নগর-তীর্থ

বিনয় ঘোষ

সামান্য কয়েকটা আঁচড়ে আমাদের এ জীবনের কত ছবিই না ফুটিয়ে তোলা যায়! কুকুরের চাইতেও নগণ্য জীবন, পোকামাকড়ের চাইতেও বৈচিত্র্যহীন! তবু তো জীবন! মানুষের!

মানুষ মনে হয়, মানুষ নয়। মানুষের আকৃতিও নেই। ঝামার মতো রুক্ষ চামড়ার তলায় পাথরের মতো শক্ত মাংসের ঢেলা। শিরগুলো পাকানো দড়ির মতো, মনে হয় গিট পড়ে রক্ত চলাচল বন্ধ করবে বুঝি। স্নায়ুতে জং ধরেছে। তর্জনি স্পর্শে ঝংকার ওঠার দিন হয়তো একদিন ছিল, যখন এরা মানুষ ছিল, যখন রং ছিল এদের চোখে, সুর ছিল এদের মনে। বাইরের পৃথিবী হাতুড়ি পিটলেও আজ শুধু একটা বিকট ভাঙা আওয়াজ বেরোয়। ফুসফুস দুটো যেন আগুনের চুল্লি, ঘোলাটে চোখেও তাই আগুনের ফুলকি দেখা যায়। হিংসায় ভরা মন। রক্তলোলুপ বন্য পশু সব।

আমি থাকি শহরের এই অঞ্চলে মাঠ-কোঠার দোতলার একটা ঘরে। কোঠাটা একটু হেলানো, মনে হয় ঝড়ে উপড়ে পড়বে। নিচের তলায় একটা মুদির দোকান। পাশে একটা রুটির দোকান, রাতে নিয়মিত আমার ছ-খানা করে রুটি খাবার বন্দোবস্ত এখানে। সিঁড়ির ধারে চায়ের দোকান, 'গোলাপি কেবিন'।

'গোলাপি কেবিনের' ছোট্ট একটু ইতিহাস, এই ছবির নানারঙের একটা রঙ। প্রোপাইটর নিমাইচরণের স্ত্রী গোলাপি বড়ো ঝাঁঝাল মেয়েমানুষ। যেমন ছিল তার তেজ, তেমনি দম্ভ। তাড়ি খেয়ে নিমাইচরণ যে কয়দিন বেয়াদপি করেছে ঘরে ফিরে, ঠাস ঠাস করে গায়ে চড় মেরে এক-একটি দাঁত ভেঙে দিয়েছে গোলাপি। ভেউ ভেউ করে কুকুরের মতো কেঁদেছে নিমাইচরণ, পায়ে ধরেছে গোলাপির, গোলাপির মন গলেনি। একদিন যখন গোলাপির দুগাছা চুড়িতে টান পড়ল, ধস্তাধস্তি হল, গোলাপি সজোরে নিমাইচরণের মাথায় ঘটির একটা বাড়ি বসিয়ে দিয়ে সেই যে বাপের বাড়ি চলে গেল, আর আসেনি। দুদিন পরে মাথায় পট্টি বেঁধে, রাস্তায় মান ভাঙানোর নানারকম ফিকির করে, নিমাইচরণ যখন শ্বশুরালয়ে পৌঁছল, তখন গোলাপির জলেডোবা ফোলা মৃতদেহ পুকুর থেকে ঘরের পিঁড়েয় তোলা হয়েছে। একবার শুধু তার ভ্যাপসা মুখের দিকে চেয়ে নিমাইচরণ ফিরে এসেছে নিজের ঘরে। তারপরেই নবাব নিমাইচরণের মমতাজ-বিবি গোলাপীর স্মৃতিরক্ষার্থে এই 'তাজমহল'। পৃথিবীর ইতিহাসে না হোক, আশপাশের বস্তির বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনের ইতিহাসে, গোলাপি কেবিনের ক্যানেস্তারার ভাঙা চেয়ারে, ছেঁড়া চাটাইয়ে, ছোটো ছোটো কাচের গ্লাসে, মাটির খুরিতে, এক পয়সার রুটিতে, চায়ে আর তাড়ির গন্ধে, নিমাইচরণের প্রেম নিত্য-নূতন অমরত্ব লাভ করে। কেবিনের ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়ে এখনও গভীর রাতে মধ্যে মধ্যে নিমাইচরণ তাড়ির মাত্রাধিক্যে গোলাপির হাতের ঠোণা খাওয়ার জন্যে বিনিয়ে বিনিয়ে নাম ধরে কাঁদে।

সকলে তখন ঘুমোয়। বিনিদ্র চোখদুটো আমার ছোটো জানালার ফাঁক দিয়ে তারায় ভরা উদাস আকাশের দিকে নিবদ্ধ থাকলেও, কান আমার শুধু কান্নাই শোনে।

আমার পাশের ঘরে একজন এজেন্ট থাকেন। দরজার সামনে পিচবোর্ডের উপর কালি দিয়ে লেখা— 'হরিহর গণ, এজেন্ট।'। এঁর সঙ্গে আমার আলাপের একটু ইতিহাস আছে। মধ্যে মধ্যে খুব ভোরে এঁর ঘর থেকে শুনি হারমোনিয়ামের শব্দ, সুরের আলাপ। তন্দ্রার ঘোরে সংগীতের বাণী কোনোদিন মন দিয়ে শুনিনি। ঘুম থেকে উঠে ঘর দেখি তালাবন্ধ। তারপর নিজের কাজে বেরিয়ে যাই সারাদিন, দেখা হয় না, রাতে এজেন্ট কখন ঘরে ফেরেন জানি না। একদিন হঠাৎ সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দেখি, এজেন্টের ঘরের দরজা বন্ধ, ভিতরে ঘুঙুরের শব্দ হচ্ছে, নাচের তালে তালে। শুনে থমকে দাঁড়ালাম। দরজায় করাঘাত করতেই যিনি খিল খুলে সামনে দাঁড়ালেন, ইনিই যে এজেন্ট ইতিপূর্বে কল্পনাও করতে পারিনি। নারীর বেশ ও হাবভাব, পুরুষের স্বর ও আকৃতি। পায়ে ঘুঙুর। হারমোনিয়াম গলায় ঝুলবার জন্যে প্রস্তুত। বললাম, 'আপনিই কি এজেন্ট?' কর্কশ কণ্ঠে জবাব এল, 'হ্যাঁ, মাজন চান? বগলাবাবুর দাঁতের মাজন— দাঁত দিয়ে রক্ত পড়া, পুঁজ পড়া, দাঁতের গোড়া কন কন করা, বদহজম, মুখের গন্ধ, দাঁতের কোটিং, মাড়ি ফোলা, দন্তশূল, দাঁতের গোড়া নড়া—' নিশ্বাস তখনও ফুরোয়নি। বললাম, 'থাক এখন, পরে হবে'। আবার একবার দম নিয়ে হরিবাবু বলতে লাগলেন, 'কী করব স্যার! ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়েছি, দেশে মা আছে বোন আছে বিবাহযোগ্যা, ভাই আছে, ঘরে খাবার নেই, ব্যাকার! ভিক্ষে করলে কেউ দেয় না, বলে সং সেজে খাচ্ছি— নিন না স্যার দুটো ভালো জিনিস, দাঁতের গোড়া—'। বাধা দিয়ে বললাম, থাক। কাঠের পুতুলের মতো কথাগুলো শুনে, দু-প্যাকেট মাজনের দাম দিয়ে চলে এলাম কলের মতো সোজা ঘরে। সঙ না সাজলে যে শহরে ভাত জোটে না, আমার এ কথাটা বোধহয় গণ মশাইয়ের কানে পৌঁছয়নি।

মাঠকোঠার দোতলার দক্ষিণ দিকে দেড়হাত চওড়া একটা কাঠের রেলিং দিয়ে ঘেরা বারান্দা। সামনে হাত দশেক জমি পার হয়েই রাস্তা। রাস্তার উপরে বড়ো বড়ো বাড়ি। সন্ধ্যা হলেই অর্গ্যান, রেডিয়ো আর গ্রামোফোনের ঐকতান শুরু হয়। মাত্র বিশ হাত চওড়া একটা রাস্তার ব্যবধান, এদিক আর ওদিক। অথচ আমরা যেন বিশ হাজার মাইল দূরে শহর থেকে বিচ্ছিন্ন। কোনোদিক থেকে কিছুরই মিল নেই রাস্তার এপারের সঙ্গে ওপারের।

উত্তর দিকে ভিতরে একটা দু-হাত চওড়া বারান্দা। এক কোণে কাঠের সিঁড়িটা বারান্দা থেকে জমির সঙ্গে লাগানো। ভিতরের এই বারান্দায় দাঁড়ালে একটা মাঠ চোখে পড়ে, তাও অনেক দূর। মধ্যে প্রায় তিনশ গজ জায়গা জুড়ে বৃত্তাকারে বস্তি। কতকগুলো খোলার ঘিনজি ঘর যেন মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে রয়েছে মাঠকোঠার কোল ঘেঁষে। এই বারান্দায় দাঁড়ালে অনেকগুলো ঘরের 'অন্দর' পর্যন্ত দেখা যায়।

কিছুদিন আগে, আজও মনে আছে আমার, উত্তরাধিকারী সূত্রে প্রাপ্ত জীবনের 'আশা' তখনও ছাড়তে পারিনি, একদিন গিয়েছিলাম চাকরির উমেদারি করতে একজন উচ্চপদস্থ নগরকর্তার বাড়ি। এই মহানগরীর এই অঞ্চলেরই স্বাস্থ্যরক্ষার ভার তাঁর উপর ন্যস্ত। তাঁর বাড়ির একটি কোণে গোয়ালঘর দেখেছিলাম— সিমেন্ট করা মেঝে, সিমেন্টের ছোটো ছোটো দেওয়াল তোলা, প্রত্যেকটাতে এক-একটি নাদুসনুদুস ভাগলপুরী গাই। স্বাস্থ্যের জন্যে ভাগলপুরী গাইয়ের মোটা বাঁটের দুধ খুব উপকারী নিশ্চয়ই।

বস্তির ঘরগুলো গোয়ালঘরের তিন ভাগের এক ভাগ। সামনে একটা মানুষের দৈর্ঘ্যের সমান একটুকরো ঘেরা পিঁড়ে, তারই একদিকে হাঁড়িকুড়ি, একদিকে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দেওয়া দড়ির খাটিয়া। প্রত্যেক ঘরে দুজন থেকে চারজন বাসিন্দা। বাসিন্দারা ধাঙড়, ময়লা ফেলা কুলি, ঝাড়ুদার ইত্যাদি। শহরের আবর্জনা প্রত্যহ ধুয়েমুছে, ঝাঁট দিয়ে, কোদাল টেনে সাফ করা এদের কাজ। শোনা যায়, এ কাজ নাগরিকদের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্যেই।

ভাগলপুরী গাইয়ের মোটা বাঁট দিয়ে দুধ ঝরে না এখানে। এক কোণে একটা তিন হাত লম্বা কল আছে, প্রায় তিনশো ছেলেমেয়ে বুড়োর জন্যে সকালে বিকেলে চার ঘণ্টা করে তারই সরু নল দিয়ে ক্ষীণধারায় জল ঝরে। ড্রেনের শিশুরা মাথায় মুখে ময়লা মেখে এসে তারই তলায় মহানন্দে গড়াগড়ি দেয়, নলটা মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে টান মেরে জল বার করে তৃষ্ণা দূর করে। মা বোনেরা অনাবনৃত হয়ে পিঠ বুক মাথা ভিজিয়ে স্নান করে। কলের সোজাসুজি রাস্তার কোণটিতে এই সময় গ্যাসের তলায় ও বিড়ির দোকানের বেঞ্চিতে ভিড় জমে। একটু আধটু গজল গানও চলতে থাকে।

বুধন ধাঙড় এই বস্তিরই একটা ঘরের মালিক। মালিক মানে বাসিন্দা। বুধন ময়লাফেলা গাড়ির কুলি। মেয়ে দিরয়া ঝাড়ু হাতে, আলো আঁধারের সন্ধিক্ষণে, প্রত্যুষে, রাস্তা ঝাঁট দিতে বেরিয়ে যায়। নির্দিষ্ট রাস্তার কোণে ছোটো একটি বকুলগাছের তলায় ভঞ্জু ধাঙড় চুপটি করে বসে থাকে। দরিয়া দুলতে দুলতে যায়।

বুধন কোদাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে লরির প্রত্যাশায়। গাল দেয় দরিয়াকে। দিনরাত দরিয়ার বিরুদ্ধে সকলের অভিযোগে বুধন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। একদিন কাজে না গেলে ভঞ্জু ঘরের পাশে এসে শিস দেয়, ব্লক সর্দার দরিয়ার ঘরের পিঁড়েতে বসে বিড়ি টানে। জিলা ইঞ্জিনিয়ারবাবুর বাড়িতে দরিয়া উপরি কাজ পায়। ইঞ্জিনিয়ারবাবুর মাতৃহীন ছেলেমেয়েদের পেরাম্বুলেটরে করে দরিয়াকে বেড়াতেও দেখেছে অনেকে। দরিয়ার জন্যে এত কেন?

বৃদ্ধ বুধন গাল দেয়, লাঠি নিয়ে মারতে যায়। লাঠি কেড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় দরিয়া। বস্তির সকলে ভিড় করে। এমন দৃশ্য নিত্যনৈমিত্তিক। মাঠকোঠার ঘর থেকে আমি দেখি আর শুনি। এক একদিন রাতে দরিয়া গলা ছেড়ে কাঁদে তার মায়ের জন্যে। বৃদ্ধ বুধনও কাঁদে মুনিয়ার জন্যে।

বুধনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় অপ্রত্যাশিতভাবে।

মাতাল নই, তবু মদ খাই আমি। চারিদিক থেকে দিনের পর দিন অকারণে সকলের যে-অভিযোগ আমার উপর স্তূপীকৃত হয়, তারই পচা দুর্গন্ধের কবল থেকে আমি মুক্তি পেতে চাই। মুক্তি পাই না, লোহার শিকলে বাঁধা পড়ি। তাই অসহায় শিশুর মতো মদের গন্ধে এইসব বিকলাঙ্গ জীবনের পর্বতপ্রমাণ নালিশের বিকট গন্ধ আমি ঢেকে দিতে চাই। দুঃসাহস আমার! শহরের সমস্ত আবর্জনা ও ড্রেনের বীভৎস গন্ধ যে-নালিশের উগ্র দুর্গন্ধের তলায় পড়ে কাঁদে, তাকে আমি উবিয়ে দিতে চাই মদের-গন্ধে!

এখান থেকে খানিকটা দূরে একটা দিশি মদের দোকান। লোকের ভিড় হয় খুব। দোকানের দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা হলঘর। পাশে ছোটো দুটো ঘরে কাঠের টেবিল আর বেঞ্চি পাতা। হলের মধ্যে বসবার কিছু নেই, খালি মদের পিপে চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। একটু এগিয়েই মদ বিক্রির কাউন্টার। বোতলের আর মদ ঢালার বগ বগ ধুপ ধাপ শব্দ। তারই ধার দিয়ে একটা ঘুপটি সিঁড়ি, দোতলায় ওঠার। উপর নীচে একই বন্দোবস্ত। দোকানের ভিতর ঢুকলেই পল্লিগ্রামের দশটি হাটের হই হই আওয়াজ শোনা যায়। পিপের উপর, মেঝেতে, বেঞ্চিতে, এক পয়সার পিঁয়াজি না হয় ছোলা ভিজে আর বোতল নিয়ে সকলে বসেছে। মোটা মোটা কাচের গ্লাসে ঢালছে, খাচ্ছে। অনর্গল বকুনি, চিৎকার, গোঙানি, কান্না, প্রাণখুলে গান চলতেই থাকে, বিরাম নেই। স্রোতের মতো লোক আসছে আর বেরুচ্ছে।

এখানে যারা আসে তাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। শ্মশানেও বিশেষ সম্মান আছে, কিন্তু এখানে সকলেই সমান। বেশিরভাগ নিম্নশ্রেণির মজুর। এখানকার মানুষগুলোকে এই সময় দেখে মনে হয় যেন এরা সব মালগাড়ির ইঞ্জিন, স্টেশনে এসে কয়লা, জল ভরতি করে নিচ্ছে, বোঝা নিয়ে আবার যাত্রা করবে। আর যে চিৎকার, কান্না আর গান, ওগুলো বাসি বাষ্প, ধূমায়মান আগুন আর ছাই।

দেওয়ালের গায়ে মৌলিক সাদা রঙের কোনো চিহ্নও নেই। তার উপর পানের পিচ, বমি আর থুতুর সংমিশ্রিত প্রলেপ। পেলিতি বা ফার্পো বা এম্পায়ারে সভ্য মানুষ আসে, এখানে আসে জানোয়ার। কারো মধ্যে যদি এ-যুগের সভ্য মানুষ কোথাও লুকিয়ে থাকে, দোকানের ভিতর পা দিলেই শ্বাসরোধে তার মৃত্যু অনিবার্য। সভ্যতার কোনো বালাই নেই এখানে।

বেঞ্চিতে একটি কোণে দেয়াল ঘেঁষে বসে, চল্লিশ পি. সি.-র এক নম্বর একটা পাঁইট শেষ করে ঢুলছি। আরএকটা পাঁইট আনবার অর্ডার দিয়েছি, তখনও এসে পৌঁছয়নি। আমাকে ঘিরে জন ছয়েক বসে ছিল, একজন পাঞ্জাবী ড্রাইভার, একজন নেপালি দারোয়ান, আর চারজন বোধহয় মুসলমান মিস্ত্রী। এদের সকলের সশ্রদ্ধ বন্ধুত্বে আমি বিব্রত হয়ে পড়লাম। নিজেদের বোতল থেকে আমাকে মদ ঢেলে দেওয়া, খাওয়ান, 'পিজিয়ে বাবু'— যেন আমি তাদের অতিথি।

হলের বীভৎস হল্লা তখন কানে শোনাচ্ছে হাজার খানেক ভ্রমরের গুন গুন গুঞ্জনের মতো। দোকানটাকে মনে হচ্ছে চলন্ত জাহাজ যেন টর্পেডোর ঘা লেগে ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের তলায়। চোখ বুজে বসে বসে ডুবছি।

এমন সময় ঘরে একজনের হঠাৎ আবির্ভাব হল। 'আরে মুনিয়া পিয়ারী, মুনিয়া, লখিয়া—'। আগন্তুকের সসংগীত নাটকীয় প্রবেশে আমরা সকলে অবাক হয়ে তার দিকে ফিরে চাইলাম। আমি সর্বপ্রথম উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, 'আইয়ে বৈঠিয়ে।' জবাব না দিয়েই বুড়ো একটা পিপের উপর চড়ে বসল। বগলে একটা বোতল, হাতে গ্লাস আর পিঁয়াজির একটা ঠোঙা। বললাম, 'আরে আইয়ে, তুম তো ভগবান হ্যায়'। সকলে সমস্বরে বলল, কিয়া ভগবান! বুড্ডা তো হামরা বাপ হ্যায়। 'আরে বাপরে বাপ' বলে বুড়ো পিপে থেকে মেঝেতে উপুড় হয়ে মাথা ঠুকলে কয়েকবার, হাত তুলে নমস্কার করলে। বুঝলাম না কেন। তারপর সেকি ডুকরে ডুকরে কান্না! এই বৃদ্ধই বুধন। কান্নার সঙ্গে কাহিনি। দশ মাস গর্ভবতী মুনিয়া একদিন ভীষণ প্রহার খেয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করে একটি কন্যা প্রসব করে মারা গেল। তারপরেই সঙ্গে সঙ্গে ঘরে আনতে হল মুনিয়ার ছোটো বোন লখিয়াকে বউ সাজিয়ে। তিন দিন মার খেয়ে এগারো বছরের লখিয়া ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল, আর ফিরল না। ছ'মাস থেকে দরিয়াকে বুধন কোলেপিঠে করে, এর ওর স্তন্য পান করিয়ে মানুষ করেছে। আর দরিয়া আজ প্রতিশোধ নিচ্ছে বুড়ো বাপের উপর। দরিয়ার জন্যে তার শান্তি নেই।

কাহিনি আর কান্না শুনতে শুনতে সকলে ঝিমুচ্ছে। আমি তখনও বেশ ডুবে যাচ্ছি। ঘণ্টা বাজল।

ভিড় ঠেলে বুধনের সঙ্গে বাইরে এলাম। বললাম, 'তোমাকে চিনি, বুধন'। বস্তির সামনে মাঠকোঠায় থাকি বলতেই সাদা ভ্রু জোড়ার তলা থেকে লাল চোখদুটো তুলে বুধন একবার আমার দিকে তাকাল। কী ভাবলে কে জানে! তারপর ভিড়ের মধ্যে তাকে আর দেখতে পেলাম না।

হলের অর্কেস্ট্রার সুর কানে ভেসে আসছে। ক্যাবারের রাত। আমার কানে তখন হাজার হাজার বুধনের কান্নার অর্কেস্ট্রা বাজছে।

বুধন তারপর একদিন মাত্র এসেছিল ভোরে আমার মাঠকোঠায়। সেই অভিযোগ, মুনিয়ার দুঃখ আর নালিশ। দরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মুনিয়ার দুঃখ, আর তার জীবনের। নগরকর্তারা তাদের কোনো আবেদনে কর্ণপাত করেন না। করদাতারাও ভুলেও কোনোদিন ভাবেন না, শহরের স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য যেটুকু আছে সেটুকু, ঠিক ওই দুটি জিনিসই ক্ষয় করে বাঁচিয়ে রেখেছে কারা! 'আমরা কি মানুষ না, বাবু?' বুধন বললে।

মানুষ? তার বিচারক আমি নই, তাই ভাবিনি কোনোদিন। শুধু মনে হয় আজ এতগুলো মানুষকে পশু করে কি প্রয়োজন কয়েকটা 'সভ্য মানুষ' তৈরি করার? আর কিই বা প্রয়োজন নগর গড়ার, যদি তার ভিতরে থাকে হিংস্র মানুষ, জানোয়ারে-ভরা মহারণ্য?

হাজার হাজার বছর পরে মানুষ প্রশ্ন করছে মানুষকে, 'আমরা কি মানুষ?' হাজার বজ্রের বিদ্রুপের অট্টহাসিতে এর উত্তর মিলবে না কি?

একদিন ভোরে উঠে দেখি বস্তির চারিদিকে সশস্ত্র প্রহরী।

কয়েকদিনে স্তূপে স্তূপে আবর্জনা জমল শহরের রাস্তায়, অলিগলিতে।

ময়লা জমাট বেঁধে গেল। দাবি বিবেচনা করবার সময় নেই। স্পর্ধার সীমা আছে। শাসন প্রয়োজন, কঠোর বিচার হবে ঔদ্ধত্যের।

মাঠকোঠার উত্তরদিকের বারান্দায় ঝুঁকে বিচার দেখলাম। এমন কি কঠোর!

পাশে আমার সেই সঙ্গী এজেন্টটিও ছিলেন। নির্বিকারভাবে আমার দিকে ফিরে তিনি বললেন, বেশ আছি মশাই, সঙ সেজে খাই, ভয় নেই। বললাম 'হু'।

সঙ্ঘ-সংগীত শুনলাম। অভুক্ত শিশুদের অসহায় ক্রন্দন, মেয়েদের করুণ কাতরানি, আর অর্ধমৃত পুরুষ-শিশুদের গোঙানি— সব মিলে নগর-নরকের এক অশ্রুতপূর্ব 'গ্র্যান্ড অর্কেস্ট্রা'।

কাজ যারা করবে না তাদের ঘর ছাড়তে হবে। ঘর তারা ছাড়ল। অনিরুদ্ধ জনস্রোতে বুধন, দরিয়া, কে কোথায় ভেসে গেল জানি না।

শেষ আঁচড়। রংও নিঃশেষ।

তিন-চারদিন পরে। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হলে রাস্তার বেরুলাম। ঘণ্টাখানেক মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। রাস্তায় প্রায় এক হাঁটু পর্যন্ত জল। ড্রেন বন্ধ, মুখ খোলা হয়নি। জল ছিটিয়ে মোটর চলেছে। ফুটপাথ ধরে আমি চলেছি। স্যাঁতসেঁতে মন।

বিদ্যুতের আলোয় দেখলাম দূরে রাস্তার কোণে স্তূপীকৃত পচা আবর্জনার পাশে কালো মতো কী একটা কুঁকড়ে রয়েছে। এগিয়ে আসতে রাস্তার আলোয় মনে হল মানুষ? আবার মানুষ? মানুষের কদর্য দুর্গন্ধ।

আলোতে মানুষই দেখলাম। পথিকরা তাকাতে তাকাতে নাকে রুমাল গুজে চলে যাচ্ছে। চলার গতিটা একটু সংযত হচ্ছে শুধু।

চারিদিকে জীবন্ত মানুষের পচা দুর্গন্ধ।

আবর্জনার মধ্যে একটা মরা কুকুরের আড়ষ্ট ঘাড় বেরিয়ে আছে। তার পাশে দলাপাকানো জীবটা হাটু কুঁকড়ে, ঘাড় বেঁকিয়ে পড়ে আছে। গায়ে সুরকি ও কাদার ছিটে এসে লেগেছে চলন্ত মোটরের চাকা থেকে। কালো পাথরখণ্ডের মতো অসাড়।

বিদ্যুতের আলোয় দেখলাম সাদা ভ্রু— লাল নয়, ফ্যাকাসে চোখ— মৃত বৃদ্ধ বুধন হাঁ করে রয়েছে।

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%