বিনয় ঘোষ
মানুষের সাহচর্য জীবনের একটা মস্তবড় লোভনীয় বস্তু হলেও সব সময় যে লোভনীয় নয়, একথা নিশ্চয়ই আপনার বহু দিন মনে হয়েছে। জীবনের প্রথম প্রেমের সময় প্রেমিকাকে যেমন সুন্দর মনে হয়, অসুখে ভোগার পর প্রথম পথ্যের দিন দূর থেকে গরম ভাতের থালাটিকে যেমন অপূর্ব মনে হয়, জীবনের সব সঙ্গি, বন্ধু, সহকর্মী বা সান্নিধ্যকামী মানুষকে আপনার তেমন মনে হয় না, হতে পারে না। আমি অবশ্য পাওনাদারের কথা বলছি না, কারণ আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে বাড়িওয়ালা, দুধওয়ালা বা মহাজনের মতো ‘centrifugal force’ বোধহয় আর কিছু নেই। যেমন, কোনো একটা রাস্তা দিয়ে হয়তো আপনি আপন মনে চলেছেন, এমন সময় হঠাৎ একটা জায়গায় এসে চমকে উঠলেন। তারপর দু-এক পা পিছু হটে, অ্যাবাউট টার্ন করে, এক মাইল ঘুরে আপনার গন্তব্য স্থানে পৌঁছলেন। কারণ, সামনেই সেই দোকানটা! আপনি ট্রামে বা বাসে বন্ধুবান্ধব নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছেন, সামনে দুটো সিট আগে দেখলেন সেই পাওনাদার হরিবাবু বসে রয়েছে। গাড়ি থেকে যে নেমে যাবেন তার কোনো উপায় নেই, কারণ বন্ধুবান্ধব আছে। তখন একবার ভেবে দেখুন, গাড়িটার মধ্যে, গোটা পৃথিবীর মধ্যে ওই একটা লোকের অস্তিত্ব আপনার কাছে কি ভীষণ অসহ্য, ভীতিপ্রদ মনে হয়। পথ চলতে চলতে হঠাৎ একটা বুনো জানোয়ারের সামনে পড়লে মানুষ বোধহয় এমনভাবে আঁতকে ওঠে না। অথচ লোকটার কোনো অপরাধই নেই, নেহাত নিরীহ লোক, শুধু হয়তো দেখা হলেই একগাড়ি লোকের মধ্যে দাঁত বার করে বলবে : 'নমস্কার কানাইবাবু! অনেকদিন হয়ে গেল, টাকাটার বড় দরকার ছিল। বাড়িতে আপনার দু-বার লোক পাঠিয়েছি।' আপনি তখন শশব্যস্ত হয়ে মিথ্যার ফুলঝুরি ছাড়বেন : 'অনেক দিন আমি কলকাতায় ছিলাম না। মানে, বাইরে গিয়েছিলাম, অসুখে ভুগলাম। মানে, এই তো দুদিন হল এসেছি। তা যাবখন একদিন, কখন থাকেন বাসায়? মানে, পরশুদিন সকালে যাব।...' ইত্যাদি।
এ তো আপনার পাওনাদার। পাওনাদার ইতিহাসে কখনো দৃষ্টিমধুর ছিল না। কিন্তু আপনার দূর-সম্পর্কের (নিকটও হতে পারে) আত্মীয়? সে তো আর পাওনাদার নয়? আপনার গ্রামে বাড়ি, সম্পর্কে খুড়ো, বয়সে অনেক বড় এবং আপনার বিশেষ শুভাকাঙ্ক্ষী। অনেকদিন পর হঠাৎ একদিন ট্রামে দেখা হয়ে গেল খুড়োর সঙ্গে। খুড়ো এক জোড়া জুতো, এক পোটলা কাপড় আর এক ঠোঙা খাবার নিয়ে রানাঘাটের লোকাল ধরতে যাচ্ছে। আপনি যাচ্ছেন অফিসে, যুদ্ধের বাজারে স্টিল কনট্রোলের হয়তো ইনস্পেকটর হয়েছেন আপনি। বেশ কাঁচা টাকা রোজগার করছেন, পরনে স্যুট, একজন অফিসারের 'পোজ' নিয়ে বসে আছেন। হঠাৎ পিছন থেকে 'কি রে হাবু? তুই?' ছোটোবেলায় আপনি হাবা ছিলেন, সব সময় হাঁ করে থাকতেন, গাল বেয়ে লালা গড়াত, চোখে পিচুটিসুদ্ধ ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকতেন, তাই আপনার আদুরে ডাকনাম হাবু। আজও বাড়িতে আপনার বুড়ো বাবা, ঠাকুমা ওই নাম ধরেই ডাকে। সুতরাং খুড়ো আপনার 'দীপক' নাম ধরে ডাকতে পারবে না। 'উরুশ্চারণই' হবে না। আপনি ঘড়ি ঘুরিয়ে একটু কাষ্ঠ হাসি হেসে নিশ্চয়ই দু-এক কথা বলে এড়াতে চাইবেন। যেমন বলবেন, 'কেমন আছেন? ভালো তো? সব খবর ভালো?' ইত্যাদি। কিন্তু শুভাকাঙ্ক্ষী খুড়ো শুভাশুভ সব খবর না দিয়ে ও নিয়ে কেন ছাড়বে? আপনি বসে আছেন সামনে ডানদিকের রোতে, খুড়ো বাঁদিকের রো-তে আপনার দুটো সিট পিছনে। ব্যাপারটা হল শুধু শোনা নয়, আপনাকে ঘাড় ঘুরিয়ে শুনতে হচ্ছে। তার ওপর অফিস-টাইম, বাদুড়ের মতো লোক ঝুলছে ট্রামে। এর মধ্যে খুড়োর খবরাখবর আরম্ভ হল, 'তোমরা তো আর খোঁজ নাও না। তোমার খুড়িমার বাতের ব্যারাম খুব বেড়েছে। পুকুর থেকে জল আনতে গিয়ে কিছুদিন আগে কলসি শুদ্ধু পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছে। বড় বিপদে পড়েছি, তার উপর আবার গর্ভবতী কি না, সেই জন্যে আরও ভয়। কলকাতায় এনেছিলাম। আর গ্রামে, লোকের যা দুঃখকষ্ট, বুঝলে? দেশের তো খবর নাও না। অমন সম্পত্তিটা তোমাদের বিক্রি হয়ে গেল। তোমার দাদাদের দিন খুব খারাপ যাচ্ছে, পরনের কাপড়চোপড় নেই, তোমার বউদি বলব কি, লজ্জায় তো কারও সামনে বেরুতে পারেন না। এ বছর ধান হয়নি। দুধ হচ্ছিল, তাও সেই শ্যামলা গাইটা মরে গেল, কাচ্চা-বাচ্চাগুলোর ভয়ানক কষ্ট...' ইত্যাদি। আপনি তখন প্রায় choked হবার উপক্রম, মানে, একগাদা লোকের সামনে খুড়ো আপনার family history সব গলগল করে বলে যাচ্ছে। ট্রামটা না-হয় খুড়োর চণ্ডীমণ্ডপ, কিন্তু আপনার ড্রয়িংরুম তো নয়, তাই আপনি কিছু বলতে কইতে পারছেন না। তারপর একটু দম নিয়ে খুড়ো যখন আবার শুরু করল (তখন আপনি হল অ্যান্ডারসনের দোকান পর্যন্ত পৌঁছেছেন) : 'হ্যারে হাবু, খাঁদিটার একটু খোঁজ খবর নিস?' খাঁদি মানে, আপনার বোন, নিজের বোন। খুড়ো বলছে : 'স্বামীটা তো একটা গেঁজেল মাতাল ছিল, হাড়েনাড়ে জ্বালিয়েছে। এখন এক পাল ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিধবা হল, কে দেখবে বল দিন?' আপনার দম বন্ধ হয়, ট্রামটা তখন condemned cell, এবং শুধু সেল নয়, তার মধ্যে যেন choking gas ছাড়া হয়েছে। আপনি এসপ্লানেডেই নামলেন, যাবেন ক্লাইভ স্ট্রিটে। এ কি আপনার দুর্ভাগ্য, না সৌভাগ্য? মনে রাখবেন, খুড়ো কিন্তু আপনার পাওনাদার নয়। এমন একটি খুড়োর সঙ্গে মাঝে মাঝে ট্রামে দেখা হলে কেমন লাগবে আপনার?
আপনি 'ক'-বাবুর সঙ্গে বিশেষ এক গুরুতর বিষয় নিয়ে আপনার বৈঠকখানায় বসে আলাপ করছেন। সেখানে আর কেউ নেই, থাকা উচিতও নয়। পাশে আপনার অন্য একটি বসবার ঘরও রয়েছে, সেখানে বসে কাগজপত্তরটা উলটিয়ে বেশ খানিকটা সময়ও কাটানো যায়। যখন আপনি 'ক'-বাবুর সঙ্গে গভীর আলোচনায় ব্যস্ত, সেই সময় আপনার এক পরিচিত ভদ্রলোক, বেশ বয়স্ক ও শিক্ষিত, ঘরে ঢুকলেন। ঘরে ঢুকেই বকর-বকর করে তাঁর বক্তব্য বলতে শুরু করলেন। যাঁর সঙ্গে আপনি আলাপ করছিলেন তাঁকে যেন তিনি দেখতেই পাননি এই রকম একটা ভাব মুখে। আপনি দু-একবার আপনার ঔদাসীন্য ও বিরক্তি হাবভাবে ব্যক্ত করলেন, কিন্তু ফল হল না। কেমন লাগে তখন আপনার এই শিক্ষিত ভদ্রলোকটিকে? এবং বাইরের সেই ভদ্রলোকের কাছেই বা তখন আপনার অবস্থা কী রকম হয়? সভ্য সমাজে চলেফিরে বেড়াবার মতো সাধারণ বোধশক্তি যার নেই, সেরকম বন্ধু সঙ্গী অনেক সময় নানাক্ষেত্রে অসম্ভব পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে। এমনকী, কায়মনোবাক্যে আপনি তখন তার বিলুপ্তি কামনা করবেন। করবেন না কি?
এগুলো হল দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কয়েকটা দৃষ্টান্ত মাত্র, আমাদের মতো আত্মসম্মান সচেতন, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের জীবনে প্রায়ই যা ঘটে থাকে। এছাড়া আরও মারাত্মক অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। মনে করুন, আপনি সে-জাতের লোক নন, যারা লক্কা-পায়রার মতো ঘাড় দুলিয়ে বক-বক-বকম-বকম করতেই ভালোবাসে এবং গাড়োয়ানি রসিকতা করে মনে করে নিজেকে একজন উঁচুদরের রসিক ব্যক্তি। রসিক লোকের সাহচর্য পাওয়া সত্যই দুর্লভ। রসিক লোকের সাহচর্য যে চায় না, শেক্সপিয়রের সংগীত-বেরসিকের মতো সেও খুন করতে পারে বলা চলে। কিন্তু মনে করুন আপনার কানের পাশে অনর্গল রসিকতার নামে সেকালের তরজাগান হচ্ছে এবং আপনার কানের ভিতর দিয়ে মর্মে সেই গান ছ-সাত ঘণ্টা ধরে প্রবেশ করছে। এর সঙ্গে চলছে আধুনিক Sexology, Philology, Criminology থেকে Politics, Economics, Astrophysics-এর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা। সদাগরি অফিসের একজন সামান্য কেরানি আপনি, অফিস ত্যাগ করে চলে যাবার উপায় নেই। আরও দুঃখের বিষয় এই যে, আপনিও কিছু লেখাপড়া শিখেছেন ও করেছেন এবং আলোচ্য বিষয়, তা সে যতই ‘nonsense’ হোক, আপনার শুনতে হচ্ছে। কেমন লাগে এরকম একটি অবস্থার মধ্যে জীবিকা অর্জন করতে? দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত এই শ্লেষ, বিদ্রুপ, রসিকতা ও আলোচনার বৈদ্যুতিক দীপ্তি, সুমধুর ঘণ্টাধ্বনি, আপনার চক্ষু-কর্ণকে যে কতদূর পীড়িত করতে পারে তা ভুক্তভোগী না হলে বুঝবেন না।
এরকম আরও নানা টাইপের লোক আছেন, যাঁরা জীবনের নানা ক্ষেত্রে বন্ধু ও সহকর্মীরূপে এসে আবির্ভূত হন। এই রকম বারোজনকে নিয়েই হয় বারোয়ারি। এঁদের ব্রেনের grey matter-এ পচন না ধরলে প্রাগৈতিহাসিক জীবের মতো এরকম বিসদৃশ ও অশিষ্ট ব্যবহার না করে নিশ্চয়ই শিক্ষিত ও মার্জিত রুচিসম্পন্ন মানুষের মতো এঁরা শোভন ও শিষ্ট ব্যবহার করতেন। তবু জানবেন, আপনার কোনো ভয় নেই। আপনি যেমন আছেন তেমনি চুপ করেই থাকুন। চারিদিকের অন্যায় ও অবিচার, জঘন্য মোসাহেবি ও ষড়যন্ত্র যদি আপনাকে অপমানিত করতে, অপদার্থ প্রমাণ করতে, দশজনের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করতে উদ্যত হয়, তা হলেও বসে থাকুন চুপ করে, জিত আপনার হবেই। কখনো ক্ষমা করবেন না এদের। ‘Lord, Forgive them, they know not what they do’— কাপুরুষের উক্তি। আপনার নীরবতার পিছনে এরকম কোনো মনোভাব যেন না থাকে। ‘Eye for an Eye, Tooth for a Tooth’-ই এ-যুগের একমাত্র ধর্ম। আপনার আপাত-নীরবতার পিছনে যেন এই সত্য জীবন্ত থাকে জীবনের প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু তবু বলছি, কম কথা বলবেন, কম তর্ক করবেন, কম প্রকাশ করবেন নিজেকে। কার্লাইল বলেছেন ‘Silence is golden.’ জানি, কার্লাইল চিররুগণ ছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁর ক্রনিক ডিসপেপসিয়ার জন্যে একথা বলেননি। আমি আপনাকে কার্লাইল-এর কথায় বলছি, চুপ করে থাকুন, কারণ ‘Philip will infallibly beat any set of men... going on raging from shore to shore with all this rampant nonsense...’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন