সাংবাদিক সাহিত্য

বিনয় ঘোষ

দৈনিক সংবাদপত্রে প্রতি সপ্তাহে অবসর দিনে অর্থাৎ রবিবারে যে সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্র বা 'সাময়িকী' প্রকাশিত হয় সে সম্বন্ধে কিছু বলব। আমরা এদেশে সাংবাদিকতা শিখেছি বিদেশি ইংরেজদের কাছ থেকে, একথা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করেন না। তেমনি 'সাময়িকী' আমদানি হয়েছে বিদেশ থেকে। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বৈদেশিক সংবাদপত্রেও এর কোনো চিহ্ন ছিল না। তখন কোনো শিক্ষণীয় ও জ্ঞাতব্য বিষয় জানতে বা পড়তে হলে পাঠকদের নির্ভর করতে হত 'মাসিক' বা 'ত্রৈমাসিক' পত্রিকার ওপর। সেকালে ইংলণ্ডের ‘Nineteenth Century’, ‘Contemporary’, ‘Fortnightlly’ মাসিক এবং ‘Edinburgh’ ও ‘Quarterly’ প্রভৃতি ত্রৈমাসিক পত্রিকা যেরকম প্রচুর সংখ্যায় কাটতি হত তা বোধহয় আজকালকার কোনো মাসিক বা ত্রৈমাসিকের পরিচালক কল্পনাই করতে পারেন না। কিন্তু এই সব পত্রিকার মূল্য খুব বেশি হওয়ার দরুন ইচ্ছা বা আগ্রহ থাকলেও সব পাঠকের পক্ষে কিনে পড়া সম্ভব হত না। দৈনন্দিন সংবাদ ছাড়াও বহু পাঠক যে আরও কিছু এই দুনিয়া সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছুক, এবিষয় প্রথমে উপলব্ধি করেন বিখ্যাত সাংবাদিক ডব্লু. টি. স্টেড (W.T.Stead)। তিনি তাই সব পত্রিকা থেকে উৎকৃষ্ট রচনা আহরণ করে একটি পত্রিকা প্রকাশ করলেন, ছ পেনি তার দাম। অল্পদিনের মধ্যেই পত্রিকাটির গ্রাহক সংখ্যা হল ৮৮,০০০। পত্রিকাটির নাম ‘Review of Reviews’।

পাঠকদের এই তাগিদ ও অভাব ক্রমে ক্রমে দৈনিক সংবাদপত্রের পরিচালক ও সম্পাদকেরাও বুঝতে আরম্ভ করেন এবং এই অভাব মেটাবার জন্যেই প্রাত্যহিক সাংবাদিকতার মধ্যেও ‘features’-এর প্রবর্তন করা হয়। তাতে সুবিধা হয় কি? প্রথমত, যেসব লেখার জন্যে বা যেসব বিষয়ে আলোচনার জন্যে পাঠকের একমাস কি তিনমাস অপেক্ষা করতে হত, দৈনিক পত্রিকায় ‘features’ প্রবর্তিত হবার ফলে পাঠকদের আর সেরকম দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার প্রয়োজন হয় না। দ্বিতীয়ত, লেখকরাও যে-বিষয় পাঠকদের নজরে তাড়াতাড়ি আনতে চান বা প্রকাশ করতে চান, এখানে সেই প্রকাশের সুবিধাও তাঁরা পেলেন। উপকৃত হলেন পাঠকেরা, সাংবাদিকতাও উন্নীত হল এক ধাপ। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মধ্যে একটা রফা হল, যে রফা রীতিমতো যুগোপযোগী। হু হু করে দৈনিকগুলোর পাঠক-সংখ্যা বেড়ে গেল এবং মাসিক, ত্রৈমাসিক, এমনকী পত্রিকাগুলোও সুযোগ পেল গভীরতর বিষয় নিয়ে আলোচনার এবং সুদীর্ঘ আলোচনাসাপেক্ষ রচনা প্রকাশের। এই ‘features’ প্রবর্তিত হবার অনেক পরে নিয়মিতভাবে দৈনিক পত্রিকাতে সাপ্তাহিক ‘magzine’ প্রকাশিত হতে থাকে, প্রধানত আমেরিকা থেকে। পরে ইংলন্ডে ও ইউরোপে এবং তারও বহু পরে অন্যান্য দেশে (আমাদের দেশেও) এই সাপ্তাহিক 'সাময়িকী' প্রকাশিত হয়।

অনেকে বলেন, দৈনিক পত্রিকায় এই 'ম্যাগাজিনে' চুটকি ব্যাপারের হালকা আলোচনাই ভালো। যুক্তি দেখিয়ে তাঁরা বলেন যে, সারা সপ্তাহ খেটে খেটে পাঠকদের মন তিতবিরক্ত হয়ে থাকে, স্নায়ুগুলো কটকট করতে থাকে, অতএব তাঁদের একটু প্রসন্ন করা দরকার এবং স্নায়ুগুলো সপ্তাহান্তে যাতে একটু আলগা হতে পারে সেইরকম হালকা আলোচনা প্রকাশ করা দরকার। কিন্তু এযুক্তির নব্বুইভাগ মিথ্যা এবং দশ ভাগ সত্যি, অন্তত পৃথিবীর বিশিষ্ট সাংবাদিক, এমনকী, সংবাদপত্রের মালিকদেরও তাই মত। হালকা বা হাসির বিষয় কিছু থাকা দরকার, একশোবার দরকার, পাঠক ক্লান্ত কেরানি, উকিল বা ডেপুটি বলে নয়, পাঠক 'মানুষ' বলে। মানুষ মাত্রেই হাসতে চায়— সেই জন্যে দরকার। কিন্তু আসলে অধিকাংশ পাঠক উদগ্রীব হয়ে থাকেন কী জন্যে? প্রতিদিনের কোলাহল ও কর্মমুখরতার মধ্যে তাঁরা অবসর পান না দুনিয়ার হালচাল ভালো করে জানার। অসবর দিনে তাঁরা কিছু জানতে চান, শিখতে চান, ভালো করে, বিস্তারিতভাবে, কারণ ওই একটা দিনই তাঁদের পুরো ছুটি। দুনিয়ার বুকের ওপর রোজ যা ঘটছে, পৃথিবী রোজ সাহিত্যে, শিল্পে, বিজ্ঞানে, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে— যেদিকে যেভাবে এগিয়ে চলেছে এবং যার চুটকি খবর তাঁরা দৈনিক সংবাদের মধ্যে পান, তারই একটু বিস্তৃত পরিচয়, ব্যাখ্যা ও আলোচনা তাঁরা পেতে চান অবসর দিনে। তার সঙ্গে একটু হাসতে চাইবেন বইকি! কিন্তু তাই বলে সপ্তাহান্তে রবিবারের সংবাদপত্র হঠাৎ এক মূর্তিমান গোপালভাঁড়ের মতো বাড়িতে এল এবং সারা দুপুর ও রাত দশটা পর্যন্ত কেবল হাসিয়ে পেটে খিল লাগিয়ে দিলে, এ নিশ্চয়ই কোনো সুস্থ পাঠক নেহাত মানুষ বলেই চাইবেন না। তা যদি চাইতেন তা হলে বাজারে শুধু ‘Punch’ ও 'অবতার'-ই চলত আর কিছু চলত না। কেবল খিল খিল করে হাসি আর কাতুকুতু অন্য ব্যাপার, অন্য শ্রেণির পত্রিকার জন্যে, কোনো সম্ভ্রান্ত দৈনিকের জন্যে কখনোই নয়। The Times, Daily Mail বা Daily Telegraph-এর মতো দৈনিকের জন্যে নয়, সেই শ্রেণির পাঠকদের জন্যেও নয়, যাঁদের মতামত ও কথা নিয়েই হয় public opinion এবং যে public opinion তৈরি করার, পরিচালনা করার দায়িত্ব সম্ভ্রান্ত দৈনিকের। বিখ্যাত সাংবাদিক উইখাম স্ট্রীড ('দি টাইমস' পত্রিকার ভূতপূর্ব সম্পাদক) তাই আক্ষেপ করে বলেছেন : ‘... public appetite for sound information can be underestimated by journalists or newspaper proprietors who trade upon what they imagine to be the public liking for vulgar trivialities. The day may come when a news-paper-maker of genius will understand how wide the field already is for journalism of a better sort and will cultivate it through a popular daily paper...’ (W.Steed : The Press)

এখানে বিজ্ঞাপনদাতাদের কথাও এসে পড়ে। বিজ্ঞাপনদাতারা অনেক সময় পত্রিকার ‘net sales certificates’ দেখে প্রলুব্ধ হন, মনে করেন বুঝি সেই পত্রিকাতে বিজ্ঞাপন দিলেই তাঁদের জিনিসে হু হু করে চাহিদা বাড়বে। কিন্তু এখানে একটা বিষয় বিজ্ঞাপনদাতাদেরও বিশেষভাবে ভেবে দেখা উচিত, কারণ তাঁদের উপরেই দৈনিক পত্রিকার অস্তিত্ব নির্ভর করে এবং সম্ভ্রান্ত দৈনিক পত্রিকার সম্ভ্রম বাঁচিয়ে রাখতে তাঁরাই পারেন। তা না হলে অনেক সময় পত্রিকাধ্যক্ষ বা সম্পাদকের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কাগজকে সস্তায় 'পপুলার' করতে হয় বিজ্ঞাপনদাতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে। পত্রিকার দুরকম 'সার্কুলেশন' আছে, একরকম ‘quantity circulation’, আর একরকম ‘quality circulation’ ভালো পত্রিকা অনেক বেশি লোকের হাতে ও মনে ঘোরে, নিম্নশ্রেণির কাগজের সংখ্যাধিক্য তার কাছে কিছুই নয়। যেমন ‘The Times’ পত্রিকা এবং বিলাতের অন্যান্য পত্রিকা। ষ্টীড সাহেব বলেছেন : ‘The higher class newspapers, whose actual sales may be barely a tenth of those claimed by the biggest ‘popular’ journals, probably pass through many more hands than do the ‘popular’ sheets. A single copy of ‘The Times’, for instance, is likely to be read or seen by many more people than a single copy of the ‘Daily Mail’ or the ‘Daily Express’. ‘The Times’ has therefore a ‘quality circulation’ both numerically and intellectually.’ (Ibid.) এ-কথাটা বিজ্ঞাপনদাতাদের বিশেষভাবে স্মরণ রাখা উচিত, বিশেষ করে যাঁরা ভালো জিনিসের বিজ্ঞাপন ভালো করে দিতে চান।

আধুনিক যুগের সম্ভ্রান্ত সংবাদপত্রের ‘quality’ সার্কুলেশন নির্ভর করে কোনো পক্ষপাতিত্ব না করে ‘news’ সরবরাহ করার উপর, বিশেষ করে ‘sound news’— ভালো সম্পাদকীয় আলোচনার ওপর এবং তার সঙ্গে উঁচু শ্রেণির সাপ্তাহিক 'ম্যাগাজিনের' উপর। যে পত্রিকা যত বেশি ‘news’ নিরপেক্ষভাবে পাঠকদের সরবরাহ করতে পারবে, যে-পত্রিকার 'সম্পাদকীয়তে' যত বেশি দৈনন্দিন ঘটনার জটিলতা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যাত হবে, যে-পত্রিকার সাপ্তাহিকী 'সাময়িকী' যত বেশি উন্নত ও সঞ্চয়যোগ্য বা ‘cutting’ রাখবার যোগ্য হবে, সেই পত্রিকার ‘quality’ সার্কুলেশন তত বেশি বাড়বে এবং সামাজিক বিচারে সেই পত্রিকার ‘popularity’-রও দাবি থাকবে তত বেশি। গড্ডলিকা প্রবাহে সস্তায় কিস্তিমাৎ করার চেষ্টার শেষ পরিণতি সুনিশ্চিত ব্যর্থতা।

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%