বিনয় ঘোষ
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ কবি দেখেছিলেন ময়নাপাড়ার মাঠে এবং কালো তা সে যতই কালো হোক, তার কালো হরিণ চোখটাই শুধু কবির চোখে পড়েছিল। কয়লা কালো, কয়লা ময়লা এবং কয়লার ময়লা শতবার ধুলেও যায় না। একথা আমরা ইংরেজের কালা-আদমি প্রায়ই বলে থাকি। অথচ আজকাল পথ চলতে মহানগরীর পথে- হাটে প্রায়ই দেখা যায়, কবি একেবারে মূর্তিমান গদ্যের দল, ময়নাপাড়ার মাঠে নয়,কলকাতার অলিগলিতে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু একবারটি বস্তাবোরখাবন্দি অথবা বাঁশের চটা-বন্দি কয়লা-সুন্দরীর দর্শনের প্রত্যাশায়। দর্শনেই তাদের হৃদয় পুলকিত হয়ে ওঠে, আর স্পর্শে তো রীতিমতো রোমাঞ্চ হয়ই। কতদিন দেখেছি কয়লার ডিপোর সামনে কয়লার ঝুঁটি ধরে টানাটানি, মারামারি, হাতাহাতি, প্রেমিকাকে নিয়ে প্রেম-প্রতিদ্বন্দ্বীদের চুলোচুলি করার মতো। ইংরেজের কালা-আদমিদেরও যে এমন কয়লার কষ্ট হবে তা কি আর জানতাম! ময়লার এত রূপ, ময়লার এত গুণ, এই কয়লা-সংকটের আগে বোধ হয় এমন করে আর কেউ মর্মে মর্মে বোঝেনি।

কয়লার সোহাগের ধূম দেখে মনে হয়, কাকেরও সুদিন আসছে। এতদিন কবিরা কোকিলের সুমধুর কুহু কুহু ডাকের জন্যে কান পেতেছিলেন। কবে বসন্ত আসবে, ঝিরঝিরে সমীরণে শীতের শুকনো ঝরাপাতার খসখসানি আর নতুন পত্রের ঝলমলানির বারতা নিয়ে কবে আসবে কোকিল! ময়নাপাড়ার কালো হরিণ-চোখো কালো মেয়ের মতো কোকিলও কবির কল্পনায় রূপ পেয়েছে, কিন্তু কালো কুব্জা কয়লার মতো কোনো আদর পায়নি শুধু কালো কাক। মহাযুদ্ধকে শতকোটি ধন্যবাদ। আজ কয়লার অভিমান সার্থক হয়েছে। দুয়োরানি কয়লা আজ মহারানি। কাকেরও বিরহ-ব্যথা দূর হবার দিন এসেছে। কর্কশ কণ্ঠ কাক এতদিন আঁস্তাকুড়ের আশেপাশে, উচ্ছিষ্টের উৎস-সন্ধানে ঘুরে বেড়াত, আজ তার এসেছে সোনার সুযোগ। কিন্তু কোথায় কাক? কয়লাসংকটের সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে কাক-সংকট (crow crisis)। শুনেছি গত মহাযুদ্ধের সময় শকুনি বন্দি করার স্কোয়াড বেরিয়েছিল চারিদিকে, যুদ্ধক্ষেত্রে শকুনি ধরে চালান দেবার জন্যে। এবারও নাকি ওইভাবে শকুনি ধরে চালান দেওয়া হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রের মৃতদেহ উদ্ধার করার জন্যে। মানুষের খাদ্যসংকট, কিন্তু শকুনির আজ পোয়া বারো। আর পোয়া বারো মানবশকুনি মজুতদারের! আজ যুদ্ধক্ষেত্রে হাটে-মাঠে-গাঁয়ে-রাজপথে শকুনির আহার্যের প্রাচুর্য। শহরের রাজপথ থেকে মৃতদেহ স্থানান্তরের যে কঠিন সংকট দেখা দিয়েছিল, তার অনেকখানি সমাধান হত বাইরে থেকে শকুন ধরে চালান দিলে। কলকাতায় এমনিতে লোক বেড়েছে যথেষ্ট, সুতরাং হাজার কয়েক শকুনের কি আর স্থান হত না? তা হলে কর্পোরেশনের কর্মকর্তারাও রেহাই পেতেন, আর সরকার বাহাদুরকেও বিবৃতি দিয়ে ব্যতিব্যস্ত হতে হত না। কিন্তু হায়! শকুনেরও সংকট (crisis of vultures)! শকুন গিয়েছে বর্মায়, মালয়ে, সিঙ্গাপুরে, শকুন গিয়েছে আফ্রিকায়, সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরের উপর দিয়ে বিমানযোগে হয়তো এতদিন ইটালিতে। কোথায় শকুন, বিপদভঞ্জন মধুসূদন! একবার দেখা দাও, শহরের রাজপথে রাজপথে একবার দেখা দাও, কাউন্সিলার আর মন্ত্রীদের বিবৃতি থেকে বাঁচাও, আর আমাদের বাঁচাও মহামারী থেকে, শবের দুর্গন্ধ থেকে, বীভৎসতা থেকে! এ-সভ্যতার 'এঞ্জেল' তুমি, হে শকুন! ভাগাড় আর বাদাড় থেকে একবার মুক্তপক্ষে আকাশখানা ঢেকে উড়ে এসো যোব চার্নকের মহানগরীতে!
তাই বলছিলাম, কাকের শুভদিন আসছে। শকুন নেই, অতএব কাকের কলরব এবার আর কর্কশ লাগবে না। পথ চলতে স্তূপীকৃত আবর্জনার দুর্গন্ধ যখন নাসিকারন্ধ্রে প্রবেশ করে, কড়কড়ে বাসি মৃতদেহ যখন জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে, তখন মনে মনে আমি অন্তত কোকিলকে নয়, কুশ্রী ও কর্কশ কালো কাককেই ভক্তের ভগবানের মতো স্মরণ করি। কলকাতা শহরে কর্পোরশন কাকের আমদানি করুন, সরকার কাক ধরার জন্যে অফিসার নিয়োগ করুন, তা হলে ময়লা ও মৃতদেহ সাফ করার সমস্যার অনেকাংশে সমাধান হবে। কয়লার মতো কাকের অভাবও নিদারুণ অনুভব করছি, দেখছি সভ্যতার তমোগুণে কালোরই এবার জয় হচ্ছে। এদিকেও দেখুন, আলোর অস্তিত্ব লোপ পেয়েছে, কালো অন্ধকার চতুর্দিকে বিরাজমান। বিষাক্ত কালো সভ্যতা ফণা তুলছে, তাই আজ কালোর এত আদর। কালো আজ সভ্যতার তাজ, আলো নয়।
বলছিলাম কয়লার কথা, রসিকতাও করিনি, হেঁয়ালিও করিনি, করবার মতো দুঃসাহসও নেই। ঘরে ঘরে আজ খনির আগুন মাথায় উঠেছে, সুতরাং কয়লা নিয়ে ঠাট্টা চলবে না জানি। আসলে আমাদের দেশে কয়লার সমস্যাটা কী রকমের? কয়লা যা এদেশে তোলা হয় খনি থেকে তার অনেকটাই নষ্ট হয় ভালো ‘processing’-এর অভাবে। অর্থাৎ কয়লা কাঁচা এবং খনিজ অবস্থায় নানারকম ব্যবহারের জন্যে চালান দেওয়া হয়, তা থেকে শক্ত এবং নরম জ্বালানি কয়লা (hard ও soft coke), আলকাতরা, অ্যামোনিয়াম বা গ্যাস তৈরি করার শিল্প-প্রতিষ্ঠানের অভাব। এ-ছাড়া coking coal-এর প্রধান ব্যবহার হওয়া উচিত লোহা গলানোর কাজে (iron smelting), কিন্তু তা করা হয় না। ফলে এমনই সংকটের মুখে আমাদের দেশের বর্ধিষ্ণু লোহা ও ইস্পাতের শিল্পবাণিজ্যকে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, কয়লা-বিশেষজ্ঞরা বলেন, আগামী ষাট বছরের মধ্যে ভারতের খনিগর্ভস্থ মোট জ্বালানি কয়লা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং লোহা গলানোর জন্যে আর কয়লা মিলবে না। ভারতে প্রচুর খনিজ লোহা মজুত আছে কিন্তু কয়লার অভাবে নাকি ভবিষ্যতে এমন অবস্থা হবে যে এই লোহা বিদেশে চালান দিতে হবে। এটা মোটেই সুলক্ষণ নয়। Coalfields Committee (1937), Coal Mining Committee (1937), Dr. Fermar, Dr. Fox, Mr. Simpson-প্রমুখ বিশেষজ্ঞদের কমিটি ও বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, (১) প্রথম কয়লা কাটার সময় এত বেশি কয়লা তোলা হয় যে, খনির ভিতরের ভারস্তম্ভগুলি দুর্বল হয়ে যায় এবং আগুন, জলপ্রবাহ প্রভৃতি নানারকম দুর্ঘটনা ঘটে; (২) ভালোভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কয়লা কাটার ব্যবস্থা করা হয় না; (৩) ‘rotational working’, অর্থাৎ নীচের 'সিম' (seam) আগে কাটার ফলে উপরের 'সিম'-গুলোর যত্ন নেওয়া হয় না। নীচের সিমের কয়লা ভালো বলে মালিকেরা মুনাফার লোভে আগে সেই গুলি কাটেন। উপরের সিমের কয়লা একটু খারাপ হলেও সেগুলোকে বালি ঠেসে (sand-stowing) ভালো করে রক্ষা করার ব্যবস্থা হয় না, ধসে পড়ে দুর্ঘটনা তো ঘটেই, কয়লারও যথেষ্ট অপচয় হয়। ঝরিয়া ও রানীগঞ্জের কয়লাখনিতে এই ‘sand-stowing’-এর অভাবে ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া, নানা জায়গায় কয়লার খনি আছে জেনেও সেগুলোকে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা হয় না। শুধু তাই নয়, কয়লার খনিতে কয়লা তুলতে তুলতে হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনার জন্যে বা মুনাফার অংশ সামান্য কমে যাওয়ার জন্যে মালিকরা খনি ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র খনি সন্ধানে যাত্রা করেন। ফলে সেই খনিটা অকেজো হয়ে যায়, বহু কয়লা তার তলায় পড়ে থাকে অব্যবহৃত অবস্থায়। যেসব জমিদার এই সব জমি 'লিজ' দেন, তাঁরাও সে রকম কড়া নিয়ম কিছু করেন না যে মালিকেরা খনির সদব্যবহার করতে বাধ্য হন। এইরকম নানাভাবে আমাদের দেশে এত বেশি কয়লা অপচয় হয়ে থাকে যে, আজ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি প্রত্যেক কয়লা-বিশেষজ্ঞ বলেছেন যে, ভারতকে অদূর ভবিষ্যতে শোচনীয় সংকটের সম্মুখীন হতে হবে। অদূর ভবিষ্যৎ যে বেশি দূরে নেয় তা আজই আমরা মনেপ্রাণে বুঝতে পারছি।
যুদ্ধের সময় এমনিতেই কয়লার চাহিদা অত্যন্ত বেশি। অতিরিক্ত কল-কারখানায় কত চুল্লি যে অহরহ জ্বলছে আর রাক্ষসের মতো কয়লা গিলছে তার ইয়ত্তা নেই। সেই দিকে নজর রেখে উচিত ছিল কয়লা উৎপাদন বাড়ানো। কিন্তু উৎপাদন বাড়েনি। কয়লা উৎপাদনের যে ‘Index’ কিছুদিন আগে ‘Capital’ পত্রিকা প্রকাশ করেছেন তাতে দেখা যায়, ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ছিল ১২০ আর ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে হয়েছে কমে ১১৫। এদিকে যুদ্ধসামগ্রী উৎপাদন বৃদ্ধির তাগিদে কয়লার চাহিদা বেড়েছে অনেক। সুতরাং সংকট আর কতদিন লুকিয়ে থাকবে? তারপর শুধু ওয়াগনের অভাব নয়, শিল্প-পরিকল্পনার শোচনীয় অব্যবস্থার জন্যে কয়লা এক শিল্পকেন্দ্র থেকে আর এক কেন্দ্রে চালান দিতে মালগাড়ির ইঞ্জিন যে কি পরিমাণ কয়লা পোড়ায় তা কল্পনা করতেও ভয় হয়। এর কি কোনো উপায় আছে?
সমাধানের নির্দেশ অবশ্য ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটি দিয়েছিলেন। প্ল্যানিং কমিটির প্রস্তাব হচ্ছে : ‘We consider that in the interests of the nation it is imperative that coal mines and the coal mining industry... should be completely nationalised.’ অর্থাৎ রাষ্ট্রের উচিত কয়লা উৎপাদন, নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়া। কয়লাশিল্পকে রাস্ট্রিকরণের (Nationalisation) যে প্রস্তাব প্ল্যানিং কমিটি দিয়েছেন তা একশোবার সমর্থনযোগ্য, কিন্তু কে সেই প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ করবে? রাষ্ট্র? সরকার? খনিমালিক?
জ্যোৎস্নালোকিত যামিনীতে মহানগরীর রাজপথে আমি তাই ধ্যাননিবিষ্টচিত্তে আজ স্মরণ করি কাক ও কয়লাকে, কারণ কয়লা তা সে যতই ময়লা হোক, এ যুগের কবির কাছে সে কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ। মনে মনে বলি :
হায় কয়লা ! তুমি কি শুধু কয়লা?
ঐ যে মেয়েটি ময়লা
ঐ যারা করে আছে ভিড়
নগরীর নীড়
তুমি কি তাদের মতো সত্য নও?
তুমি শুধু কয়লা, হায় কয়লা?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন