মা গো! বাঁচিয়ে দে—

বিনয় ঘোষ

প্রবাদ আছে, সতীর বাম কনুই ফুঁড়ে উঠেছেন চতুর্ভুজা পিতলের মা মঙ্গলচণ্ডী। পাশেই রয়েছেন কালো তেলচুকচুকে কষ্টিপাথরের ভৈরব নটেশ্বর। বেলপাতা, দুধ আর গঙ্গাজলের মধ্যে গা-ঢাকা দিয়ে নটেশ্বর পাথুরে চোখ বুজে বসে আছেন। মন্দিরের সামনে ছোট্ট জনতা। আধ-বসনা, মলিনা, লজ্জাবনতা মায়েরা, শুকনো মুখ, রুক্ষ্ম চুল, কোলে হাড়-লিকলিকে শিশু। চোয়াল-উঁচু, চোয়াড়, রূঢ়শ্রী পুরুষের দল, এক চোখে তাদের আগুন, আর একচোখে ভয়। ঘোলাটে-চোখো, নতপিঠ বৃদ্ধবৃদ্ধা, সর্বাঙ্গে তাদের আতঙ্ক।

শনিমঙ্গলবারের গভীর রাতে মা মঙ্গলচণ্ডীকে সকলে মন্দিরের সামনে করজোড়ে দাঁড়িয়ে ডাকে 'মা, মা' বলে। নটেশ্বরের মাথায় বিল্বপত্র আর গঙ্গাজল ঢেলে বলে, 'বাবা নটেশ্বর, অভয় দাও বাবা।' গ্রামের এই মন্দিরে ভৈরব নটেশ্বরের পাশে মা চণ্ডী পাঁচশ বছরের বেশি অধিষ্ঠিতা রয়েছেন। বর্গীরা এল, নবাবরা একে একে এল গেল, গঙ্গার বুক বজরায় ভরে গেল, ঘোড়ার পিঠে চড়ে খট খট করে কোন দেশের বণিকরা এল কটা-চোখো, লাল-মুখো, বিধর্মী, ম্লেচ্ছ। কত হাজার হাজার লোকের সুখদুঃখ কান্নাহাসি, সাধনভজন, জন্মমৃত্যু নটেশ্বর ও মঙ্গলচণ্ডী দেখলেন, শুনলেন, একটুও নড়লেন না। তবু সবাই হেঁট হয়ে মেনে নিল, তাদের পিতলের মায়ের প্রাণ আছে, কষ্টিপাথরের নটেশ্বরবাবার পাথুরে বুক তাদেরই মতো ধুকধুক করে।

আজ শনিবার। দুপুর রাতে গাঁ-সুদ্ধু সকলে এসে জড়ো হয়েছে মন্দিরে। ছেলেবুড়ো, মেয়ে-পুরুষ সকলে। লণ্ঠন নেই, লাঠি আছে হাতে। আলো নেই, তেল নেই। গাছের শুকনো পাতা জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে সকলে মুখ দেখছে মা মঙ্গলচণ্ডীর, আর পৌষের রাতে আগুন পোহাচ্ছে। দূরে দলছাড়া হয়ে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে কেলো, চোরের মতো। গোলা-বারুদের কারখানায় কাজ নিয়েছে কেলো, গাঁয়ের সকলের গায়ের জ্বালা, বলে 'কেলোর এবার মরার পাখনা উঠেছে।' কেলোর বুড়িমা দুবেলা এসে মঙ্গলচণ্ডীর কাছে মানত করে যায়— 'আধখানা পাঁঠা দেব মা, কেলোর সুমতি দাও'।

হাফপ্যান্ট পরে কেলো মাঝে মাঝে গাঁয়ে সকলের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। স্টিলের হেলমেটটা একটু বেঁকিয়ে কোমরে হাত দিয়ে শ্রোতাদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে: 'বলি করকমের বোমা আছে জানো তোমরা, হ্যাগা?' একজন মুখ-ঝটকা দিয়ে ওঠে : 'যা, ফুটানি মারিস নে কেলো,— ভারি আমার যুদ্ধু ফেরত কাপতেন রে—'। ভ্রুক্ষেপ না করে কেলো বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে বলে : 'কলা জানো। বলে যাচ্ছি, হাত গুণে যাও— এক আগুনে বোমা, দুই ফসফস বোমা, তিন বিষফোঁড়া বোমা'— সকলে হো-হো করে হেসে ওঠে। কেলো কিন্তু দমবার পাত্র নয়, বলতে বলতে হাঁফিয়ে ওঠে— যুদ্ধের কথা, কারখানার লক্ষ লক্ষ গোলার কথা, বড়ো বড়ো কামান বসানোর কথা, সেপাইসামন্তের কথা, বোমার কথা। রাতে কেলো প্রতিবেশীর দরজায় গিয়ে ডাকে : 'পাঁচুখুড়ো বাড়ি আছ নাকি, ও খুড়ো!' দরজা খোলে, খুড়ো নয়, খুড়ি। সামনে দাঁড়ানো কেলোর আপাদমস্তক একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে খুড়ি ঝাঁঝিয়ে ওঠে : 'আ-মরণ, আবার ধরাচূড়ো পরে এসেছেন— দরজার ঝনকাঠ পেইরেছিস কি ঠ্যাং বেড়িয়ে ভেঙ্গে দেব, দূর হ, দূর হ!' কেলো বলে : 'বাপরে বাপ— গরম তেলে লঙ্কা ফোড়নের মতো চিড়বিড় করে ওঠো কেন খুড়ি? শোনোই না, বলি ঘরের পাশে গর্ত কেটেছো, যারে বলে সিলিট টেরেঞ্চ?' খুড়ি বলে : 'কেন রে ড্যাকরা, মোছলমানের মতো গোর আমি দেব কেন? বালাই ষাট— বোমাই দেবে, হেঁদুমোছোলমান সবাইকে একত্তর গোর দেবে, দাঁড়াও— তখন তোমার মঙ্গলচণ্ডী আর লটেশ্বর কেমন ঠেকায় দেখব।' 'দূর হ হতচ্ছাড়া, দূর হ বলে তেড়ে আসে খুড়ি। 'মঙ্গলচণ্ডী ছেড়ে গর্ত কাট খুড়ি, এ তোমার ভল্লুকে জ্বর নয়, মঙ্গলচণ্ডীর সাধ্যি নেই বাঁচায়—', বলতে বলতে কেলো অদৃশ্য হয়ে যায়।

এমনি করে কেলো সারাটা গ্রাম ক'মাস ধরে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাচ্ছে। কয়েকজন তরুণ জেলে-নাপিত-কুমোর-চাষির ছেলে তার দলে ভিড়েছে, বাকি সকলে উঠতে-বসতে কেলোর মুণ্ডুপাত না করে জল খায় না। মা মঙ্গলচণ্ডীর মন্দিরে মাথা ঠুকে ঠুকে কেলোর মার কপালে কালচিটে পড়ে গেল, কেলোর সুমতি দিল না মঙ্গলচণ্ডী। 'যমের অখাদ্য' কেলো দাঁত বার করে খিল খিল করে হাসে, আর গাঁয়ের সকলে তেলেবেগুনে চটে যায়।

আজ গাঁ-সুদ্ধু সকলে এসেছে মা মঙ্গলচণ্ডীর মন্দিরে। কেলোও এসেছে সকলের সঙ্গে। গত রাত্রির সাইরেনের কথা মনে পড়ছে। এতদিন পরে সত্যিকার সাইরেন, শহরতলিতে বোমা পড়েছে। রাখালের পালে বাঘ পড়েছে, কেলো ভাবে আর বুক দুর-দুর করে ভয়ে। আজ সব ভুলে গিয়ে কেলো মঙ্গলচণ্ডীর পিতলের চকচকে মুখের দিকে চেয়ে মনে মনে সকাতর প্রার্থনা জানায় : 'মাগো, বাঁচিয়ে দে মা!' মন্দিরের সামনে কেলোর মা মাথা হেঁট করে উবু হয়ে রয়েছে। মন্দিরের চারিদিকে মাঝেমাঝে ছেলেমেয়ে-বুড়ো সকলে সমস্বরে 'মা, মা' বলে চেঁচিয়ে উঠছে। মন্দিরের ভিতর মা মঙ্গলচণ্ডীর সামনে যোগাসনে ধ্যানমগ্ন ভুবনঠাকুর গা-ঝাড়া দিয়ে 'মা, মা' বলে ডাক দিয়েছেন। আশপাশের গাছপালা কেঁপে উঠল। ভুবনঠাকুর ভিতর থেকে হাত ইশারা করলেন ঢাকিদের। জনতা হাঁক দিল, 'ঢাক বাজাও'।

ঢাকের আওয়াজ আর মা, মা শব্দ ভেদ করে কেলোর বিকট চিৎকার শোনা গেল: 'ঢাক থামাও।' থমকে দাঁড়াল জনতা, থেমে গেল ঢুলির কাঠি, ভুবনঠাকুরের আরতির ঘণ্টা হাতে আড়ষ্ট হয়ে রইল। কেলো প্রাণপণে চিৎকার করছে : 'ফিরে যাও সব, ঘরে যাও। বোবা জনতা অবাক হয়ে দেখল একবার আকাশের দিকে। চারিদিক আলোয় আলো, ফুটফুটে জ্যোৎস্না উঠেছে, কখন কেউ জানে না।

গত রাত্রির মতো কাছের গোলাবারুদের কারখানা থেকে, থানা থেকে, শহরতলির চারিদিক থেকে রাতের নিস্তব্ধতা চিরে সাইরেন বাজল। করুণ একটা কান্নার সুর ঢেউয়ের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে আকাশে-বাতাসে। যেন কোনো দানবের বুকে বল্লম বিঁধেছে, আর্তনাদ করছে দানব।

ভীত, সন্ত্রস্ত, পলায়মান জনতার হল্লার মধ্যে শোনা গেল কেলোর মা চেঁচিয়ে ডাকছে: 'ও কেলো, কেলো, ফিরে আয় বাবা!' দূর থেকে কেলোর গলা শোনা গেল: 'ঘরে যাও, এ-আর-পি ইসটিশনে যাচ্ছি।' ভুবনঠাকুর মন্দিরের ভিতর থেকে হেঁকে বললেন : 'ফিরে যাও সব, ভয় নেই— আমি মন্দিরেই থাকব, মায়ের পুজো বন্ধ হবে না।'

মাঠের উপর দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে পাঁচুখুড়ো পাশের হিরু নাপিতকে জানিয়ে দিল : 'হা অন্ন! হা বস্তর! তার ওপর আকাশ থেকে আগুন বৃষ্টি, এবারে কলির শেষ হিরু ভাই, পাঁজিতে সব লিখে দিয়েছে—। কেলোর মার ডাক তখনও শোনা যাচ্ছে : 'ও কেলো, কেলো—'

দানবের বুকফাটা কান্না থেমেছে অনেকক্ষণ।

বোঁ-ওঁ-ওঁ শব্দ হচ্ছে দূরে, বহুদূরে, মাথার উপর। বোঁ-ওঁ ওঁ-ওঁ। গাছের পাতা পর্যন্ত নড়ে না।

'মা মঙ্গলচণ্ডী, মাগো, বাঁচিয়ে দে'— গলা ভাঙা, কাঁপছে, মুখ সাদা, হাত-পা হিম। গুম গুম শব্দ হচ্ছে আকাশে। উড়ন্ত দানবের পাখার শব্দ। দুম-দুমদাম দমদুম—

মাটি কেঁপে উঠল। চালাঘর, গাছপালা থর-থর করে কেঁপে উঠল। গোরু-বাছুর-ছাগল-মানুষের হঠাৎ ভয়ার্ত চিৎকারে এক-একবার নিস্পন্দ নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আবার সব ঠান্ডা, খুব দূরে গুম-গুম-গুম শব্দ, সব হিম, অসাড়।

মন্দিরের চারিদিকে গ্রামের ছেলেমেয়ে-বুড়োদের ভিড় জমেছে। পাঁচশো বছরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর মন্দির ধুলোয় গুড়িয়ে গিয়েছে। মা মঙ্গলচণ্ডীর পিতলের মুখ, হাত-পা, দেহ দুমড়ে বেঁকে পড়ে রয়েছে একদিকে, আর-একদিকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ঝলসানো ভুবনঠাকুরের বীভৎস দেহ। বাতাসে বিষের গন্ধ। নটেশ্বর দশ হাত এক ডোবার তলায় কোথা দিয়ে পাতালে প্রবেশ করেছেন। ডোবা থেকে কুণ্ডলি পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে আকাশে।

জনতার ভিতর থেকে কে একজন চেঁচিয়ে উঠল, 'মা নেই'। কথাটা চাবুকের মতো লাগল বুকেপিঠে, শিউরে উঠল সকলে। আর একদল বললে : 'আমরা আছি'। মা, মা, শব্দে ফেটে গেল চারিদিক।

দূর থেকে দৌড়ে আসছে, ও-কে? কাঁদতে কাঁদতে? কেলোর মা, হাতের মুঠোয় কেলোর ছিন্নমুণ্ড। আঁৎকে উঠল সকলে।

থানার দারোগা, পুলিশ, এ-আর-পি ওয়ার্ডেনরা একদিকে দাঁড়িয়ে আছে। দৌড়ে এসে চুলের ঝুঁটিসুদ্ধু কেলোর ছিন্নমুণ্ডটা তুলে ধরে বুড়ি হাঁউমাঁউ করে কেঁদে উঠল— 'বাঁচিয়ে দাও দারোগাবাবু, আমার কেলোর ওষুধ দাও'। বুড়ির দিকে একবার ফিরে দারোগাবাবু মাটিতে পা-ঠুকে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লেন। একজন ওয়ার্ডেন বলল : 'এ-আর-পি স্টেশন যাবার পথে প্লিন্টারে দুটুকরো হয়েছে'।

কেলোর মা উদভ্রান্তের মতো ছুটে গেল মন্দিরের দিকে। মন্দির নেই। ঝলসানো দুমড়ানো পিতলের মা মঙ্গলচণ্ডী পড়ে রয়েছে দূরে। আছড়ে কেঁদে পড়ল কেলোর মা : 'মাগো, বাঁচিয়ে দে'—

দারোগার ইশারায় জমাদার কেলোর ছিন্নমুণ্ড বুড়ির হাত থেকে ছিনিয়ে ফেলে দিল দূরে। দারোগাবাবু নোটবই বার করে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন : 'তোর ছেলের নাম কি বুড়ি?' পাঁচুখুড়ো তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললে : 'নাম কেলো'। 'ড্যাম কেলো'— দারোগাবাবু বললেন, 'পদবি কী?'

পাঁচুখুড়ো একবার সকলের মুখের দিকে চেয়ে দারোগাবাবুর দিকে ফিরে বলল : 'পদবি?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, পদবি—'

পাঁচুখুড়ো ভড়কে গিয়ে বললে : 'আমাদের কেলো—'

চারিদিকের 'মাগো, বাঁচিয়ে দে' কান্নার শব্দের মধ্যে দারোগাবাবু মুখ ভেংচে বললেন: 'স্টুপিড'।

১৯৪৩
সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%