মধ্য-বিত্ত

বিনয় ঘোষ

আজব শহর কলকেতা।

রাঁড়ি বাড়ি জুড়ি গাড়ি মিছে কথার কি কেতা।

হেতা ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে বলিহারি ঐক্যতা';

যত বক বিড়ালে ব্রহ্মজ্ঞানী, বদমাইসির ফাঁদ পাতা।।

সরকারি সরবরাহ বিভাগে বেসরকারি বাবু ও বিবি-সরবরাহ শুরু হয়েছে। ট্রামে-বাসে তিল ধারনের জায়গা নেই। না-পুরুষ-না-রমণী-অবস্থা যাত্রীদের। কলকাতার বেলা দশটা। বেকারের দল সব সাকার হয়েছে, খাঁদিবুঁচিরাও বাদ যায়নি। বহু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার খাবি খেতে খেতে বেঁচে উঠেছে। যারা চিরদিনই নিষ্কর্মা, তারা সব আজ বিশ্বকর্মার কারখানায়, 'অর্ডন্যান্স' ফ্যাক্টরিতে। ভদ্রসন্তান শ্রমিক হয়েছে। নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন জীবন, শ্রমের চাপে চোয়াল ঠেলে উঠলেও, লাগছে মন্দ না। সরবরাহ বিভাগ আর অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বাদ দিয়ে যারা অবশিষ্ট থাকে, তারা সামান্য কিছু পুঁজি নিয়ে হাওয়াতে ঘুরছে, স্বাধীন হাওয়ায়। কেউ বিধান-ঘাঁটির সাব-কনট্রাকটর, বাকি সব চোরাবাজারের গোপন মজুতদারের প্রকাশ্য দালাল। কাঠ-কয়লা-আসবাবপত্তর লোহালক্কড়-তার-বল্ট- পাইপ-সুইচ-বালব-ব্লেড-কাপড়-কাগজ-কুইনাইন-চাল, নিত্য ব্যবহার্য যাবতীয় জিনিসের সর্বময় নিধিরাম সর্দার। ঢাল-তলোয়ার না নিয়েই কর্মক্ষেত্রে অনেকে অবতীর্ণ হয়, তারপর গুরুর কৃপায় ব্লেড-কাগজ-তার-বল্টুতে হাত পাকিয়ে, কিছু ব্যাংকে জমা দিয়ে, চেক বই পকেটে করে কুইনিন ও চালের উচ্চস্তরে উন্নীত হয়। শহরের কাফে-হোটেলে, রাস্তার মোড়ে এই দালালদেরই দর্শন মেলে বেশি। দুদণ্ড বসে এক কাপ চা নিয়ে গালগল্প করার জো নেই। পাশ থেকে, পিছন থেকে অনবরত দরদস্তুর শোনা যাচ্ছে। চারিদিকে চোরাবাজারের দালাল। চোরা জিনিসের দরদস্তুরের সঙ্গে চলছে দালালি-পলিটিক্স। জাপানিরা রেডিওয় বলছে সস্তায় চাল পাওয়া যাবে— মাইরি বলছি মা-কালীর দিব্যি! আরএকজন তার মধ্যে ফোড়ন দিল, মেয়েমানুষও। ভারতের নারীদের যারা বেইজ্জৎ করেছে, তাদের পালা আসছে এবার। ফিরিঙ্গি-মেয়ে বাড়ির ঝি— আই বাপ! তিয়েনৎসিনে জাপানিরা তো তাই করেছিল, স্কার্ট খুলে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল রাস্তায়, ডুগডুগি বাজিয়ে নাচিয়েছিল। আরএকজন বললে, সত্যি বলেছে না কি? জাতীয় স্বাধীনতার দালালি রূপান্তর। হাজার হাজার মণ চালের গুদামে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে আমার স্বদেশবাসী, সেখান থেকে ইংরেজ-বিদ্বেষী স্বদেশপ্রেমের অমৃতবাণী শোনা যাচ্ছে। সদর দরজায় স্বদেশপ্রেমের লাউডস্পিকার। হে দেশবাসী! চাল গুর্খায় খেল, আমেরিকানরা খেল, আর চাল সব আটক রয়ে গেল বর্মায়। সুতরাং গ্রামে চাল ১০০ টাকা মণ, শহরে ৪০ টাকা। খিড়কির দরজায় সেই ইংরেজের দপ্তরেই আনাগোনা, সেই গোপনে মুনাফালোভের ষড়যন্ত্র ও বকরার হিসেবনিকেশ, কারণ বর্মার চাল নেই, অর্থাৎ বাজারের প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা নেই, দেশি ব্যবসায়ীর পোয়া-বারো, সে-ই হর্তাকর্তাবিধাতা। কার সাধ্য তাকে মজুতমালের পর্বতপ্রমাণ গদি থেকে টেনে মাটিতে নামায়। ধন্য দেশপ্রেম! বলিহারি যাই জাতীয়তাবাদের, জাতীয় স্বাধীনতার!

গেল, গেল, গেল, রব উঠেছে মধ্যবিত্তশ্রেণির প্রতিনিধিদের কণ্ঠ থেকে। হায়! হায়! মধ্যবিত্ত গেল! সাহিত্যের মজলিসে, চক্রে, রাজনীতির ড্রয়িংরুমে, আসরে, সভায়, বিরাট বিরাট কেউকেটারা বুক চাপড়ে হা-হুতাশ করছেন, গেল মধ্যবিত্ত, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এতদিনের সাধের রাজনীতির বুনিয়াদ, এতদিনের সাহিত্য-সংস্কৃতির কংক্রিট-স্তম্ভ এবারে বুঝি সময়-সংকটের এক টনী বোমায় ধূলিসাৎ হয়ে যায়! তিষ্ঠ বৎস! মধ্যবিত্ত যায়নি। কোথায় যাবে? মধ্যবিত্ত গেলে রাজনীতির সভায় জাতীয়তাবাদের জাঁদরেল বক্তৃতা শুনে ঘন ঘন হাততালি দেবে কে? মধ্যবিত্ত গেলে বাপের চালের আড়তদারির সঙ্গে ছেলের দেশপ্রেম ও রিলিফ ওয়ার্ক একত্রে চালাবে কে? মধ্যবিত্ত গেলে সদর দরজায় স্বদেশ প্রেমের সাইনবোর্ড লটকে, খিড়কির দরজা দিয়ে সরকারি সেরেস্তায় মজুত চালের মুনাফার হিসেবনিকেশ করবে কে? মধ্যবিত্ত গেলে ওয়ার কনট্রাকটারিতে গলগণ্ডের মতো ফেঁপে পেট্রলের নিদারুণ অভাবের দিনেও হাম্বারে চড়ে হোটেলে যাবে কে? মধ্যবিত্ত গেলে চোরাবাজারের দালালির পয়সায় একশো টাকার 'হোয়াইট হর্স', 'জনি ওয়াকার' জলের মতো ঢক ঢক করে গিলবে কে, প্রাইভেট ‘Call House’-এ দুঃস্থ, অসহায় নিম্নমধ্যবিত্তদের পরিবার ধ্বংস করবে কে, তাদের স্ত্রী-কন্যাদের ব্ল্যাক-আউট রাতে সর্বনাশ করবে কে? মধ্যবিত্ত গেলে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জীবনরক্ষার জন্যে লঙ্গরখানা খুলবে কে, সস্তায় খিচুড়ি দেবে কে, জাতির জীবন-মরণ সংকটের দিনে ভেদ-বৈষম্যের বিষ ছড়াবে কে?

মধ্যবিত্ত যায়নি। দেশের এই ঘোর সংকট, এই বিরাট সামাজিক উলটপালট, উত্থান-পতনের অন্তঃস্থল পর্যন্ত দৃষ্টি দিলেই পরিষ্কার দেখা যাবে মধ্যবিত্ত যায়নি। মুমূর্ষু মধ্যবিত্ত যুদ্ধের গঙ্গাজল ছিটিয়ে রীতিমতো চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। যা গিয়েছে তা অতি সামান্য। তাও তারা নিশ্চিহ্ন হয়নি, জখম হয়েছে। গিয়েছে স্কুলমাস্টার, কারণ বছরের পর বছর মাস্টারি করে মগজ খালি হয়ে গিয়েছে, দালালির বুদ্ধি নেই। আর গিয়েছে বাঁধা স্বল্পবেতনের কেরানি ও চাকরে বাবুরা। এরা সকলেই জখম বা hard hit, কিন্তু একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়নি, গঙ্গা-যাত্রার অবস্থা থেকে আবার শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলছে। বাকি আর কেউ যায়নি। চোরাবাজারের দালাল, ব্যবসায়ী, যুদ্ধের টেকনিসিয়ান, কর্মচারী, কনট্রাকটর, কেরানি,— কেউ যায়নি। সবাই ফুলে ফেঁপে ফাটবার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে। চড়াদামের ব্যাবসার বাজার এরাই চাঙ্গা করে রেখেছে। ফিলম ও থিয়েটার ব্যবসায়ীর বাজার এরাই গরম রেখেছে। দোকানে এদের ভিড়, হোটেলে এদের ভিড়, চিৎপুর-চৌরঙ্গীতে এদেরই 'কিউ'। যুদ্ধের বাজারে এরা অমর, অক্ষয়, এদের মারবে কে? অতএব মাভৈঃ! মধ্যবিত্ত যায়নি। গ্রামের মহাজন, জোতদার, শহরের আড়তদার, ব্যবসায়ী, দালাল, এদেরই তো পৌষমাস।

মধ্যবিত্ত-অট্টালিকার দু-একটা খিলানের চটা উঠেছে মাত্র। বাকিটা ফেরো-কংক্রিট আর ইস্পাত দিয়ে পুনর্গঠিত হচ্ছে। মধ্যবিত্ত সমাজের একেবারে তলার দিকটা ভেঙে পড়েছে, বিপর্যস্ত হয়েছে। মধ্যের ও উপরের তলা একটার পর একটা তলা গেঁথে ধনিকদের স্কাইক্রেপারের সমদৈর্ঘ্যে পৌঁছবার প্রয়াস পাচ্ছে। শুধু তাই নয়। আরও গভীরে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, মধ্যবিত্ত সমাজের কলেবরও বৃদ্ধি হচ্ছে। যুদ্ধের আগে যারা শ্রমজীবী ছিল, দিন এনে দিন খেত, তারা আজ ছোটো কারখানার মালিক। বিরাট বিরাট লোহা-ইস্পাত অস্ত্রের কারখানার খুদে জোগানদার। নিজেরা হাঁপর টেনে তারা আজ আর হাতুড়ি পেটে না, আজ তারা বড় মিস্ত্রি, মালিক-মিস্ত্রি, বাড়িতে বসে তারা সাইগন রেডিয়ো শোনে, সেকেন্ড-হ্যান্ড মোটর ড্রাইভ করে মেট্রোতে যায়। এরকম একজন দুজন নয়, অনেকে। বিত্তহীন থেকে এরা মধ্যবিত্তের স্তরে একলাফে উঠেছে, তারপর ধাপে ধাপে মইয়ের মাথায় উঠতে চাইছে। সুতরাং মধ্যবিত্তের ভয়ডর নেই। মাভৈঃ মধ্যবিত্ত! বাংলার 'ব্যাঘ্রশাবক' বৃথাই বিলাপ করছেন, বৃথাই মাড়োয়ারি ভাইরা ষণ্ড-শুশ্রূষার জন্যে মাথা না ঘামিয়ে মধ্যবিত্তের রিলিফের জন্যে ব্যস্ত হয়েছেন। মধ্যবিত্ত মরবার নয়। অন্তত যুদ্ধের সময় তো নয়ই। কারণ মধ্যবিত্তের মস্তিষ্ক, মধ্যবিত্তের শ্রম ও সহযোগিতা না পেলে ধনিকদের যুদ্ধ চলে না। কোনোদিনই চলেনি। যতদিন যুদ্ধ ততদিন মধ্যবিত্তের আশা-ভরসা। তারপর অবশ্য একেবারে হতাশ হবার কিছু নেই। আজ যে মধ্যবিত্ত-প্রাসাদ ইট-পাথর দিয়ে ধাপে ধাপে গড়ে তোলা হচ্ছে, তার কয়েকটা তলা যুদ্ধের পর ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, কোনো চিহ্নই পাওয়া যাবে না। যুদ্ধের কলকারখানা, আত্মরক্ষার প্রতিষ্ঠান, যুদ্ধ-সংক্রান্ত ব্যাবসাবাণিজ্য থেকে যুদ্ধ-দানব যখন লক্ষ লক্ষ চাকুরিজীবী উগরে দেবে, তখনই আসবে বেকার ও অর্থনৈতিক ঘোর সংকটের সঙ্গে আসল মধ্যবিত্ত-সংকট। বাংলার ব্যাঘ্র-শাবকেরা সেইদিনের জন্যে প্রস্তুত হন, আজকে স্বশ্রেণির সমবেদনার পরদার অন্তরালে চুপিচুপি চোরাবাজারের মুনাফাখোরদের পিঠ থাবড়ে লাভ নেই, আজকের একতার নিষ্ঠুর সংগ্রামে সাম্প্রদায়িকতার কীলক প্রবেশ করিয়ে আত্মহত্যা করে লাভ নেই। যতদিন যুদ্ধ ততদিন মধ্যবিত্ত বাঁচবেই।

যারা মরবার মরেছে শুধু তারাই। আজও তারাই মরছে। বাংলার ছয় কোটি লোকের মধ্যে এক কোটি আন্দাজ নিঃস্ব, ভূমিহীন চাষি, আর দেড়কোটি আন্দাজ ভাগচাষি ও গরিব চাষি, জেলে, নাপিত, কাঁসারি, কুমোর; মরেছে এরাই, মরবেও এরাই। মধ্যবিত্ত মরেনি। সমগ্র বাংলার সমাজে যে বৈপ্লবিক বিপর্যয় ঘটেছে তা মধ্যবিত্ত সমাজে নয়, নিম্নের এই বিত্তহীন সমাজে। এই বিপর্যয়ের প্রতিক্রিয়া আজও তেমনভাবে সমাজে দেখা দেয়নি, মহাসংকটের জগদ্দলের তলায় চাপা পড়ে রয়েছে। শুধু সমাজ-দেহে নয়, সমাজ-মানসে পর্যন্ত যে পরিবর্তন এই বিপর্যয়ের অনুগামী হবে, তা যেমন বিরাট ও জটিল, তেমনি বৈপ্লবিক। কারণ নিম্নের এই বিত্তহীন সমাজে শুধু ঘর ভাঙেনি, পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি, তার সঙ্গে দিনে দিনে, মুহূর্তে মুহূর্তে ভেঙেছে চিরদিনের, চিরআদরের সংস্কার ও সংকীর্ণতা, ধ্যানধারণা, মূল্যবোধ, নীতিবোধ, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস— সব।

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%