বিনয় ঘোষ
'হুপ' করে লাফিয়ে পড়ে রসিক চূড়ামণি হাফ-বাবুদের হাঁচড়ে গায়ের ছাল তুলে নিতে ইচ্ছে হয়েছিল— একথা আগে বলেছি; তাতে কেউ বলতে পারেন, এমন জাম্বুবানের প্রবৃত্তি আমাকে হঠাৎ পেয়ে বসেছিল কেন? এঁদের অতি-চেতন 'মনুষ্যশ্রেণিবোধকে' আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি, সঙ্গে সঙ্গে একথাও আবার স্বীকার করছি যে, মাঝে মাঝে এই ভদ্রসমাজে চলে ফিরে বেড়াবার সময় আমার প্রায়ই ইচ্ছে করে জৈবিক ক্রমবিকাশের কয়েক ধাপ নেমে এসে জাম্বুবান বা দানব হই। ছোটোবেলা বাপ-মায়ের শাসন মানিনি, ঘরছাড়া করে দেওয়ার বহু আগে নিজেকেই ঘরছাড়া হতে হয়েছে। কারণ তাঁদের উপহার দেওয়া ঠুলি কলুর বলদের মতো চোখে পরতে পারিনি। তাহলে হয়তো এতদিন হতচ্ছাড়ার মতো জীবন না কাটিয়ে ঠুলির ভিতর দিয়ে গোরুর মতো করুণ দৃষ্টিতে বাইরের পৃথিবীর দিকে চেয়ে আপনাদের এই সমাজের ঘানি ঘর্ঘর করে ঘুরিয়ে যেতাম। তা যখন পারিনি করতে তখন আর চোখ বুঁজে থাকার ফুরসত কোথায়? ইচ্ছেটা আমার সুস্থ নয় জানি, কিন্তু সমাজের সর্বাঙ্গ যখন উপদংশে ক্ষতবিক্ষত তখন টম্যাটোর মতো সুস্থ দেহ আর কচ্ছপের মতো সুস্থ মন নিয়ে সমাজে বাস করা চলে কি? অনেকে বলবেন, 'নিউরসিস'। মানি— 'নিউরসিস' কিন্তু 'নিউরসিসই' যে সমাজের 'নেমেসিস'। সমাজের বুকে আগুনের ফুলকি হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে, আর আমরা তার মধ্যে বাস করছি, ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছি বারুদের মতো মন নিয়ে। 'বার্স্ট' একদিন করতেই হবে, তা সে ঘরের বউ-এর বিরুদ্ধেই হোক, আর সমাজপতি রাষ্ট্রপতিদের বিরুদ্ধেই হোক। এমনি 'বার্স্ট' করার মুহূর্ত কত না আসে প্রত্যেকদিন, যেমন এসেছিল আমার সেদিন ওই 'কিউ'-এর সামনে।
গুনগুন করতে করতে সেদিন রাতে ঘরে ফিরে দেখি স্ত্রী আমার গরম তেলের মতো টগবগ করছেন। আর যাবি কোথা! শুকনো লংকা, অর্থাৎ আমি হাজির হতেই যা হবার এবং যা বলার নয় তাই হল। নিভন্ত উনুনের উপর ধ্যানমগ্ন ভাতের হাঁড়িটাকে দেখে করুণা হল, ভয়ও হল। তাড়াতাড়ি ফিরে মাসকাবারের জিনিসপত্তর এনে দেবার কথা ছিল আমার, স্রেফ ভুলে গিয়েছি। ঢক ঢক করে দু-গ্লাস জল খেয়ে পেটেতে দুটো পালোয়ানি থাবা মেরে শুয়ে পড়লাম পাটির উপর। স্ত্রীকে বললাম 'শতকরা ৯০ জনের মধ্যে আমরা মাত্র দুজন। ম্যাট্রিকে তো তোমার ম্যাথামেটিকস ছিল, জানো পার্সেন্টেজ কষলে ডেসিমেল পয়েন্টের পর কতগুলো শূন্য পড়বে? সুতরাং, দুঃখ কিসের?' স্ত্রীটির স্বভাবও ঠিক খড়ের আগুনের মতো, যেমন দপ করে জ্বলে ওঠে তেমনি খপ করে নিভে যায়। এর মধ্যেই মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। হাসতে হাসতে আমাকে তিনি শুনিয়ে গেলেন, 'পাশের ফ্ল্যাটে ওদের রান্নার পর উনুন খালি হলে রেঁধে নেব।' 'বহুতাচ্ছা' বলে আমি আমার ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে রইলাম। মাথার মধ্যে ভিমরুলগুলোর ভোঁ তখন রীতিমতো 'সিমফনি'তে পরিণত হয়েছে। চোখের সামনে, মাথার মধ্যে, দেওয়ালের গায়ে, কড়িকাঠে, এমনকী, স্ত্রীর মুখের উপর পর্যন্ত সেই 'কনট্রোল শপের' সামনের লম্বা 'কিউ'টা বারবার 'ফেড ইন' আর 'ফেড-আউট' করছে। অচেনা মূর্তির মিছিল। দড়ির এক প্রান্তে 'কনট্রোল শপ' আরেক প্রান্তে আদিম শূন্য— ‘vast multitude of stars are wandering about in space.’ একদিকে টাটার হাজার ফার্নেসের উত্তাপ নিয়ে অসংখ্য ঘূর্ণায়মান গ্রহনক্ষত্র, আরেক দিকে 'কনট্রোল শপের' সামনে দোকানদারের হাতে একঠোঙা চাল। উত্তাপ ক্রমে ঠান্ডা হতে হতে দেখালাম— জন্ম নিল জীবন (Life), এই পৃথিবী। তার পরে— কত পরে জীবজন্তু, মানুষ আর মানুষের এই সভ্যতা। হায়রে মানুষ! হায়রে সভ্যতা! এরই জন্যে এত বড়াই! ভুলে যেও না পদার্থবিদদের ‘Second Law of Thermodynamics’— দম দেওয়া ঘড়ির মতো ব্রহ্মাণ্ডের অন্তর্শক্তি (energy) ধীরে ধীরে কমে যাচেচ্ছ, একদিন ঘড়ির মতোই ব্রহ্মাণ্ড একেবারে স্থির হয়ে যাবে, গতির কোনো চিহ্ন থাকবে না তখন?
তখন আর কি? আমরা সবাই হয়ে যাব রেফ্রিজারেটারের দই, না-হয় আইসক্রিম সন্দেশ। রাবিশ! আরে, ঘাবড়াবার কি আছে? ঠান্ডা হলেই হল নাকি? আসলে থার্মোডাইনামিকসের সেকেন্ড ল-টা যখন পদার্থবিদদের মাথায় এসেছিল, তখন সমাজের অবস্থাটা কী? বাণিজ্য-বিপ্লবের (Industrial Revolution) পর সমাজে অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিরোধ ও সংঘাত এত তীব্র হয়েছিল, ‘Natural Selection’ এমনভাবে হাঁটু গেড়ে বসেছিল বৈজ্ঞানিকদের ও দার্শনিকদের মনে যে, পৃথিবীতে আবার যে কোনোদিন শান্তি আসবে তা কেউ কল্পনা করতেও পারেনি। ফলে সবক্ষেত্রেই, সাহিত্যে ও শিল্পকলায়, নৈরাশ্যবাদ ও অদৃষ্টবাদ ফুটে উঠেছিল এবং বৈজ্ঞানিকদেরও মাথায় এসেছিল ওই থার্মোডাইনামিকসের সেকেন্ড ল। অতএব মাভৈঃ! মানুষ ও জগৎ যেমন এগিয়ে যাচ্ছে তেমনি এগিয়ে যাবেই— মাঝে মাঝে আছাড় খেতেই হবে, ফ্র্যাকচারও হবে। তাতে কি ভয় পেলে চলে?
বৈজ্ঞানিকরা বলেন, জৈবিক ক্রমবিকাশের কাল হচ্ছে প্রায় একশো কোটি বছর। এখন আমার ওই দুশো গজ লম্বা 'কিউ' বা দড়িটাকে যদি এই একশো কোটি বছরের একটা ‘tape’ ধরে নিই, কিউয়ের প্রত্যেক গজ পঞ্চাশ লক্ষ বছর, তা হলে 'কিউ'-টাই হবে জৈবিক ক্রমবিকাশের ইতিহাস! 'কিউ'য়ের শেষে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বাসার সামনের কয়লাওয়ালার সহধর্মিণী। ওকে আমি চিনি, ওর নাম রুক্মিণী। আধাপাগলি রুক্মিণী থেকেই কিন্তু 'জীবনের' গুরু। এক ইঞ্চি কিউয়ের মধ্যে প্রায় চার হাজার জেনারেশনের আয়ু শেষ হচ্ছে। অর্ধাহার ও অনাহারে থেকেও রুক্মিণীর দেহের স্থূলতা এখনও যতখানি আছে, তাতে রুক্মিণীর দেহের প্রস্থ পার হতে কত জেনারেশন যে জন্মাচ্ছে মরছে তার ঠিক নেই। 'কিউ'টা রুক্মিণীর কাছ থেকে আরম্ভ হয়ে সোজা এসে শেষের দিকে একটু বেঁকে দুটো 'ব্যাফল ওয়ালের' মধ্যে দিয়ে দোকানের সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে। কোনো জীব-বৈজ্ঞানিক (সিভিক গার্ড নয়) যদি রুক্মিণীর কাছ থেকে 'কিউ' পর্যবেক্ষণ করতে করতে কনট্রোলের কাউন্টার পর্যন্ত যান তা হলেই তিনি জীবজগতের আগাগোড়া ইতিহাস বলে দিতে পারেন। এখন দেখা যাক আমাদের বৈজ্ঞানিক মশাই কী দেখছেন?
রুক্মিণী, জগত্তারিণী, হরিদাসী, হাবার মা, মানকের পিসি, এমনি করে একে একে সব চলে যায়। বাঁকের কাছ থেকে কনট্রোলের দোকানদারের গোল গোল চোখ আর লোমশ হাত দেখা যায়, অথচ জীবজন্তু বা চতুষ্পদ জন্তু পর্যন্ত কিছুই দেখা যায় না, দ্বিপদ মানুষ তো দূরের কথা। প্রায় 'ব্যাফল ওয়ালের' কাছ বরাবর পৌঁছলে তবে সর্বপ্রথম নজরে পড়ে পালকওয়ালা জীব অর্থাৎ ম্যামাল ও পাখি। তখনও ডাইনোসার সরীসৃপজাতীয় জীব হেঁটে যাচ্ছে কিউয়ের ধার দিয়ে। 'ব্যাফল ওয়ালের' মধে আধ-চ্যাপটা গণেশের ঠাকুমা-বুড়ির কাছে গেলে দেখা যায় বানর। দোকানের প্রায় আধ গজ দূরে, যেখান থেকে খেঁদির দিদিমা দোকানির বাপান্ত করতে করতে হাত বাড়াচ্ছে, সেখানেই দেখা যায় বিখ্যাত ‘missing link’ পিথিক্যানথ্রোপাস (Pithecanthropus)— অর্ধেক-বানর তার অর্ধেক-মানব। কাউন্টারের সামনে ঘর্মাক্ত কলেবর রক্তচক্ষু হেমাঝির হাতের বাইসেপের কাছে দেখা যায় কুঁজো নিয়ানডার্দাল মানুষ, (Neanderthal Man) উঁকি মারছে। ঠিক আমরা যে-জাতের মানুষ, অর্থাৎ ‘Homo Sapiens’ বা 'বুদ্ধিমান মানুষ', সে-জাতের মানুষ কিন্তু 'নিয়ানডার্দাল ম্যান' নয়। বুদ্ধিমান মানুষের প্রথম চেহারা দেখা যায় হেমাঝির আগুনে পোড়া কবজির কাছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ, অর্থাৎ যাযাবর ও আদিম শ্রেণিহীন জীবন থেকে আরম্ভ করে রোম সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন পর্যন্ত ইতিহাস হেমাঝির হাতের তেলোতেই শেষ হয়ে গিয়েছে। হেমাঝির হাতের আঙুল মধ্যমার গোড়াতে আমেরিকা আবিষ্কৃত হল। কোপার্নিকাসের থিওরি অনুযায়ী মানুষ প্রথম চেয়ে দেখল এই বিরাট পৃথিবীর দিকে আর পৃথিবীর তুলনায় নিজের ক্ষুদ্রত্বের দিকে। মধ্যমার দ্বিতীয় রেখা পর্যন্ত পৌঁছতে দূর থেকে প্রথম শোনা গেল বাণিজ্য-বিপ্লবের (Industrial Revolution) কলরব, যন্ত্রের শব্দ। মানুষের জীবনযাত্রায়, সমাজব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এল। মধ্যমার তৃতীয় রেখার কাছে বাণিজ্য-বিপ্লবের প্রতিযোগিতায় Competition) ও প্রতিক্রিয়ায় ক্ষতবিক্ষত সমাজকে সমাজবিজ্ঞানী ডারউইন প্রথম শোনালেন জীবজগতের ক্রমবিকাশের কথা, মানুষের সভ্যতার নিষ্ঠুর ইতিহাস ‘Survival of the Fittest’ অর্থাৎ রাজনীতিকের ব্যাখ্যায় 'জোর যার মুলুক তার' বাণী। ক্রমবর্ধমান যন্ত্রসভ্যতা ও ধনতান্ত্রিক সমাজের কাছে এ-বাণী নিষ্ঠুর হলেও মধুর বাণী, সাম্রাজ্যতন্ত্রের ইতিহাসের দীক্ষামন্ত্র। ডারউইনের এই অবদান জীববিজ্ঞানের ও ক্রমবিকাশের চিরদিনের রহস্যলোক আলোকিত করে দিল। তারপর কি?
তারপর আমাদের হেমাঝির মধ্যমার ডগা ট্যাংরা মাছের কাঁটা ফুটে বিষিয়ে পুঁজরক্তে ফুলে উঠেছে। চিরে বিষ বার করে না দিলে স্বস্তি নেই, শান্তি নেই। সেই আঙুলের ডগায় বসে পাকা দাড়িওয়ালা কার্ল মার্কস মানুষের সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাস ব্যাখ্যা করে বললেন, 'ভয় নেই, সমাজ ও সভ্যতা চির-প্রগতিশীল, তবে মসৃণ বা যান্ত্রিক নয়। ক্রমবিকাশের পথের বাঁকে বাঁকে বিপ্লব, এক বাঁক থেকে আর এক বাঁক অগ্রগতি।' মানুষ প্রথম শুনল অভয়বাণী। প্রথম বুঝতে চেষ্টা করল যে, সে একদিন রেফ্রিজারেটরের দইয়ের মতো ঠান্ডা হিম হয়ে যাবে না। মানুষই তার সমাজ ও সভ্যতার স্রষ্টা ও কর্তা। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, কর্মের চাপে কর্তার সত্তার রূপান্তর।
কিন্তু হেমাঝির ফোলা আঙুলের ডগাটা আজও বিষিয়ে টাটাচ্ছে, অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। সার্জেনের অপটুতার জন্যে অস্ত্রোপচার অনেকবার ব্যর্থ হয়েছে, যেমন, গত মহাযুদ্ধের পর হয়েছে ইউরোপে, আবার আংশিক সফলও হয়েছে কোথাও দক্ষতার জন্যে, যেমন, বিশাল 'ইউনিয়ন অফ সোশ্যালিস্ট সোভিয়েট রিপাবলিকসে।' কিন্তু বদরক্ত আজও জমে আছে অনেকখানি। হেমাঝি মুখ ফুটে বলতে পারেনি : 'আঃ বাঁচলাম!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন