কিউ

বিনয় ঘোষ

এক নতুন অর্ধোদয় যোগের অভিজ্ঞতা হল একবার আমাদের, অর্থাৎ আমরা যারা শহরবাসী তাদের। এতদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্ত্রী-পুরুষদের লাইন দেখেছি কনট্রোল শপের সামনে। দেখতে দেখতে চোখ একরকম অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। প্রথম প্রথম মনটা বিদ্রোহ করত এই সভ্যতার বিরুদ্ধে। কতদিন ভাবতে ভাবতে রাস্তায় দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে পড়েছি। মনে হয়েছে দিই উড়িয়ে ডিনামাইট দিয়ে এই সভ্যতার উঁইঢিপিটাকে। কিন্তু পরক্ষণেই সিভিকগার্ডের ভয়ে কেঁচো হয়ে গিয়েছি। মনে মনে ভেবেছি, ছি ছি, কি ছেলেমানুষ আমি। মধ্যে মধ্যে এক একটা কিউয়ের দিকে গাড়োলের মতো হাঁ করে চেয়ে থাকি, চোখের সামনে দেখতে পাই নারীর নারীত্ব চেপটে চাপাটি হয়ে যাচ্ছে। দেখি, শহরের কাছাকাছি-গাঁ-থেকে-আসা ভুখতাড়িত পল্লিবালাদের অর্ধাবৃত দেহের উপর মুকুট-প্রতিনিধিদের বেঁটে বেঁটে ডান্ডার চাপ পড়ছে। পেটের জ্বালায় একটু কৃপাদৃষ্টির লোভে তারাও চেষ্টা করছে ওই গরম লাইনের ভিতর থেকেই টোপ ফেলতে। গার্ড কোথাও টোপ গিলছে, কোথাও গিলছে না, কোথাও বা গার্ডের ওপর গুন্ডারা টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে। এসব একরকম নিত্যদৃশ্য হয়েছে এই সভ্য মহানগরীতে। আর দেখে দেখে চোখ মন দুই-ই হয়েছে গন্ডারের চামড়া; কিছুই আর বেঁধে না, বাজে না সেখানে। সাইরেনের ভয়ংকর আর্তনাদের মতো ভিতরটা যখন ককিয়ে উঠতে চায় তখন নানারকম বীভৎস মুখভঙ্গিমায় তাকে বোবার মতো প্রকাশ করেই খালাস হই। হাজার হোক, নারায়ণ তো আমাদেরই গৃহদেবতা! গৃহদেবতার মতো আমাদের বুকও আজ শিলায় শিলিত, সব দুঃখ-কষ্টের নিস্তব্ধ গোরস্থান।

একবার যে-কোনো কারণেই হোক আমাদের মহানগরীতে দু-একদিন জল পাওয়া যায়নি। গায়ে ফোসকা পড়ার মতো গরম পড়েছে। রাজপথে রিকশাওয়ালার চামড়ার পা গলা গরম পিচের সঙ্গে আটকে যায়। এই অবস্থায় জলের দুর্ভিক্ষ সহজ কথা নয়। দুদিনেই গোটা মহানগরীতে সোরগোল পড়ে গেল, নতুন নতুন দৃশ্য চোখে পড়তে লাগল পথে ঘাটে। গঙ্গার ঘাটে দু-দশটা চন্দ্রগ্রহণের ভিড় হেদুয়া, কলেজ স্কোয়ার, ওয়েলেসলি স্কোয়ার, শহরের কোনো ট্যাঙ্ক বা পুষ্করিণীতে তিল পরিমাণ ঠাঁই ছিল না। বাঁধানো সিঁড়ির উপর শিশুদের, নারীদের, পুরুষদের পাশাপাশি 'কিউ'— জলে নামছে, ডুব দিচ্ছে আর উঠছে পানকৌড়ির মতো। তার উপর স্কোয়ার ঘিরে দর্শকদের ভিড়, কারণ এ জীবন্ত সিনেমা কি-না! আরও চমৎকার ও উপভোগ্য দৃশ্য দেখলাম কর্পোরেশনের জরুরি অবস্থার জন্যে খোড়া টিউবওয়েলে, সিকি মাইল লম্বা কিউ। এই কিউয়ের বৈশিষ্ট্য দেখলাম এই যে, কোনো কোনো জায়গায় মানুষ নেই, কলের কাছ থেকে বালতি-ঘড়া-ঘটি-গাড়ু-বদনা-কলসি-কুঁজো-হাড়ি-ড্রাম সার-সার চলে গিয়েছে কিউয়ের মতো, মালিকদের দূরে জটলা। শহরে এতদিন দেখছিলাম পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের কিউ। নোয়েল কাওয়ার্ডের ‘Waiting in a queue’ কাব্যটির রিফ্রেন আবৃত্তি করতে লাগলাম

Waiting in a queue

Waiting in a queue

Everybody’s always waiting

in a queue.

Fat and thin

They all begin

it’s grand––queueing it.

Everywhere you go

Everywhere you go

Everybody’s always standing

in a row.

Short and tall

And one and all

The same as sheep––

just keep–– doing it...

ট্রামে বাসে দেখলাম শহরবাসীদের মধ্যে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। একজন হ্যাটকোট-পরা ভদ্রলোক মুখের চুরুটের ফাঁক দিয়ে সহযাত্রীদের শুনিয়ে বললেন, ‘this is town life sir.’ সকলে সমর্থনের হাসি হাসলেন। অর্থাৎ ভাবটা এই— যেন তাঁরাও ঠিক ওই কথাটাই ভাবছিলেন, শহুরে জীবনের অসুবিধার কথা। অতএব সিদ্ধান্ত হল শেষপর্যন্ত, 'দাও ফিরে সেই অরণ্য, লও এ নগর।' মনে মনে ভাবলাম, ফিরিয়ে আর দিতে হবে না— বাস করছ অরণ্যেই, নগরে নয়। কথাটা বললে হয়তো হেঁয়ালি শোনাত। তা ছাড়া, প্রচণ্ড বিতর্কের সৃষ্টি করত। দরকার কি? বোবার শত্রু নেই, চুপ করে বসে রইলাম। বসে বসে মনে পড়ল আমাদের পাড়ার এক ফক্কর ছোকরার একটি গানের কথা। গানটি বোধহয় তার নিজেরই রচিত, মনোরাজ্যের অফুরন্ত প্রেমিকাদের লক্ষ্য করে। গানটি হচ্ছে : 'টুসকি মেরে পেইলে গেলি, মাইরি মাইরি মাইরি-মাইরি।' গানটি রসোত্তীর্ণ কি-না জানি না, তবে অশ্লীল নয়। ট্রামের সহযাত্রীদের 'সভ্যতা' সম্বন্ধে একই মনোভাবের পরিচয় পেলাম। আধুনিক সভ্যতাকে তাঁরা সকলেই ভালোবাসেন, তাতে ভোগ করতে চান কিন্তু চঞ্চলা চটুলা 'সভ্যতা সুন্দরী' যেন 'টুসকী' মেরে তাঁদের কাছে এসেও 'পেইলে' গেল। তাই বল্কলধারী ও অরণ্যচারী হবার বাসনা তাঁদের।

ট্রামের কামরা শ্রদ্ধানন্দ পার্ক নয় বা আমার ঘর নয়। তা না হলে একটা নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা হয়তো দিয়ে ফেলতাম শেষপর্যন্ত। বলতাম, যে স্ট্যান্ডার্ড ক্লথ দেখে আপনাদের বল্কলধারী হবার ইচ্ছে হচ্ছে, যে-জলাভাব খাদ্যাভাব দেখে আপনাদের অরণ্যচারী হবার বাসনা জাগছে, সেগুলোর কারণ কী তা কি একবার ভেবে দেখেছেন কেউ? গোড়ার গলদ দূর করুন, সভ্যতা-সুন্দরী টুসকি মেরে পালিয়ে যাবে না, প্রেম দেবে, ভালোবাসা দেবে, জীবনকে সুন্দর ও মধুর করবে। নগর ছেড়ে গ্রামে যেতে হবে না, গ্রামই নগর হয়ে উঠবে। এ-দোষ সভ্যতা সুন্দরীর নয়, সভ্যতার বর্তমান বিধাতা যারা তাদের। বক্তৃতাটা ভিতরেই সোডার মতো বজবজিয়ে উঠে ঠান্ডা হয়ে গেল। কাউকে শোনানো হল না।

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%