বিনয় ঘোষ
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় লেখাগুলি লিখেছিলাম ১৯৪২-৪৩ সালের মধ্যে। দৈনিক 'যুগান্তর' পত্রিকায়, রবিবারের সাময়িকী বিভাগে, লেখাগুলি 'শ্রীবৎসের নানাপ্রসঙ্গ' নামে প্রকাশিত হয়। এই সাময়িকী বিভাগের আমিই তখন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলাম। 'শ্রীবৎসের নানাপ্রসঙ্গ' নামেই লেখাগুলি গ্রন্থাকারে সংকলিত হয় ১৯৪৪ সালে। তাড়াতাড়ি বিক্রিও হয়ে যায়, কেন জানি না, ৩৫ বছর আগেকার পাঠকরা জানেন। তাঁরা কেউ-কেউ মরে গিয়েছেন, কেউ-কেউ লেখকের মতো আজও বেঁচে রয়েছেন। পুরাতন পাঠক যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের দু-এক জনের সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞাসা করতাম, কেন তাঁরা বইটি কিনেছিলেন। যদি কেউ বলেন, বইটির দাম তখন দু-টাকা ছিল তাই, তাহলে অবশ্য বলার কিছু নেই, যদিও তখনকার দু-টাকার ক্রয়মূল্য ছিল এখনকার কুড়িটাকার বেশি ছাড়া কম নয়। মনে হয় লেখাগুলির একটা স্বাদ ছিল এবং একটা মূল্যও ছিল। স্বাদটা সাহিত্যিক, মূল্যটা সামাজিক। স্বাদ ও মূল্য দুটোই এখনও আছে বলে আমার ধারণা। একালের পাঠকদের শানিত জিবে স্বাদটা খুব মধুর না লাগতে পারে, কিন্তু বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতিতে লেখাগুলির মূল্য কিছুটা বেড়েছে বই কমেনি।
কমেনি তার কারণ গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আমাদের দেশের সমাজের ব্যাপক ভাঙন আরম্ভ হয়েছে, নৈতিক ব্যবসায়িক সাংস্কৃতিক ভাঙন। সেকালের মূল্যায়নের নোঙর ও মানদণ্ডগুলিও উপড়ে ভেঙে গিয়েছে। আজকালকার সমাজে যাদের আমরা বুক ফুলিয়ে চলতে দেখি, সেই ধান্দাবাজ চোরাকারবারি দালাল মিথ্যাচারী নব্যবাবুদের উৎপত্তি হয়েছে গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরিবেশে। এই শ্রেণির উৎপত্তিকালের পরিচয়, প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিতে, লেখাগুলির মধ্যে তুলে ধরেছিলাম, পঁয়ত্রিশ বছর আগে। সেইজন্য লেখাগুলির পুনর্মুদ্রণের প্রয়োজন বোধ করেছি। লঘুগুরুভঙ্গিতে কয়েকটি গুরুবিষয়েরও আলোচনা এই সংকলনে আছে। আজ লিখলে সেগুলি অন্যভাবে লিখতাম, কিন্তু তাহলেও তখনকার লেখার গুরুত্ব আজও অস্বীকার করা যায় না।
বিনয় ঘোষ
আগস্ট ১৯৭৯
যাদবপুর। কলকাতা ৭০০০৩২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন