মধ্য-চিত্ত

বিনয় ঘোষ

চাঁদনি রাত। কৌটো থেকে পানের শেষ খিলিটা সদোক্তা মুখের ভিতর গুঁজে দিয়ে ছাতিটা বগলদাবা করে আমাদের পাঁচুদা অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল পথে। হিসাবে পাঁচ আনার গরমিল, মাগগি ভাতার দাবি নামঞ্জুর, হরিদার মিলিটারাইজেশন স্কিম'-এর গালভরা গল্প, বড়বাবুর ধমকানি— সব মিলিয়ে পাঁচুদার মনটা হয়ে আছে অতি-রগড়ানো পাতিলেবুর মতো তেতো। বিরক্তিতে মুখটা পাঁচের মতো কুচকে পাঁচুদা সিঁড়ি দিয়ে নামছে আর ভাবছে : স্কিমটা ভলান্টারি হলেও পঁচিশটাকা বেতনবৃদ্ধি, আর তার সঙ্গে মিলিটারি উপাধি 'নায়ক'— এ বড়ো নেহাত কম লোভনীয় নয়। তবে চব্বিশ ঘণ্টার নোটিসে যে কোনো জায়গায় চালান যেতে হবে এই যা। অর্থাৎ সরকারের 'সামরিক পরিকল্পনা'য় পাঁচুদার বেতন-বৃদ্ধি হবে মাগগিভাতাও মিলবে, তার উপর নামটা হবে 'নায়ক পাঁচকড়ি দত্ত'। বড়বাবু হবে 'কাপ্তেন'। বন্ডে প্রায় সকলেই সই করেছে, কয়েকজন মাত্র করেনি, তার মধ্যে পাঁচুদাও একজন। পাঁচুদা বলে, ভালো করে ব্যাপারটা স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করা উচিত, তারও তো একটা মতামত আছে। সামান্য কয়েকটা টাকার লোভে জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনা কি উচিত? পাঁচুদার তৃতীয়পক্ষের প্রগতিশীলা সহধর্মিণী কুমুদিনী দেবীও সেমি-মিলিটারাইজড, অর্থাৎ তিনি এ. আর. পি-র ওয়ার্ডেন। ওয়ার্ডেনের ডিউটি দিয়ে সভাসমিতি করে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে আহারান্তে অকাতরে রোজই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েন, বলি-বলি করে পাঁচুদার বলা হয় না কথাটা। অথচ গোনা দিন চলে যায়। আজ রাতে কথাটা পাড়তেই হবে।

ভাবতে ভাবতে পাঁচুদা ট্রাম স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল। রাত প্রায় এগারোটা। পাশের ফুটপাতে একটা বড়ো বাড়ির ঝুলবারান্দার তলায় একদল লোক চিৎপটাং হয়ে ঘোঁত ঘোঁত করে ঘুমুচ্ছে। দ্বাদশীর চাঁদের আলো এসে পড়েছে তাদের ধূলিমলিন, প্রায় উলঙ্গ দেহের উপর। একটা 'পাসিং শো' সিগ্রেট ধরিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আড়ালে সরে দাঁড়াল পাঁচুদা। ব্যাফলওয়ালের পাশ ঘেঁষে বসে কে একজন বিড়ি টানছে। পানের দোকান থেকে আর একজন খৈনি টিপতে টিপতে এগিয়ে এল সেইদিকে। ঘুমন্ত স্ত্রীলোকটির মাথার কাছে দাঁড়িয়ে খৈনিটা হাতে ঝেড়ে গুঁজে দিল মাড়ির ফাঁকে। স্ত্রীলোকটি অকাতরে ঘুমুচ্ছে হাত পা ছড়িয়ে, সর্বাঙ্গে আবরণ নেই বললেই হয়। কোলের শিশুটি একটি হাত মায়ের রুক্ষ চুলের সঙ্গে জড়িয়ে স্তন কামড়ে ধরে বুকের উপর যেন ঝুলে রয়েছে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার লিকলিকে ধড়টা ধুকছে। লোকটা এইবার পা দিয়ে ঠেলা দিচ্ছে স্ত্রীলোকটিকে। ব্যাফলওয়ালের পাশ থেকে কাশির শব্দর হল খকখক করে। স্ত্রীলোকটি ধড়ফড় করে উঠে শিশুটিকে বুকে করে একটা ভাঙা কলাই-করা থালা নিয়ে চলল লোকটার পিছু পিছু। কোমরের একফালি কাপড়ের উপর ফুট ফুট করছে জ্যোৎস্না, শীর্ণ শ্রান্ত মুখের উপর চাঁদের আলো পড়েছে। বাংলার মাতৃমূর্তি! বিশ্বরূপ দর্শনে হতভম্ব হয়ে পাঁচুদা একবার চাঁদের দিকে চেয়ে ভেংচি কাটল। ইচ্ছা হল বলে: 'যদি উঠতেই হয় বেহায়ার মতো, তা হলে মেঘের আড়ালে মুখ ঢেকে থাকতে পার নি?' পাঁচুদা এমনিতে ভিতু হলেও, ভাবুক লোক। ট্রামের আশা ছেড়ে দিয়ে পাঁচুদা পদভরসায় গৃহাভিমুখে যাত্রা করল। এর চেয়ে ব্ল্যাকআউট ভালো, শতগুণে ভালো। সভ্যতার এই উলঙ্গ মূর্তি, এই বিকৃত উপদংশ অন্ধকারে ঢেকে রাখাই ভালো। পাঁচুদার মাথায় চিন্তার মজলিস। বড়বাবু কি বাড়ই বেড়েছে! রেশনের চাল মেরে ব্যাবসা করে ব্যাটা ফেঁপে গেল, আবার কথায় কথায় লোককে ঘাড়ধাক্কা দেয়! কিচ্ছু টিকবে না বাবা, সব রসাতলে যাবে। একবার বাসুকি ফণাটি নাড়ুক! পাঁচুদা পা চালিয়ে গান ধরল

দুনিয়ার মাঝে বাবা সব হ্যয় ফাঁক,

বাবা সব হ্যয় ফাঁক।

ধনের গৌরবে কেন মিছা কর জাঁক,

বাবা মিছা কর জাঁক।

নারীর কোমল গাত্র, মদনের সুরাপাত্র,

তাহার উপর মাত্র, নয়নের তাক।

বসনে বিচিত্র সাজ, কাবায় রঙ্গিল কাজ,

শিরে দিয়ে বাঁকা তাজ, ঢেকে রাখ টাক,

দুনিয়ার মাঝে বাবা সব হ্যয় ফাঁক।

বর্তমানে পাঁচুদার এই হল জীবনদর্শন। কেউ পাঁচুদাকে 'সিনিক' বলেছে, 'পেসিমিস্ট' বলেছে, কিন্তু পাঁচুদা ভ্রূক্ষেপ করেনি। টাকের উপর ঘাসের চাপড়ার মতো চুলে একবার হাত বুলিয়ে পাঁচুদা তাদের নাকের ডগায় আঙুল নাচিয়ে জবাব দিয়েছে : 'বাপু হে! বয়স বাড়ুক, চল্লিশের উপরে যাও তখন বুঝবে!' পাঁচুদার থিওরি হল ‘Every man after forty is a cynic.’ কথাটা বলার ভঙ্গি পাঁচুদার আরও চমৎকার! পাঁচুদা বলে, 'কি জান? আদর্শবাদ হল ওই আঙ্গুর ফল। যৌবনে লাফঝাঁপ দিয়েও যখন তার নাগাল পাওয়া যায় না, তখন এই ‘grapes are sour’-সুলভ মনোভাবকেই বলে সিনিসিজম, প্রৌঢ়ত্বে পা দিলে মানুষের যা হতে বাধ্য। পাঁচুদার দর্শন তাই 'দুনিয়ার মাঝে বাবা সব হ্যয় ফাঁক!' যাক

পাঁচুদা হন হন করে চলেছে। রাত বারোটা বেজে গেল। শর্ট কাট করার ঝোঁকে পাঁচুদা ঢুকে পড়ল এক বাই-লেনের মধ্যে। শুধু দক্ষিণ দিকটা খেয়াল করে একেবেঁকে চলেছে পাঁচুদা, অচেনা গলি। হঠাৎ গলির একটা বাঁকে হট্টগোল শুনে পাঁচুদার চিন্তার তকলির সুতো গেল ছিঁড়ে। এগিয়ে গিয়ে ছাতাটা বগলে জোরে চেপে ধরে গলা বাড়িয়ে পাঁচুদা দেখল সার-সার লোক লাইনবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপার কী? রাত দুপুরেও চাল-ডালের ব্যাবসা! চোখটা একবার সার্চলাইটের মতো চারিদিকে ঘুরিয়ে নিল পাঁচুদা। রিকশায় গোরা সৈন্য বসে আছে, সারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিকশা। হঠাৎ সুতীব্র বামাকণ্ঠ শুনেই উপরে তাকিয়ে দেখল পাঁচুদা, সর্বনাশ! উপরের ঘর থেকে তরঙ্গায়িত তান শোনা যাচ্ছে, 'মোর হিয়া কেঁদে মরে!' আর তার সঙ্গে তবলার এলোপাথাড়ি বোল— তাক-তেরেকেটে তাক-গদি-ঘিনে-ধা! পাঁচুদার টাকের উপর কে যেন চাঁটি মারল, 'এই বেয়াকুফ! ভাগো হিয়াসে!' পাঁচুদা টেনে চম্পট দিয়ে গলির যেমুখ দিয়ে ঢুকেছিল আবার সেই মুখ দিয়ে সট করে বেরিয়ে গেল! বাপরে বাপ! গিলে হজম করে ফেলেছিল আর কি।

প্রকৃতিস্থ হয়ে পাঁচুদা ভালো করে বুঝল ব্যাপারটা। শ্রীভগবান এখন সর্বভূতে কিউ রূপে আবির্ভূত হচ্ছেন! এই কিউয়ের কি আর শেষ নেই! এখানেও কিউ! এখানেও আবার race superiority হিসেবে priority! কালে কালে হল কী? বাঙালি শ্রীরাধারাও আজ গোরাকৃষ্ণদের উদ্দেশে কাতর—

পিয়া জব আওব ই মঝু গেহে

মঙ্গল জতহু করব নিজ দেহে।

কনআ কুম্ভ করি কুচজুগ রাখি

দরপন ধরব কাজর দেই আঁখি।

বেদি বনাওব হম আপন অঙ্কমে

ঝাড়ু করব তাহে চিকুর বিছানে।

কদলি রোপব হাম গুরুয় নিতম্ব

আম্রপল্লব তাহে কিঙ্কিনি সুঝম্প।

বহুতাচ্ছা দুনিয়া! ভালোল্লাসে কথাটা বেরিয়ে এল পাঁচুদার মুখ দিয়ে। দুনিয়ার মাঝে বাবা সব হ্যয় ফাঁক!

পাঁচুদার দর্শনই সব জায়গায় ফলে যাচ্ছে। দরদর করে ঘামতে ঘামতে পাঁচুদা যখন ফিরল তখন রাত প্রায় একটা। ফিরে দেখল ঘর শূন্য, কুমুদিনী দেবী নেই। ভৃত্য বৃন্দাবন দরজা খুলে দেওয়ালে ঠেস নিয়ে দাঁড়িয়ে ঢুলছে। পাঁচুদা সহজে চটার লোক নয়। বৃন্দাবনকে জিজ্ঞাসা করল, 'গেল কোথায়?' বৃন্দাবন যা জবাব দিল তাতে আশার কিছু নেই। কে একজন বাবু মোটরে করে এসেছিল, মা রাত্রি নটার সময় তাঁর সঙ্গে বেরিয়েছেন। পাঁচুদা কথাটা শুনে ছাতিটা দুবার মেঝের উপর ঠুকে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। কাকস্য পরিবেদনা। এ. আর. পি.-র ওয়ার্ডেন কয়েকজন মোড়ে পায়চারি করছে বটে, কিন্তু ওরা কি খোঁজ রাখবে? থানা-পুলিশও একটা হাঙ্গামার ব্যাপার, তার উপর কেলেঙ্কারি! আধঘণ্টার মতো এধার ওধার ঘুরে ফিরল পাঁচুদা। তাজ্জব ব্যাপার! কুমুদিনী দেবী ইতিমধ্যে ঘরে ফিরে retire করেছেন। পাঁচুদা পাঁচের মতো মুখ করে ঢুকতেই তিনি বললেন, 'রেড সিগন্যাল পড়েছিল, স্টাফ অফিসারের সঙ্গে কনট্রোল-এ গিয়েছিলাম। তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ো, রাতে সাইরেন পড়তে পারে!' পাঁচুদার মুখে উত্তর জোগাল না, শুধু বুকটার মধ্যে 'গুঞ্জরিয়' উঠল : দুনিয়ার মাঝে বাবা সব হ্যয় ফাঁক!

ভাতের গ্রাস মুখে দিতে দিতে পাঁচুদা ডাকল : 'বৃন্দাবন!' বৃন্দাবনের নাক ডাকছে। পাঁচুদা আবার ডাকল : 'ও বৃন্দাবন!' 'বাবু!' বলে বৃন্দাবন ঠেলে উঠল। পাঁচুদা বলল: 'শোন! কাল একটা লাল বাতি কিনে এনে আমার ঘরে লাগিয়ে দিবি, বুঝলি?' বৃন্দাবন ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%