বিনয় ঘোষ
একবার ঢাকায় এক সম্মেলনে অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা বিজ্ঞান সম্বন্ধে আলোচনা-প্রসঙ্গে তাঁর নিজের গবেষণার বিষয়টি যতদূর সম্ভব সরলভাবে সকলকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর বক্তৃতা শেষ হবার পর জনৈক শিক্ষিত ভদ্রলোক (স্থানীয় আদালতের একজন প্রবীণ উকিল) তাঁকে উঠে বলেন : 'আরে মশায়, বকরবকর তো অনেক কিছুই করলেন, তা গবেষণাডা হইল কি? ব্যাবাক তো আমাগো ব্যাদেই আছে।' সাহা মহাশয় তাঁকে সবিনয় অনুরোধ জানান, বেদের কোনখানে আছে বলতে। ভদ্রলোক রেগে টং হয়ে সাফ জবাব দেন, 'ব্যাদ আবার পড়ুম কি মশয়, শুনছি—।' বেদ ও বৈদিক যুগের পর যে পৃথিবীর মানুষ ও সমাজ এগিয়েছে একথা আমাদের দেশের শতকরা নব্বুই জন শিক্ষিত লোক আজও বিশ্বাস করেন না। এটা আমার হঠোক্তি নয়, খাঁটি সত্য সম্বন্ধে খেদোক্তি। প্রমাণ করতে হলে এখানে অনেক স্বনামধন্য বিদ্বান 'লৌহ-ভীমের' কথা উদ্ধৃত করতে পারি, কিন্তু যেহেতু এ-রাজত্বে অনেকে সিংহাসনের উপর বসে আজও ঈশ্বরের কৃপায় ইতর ও মূর্খদের বিদ্যা বিতরণ করছেন তাই আপাতত নাম প্রকাশের কেলেঙ্কারি থেকে তাঁদের রেহাই দিলাম।

প্রবীণ উকিলের কথা শুনে হঠাৎ মনে পড়ল আমার বুড়ি তালুইমা আর বুড়ো বিকল-মালির কথা। একবার আমার তালুইমাকে কোনো অনিবার্য কারণে পালকি ছেড়ে ট্রেনে চাপতে হয়েছিল, সঙ্গে ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র অর্থাৎ আমার বড় দাদামশাই অম্বিকাচরণ। তালুইমা তো কিছুতেই ট্রেনে উঠবেন না, অনেক কষ্টে তাঁকে চ্যাংদোলা করে তোলা হল কামরায়। ট্রেন হুস হুস করে চলতে লাগল। তালুইমা কামরার দুদিকের ধাবমান গাছপালা, মাঠ, মানুষ, গোরুর দিকে ফ্যালফ্যাল করে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে দাদামশাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদু কাঁদু হয়ে বললেন : 'ও অম্বু! মানষিতি না, গরুতি না, একি ভূতি ওড়ায় নে যাচ্ছে?' দাদামশাই গম্ভীর স্বরে জবাব দিলেন : 'হু— যাচ্ছে তো হইছে কি?' তালুইমা আর থাকতে না পেরে বললেন : 'ন্যামে পড় ন্যামে পড়, কোন বাদাড়ে নিয়ে গিয়ে ফ্যালবানে—'। হাসবেন না, তালুইমা শিক্ষিতা নন। তিনি যখন বধূবেশে শ্বশুরালয়ে আসেন তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় হামাগুড়ি দিচ্ছেন, বর্ণপরিচয় বা বোধোদয় লেখা আরম্ভ করেননি। এ-তো গেল তালুইমার কথা। এবারে বিকল-মালির কথা বলি। আমাদের মামাবাড়ির বহু পুরাতন মালি-বিকলমিয়াকে আমরা দেখা হলেই বলতাম : 'বিকল, একবার কলকাতা ঘুরে এল, দুকুড়ি টাকা হলেই হবে!' গ্রাম ছেড়ে বিকল জীবনে বাইরে যায়নি, কলকাতা একবার ঘুরে আসবার সখ ছিল খুব। বিকলের একটা কথাই ছিল, 'কলকাতা যে না গেছে সে মায়ের গর্ভেই আছে।' আমরা ভাইবোন মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিকলকে কলকাতার আজব গল্প শোনাতাম, কারণ না শুনিয়ে উপায় নেই, বিকল কাজ সেরে সন্ধ্যার পর এসে বলত, 'দাদু, শহরের গল্প শোনাও—' আমরা শোনাতাম : হাজার হাজার মটর পিঁপড়ের মতো সার বেঁধে চলেছে, বড়ো বড়ো দোতালা-তেতালা বাস, ইলেকট্রিক আলো জ্বলছে, পাখা ঘুরছে, বিশতালা, পঁচিশতালা বাড়ি, কলের পালকিতে লোক উঠছে নামছে, হোটেল-হাসপাতাল স্কুল-কলেজ— এলাহি কাণ্ডকারখানা, আর সে রাস্তা কি? বড়ো বড়ো দালানবাড়ির মেঝের মতো চকচক করছে, তার উপর দিয়ে ছোটো ছোটো রেলগাড়ির মতো চলছে ট্রামগাড়ি, ইঞ্জিনে নয়— বিদ্যুতে। শহরের এক জায়গায় গানবাজনা, থিয়েটার বক্তৃতা হচ্ছে, আর লক্ষ লক্ষ লোক ঘরে বসে তাই শুনছে। মেয়েরা ঘোমটা দিচ্ছে না, বোরখা পরছে না, দৌড়ঝাঁপ করছে, হাসছে, খেলছে, সাঁতার কাটছে, চাকরি করছে অফিসে, ছেলেদের সঙ্গে পথেঘাটে কথা বলছে, মেমসাহেবেরা পুরুষদের হাত ধরে ঝাকুনি দিচ্ছে, কোমর জড়িয়ে ধরে ছেলেমেয়েরা চলছে পথের উপর দিয়ে—।' বিকলমিয়ার পাকা দাড়ির মধ্যে ঠোঁট দুটো ধীরে ধীরে ফাঁক হয়ে যেত, সাদা ভ্রূজোড়ার তলায় চোখ দুটো আসত স্থির হয়ে। তখন ভাবতাম তালুইমা, বিকলমিয়া, এরা সব জংলি ভূত, বেচারি! জ্ঞান হতে আজ বুঝতে পারছি উপরোক্ত শিক্ষিত উকিল মশাইয়ের শ্রেণির লোকের চাইতে আমার তালুইমা, বুড়ো বিকলমিয়ার শ্রেণির লোক অনেক বেশি 'প্রগ্রেসিভ'। কারণ তারা তাজ্জবকে তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দেয়নি, বলেনি 'ব্যাদে আছে, কোরাণে আছে।' তারা কান পেতে শুনেছে মানুষের বৈজ্ঞানিক অভিযানের কথা, বুঝেছে তাদের যুগ আর নেই, সরলভাবে বিশ্বাস করেছে মানুষের ক্ষমতাতে, বিজ্ঞানের ঐন্দ্রজালিক শক্তিতে। তারা মাদুলি আর মামদো ভূতে বিশ্বাস করলেও উড়োজাহাজ আর বৈদ্যুতিক আলোকে আলাদা করে দেখেছে, স্বীকার করে নিয়েছে শেষের দুটো মানুষেরই জ্ঞানের আবিষ্কার, প্রকৃতির ঘাড়ে মামদো ভূতকে চাপায়নি, বলেনি বিজ্ঞান বুজরুকি ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে বিজ্ঞান পুরোনো ভূতের গল্প নূতন কায়দা করে বলা।
আমাকে কে শোনায় তার ঠিক নেই, আমি একদিন বিকলমিয়াকে বিজ্ঞানের গল্প শুনিয়েছি মনে হলে আজ হাসি পায়। এইচ. জি. ওয়েলস বা আলডুস হাক্সলির 'ফ্যানটাজিয়া' বাদ দিলেও যদি আজ বিজ্ঞানের সাধকদের কাছে গিয়ে একঘণ্টা দাঁড়াতে হয় তা হলে যা গল্প তাঁরা শুনিয়ে দেবেন তাতে আমি কেন, অনেককেই বিকল মালি বনে যেতে হবে। কেউ বলবেন, 'কয়লা আর তেলই তো এতদিন সবকিছুর শক্তি জুগিয়েছে, কিন্তু কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই পৃথিবীর কয়লা আর তেল উজাড় হয়ে যাবে, তখন হবে কী? জল আছে কিন্তু সব জায়গায় বা সব সময় জল প্রচুর পাওয়া যায় না। বাতাস আছে। বাতাস থেকে শক্তি নিয়ে জমিয়ে রাখতে হবে, বড়ো বড়ো উইণ্ডমিল থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি গোটা দেশে সরবরাহ করতে হবে। আমরা এখন সেইদিকেই নজর দিচ্ছি, কারণ পৃথিবীর কয়লা ও তেল ফুরিয়ে এল!' কেউ বলবেন, 'কাঁচা লোহা ও কাদা (clay) কীভাবে আরও কাজে লাগানো যায় তারই চেষ্টা করছি আমরা। কাদার মধ্যে ২৪% অ্যালুমিনিয়াম আছে। একদিন যেমন লোহা ও ইস্পাত ব্রোঞ্জ ও ফ্লিন্টের আধিপত্য কেড়ে নিয়েছিল তেমনি ভবিষ্যতে অ্যালুমিনিয়াম লোহা ও ইস্পাতের আধিপত্য না কাড়তে পারলেও অন্যান্য ধাতুর মধ্যে যে সে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।' কেউ বলবেন, 'মানুষ অধিকাংশ খাদ্য পেয়ে থাকে গাছপালা থেকে, কিন্তু গাছপালা প্রায়ই তার শর্করাভাগ সহজ পাচ্য স্টার্চে পরিণত না করে, করে সেলুলোজে পরিণত। সেলুলোজ হজম হয় না সহজে। পেটের মধ্যে ব্যাকটেরিয়ার চাক থাকার দরুন মানুষ বেঁচে যায়। আমরা তাই রাসায়নিক উপায়ে সিনথেটিক ফুড তৈরি করার চেষ্টা করছি। মানুষের অধিকাংশ খাবার আরও সরল উপায়ে তৈরি করা যায়, এমনকী প্রোটিন পর্যন্ত। কয়লা এবং নাইট্রোজেন থেকে আমরা খাবার তৈরি করতে পারি। শুধু তাই নয়, এত বড়ো পৃথিবীর সর্বত্র খাবার ব্যবস্থা করার দরকার হয় না। যে কোনো ছোটো একটা রাষ্ট্রে বা প্রদেশে আধুনিক বৈজ্ঞানিক উপায়ে খাবার তৈরি করলে পৃথিবীর লোক তা খেয়ে শেষ করতে পারবে না।' আর একজন বলবেন : 'আরে, সুন্দর মানুষ, দীর্ঘজীবী মানুষ তো আমরাই গড়ব; একেবারে হাতে হাতে ল্যাবরেটারিতে, বীক্ষণাগারে।' এমনি অনেক কথা আমাদের শুনতে হবে, যার একটাও মিথ্যা নয়, যা কোনোদিন ব্যাদে বা কোরানে ছিল না, অথচ যা প্রতিদিন আমাদের জীবনের মূল পর্যন্ত নাড়া দিচ্ছে, জীবনের ধারা ও সমাজব্যবস্থাকে দ্রুত এক বৈপ্লবিক রূপান্তরের দিকে ঠেলে নিয়ে চলেছে। বিশ্বাস করি আর না-করি, বিজ্ঞানের বিরাম নেই।
আমাদের দু-এক পুরুষ পরে যারা আসবে তারা দেখবে তাদের ফুলবাগানে সিনথেটিক ফুড তৈরি হচ্ছে, কসাইখানার জায়গায় উঠেছে খাবার তৈরির কারখানা। তালুইমা কি জানত যে একদিন তার নাতনির নাতনি ওই রেলগাড়ি চালাবে, উড়োজাহাজ চালাবে? বিকলমিয়াও নিশ্চয় ভাবতে পারেনি যে তারই নাতি একদিন প্রশস্ত মাঠের বুকের উপর দিয়ে ট্র্যাক্টর চালিয়ে যাবে, ঘরে বসে রেডিয়ো শুনবে, বিদ্যুতের আলো তার গ্রামের ঘরেই জ্বলবে। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের সভ্যতাও ঐতিহাসিক যুগ থেকে তো সেই দিকেই এগিয়ে চলছে। তাই লেনিন যখন 'সাম্যবাদ' কী? প্রশ্নের উত্তরে এককথায় বলেছিলেন : ‘Electrification plus the Soviets’— তখন তিনি প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাননি, উপরন্তু দূরদর্শী বৈজ্ঞানিকের মতোই জবাব দিয়েছিলেন। বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হ্যালডেনও বলেছেন : ‘Human progress in historical time has been the progress of cities dragging a reluctant countryside in their wake.’ ইতিহাসের চমৎকার সার কথা। গররাজি গ্রামাঞ্চলকে টেনেহেঁচড়ে মহানগরী টেনে নিয়ে আসছে তার দিকে— এই তো সভ্যতার ইতিহাস, ঐতিহাসিক যুগের। মহানগরী নগর, মফসসল শহর, মহকুমা শহর, বর্ধিষ্ণু গ্রাম— এইভাবে এগিয়ে আসছে সমস্ত দেশ, সমস্ত জাত— ব্যবহারিক জীবনের সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে নৈতিক জীবন, জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিমা। বিকলমিয়ার নাতি যে-দিন ট্র্যাক্টর চালাবে, রেডিয়ো শুনবে মাঠে বসে, আর মৌচাকের মতো দেশব্যাপী পঞ্চায়েতে তারাই গঠন করবে শাসনতন্ত্র, সেদিন বৈজ্ঞানিক সভ্যতা ও বিজ্ঞান সার্থক হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন