২হাস্যকৌতুক ও কিউ

বিনয় ঘোষ

হোস পাইপ নয়, কংক্রিটের হিউম পাইপও নয়, রীতিমতো রক্তমাংসের 'হিউম্যান' পাইপ। স্পিটফায়ারে ব্যোম থেকে দেখলে মনে হবে মানুষের পাইপ-লাইন। ডোবার মধ্যে বসে দেখলে মনে হবে মানুষের চিমনি। ক্যাম্বিস নয়, কংক্রিট নয়, ইস্পাত নয়— মানুষ। চৈত্রের চামড়া-পোড়া রোদে এরকম পাইপ আজকাল চারিদিকে দেখি মহানগরীর রাজপথে, অলিগলিতে। কখন দেখি জেলেপাড়ার মুদির দোকানে, কখন চিৎপুরের কান্তার আড়তে, সিনেমার কাউন্টারে, ঘোড়দৌড়ের মাঠে, কখন কলেজ স্কোয়ারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শ্রীশ্রীচেতাবনীর চেলাদের হস্তরেখার ছকের চারিদিকে। মণিপুরের ওদিক থেকে আসছে বিরাটকায় কলকি অবতার, রথিডং-এর দিক থেকে খর্বকায় জাপানি স্থলদস্যু। সভয়ে স্মরণ করি শ্রীশ্রীচেতাবনীকে আর মিস্টার উইনস্টন চার্চিলকে।

সেদিন চার্চিল ও চেতাবনীর শতনাম জপতে জপতে ঘরের দিকে ফিরছি, পথে দেখলাম এইরকম এক জ্যান্ত পাইপের সামনে ছোটোখাটো একটি জনসভার দৃশ্য। ব্যাপারটা আর কিছু নয়— একটি গর্ভবতী স্ত্রীলোক পাইপের তাতে বেহুস হয়ে পড়েছে, আর একজন প্রায় ঘণ্টা তিনেক ধরে শামুকের মতো এগিয়ে দোকানির হাত বরাবর পৌঁছে দৈবাৎ পিছলে গিয়েছে পাইপের গা থেকে। কংক্রিট ইস্পাতের পাইপ তাতে আগুন হয়, পিচের রাজপথ গলে যায়, মানুষের পাইপও ঘেমে হড়হড়ে হয়ে থাকে। স্ত্রীলোকটির দোষ নেই। স্বস্থানে প্রবেশাধিকার চাচ্ছে, পাচ্ছে না। পিছনের 'বনটিয়া' সখি আঙুল দেখিয়ে দিচ্ছে প্রায় দুশো গজ লম্বা পাইপের পুচ্ছপ্রান্ত। ফলে স্ত্রীলোকটির মূর্তি হয়েছে শ্মশানকালীর মতো— করাল বদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং। পাইপের পুচ্ছপ্রান্তে দাঁড়িয়ে 'পুচ্ছটি-তোর-উচ্চে-তুলে-নাচা'-মার্কা জন-কয়েক মধ্যবিত্ত 'সবুজ' খিলখিল করে হাসছে। কারণ বোধহয় ঘটনার উদ্ভটত্ব। একবার শুধু বিদ্যুতের মতো মনে হল, হুপ করে লাফিয়ে পড়ি ওদের ঘাড়ের উপর। হাঁচড়ে গায়ের ছাল তুলে নিই। কেন হল জানি না, বোধহয় রক্তের দোষ। কিন্তু লেজ যখন অনেক কষ্টে একবার খসিয়েছি তখন আবার প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরে যেতে লজ্জা হল। প্রতিক্রিয়ার উত্তাপ দ্রুত প্রায় ফ্রিজিং পয়েণ্টে নেমে এল। করুণ রস, বীভৎস রস ও হাস্যরসের ত্রিবেণী সঙ্গমে মন তখন আমার আরামে চিৎ সাঁতার কাটছে।

মাথা তো আর মাথা নয়— ভিমরুলের চাক। ভোঁ করে বেরিয়ে এল চিন্তার ভিমরুল ঝাঁকে ঝাঁকে। সেই হাসির খোঁচা। ভাবছিলাম কারা ওরা, এমন টনটনে রসজ্ঞান। ব্ল্যাক-মার্কেটের কাঁচাপাকা মালের দালাল অথবা শিল্পী। হয় সুপার-ব্রোকার, না হয় স্যাটারিস্ট। কিন্তু বাবুদের মুখের উপর খোসামুদে বয়স্যের ছাপই স্পষ্ট, শিল্পীর সৌম্যভাব নেই। যে দেশের লোক হাসতে ভুলে গিয়েছে সে-দেশে এমনি বয়স্যের হাসিই চোখে পড়ে বেশি। এদেশের ভুড়িওয়ালা ভুঁইয়াদের মেজাজ খুশ রাখার জন্যে যে হাফ-আখড়াই ও তরজার সৃষ্টি হয়েছিল একদিন আজ তাই ফিরে আসছে আবার বিংশ শতাব্দীর ফুলবাবু ও হাফবাবুদের দৌলতে।

যে-দেশের লোক হাসতে ও হাসাতে পারে না, বুঝতে হবে তার প্রাণশক্তি লোপ পেয়েছে। যে হাসে এবং হাসাতে পোরে সে-ই তো মানুষ। দার্শনিক বার্গসঁ তাই মানুষকে বলেছেন, ‘an animal which laughs and is laughed at.’ সত্যিই তো, হাসি বাদ দিলে তো মানুষের সংস্কৃতির ভাণ্ডার অর্ধেক খালি হয়ে যায়। সংস্কৃতির আর্যরসিকরা হয়তো বলবেন 'বিশুদ্ধ হাসি'র কথা, কিন্তু 'বিশুদ্ধ হাসি' মাঝে মাঝে পথে ঘাটে নজরে পড়ে, কেউ রাস্তার কলের জলে ফুঁ দিয়ে, কেউ বা ট্র্যাফিকের মধ্যে ক্রুশুবিদ্ধ যিশুর মতো দাঁড়িয়ে 'বিশুদ্ধ হাসি' হাসছে। কিন্তু সে হাসি দেশে যত কম দেখেন ততই মঙ্গল। হাসি সম্বন্ধে দ্বিতীয় কথা হল, হাসি সামাজিক। সমাজের ভিতরকার বিরোধ থেকে হাসির ফোয়ারা ছোটে। ভালো হাসি হাসতে হলে সমাজের মধ্যে এসে দাঁড়াতে হবে, সমাজ-সচেতন হতে হবে। তা না হলে রাজা হাসল, পারিষদ হাসল। যিনি হাসবেন তাঁর দায়িত্ব কম নয়। হাসি, শ্লেষ, বিদ্রুপ হবে উদ্দেশ্য-প্রধান, আর যিনি হাসাবেন তাঁর উদ্দেশ্য হবে ক্ল্যাসিক কমিডিয়ানের যা উদ্দেশ্য তাই— to chasten morals with ridicule?’

তাই বলে হিউমারিস্ট বা স্যাটারিস্ট গুরুমশাই নন, আর্টিস্ট। সোজাসুজি কান ধরে ঠাস করে চড় মারলে স্যাটারিস্টের চলবে না। হাত ধরে নিয়ে এসে তাঁর নায়ক নায়িকাদের দাঁড় করাতে হবে সমাজের মধ্যে, সমষ্টির মধ্যে। তারপর ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাতে তাদের মুখোশ এমনভাবে খুলতে হবে যাতে তাদের সত্তার প্রতিটি অণু-পরমাণু shame! shame!’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। নাট্যশালার অডিটোরিয়াম থেকে বাইরের বৃহত্তর সমাজের অডিটোরিয়াম পর্যন্ত পাঠক, দর্শক, শ্রোতাদের মধ্যে গায়ে যার বিঁধবে সে-ই বুঝবে। শিল্পীর কাছে কৈফিয়ত চাইলে তিনি বলবেন : ‘If I sometimes make you feel like a fool, remember that I have by the same action cured your folly, just as the dentist cures your toothache by pulling out your tooth. And I never do it without giving you plenty of laughing gas.’— (Bernard Shaw) আমি বলি, লাফিং-গ্যাসের সঙ্গে কিছু টিয়ার-গ্যাসও ছাড়া ভালো।

একসময় আমাদের দেশের কবিরা আমাদের শুনিয়েছেন স্ত্রীর পতিনিন্দা, সতীনের ঝগড়া। তারপর ইংরেজ প্রভুদের সংস্পর্শে এসে সমাজে যে নতুন ভাবধারা, নতুন আচার-ব্যবহার চালু হল, নতুন ও পুরাতনের সংঘাতে যে ভাব-বিরোধ ও আচার-বৈষম্য দেখা দিল, তার ফলে আমাদের সাহিত্যক্ষেত্রে এলেন ভবানীচরণ, প্যারীচাঁদ, কালীপ্রসন্ন, দীনবন্ধু, ঈশ্বর গুপ্ত,— হাস্যরসে ও ব্যঙ্গরসে আমাদের সাহিত্যের বহুদিনের অভাব এঁরা মিটিয়ে দিলেন অনেকখানি। বাংলার হাফ-আখড়াই, খেমটা-তরজার প্রভাব থেকে এঁরা একেবারে মুক্তি পাননি সত্যি, কিন্তু এঁরাই বাংলা সাহিত্যে সামাজিক ব্যঙ্গ রচনার স্রষ্টা। তারপর এলেন রবীন্দ্রনাথ, অমৃতলাল, দ্বিজেন্দ্রলাল, পাঁচকড়ি, বীরবল, কেদারনাথ, পরশুরাম, দিবাকর শর্মা, সজনীকান্ত দাস, বনফুল এবং আরও অনেকে। ক্রমে ক্রমে এঁদের মধ্যে অনেকেরই কলমের ধার কমে এল। হাসি 'সুড়সুড়িতে' এবং ব্যঙ্গ রঙ্গে পরিণত হল। তার কারণ, আজ আমাদের সমাজের ভিতরকার বিরোধ এত তীব্র হয়েছে যে, এঁদের শক্তিতে হাল ধরে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই পরস্পর-বিরোধী নানারকম আদর্শ ও ঘটনার আবর্তে যখন সমাজের বুকে ভয়ানক তোলপাড় শুরু হয়েছে ঠিক তখনই এঁরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, ভিড় দেখে পথের পাশে গা-ঢাকা দিচ্ছেন।

নতুন লেখকদের মধ্যে এই শক্তির পরিচয় আজও পাওয়া যায়নি। 'রাজবন্দি' লেখকদের দু-একজনের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই তা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। মালমশলার ভাণ্ডার যখন ভরতি তখন শুধু অক্ষম ও উদ্ভট কাব্য লিখে আমরা নিজেদেরই ব্যঙ্গ করছি। তা না হলে সেদিন ওই বাবুদের হাসি দেখে আজও চুপ করে বসে থাকি? ঊনবিংশ শতাব্দীর 'বাবু' আজ চেতাবনী ও চার্চিলের সাঁড়াশির মধ্যে বন্দি। আমার মাথায় এর বেশি আর কিছু এল না। মাথা তখন সোঁ সোঁ করছে, কানে ভোঁ বাজছে, পেট কোঁ কোঁ করছে। একখানা রামপ্রসাদী গুন গুন করতে করতে বাড়ি ফিরলাম শেষপর্যন্ত

এবার কালী তোমায় খাব—

গণ্ডযোগে জন্ম নিলে সে হয় যে

মা-খেকো ছেলে,

এবার তুমি খাও কি আমি খাই মা,

দুটার একটা করে যাব,

এবার কালী তোমায় খাব।

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%