে। মিষ্টি আস্বাদ পেয়ে শিশু চক চক করে চুকিয়ে চুকিয়ে খায়। সরু সরু পা দুখানা ঘন ঘন নাড়ে, বুকের ভিতর অ্যাঁক অ্যাঁক শব্দ হতে থাকে।

শিশুর মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে চেয়ে লক্ষ্মীর মনে হয় কিছুদিন আগেকার একটি মুমূর্ষু কুকুরছানার কথা। সানকির জল মেশানো সকড়ি চুক চুক করে খেতে কুকুর ছানার ছোট্ট লেজটি নাড়ার ভঙ্গিমা লক্ষ্মীর চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে ওঠে।

হঠাৎ ছ-টি সদ্যোজাগ্রত উলঙ্গ শিশুর কলরবে ঘরের ভিতর সরগরম হয়ে ওঠে। সকলের মুখে একই বুলি, মার কাছে খাবার কোথায় তার প্রশ্ন।

লাট্টু ছোট্টুর চুল ধরে এক টান দিয়ে বললে : তুই খাবি কেন? কাল রাতে তুই খেইছিস।

বেশ করেছি, তোর কি— বলে ছোট্টু লাট্টুর পিঠে এক কিল বসিয়ে দিয়ে মায়ের পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়।

রামলাল তখন কারখানায় পোশাক পরে সানকির পাশে এসে বসেছে। ছ-জন বৃত্তাকারে সানকির পাশে বসে সাজানো রুটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।

জটু বললে : ছোট্টুকে দিস নে বাবা, ও কাল চুরি করে খেয়েছে। জটুর কথা শেষ হতে না হতে লাট্টু এক লাফ দিয়ে উঠে ছোট্টুর পিঠটা জোর করে রামলালের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে ক্ষতচিহ্নের উপর আঙুল দেখিয়ে বললে : এই যে—

রামলাল লক্ষ্মীর দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করলে : কী হয়েছে রে?

লক্ষ্মী বললে : লক্ষ্মণের বউ রুটি ভাজছিল— ছোট্টু একখানা রুটি তুলে নিয়ে ছুটে পালাচ্ছিল, তাই লক্ষ্মণের বউ সানকি ছুড়ে মেরেছে—

সানকি ছুড়ে মেরেছে? একখানা রুটি নিয়েছে বলে? এতবড় আস্পর্ধা লক্ষ্মণের বউ-এর, ছেলেটা যদি ঘায়ে-অঘায়ে লেগে খুন হত?— কথাগুলো শেষ করেই রামলাল সোজা ছোট্টুর গালে সজোরে এক চড় মেরে বললে : কুকুরের জাত, যাস কেন? যাবি আর?

ছোট্টু কাঁদতে কাঁদতে মার দিকে ফিরে ধমক দিয়ে বলে : তুই তো খেতে দিস না—

দুবছরের পট্টু, ছোট্টুর অবস্থা ও রামলালের উগ্রমূর্তি দেখে ভয়ে হাউমাউ করে তাড়াতাড়ি বলে উঠল : লুতি আর খাইনি বাবা—

রামলাল আর কোনো কথা না বলে সোজা উঠে দাঁড়াল। লক্ষ্মী তার মুখের দিকে চেয়ে বললে : খেলে না?

না— ওদের ভাগ করে দিস,— বলে রামলাল কারখানায় চলে গেল।

ছোট্টুর খিদে পেয়েছে, খেতে চেয়েছে, লক্ষ্মী খেতে দেয়নি। তাই যদি সে একখানা রুটি নিয়েই থাকে তাতে ক্ষতি কি? ছেলেমানুষ, তার কি বুদ্ধি হয়েছে? লক্ষ্মণের বউ সেজন্যে তাকে ভাঙা সানকি ছুড়ে মারলে! বড় দ্যামাক হয়েছে লক্ষ্মণের বউ-এর।

রামলাল হন হন করে কারখানার দিকে হাটতে হাটতে চিন্তা করে। আজ সন্ধ্যায় ফিরে সকলকে ডেকে এর বিচার সে করবেই। এত বড় অহংকার!

রামলালের হঠাৎ মনে পড়ে এক পাগলের কথা। সেদিন সে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল— একটি বাড়ির ফটকের সামনে খুব হট্টগোল শুনতে পায়। উলঙ্গ একটি লোক, মাথায় একরাশ রুক্ষ চুল, গায়ে ছাই-মাটি মাখা, গোলমালের কারণ হচ্ছে সেই। দুজন খোট্টা দারোয়ান তাকে জুতো-পেটা করতে করতে অশ্রাব্য গালাগালি দিচ্ছিল। হাত-দশেক দূরে কয়েকজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। প্রহারের দাপটে লোকটির নাকমুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। অপরাধ একখানা কাপড় চুরির। মার খেয়ে লোকটি নর্দমার পাশে শুয়ে শুয়ে ধুকতে লাগল।

রামলাল সেই লোকটিকে প্রায়ই দেখেছে উলঙ্গ হয়ে বড় রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশের মতো চলন্ত যানবাহনগুলিকে হুকুম করছে— ইধারসে যাও, উধারসে যাও— কোনো কোনো মোটরের যাত্রীর কাছে হঠাৎ মুখ বাড়িয়ে চিৎকার করে বলছে: জাহান্নমে যাও, বেজন্মার দল—

প্রশস্ত রাজপথ। দুপাশে বহু লোকের ভিড়। তার কিন্তু কোনো কিছুতেই ভ্রূক্ষেপ নেই। সোজা উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তার মাঝখানে অবিরাম অর্থহীন বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছে:

—চাকা ঘুরছে, বন বন করে ঘুরছে,— চোখের মাথা খেইছিস বেজন্মার দল, দেখবি কেন— শাঁকও বেজেছে, হা-হা—! বলতে বলতে হঠাৎ থেমে আকাশের দিকে চেয়ে আবার বলতে থাকে,— ঘোরাও দেখি বাবা— গদা-খানা একবার ঘোরাও, মুণ্ডপাত কর— বেজন্মার দল—।

তারপর পিছনে ট্রাফিক পুলিশকে এগিয়ে আসতে দেখে দৌড়ে এক গলির মধ্যে সে অন্তর্ধান করে।

রামলালের চলতে চলতে এই পাগলটির কথা মনে পড়ে আর ভাবে, একখানা ছেঁড়া কাপড়েই তো ওর অভাব মেটে। অথচ কেউই দেয় না এমনি। চাইলে মুচকি হেসে বলে পাগল, না চেয়ে নিলে চোখ লাল করে বলে চোর। কেন চাইবে? চুরি করবে, ডাকাতি করবে, একশোবার করবে—

কারখানার দ্বিতীয় ভোঁ আরম্ভ হতেই রামলাল চমকে উঠল। ভোঁ থামতে না থামতে দৌড়ে সে ফটকের সামনে পৌঁছে গেল।

এদিকে ছোট্টু তার মাকে ভাগবাটরার অবসর না দিয়েই ছোঁ-মেরে সানকি থেকে একখানা রুটি আর একটু গুড় নিয়ে ছুটে কসাইখানার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। রোজ তার এখানে সকাল সন্ধ্যায় আসা চাই-ই। সকালে একটু চামড়া, এক টুকরো হাড় নিয়ে কঙ্কালসার কুকুরগুলোর গজরানি ও কামড়াকামড়ি দেখা, আর সন্ধ্যায় যখন কসাইয়ের দল হর-র-র শব্দ করতে করতে ভেড়ার পাল নিয়ে কসাইখানার দিকে আসে তখন কম্পমান ভেড়ার ভয়ার্ত ব্যা-আ রব শোনা ছোট্টুর নিত্যনৈমিত্তিক কর্তব্য। অনাস্বাদিত কোনো মাদক দ্রব্যের নেশায় যেন ছোট্টু বিভোর হয়ে যায়। হতভম্বের মতো নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে আর শিশু মনে নানারকম কুতূহলী প্রশ্ন জাগে।

কারখানার ভোঁ সকলকে আকাশ-স্পর্শী সুরে আহ্বান করে বলে : আয়! দলে দলে তোরা আয়! জ্বলন্ত চুল্লি তোদের ডাকছে, বিরাট কলেবর লৌহ-যন্ত্র বিকট চোয়াল ফাঁক করে ক্লান্তিহীন খট খট ঘটাং ঘটাং ঝুজ— বিচিত্র সুরে তোদের ডাকছে; ছেনি, লোহা, হাতুড়ি, হাঁপর, চিমটে, ক্রেন তোদের ডাকছে,— আয়!

ধোঁয়ার আস্তরণের ফাঁক দিয়ে রক্তবর্ণ সূর্য দেখা যায়, উত্তপ্ত লাল লৌহখণ্ডের মতো, যেন মেঘের লৌহবর্ত্মের উপর দিয়ে গড়িয়ে চলেছে। রক্ত-মাংসের যন্ত্রের দল সেদিকে ফিরে চায় কি না চায়, ঘাড় হেঁট করে দৈনন্দিন কাজের আহ্বানে সাড়া দেয়। দলে দলে সব কারখানার অগ্নিগহ্বরে প্রবেশ করে।

সঙ্গে সঙ্গে যে যার নিজ নিজ বিভাগে সারবন্দি হয়ে দাঁড়ায়। ঘর্ষণে ঘূর্ণনে, আঘাতে, আবর্তে, আস্ফোটে, শব্দ-প্রতিশব্দের মধ্যে ইস্পাতের প্রতিমূর্তিরা সব কাজে লিপ্ত থাকে। আগুনের তাপে রক্ত বাষ্প হয়ে যায়। অজস্র ধারায় বুকপিঠের দুপাশের শক্ত মাংস-স্তূপের পাশ বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ে। অবরুদ্ধ আবহাওয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট হয়, ফুসফুসের সম্প্রসারণে সকলের প্রশস্ত বক্ষ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে।

ছুটির ভোঁ শুরু হতেই সকলের হাত-পা সব অবসন্ন হয়ে আসে। স্ফীত শিরা উপশিরা শিথিল হয়। গন্তব্য স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনের ইঞ্জিন যেমন জঠরস্থ বাষ্প ছেড়ে দেয়, তেমনি সকলের বাষ্পাকুল বক্ষ থেকে হুস করে পাজর-বন্দি হাওয়া বেরিয়ে আসে।

ছুটির পরে রামলাল কারখানার বাইরে আসতেই হামিদ দৌড়তে দৌড়তে এসে তার কাঁধে হাত দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে বললে : আমাদের এক আস্তানা আছে, যাবি সেখানে?

কোথায়? রামলাল জিজ্ঞাসা করলে।

'বেশি দূর নয়, কাছেই।'

'কে কে যাবে?'

'আমরা ছ-জন,— আমি, তুই, কিষাণ, বিহারী, জমীরউদ্দিন আর আমেদ—'

'মদ খাওয়াস তো যাই—'

'বোতল বোতল মদ, কত খাবি তুই? রোজ আমরা পেট ভরে মদ খাই সেখানে।'

রামলাল আপত্তি করে না, কিন্তু মনে মনে ভাবে পেট ভরে মদ জোটে কোথা থেকে। হামিদ কোথায় এমন জায়গার সন্ধান পেলে?

যথাস্থানে পৌঁছে রামলালের ভুল ভেঙে যায়। রামলাল দেখে ছোট্ট একটি খোলার ঘর, দুখানা চাটাই পাতা, মদের বোতল, তাড়ির ভাঁড় কিছুই নেই। অবাক হয়ে রামলাল ঘরের চারকোণে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে দেখে, কিছুই বলতে পারে না।

হামিদ রামলালের কানে কানে বলে : চুপ করে কথাগুলো শোন, মদ পরে খাবি।

ফিরবার পথে হামিদ জিজ্ঞাসা করে : শুনলি?

রামলাল জবাব দেয় 'হু'।

'মদ খাবি?'

রামলাল জবাব দেয় না। চুপ করে দুজনে পথ চলতে থাকে।

রাতে ছেঁড়া চাটাইয়ের উপর শুয়ে শুয়ে ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে রামলাল মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। কালো কালো দৈত্য-মূর্তিরা দুরন্ত বেগে ছুটে চলেছে। নিস্তরঙ্গ আবহাওয়ায় অশান্তি। কারও চোখে ঘুম নেই।

মেঘের পাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ ঝলকায়, রণাঙ্গনে কামান বিস্ফোরণের আলোর মতো। রামলাল ভাবে কোথায় যেন ঝড় উঠেছে। ঝড়ের নিঃশব্দ পদসঞ্চারণ সে শুনতে পায়। প্রকৃতি নিস্তব্ধতার অবগুণ্ঠন খুলে ফেলে আরণ্যক হিংস্রতায় উন্মুক্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ করে বুঝি।

লক্ষ্মীর পাশে বসে কপালে হাত দিয়ে রামলাল বলে : কতদিন মাতাল হয়ে তোকে মারধোর করিছি—

লক্ষ্মী কোনো সাড়াশব্দ দেয় না, চুপ করে মরার মতো নিস্পন্দ হয়ে শুয়ে থাকে। রামলালের আজ রাত করে ঘরে ফেরাতেই তার সন্দেহ হয়েছে। রামলাল নিশ্চয়ই নেশা করেছে, মদ পায়নি, গাঁজা খেয়েছে।

রামলাল বলে : ছেলেগুলোকে আর লাথি-ঝাঁটা মারিস নি, ওদের দুটো মিষ্টি কথা বলে আদর করিস। —একটু থেমে রামলাল আবার বলতে থাকে, : ওদের বাঁচিয়ে রাখ লক্ষ্মী, বাঁচিয়ে রাখ—

লক্ষ্মী ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যায়, সমস্ত শরীর হিম হয়ে আসে। রামলালের এই অদ্ভুত পরিবর্তন তার কাছে অহেতুক ও অবান্তর বলে মনে হয়। এ তার পরিবর্তন নয়। প্রচণ্ড নেশার ঘোরে রামলাল অর্থহীন প্রলাপ বকছে। মাতাল, চণ্ডুখোর, গেঁজেল রামলাল নেশার ঘোরে ভুল বকছে। খুন করবে নাকি!

লক্ষ্মীর মাথাটা দুহাতে চেপে ধরে রামলাল বলে : নেশা আর করব না, তোর মাথার কিরে, নেশা আর করব না—

লক্ষ্মী মনে হল বলে : রেখে দাও, তোমার কিরে, ও আমি ঢের শুনেছি— কিন্তু কথা-কটা মুখের কাছে এসে আটকে যায়।

রামলাল বলে : আমরা নাকি ওদের ভাই— কথা শুনলে অবাক হয়ে যাবি— ওরা বলে আমরা নাকি চোর নই, ডাকাত নই—

লক্ষ্মীর মনে হয় জোর গলায় বলে : তা বইকি— তবে কি, জেল খেটে খেটে হাড় তো তোমাদেরই পেকে যায়—

—হামিদ খুনি নয়, লক্ষ্মী,— ল্যাংটা পাগলটা চোর নয়, ছোট্টু চুরি করেনি—

হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে কে যেন রামলালের টুটি টিপে ধরে। বিদ্যুতের আলোয় রামলাল চেয়ে দেখে লক্ষ্মী ঘুমুচ্ছে, ছোট্টু, লাট্টু, পট্টু সব অকাতরে ঘুমুচ্ছে। রামলালের শ্রান্ত দেহ অবশ হয়ে আসে।

ঘুমন্ত ছোট্টুর স্বপ্নাচ্ছন্ন সীমাহীন দৃষ্টিপথে অসংখ্য কম্পমান মেঘ-যুথ চারিদিকে ভয়ার্ত কণ্ঠে ব্যা-অ্যা-অ্যা রবের প্রতিধ্বনি তুলে বিলীয়মান।

আধ-ঘুম আধ-জাগরণের গোধূলি-চেতনায় রামলালের চোখের সুমুখে লক্ষ লক্ষ হামিদের অপচ্ছায়া।

বাইরে স্তূপীকৃত গাঢ় কৃষ্ণমেঘের অবয়ব জুড়ে আসন্ন ঝড়ের আভাষ।

সকালে লক্ষ্মীর যখন ঘুম ভাঙল তখন সমস্ত শরীর তার এক অদ্ভুত চেতনার আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে পেট থেকে এক একটা অসহ্য ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠে সর্পিল গতিতে বুক পর্যন্ত গিয়ে মেরুদণ্ড বেয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে আসে। মাথা, হাত-পা সব ঝিন ঝিন করে। শরীর ক্রমেই অবসন্ন হয়ে আসে। এ চেতনার সঙ্গে লক্ষ্মীর পরিচয় আছে, তার আর বুঝতে বাকি থাকে না, চোখের সামনে সব ঘোলাটে হয়ে যায়। ভয়ে মুখের রং পাঁশুটে হয়ে আসে।

গমনোদ্যত রামলালের মুখের দিকে চেয়ে লক্ষ্মী বলে : একটু তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরো, কারখানার ছুটির পর যেও না কোথাও—

রামলাল নির্লিপ্তভাবে জবাব দেয় : না গেলে চলবে না— এত করে বলেও তোর বিশ্বাস হল না— দ্রুত পা ফেলে রামলাল ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

সারাদিন লক্ষ্মী ঘরে বাইরে ছটফট করে ঘুরছে। সেই সংকটময় মুহূর্ত দ্রুত এগিয়ে আসছে। ভয়ে কাঠ হয়ে লক্ষ্মী জানালার কাছে এসে দাঁড়িয়ে কারখানার পথের দিকে চেয়ে থাকে। স্থির হতে পারে না, ক্রমেই যন্ত্রণা বাড়ে। ঘরের মেঝের উপর লক্ষ্মী অস্বস্তিতে পায়চারি করতে থাকে।

চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে। দলে দলে মজুরেরা ঘরে ফেরে।

রাত ভোর যাদের কাজ তারা ঘর ছেড়ে কারখানার দিকে যায়।

রামলাল তাহলে সত্যিই ফিরল না!

ছেলেগুলোর পেটে কাল থেকে কিছু পড়ে নি। খিদের তাড়নায়, তার উপর মায়ের এইরকম হাবভাব দেখে কে কোথায় উধাও হয়েছে ঠিক নেই।

রাত্রি দেড় প্রহর উত্তীর্ণ হয়ে গেল। রামলাল এখনও ঘরে ফিরল না। লক্ষ্মীর আর সহ্য হয় না।

বুনো শুয়োরের মতো গজরাতে গজরাতে লক্ষ্মী মেঝের উপর আছড়ে পড়ে যন্ত্রণায় মুখ ঘসটাতে থাকে। হাঁটু দুটো মুড়ে পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে ঘরের এক কোণে দেয়ালের দিকে সরে সরে যায়। মাঝে মাঝে গোঙিয়ে ওঠে। দু-হাত দিয়ে পরণের কাপড়খানা শতটুকরো করে ফেলে। চোখের সামনে বার বার আলো ঝলকে উঠে নিভে যায়। হাত-পা লোহার মতো শক্ত করে টান টান করে ছড়িয়ে দিয়ে 'মাগো' বলে লক্ষ্মী বীভৎসভাবে আর্তনাদ করে ওঠে।

আশপাশের কুঠুরি থেকে সকলে ছুটে আসে। রাত্রি শেষে প্রদোষান্ধকারে রামলালের অষ্টম সন্তান হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে ভূমিষ্ঠ হয়। ছোটো ছোটো পা ও মুষ্টিবদ্ধ হাত দুখানা নাড়াবার ভঙ্গিমা দেখে মনে হয় যেন এ পৃথিবীর উপর সে আদৌ সন্তুষ্ট নয়।

ভোর হয়। কারখানার ভোঁ বাজে। লক্ষ্মী চোখ মেলে ঘরের চারিদিকে চেয়ে রামলালকে দেখতে পায় না। হাত বাড়িয়ে কিষাণের বউ-এর কাছ থেকে শিশুটিকে বুকের উপর নিয়ে স্তন্যপান করাতে থাকে।

আজকের দিনে রামলাল কারখানায় গেল কি করে! কাল রাতের মদের নেশা রামলালের কি এখনও কাটেনি? গেঁজেল, মাতাল, চণ্ডুখোর রামলালের কথা কি কখনো সত্য হয়? রামলাল শপথ করে, বলে'লক্ষ্মী' তোর মাথার কিরে, নেশা আমি করব না— ছেলেগুলোকে বাঁচাস— হায়রে কিরে! মাতাল রামলাল প্রলাপ বকেছে। গেঁজেল রামলাল মিথ্যা কথা বলেছে।

সেদিনের সকালেই একখানি দৈনিক সংবাদপত্রে গলিত ধবল ও কুষ্ঠের বিজ্ঞাপনের তলায় এক কোণে ছোটো বর্জাইস অক্ষরে ছ-লাইনের এই সংবাদটি প্রকাশিত হয় :

মোহনচাঁদের লৌহ ও ইস্পাতের কারখানায় গতকল্য হঠাৎ ক্রেন ছিঁড়িয়া একটি দুর্ঘটনা ঘটে। তিনজন শ্রমিক আহত হয় এবং কর্তৃপক্ষরা সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের হাসপাতালে স্থানান্তরিত করিয়া প্রাথমিক চিকিৎসার বন্দোবস্ত করেন। বিষয়টি তদন্ত চলিতেছে। কেহই গুরুতরভাবে আহত হয় নাই বলিয়া সংবাদ পাওয়া গিয়েছে।

সব সংবাদ সত্য হয় না। তিনজন নয়, আটজন শ্রমিক আহত হয় এবং যে দুজন তৎক্ষণাৎ মারা যায় তার মধ্যে রামলাল একজন।

লক্ষ্মীর কথামতো রামলাল সেদিন কারখানার ছুটির পর ঘরে ফেরেনি!

শিশুর মুখে-চোখে লক্ষ্মী ঘন ঘন চুমু খায়। স্তন-মুখে শিশু কচি কচি ঠোঁট নাড়ে আর তার প্রশান্ত কপালের দিকে চেয়ে লক্ষ্মী ভাবে : বাঁচাস— কি করে বাঁচাব—?

ছেলেগুলো সব মাকে ঘিরে বসেছে। পট্টু মায়ের মাথার কাছে বসে এই অদ্ভুত জীবটির নাকে মুখে হাত দিচ্ছে বার বার আর লক্ষ্মীকে জিজ্ঞাসা করছে : ভাই, ভাই, না-মা? লুতি খাবে?

ছোট্টু তার দৈনন্দিন কর্তব্য ভোলেনি। ভোরে সে কসাইখানার পাশে গিয়ে রোজকার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কঙ্কালসার কুকুরগুলোর হাড় আর চামড়া নিয়ে কামড়াকামড়ি দেখছে। গাড়ি বোঝাই জবাই-করা ছাল-ছাড়ানো ভেড়া বাজারে চলেছে। দুদিন উপবাসী ছোট্টুর জিব দিয়ে লালা ঝরে আর মনে মনে ভাবে আজ যত রাতই হোক রামলাল ঘরে ফিরলে সে জিজ্ঞাসা করবে : কাঁচা হাড় চামড়া খায় না বাবা?

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%