জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক

বিনয় ঘোষ

ইস্পাত দিয়ে তৈরি নয় মানুষের সমাজ। তবে একেবারে মাটি দিয়েও গড়া নয় যে একটু ঝড়-জলে ভেঙে যাবে। বরং বলা চলে রি-ইনফোর্সড কংক্রিটের তৈরি, জাপানি বোমার ঘা লেগে তার কিছুই হবে না, বড় জোর একটু চিড় খাবে, না হয় গর্ত হয়ে যাবে। তাকে ভাঙতে হলে প্রয়োজন শত শত পাউন্ড ওজনের বোমা। কথা হচ্ছে, সমাজও ভাঙে, ভাঙতে তাকে হবেই, হয়ও। এক একটা যুগ যখন বাঁক ফেরে, বিপ্লবের মঞ্জীর বেঁধে পায়ে ইতিহাস যখন নৃত্য শুরু করে, তখনই পড়তে থাকে টন টন বোমা কংক্রিটের দেওয়াল ও ছাদের উপর। সমাজ ভেঙে যায়, একেবারে চুরমার হয়ে মিশে যায় ধুলোর সঙ্গে। কিন্তু ইতিহাস শুধু নটরাজ বা বাইজি নয়, প্রলয়-নাচন নেচেই তার মুক্তি নেই। ইতিহাস সুদক্ষ স্থপতিও (Architect), আবার নতুন পরিকল্পনায় তাকে গড়ে তোলে। এই ইতিহাস, চিরপরিবর্তনশীল মানুষের সমাজের এই হল গতিভঙ্গি।

আজকের যুগসন্ধিক্ষণেও তাই মানুষের সমাজ ভাঙনের হাত থেকে রেহাই পায়নি। টন টন বোমা শেলের আঘাতে শুধু মেঘচুম্বি হর্মমালাই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে না, শুধু গির্জার ও মন্দিরের চূড়াই যে ভেঙে পড়ছে তা নয়, পর্ণ কুটিরই শুধু পুড়ে ছাই হচ্ছে না। তার সঙ্গে কক্ষচ্যুত হচ্ছে হর্মবাসীরা, দেবতার আসন টলমল করে উঠছে, আর 'ছায়াসুনিবিড়' শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলির মানুষের বেড়াবন্দি শান্তিপ্রিয় জীবন প্রচণ্ড ঘূর্ণাবর্তে পড়ে আইঢাই করছে। সারা পৃথিবীব্যাপী আজ এই ভাঙনের পালা শুরু হয়েছে মহাযুদ্ধের মহাসংকটের মধ্যে। ইংলন্ড, আমেরিকা, পদানত ইউরোপ, মহাচীন, এমনকী আমাদের ভারতবর্ষও এই সংকট এড়াতে পারেনি। মহাযুদ্ধের বিভীষিকা ও আর্তনাদের অন্তরালে চলেছে সমাজের জীর্ণ পাঁজরের উপর নিষ্ঠুর ইতিহাসের নির্মম কুঠারাঘাত। জীর্ণ পাঁজর খসে পড়ছে, চারিদিকে ঘুণধরা দেওয়াল ভেঙে পড়ছে। আজ এমনই এক অবস্থা যখন রবীন্দ্রনাথের সেই 'বাঁধ ভেঙে দাও' গানের কথা মনে পড়ে—

বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও

বন্দী প্রাণমন হোক উধাও।

শুকনো গাঙে আসুক

জীবনের বন্যা উদ্দাম কৌতুক

ভাঙনের জয়গান গাও।

জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক

আমরা শুনেছি ঐ, মাভৈঃ মাভৈঃ মাভৈঃ

কোন নূতনের ডাক।

চিনের কথাই ধরা যাক, কারণ ঘরের পাশেই চিন। তা ছাড়া, সভ্যতার ঐতিহ্য ও সামাজিক অবস্থার দিক থেকে বিচার করলে ভারতবর্ষ ও চীনকে সহোদর ভাই বলা চলে। ক্ষিপ্ত গন্ডারের মতো আরণ্যক হিংস্রতায় নিপ্পনী সাম্রাজ্যবাদ আজ ছ বছর ধরে চিনের মাটি ও মানুষ দলেপিষে ফুড়ে চলেছে। এই ছ বছর চীন শান্তির আস্বাদ পায়নি, কিন্তু শান্তির অবসাদ তার রক্তাক্ত দেহের কোথাও নেই। মাঝে মাঝে চুংকিং থেকে তিব্বত ও ব্রহ্মদেশের মাথার উপরের কৃষ্ণমেঘ চিরে এদেশে ভেসে আসে চিনের আহত ও মুমূর্ষু নর-নারী-শিশুর করুণ আর্তনাদ, হোপাই ও হোনান থেকে মেঘদূত আসে সর্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষের মর্মান্তিক বারতা নিয়ে। কনফুসিয়াসের (Confucius) ঘরোয়া দর্শনের ঘুম পাড়ানি দোলায় লালিত চিনের নরনারী আজ ঘরছাড়া, লক্ষ্মীছাড়া। চিনের আদিম পরিবারের (clan family) গোরস্থান আজ যুদ্ধক্ষেত্রের পরিখা। একান্ত স্বার্থপর শান্তিকামী গৃহস্থের জীবন আজ সংকটের শতমুখী আক্রমণে ছত্রভঙ্গ। শুধু ছত্রভঙ্গ নয়, জীবনের তাগিদে, আত্মরক্ষার তাগিদে, আজ ছোটো ছোটো আদিম পরিবারের চোর-কুঠুরিতে বন্দি চিন মুক্ত ও মুক্তিকামী চিনের বৃহত্তম সমাজের ছায়াতলে আশ্রয়প্রার্থী। জাতির সংকট আজ চিনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনকে করেছে সমষ্টি-কাতর। চৈনিক সমাজের বহু পুরাতন দেয়াল আজ এমনি করেই ভাঙছে, এমনি করেই কনফুসিয়াস বিংশ শতাব্দীর চিনের জীবনের মহাযাজ্ঞিক অনুষ্ঠান থেকে অপৃসত হচ্ছেন। 'মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম জীবিত অবস্থায় বাপমায়ের সেবা করা, মৃত্যুর পর তাঁদের সশ্রদ্ধভাবে গোর দেওয়া, তারপর গোর দেওয়ার পর তাঁদের পুণ্য স্মৃতিপূজা করা'— এই বহু পুরাতন কনফুসিয়ান লোকপ্রবাদ আজ লোকান্তরিত। সেই আফিংখোর চিনের কিশোর-কিশোরীকে যদি আজ বলা যায়, 'তোমার সেবা প্রথম প্রাপ্য কার?' তা হলে তারা নিঃসংশয়ে মাথা তুলে বলবে 'চিনের', পরিবারের নয়। কত শত্রুকবলিত প্রদেশ ও গ্রাম থেকে চিনের কত যুবক-যুবতী হয়তো সারা জীবনের মতোই গৃহত্যাগী হয়েছে (বৈরাগী নয়) তবুও পূজনীয় বাপ-মায়ের জাপানি বশ্যতা স্বীকারের কাকুতিতে কর্ণপাত করতে তারা পারে নি। কনফুসিয়াসের লালেবাই-লালিত চিনের পরিবার আজ তাই বিকলাঙ্গ, খণ্ড-বিখণ্ড, চূর্ণ-বিচূর্ণ। শুধু তাই নয়, এই ভাঙনের পাশাপাশি চলেছে অনিবার্য গঠন। এও ইতিহাস। বহুভাষী চিনের জনসাধারণ চলেছে এক প্রদেশ ছেড়ে আর এক প্রদেশে, যেখানকার ভাব ভাষা ও আচার ব্যবহারের সঙ্গে তাদের কোনোই পরিচয় নেই। জল-বাতাসের ট্যাবু (taboo) অথবা গ্রামের টোটেমের (totem) কৃপায় এতদিন এসব ছিল তাদের কাছে বিদেশ বিভুঁই, সেখানে যাত্রা নিষেধ। আজ সেই নিষিদ্ধের (taboo) চিন-প্রাচীরের চিতাশয্যা রচনা করেছে ধুলায় অগ্নিবোমা। তাই দেখা যায়, হয়তো সেন্সীর কোনো রেস্তোরাঁয় চা-পান করছে একসঙ্গে এক ডজন প্রদেশের বারভাষীরা, য়ুনানের কোনো তাঁতশালায় তাঁতবোনা শেখাচ্ছে সাংহাইয়ের মেয়ে, মাঞ্চুরিয়ার পলাতক অধিবাসীরা হোনানের সৈনিকদের জন্যে তৈরি করছে ব্যান্ডেজ ও ইউনিফর্ম, শান্টং-এর আটাজীবী কৃষকদের দলবদ্ধ করছে হুনানের অন্নজীবী কৃষকদের, আবার ক্যান্টনের কোনো খোঁড়া সৈনিক বিবাহ করছে নানকিং-এর কোনো সদ্য বিধবাকে। এমনি করে চিনের পুরাতন বাঁধরুদ্ধ সমাজের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে, আর তার বাঁধমুক্ত জোয়ার এ-কূল ও-কূল, এ-গ্রাম সে-গ্রাম— একাকার করে দিচ্ছে। মনের মানা শাস্ত্রের বাধা কিছুই মানছে না।

চিনের বহু মধ্যবিত্ত পরিবার নেমে এসেছে বিত্তহীন শ্রমজীবীদের (proletariat) স্তরে। শিক্ষক, সৈনিক, ছাত্র, শ্রমিক এক জায়গায় একই অবস্থায় সমান আয় করছে, পাশাপাশি জীবনযাত্রা নির্বাহ করছে দিনের পর দিন, বছর পর বছর। রক্ষণশীলতা আজ চিনের জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই অশ্লীলতারই নামান্তর। সমান সৌভাগ্য দুর্ভাগ্য, সমান আশা-নিরাশা ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর সব অভিমান, সব অহঙ্কারকে স্টিমরোলারে পিষে সমতল করে দিচ্ছে। সব শুচিবায়ুতা সমবায় জীবনের সংস্পর্শে অন্তর্ধান করছে কর্পূরের মতো।

ধর্মেরও নিষ্কৃতি নেই। মৃত্যুর মুখোমুখি পরিচয়ের পর ধর্মভীরু সংস্কার-অন্ধ চীনের জনসাধারণের সামনে আজ বিরাট প্রশ্ন। চারিদিকে বুদ্ধ ও তাওয়ের মন্দির ভগ্নস্তূপে পরিণত। কোথাও বা এই মন্দির হয়েছে শত্রুর গণিকালয়, আবার কোথাও হয়েছে চিনা গেরিলাদের গোপন ঘাঁটি, অস্ত্রতৈরির ছদ্মবেশী কারখানা। তারপর চিনের শুভাকাঙ্ক্ষী জাপানি সৈনিকেরা যখন—

''গর্জিয়া প্রার্থনা করে

আর্তরোদন যেন জাগে ঘরে ঘরে।

আত্মীয় বন্ধন করি দিবে ছিন্ন

গ্রামপল্লীর রবে ভস্মের চিহ্ন;

হানিবে শূন্য হতে বহ্নি আঘাত,

বিদ্যার নিকেতন হবে ধূলিসাৎ,

বক্ষ ফুলায়ে বর যাচে

দয়াময় বুদ্ধের কাছে।—''

—তখন আফিংখোর জড়ভরত চিনেরও নেশার ঘোর কেটে যায়। মনে হয় ধর্মই আফিং। বুদ্ধের মন্দিরে বিশ্বাসের অগ্নি-আখরে যখন লেখা হয় 'দেবতা' তখনই মিৎসুই-মিৎসুবিসির পুষ্পকরথ আকাশ থেকে তার উপর বহ্নি-আঘাত হেনে লিখে দেয়— 'নাই'। 'অহিংসা পরম ধর্ম' বাণী তখন চিনের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে কি, যখন 'উৎকট দর্শন' জাপানিরা দাঁতে দাঁত ঘষে হিংসার উষ্মায় অধীর হয়ে সিদ্ধির বর চাইতে স্পর্ধায় চলে বুদ্ধের মন্দির তলে?

এমনি করেই ভেঙেছে আমাদের ভারতীয় সমাজ, আমাদের বাংলাদেশের সমাজ, বাংলার ঘর। প্রত্যক্ষ যুদ্ধের আস্বাদ বলতে যদিও আমরা মাত্র পেয়েছি মোট কয়েক টন জাপানি বোমা, তা হলেও সামগ্রিক যুদ্ধ কড়ায় গন্ডায় সুদে-আসলে তার পাওনা আদায় করে নিচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। বাংলার মাটি, বাংলার বায়ু, বাংলার আকাশ, বাংলার জল, বাংলার মানুষ, বাংলার সমাজ আজ সেই বিরাট পরিবর্তন ও আবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে। বাংলার বাঁধ ভেঙেছে।

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%